Sunday, 21 July, 2019, 3:26 PM
Home আইন-আদালত
শুনেই হতবাক, ‘কে কইল’
আইপোর্ট রিপোর্ট
Published : Thursday, 20 December, 2018 at 3:22 PM, Update: 20.12.2018 3:27:54 PM, Count : 2

গ্রিন রোড হয়ে পূর্ব রাজাবাজারের গলির মুখে ঢুকতেই মাথার ওপর দড়ি বাঁধা পোস্টারের সারি। সবই নৌকার। কয়েক মিটার এগোতেই হাতের বাঁয়ে নাজনীন স্কুল অ্যান্ড কলেজ। ফটকের সামনে এক চিলতে ফাঁকা জায়গা। সঙ্গী প্রথম আলোর আলোক–চিত্রী স্কুলের ফটকের ছবি তুলছিলেন দেখে এগিয়ে এলেন একজন। হাত মিলিয়ে জানা গেল তিনি নিরাপত্তা–কর্মী। দিনরাত এখানেই থাকেন। জানতে চাওয়া হলো, সেপ্টেম্বর মাসে এখানে বিএনপির নেতা-কর্মীদের জমায়েত, পুলিশের ধাওয়া ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছিল কি না। তিনি বিস্মিত হয়ে বললেন, ‘কে কইল, এরম কিছু হইলে জানমু না!’ পরে বললেন, ‘ঘটনা কী, একটু খুইলা কন তো!’

তাঁকে জানানো হলো, গত ১০ ও ২০ সেপ্টেম্বর এখানে জমায়েত হওয়া বিএনপির নেতা-কর্মীরা পুলিশ দেখে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পালিয়ে গেছেন। শেরেবাংলা নগর থানায় করা চারটি মামলায় এ কথা উল্লেখ করেছে পুলিশ। ১০ সেপ্টেম্বর হওয়া মামলায় নাজনীন স্কুলের সামনে থেকে ২৭টি ককটেল উদ্ধারের উল্লেখ রয়েছে। বিস্মিত হয়ে তিনি বলেন, ‘এই চিপা গল্লিতে এতো ককটেল ফুডাইব কই?’

গত সেপ্টেম্বরে পুলিশ এ রকম ৫৭৮টি নাশকতার মামলা করেছে বলে আদালত থেকে তথ্য পাওয়া গেছে। মামলাগুলোর প্রায় সব আসামিই বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। এসব মামলার আসামিদের ধরতে বিশেষ অভিযান শুরু করেছে পুলিশ। এ পর্যন্ত বিএনপির দেড় হাজার নেতা-কর্মী গ্রেপ্তারও হয়েছেন।

এসব মামলার সূত্র ধরে গত শুক্রবার সকাল থেকে আটটি ঘটনাস্থলে সরেজমিনে গিয়ে ওই নিরাপত্তাকর্মীর মতো কিছু বিস্মিত মুখ দেখতে হলো। সোবহানবাগে ঢাকা ডেন্টাল কলেজ ছাত্রাবাসের এক নিরাপত্তাকর্মী ঘটনা শুনে বিস্মিত হয়ে টেনে নিয়ে গেলেন ছাত্রাবাসের ক্যানটিনের রান্নাঘরে। সেখানে তখন চার কর্মী দুপুরের খাবার তৈরি করছিলেন। ‘শোনো তো এই ভাই কী কয়’ বলে নিরাপত্তাকর্মী তাঁদের সবাইকে পুলিশের মামলার বিবরণটা আবার শোনাতে বললেন। তাঁদেরও জানানো হলো, গত ১২ সেপ্টেম্বর ওই হোস্টেলের ভেতরে উত্তর-পূর্ব কোনায় ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে হয়েছে বলে ৬১ জন বিএনপির নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। শুনে সবাই বিস্মিত, কেউ দ্বিধান্বিত। একজন বললেন, পুলিশ মামলা দিয়ে এত বড় অভিযোগ যখন করেছে, কিছু না কিছু তো সত্য হবে। কেউ সরাসরি ঘটনা নাকচও করছিলেন না। তাঁদের মধ্যে বয়সে বড় ওই নিরাপত্তাকর্মী বলেন, ‘কী যে বলেন ভাই, ককটেল ফুটাইলে তো পুরা হোস্টেল কাঁইপা উঠত। ওই ঘটনা না জানার তো কোনো কারণ নাই। আর আমরা এইহানে আছি না, কে এই আকাম করতে এহানে আইব!’

শেরেবাংলা নগর টিঅ্যান্ডটি মাঠের পূর্ব কোনায় গত ৩০ সেপ্টেম্বর ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছিল অভিযোগ করে ৭০ জন বিএনপির নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে মামলা করেছে পুলিশ। টিঅ্যান্ডটি মাঠটি জাতীয় সংসদ ভবনের উল্টো পাশে, খুব কাছেই। শুক্রবার বেলা ১১টার দিকে মাঠের পূর্ব পাশে গিয়ে দেখা গেল, এক কোনায় শেরেবাংলা নগর পুলিশের ৫ নম্বর বিট কর্মকর্তার কার্যালয় বা বক্স, তার সামনে পুলিশের টহল পিকআপ দাঁড়িয়ে (ঢাকা মেট্রো ঠ ১৪-২২৩৮)। আরেক কোনায় বসে জুতা মেরামত করছিলেন একজন, কয়েকটি অটোরিকশা ও ভাড়ার মোটরসাইকেল সেখানে দাঁড়িয়ে। জুতা মেরামতকারী বললেন, তিনি অনেক দিন ধরেই এখানে বসেন। সেপ্টেম্বরে ওই মাঠের আশপাশে ককটেল বিস্ফোরণের কথা স্মরণ করতে পারলেন না বা কেউ তাঁকে বলেননি বলে জানান।

পশ্চিম আগারগাঁওয়ে বিএনপি বাজারসংলগ্ন ঈদগাহ মাঠে গত ৪ সেপ্টেম্বর বিএনপির নেতা-কর্মীরা জড়ো হওয়ার পর কয়েকটি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটিয়েছেন বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে। বিস্ফোরিত ককটেলের অংশবিশেষ উদ্ধারের কথাও মামলায় বলা হয়েছে। সেখানে গিয়ে দেখা গেল, মাঠে ছেলেরা দল বেঁধে খেলছে। তাদের সবার বাড়ি আশপাশে। কেউই সাম্প্রতিক সময়ে সেখানে ককটেল বিস্ফোরণের কথা জানে না। মাঠের কোনায় পাওয়া গেল এক রিকশা মেরামতকারীকে। এতগুলো ককটেল বিস্ফোরণের কথা শুনে তিনি অবাক। বললেন, ‘এখন এইখানে আর এইসব হয় না। একসময় যখন বিএনপি বস্তি ছিল, তখনকার কথা ভিন্ন।’

আগারগাঁও নতুন বাজারের পেছনে গত ৫ সেপ্টেম্বর ককটেল ফুটেছে বলে ২১ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে পুলিশ। বাজারের পেছনের দিকটায় খাবারের দোকান, তার পরে সরকারি স্টাফ কোয়ার্টারের জায়গায় একটি ছাগলের খামার। খাবার দোকানের একজন বললেন, ‘ককটেল ফুটব ক্যা, এইহানে সবাই ব্যবসা করে। মাঝে মইদ্দে হল্লা-চিল্লা হয়, তয় কেউ ককটেল মারে না।’

হাতিরঝিল থানার মামলা

শেরেবাংলা নগর থানার পুলিশের মতো হাতিরঝিল থানার পুলিশও ককটেল বিস্ফোরণ, পুলিশের ওপর হামলা এবং নাশকতার অভিযোগে বিএনপির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি মামলা করেছে। এ রকম আটটি মামলার এজাহারে দেখা যায়, সব মামলাতেই কয়েক লিটার করে অকটেন বা পেট্রল জব্দ দেখানো হয়েছে। মামলার এসব তথ্য নিয়ে সরেজমিনে গিয়ে ঘটনাস্থলের আশপাশের লোকের সঙ্গে কথা বলে কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি।

এক তালা-চাবিওয়ালা মন্তব্য করলেন, ‘পুলিশের ককটেল মনে হয় ফুস (নিঃশব্দে) কইরা ফুটছে, এই জন্যে কেউ কিছু জানে না।’ হায়দার শেখ বসেন মগবাজার এলাকায় একটি মসজিদের সামনে। সেখানে গত ১৮ সেপ্টেম্বর সকাল ১০টা ১০ মিনিটে বিএনপির নেতা-কর্মীরা ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটান বলে হাতিরঝিল থানায় মামলা করে পুলিশ। মামলার অভিযোগ, বিএনপির এক-দেড় শ নেতা-কর্মী জড়ো হয়ে রাস্তা আটকে নাশকতার ষড়যন্ত্র করছিল খবর পেয়ে এখানে পুলিশ এলে তারা কয়েকটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পালিয়ে যায়। ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ একটি জারে পাঁচ লিটার অকটেন, আধা লিটারের পাঁচটি বোতলে ভরা আরও আড়াই লিটার অকটেন, সাতটি বাঁশের লাঠি এবং বিস্ফোরিত বোমার ছোট পাথর, ভাঙা কাচ ও বালু উদ্ধারের কথা বলেছে। উদ্ধারকৃত বস্তুগুলো আসামিদের ফেলে যাওয়া বলে উল্লেখ করে পুলিশ। এসব ঘটনার বিবরণ শুনে অবাক আশপাশের ব্যবসায়ীরা। এক বছরের মধ্যে ওই সড়ক কেউ অবরোধ করেছে বলে তাঁরা মনে করতে পারলেন না। একজন ব্যবসায়ী মুঠোফোনে ক্যালেন্ডার বের করে বললেন, ‘ওই দিন মঙ্গলবার আছিল। এমনিতেই এই এলাকায় তহন হাতিরঝিল থিকা আসা গাড়ির জ্যাম লাইগা থাকে। ওই সময় এইহানে কেউ রাস্তা আটকাইয়া ককটেল ফুটাইলে তো ঢাকা শহরে হাউকাউ পইড়া যাইত।’

মগবাজার রেলগেটের কাছে ইনসাফ বারাকা হাসপাতাল ও যমুনা অটো সেন্টারের মধ্যবর্তী দিলু রোডের পূর্ব মাথায় গত ১২ সেপ্টেম্বর বেলা পৌনে ১২টায় ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে বলে আরেকটি মামলা করেছে হাতিরঝিল থানার পুলিশ। ওই মামলার আসামি ৮৯ জন বিএনপি ও জামায়াতের নেতা-কর্মী। মামলায় আগের মামলাটির মতোই রাস্তা আটকে, নাশকতার ষড়যন্ত্রের তথ্য পেয়ে পুলিশ সেখানে যায় বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর পুলিশের উপস্থিতি বুঝে আসামিরা ককটেল ফুটিয়ে পালিয়ে গেছেন। এজাহারে পাঁচ লিটার অকটেন ভরা একটি জার ও সিকি লিটার পেট্রল ভরা দুটি বোতল, বিস্ফোরিত বোমার ছোট পাথর, ভাঙা কাচ ও বালু উদ্ধারের কথা বলেছে পুলিশ। আল-বারাকা হাসপাতাল ও যমুনা অটো সেন্টারের (সিএনজি স্টেশন) কর্মীদের কেউই ভরসন্ধ্যায় এ রকম ঘটনার কথা মনে করতে পারলেন না। যমুনা সিএনজি স্টেশনের একজন বয়স্ক কর্মী মামলার বিবরণ শুনে কোনো কূলকিনারা না পেয়ে বললেন, ‘মনে হয় কুনো গাড়ির চাকা ফাটছিল, তাই শুইনা কেউ পুলিশরে ককটেলের কথা কইছে।’ পুলিশের উল্লিখিত ঘটনাস্থলেই বসে ফুটপাতে ফল বেচেন এক তরুণ। মামলার বিবরণ শুনে প্রথমে বললেন, ‘না না, এ রকম কিছু হয়নি।’ পরে আবার মাথা চুলকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনেরা কি পুলিশের লোক, আমারে কি সাক্ষী করতাছেন।’ সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে বললেন, ‘যান তো ভাই, পরে সমিস্যা হইব।’

২৭ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় হাতিরঝিলসংলগ্ন বিয়াম গলির মুখে নূর নগর মসজিদের সামনেও ককটেল ফুটেছে বলে ১০২ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে হাতিরঝিল থানার পুলিশ। শুক্রবার জুমার নামাজের সময় ওই মসজিদের সামনে হাজির হয়ে স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দাকে মামলার বিবরণ শুনিয়ে জিজ্ঞেস করা হলো, সবাই বললেন তাঁরা কিছু জানেন না। মসজিদে ঢোকার মুখে এক দোকান। ২৭ সেপ্টেম্বর এখানে বোমা ফুটেছিল কি না জানতে চাইলে ওই দোকানের এক কর্মী বললেন, ‘না তো, এ রকম হলে তো অবশ্যই জানতাম।’


সূত্র- প্রথম আলো






« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: [email protected], বার্তা বিভাগ: [email protected]