Monday, 14 October, 2019, 1:59 AM
Home জাতীয়
দেশের ভাগ্য নির্ধারণে ভোটের ভূমিকা
মো. মইনুল ইসলাম
Published : Tuesday, 4 December, 2018 at 8:18 PM, Count : 0
প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে গ্রিসের নগর রাষ্ট্রগুলোতে গণতন্ত্রের ধারণাটির উদ্ভব এবং অনুশীলন শুরু হয়। গ্রিক শব্দ দুটি ‘Demos’ এবং ‘Kratis’ তথা জনগণের ক্ষমতা থেকেই কাল পরিক্রমায় ইংরেজি শব্দ Democracy বা গণতন্ত্রের জন্ম হয়।

বর্তমানে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারা দেশ শাসনের প্রচলিত ধারণাই গণতন্ত্র। গণতন্ত্র আজ বিশ্বনন্দিত একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা। গণতন্ত্র যেহেতু জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের শাসন, তাই নির্বাচনের এত গুরুত্ব। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সম্মেলন গৃহ বা পরিষদ হচ্ছে পার্লামেন্ট বা সংসদ।

সংসদের দুটি প্রধান কাজ হচ্ছে দেশের আইন প্রণয়ন এবং নীতিনির্ধারণ। তাছাড়া দেশ ও জনগণের নানা গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা ও দাবি-দাওয়ার কথা তুলে ধরা ও আলোচনা করাও সাংসদ বা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কাজ।

ব্রিটিশ পার্লামেন্ট বিশ্বের একটি পুরনো ও ঐতিহ্যবাহী সংসদ বা পার্লামেন্ট, তাই তাদের সংসদ সদস্য তথা Member of the Parliament বা গচদের অনুকরণে আমাদের দেশেও সংসদ সদস্যদের এমপি বলা হয়ে থাকে।
আমাদের মতো স্বল্পোন্নত এবং স্বল্পশিক্ষিত মানুষের দেশে গণতন্ত্রের নামে যে নির্বাচন হয় তা কতটা জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে, তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটায় এবং জনগণের শাসন কায়েম করে তা নিয়ে অনেক প্রশ্ন আছে। তবু অনেকটা অবাধ, নিরপেক্ষ এবং সুষ্ঠু নির্বাচন হলে তাকে আমরা বিশ্বাসযোগ্য বা গ্রহণযোগ্য বলে ধরে নেই।

এ দেশে নির্বাচনে সাধারণত অংশ নেয় কয়েকটি রাজনৈতিক দল বা জোট। তাদের মধ্যেই প্রতিযোগিতা হয়। যে দল বা জোট প্রতিযোগিতায় বেশি ভোট পায় তারাই বিজয়ী হয় এবং সরকার গঠন করে। সরকার গঠনকারী বিজয়ী দল যতটা দেশপ্রেমিক এবং জনগণ তথা ভোটারদের সেবা এবং মঙ্গল কামনায় আন্তরিক হন, ততটাই দেশ এবং জনগণ উপকৃত হন। তাতেই বাস্তবে প্রতিফলিত হয় জনগণের শাসন (গণতন্ত্র) এবং উন্নয়ন।

কিন্তু আসল সমস্যা হল দলে। যে সরিষা দিয়ে ভূত ছাড়াবেন বা তাড়াবেন সে সরিষায় যদি ভূত থাকে, তাহলে ভূত তাড়াবেন কী করে! প্রশ্ন হল, আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো কতটা গণতান্ত্রিক? তাদের অভ্যন্তরীণ প্রশাসন বা পরিচালনায় কি গণতন্ত্র আছে? সাধারণ সদস্যদের মতামত বা ভোট দিয়ে কি দলের নেত্রীরা নির্বাচিত কিংবা পরিচালিত হয়? দলের নীতি, আদর্শ এবং কর্মসূচি অনুসরণ এবং বাস্তবায়নে যা দেখা যায় তা হল শীর্ষ নেতা-নেত্রীদের একচ্ছত্র আধিপত্য।
নির্বাচনে দল বিজয়ী হলে শীর্ষ নেতা-নেত্রীদের আদর্শ-উদ্দেশ্য এবং ইচ্ছা-অনিচ্ছাই প্রাধান্য পায়। বিএনপির গত যে সম্মেলনগুলো হয়েছে, তাতে কাকে সভাপতি, কাকে সিনিয়র মহাসচিব এবং কাকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি করা হবে সেগুলোই ছিল মূল আলোচ্য এবং সিদ্ধান্তের বিষয়। এও দেখা গেল, দলের সভানেত্রী দুর্নীতির মামলায় দণ্ডিত হবে এটা টের পেয়ে দলীয় গঠনতন্ত্র সংশোধন করে দণ্ডিতদেরও দলের সদস্য বা নেতৃত্বে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। যা হোক, বাস্তবে যা দাঁড়িয়েছে তা হল বিএনপি খালেদা জিয়া এবং দলের প্রতীক বা মার্কা ধানের শীষ এক এবং অভিন্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ, শেখ হাসিনা এবং নৌকা মার্কা ভোটের ক্ষেত্রে আমজনতার কাছে এক এবং অভিন্ন বলে পরিচিতি পেয়েছে।

এখন প্রশ্ন হল, নির্বাচন থেকে আমরা প্রত্যাশিত সুফল পাই না কেন? কেন পাই না কাঙ্ক্ষিত গণতন্ত্র, সুশাসন ও উন্নয়ন? এর কারণ অনেকটা নির্বাচনের মধ্যেই নিহিত আছে। যারা নির্বাচিত হন, তাদের একটা ভালো অংশই দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ দরিদ্র মানুষের উন্নয়নের চেয়ে নিজের উন্নয়নে বেশি আগ্রহী হয়ে পড়েন। নিজের বা আপন আত্মীয়স্বজনের সম্পদ এবং ক্ষমতা বৃদ্ধি হয়ে দাঁড়ায় তাদের প্রধান কাজ। সরকারি দলের সংসদ সদস্যদের একটি বড় অংশের কাছে রাজনীতি হয়ে দাঁড়ায় একটি লাভজনক ব্যবসা, যা লোকমুখে ‘এমপি’ বাণিজ্য বলে পরিচিতি পেয়েছে। একটি বড় দল বা জোট থেকে নির্বাচনে মনোনয়ন এবং প্রার্থী হওয়ার এটাও একটি কারণ। মনোনয়ন এবং নির্বাচনে তারা বিপুল পরিমাণ অর্থও খরচ করেন বলে জনশ্রুতি আছে। এক বন্ধুর মতে জাতীয় নির্বাচনে বেশকিছু প্রার্থী নিম্নে তিন কোটি এবং ঊর্ধ্বে ছয় কোটি টাকা খরচ করে থাকেন। এত বিপুল পরিমাণের অর্থ যারা নির্বাচন বাবদ খরচ করেন, তারা যে বড় মাপের ধনী তা অস্বীকার করা যায় না। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা তা করেন বিনিয়োগ হিসেবে। নির্বাচিত হলে এমপি বাণিজ্যের মাধ্যমে তারা তার ২ থেকে ৩ গুণ আদায় বা লাভ করে থাকেন বলে যেমন বন্ধুটির মত, তেমনি আছে জনরব। আমাদের সংসদে ক্রমাগত ব্যবসায়ীদের সংখ্যা বৃদ্ধি এটাই প্রমাণ করে।

সৎ, আদর্শবান, ভদ্রলোক, জ্ঞানী কিংবা গুণী কয়জন মানুষ দেশে সাংসদ বা এমপি হন? কারণ যারা ধনী নয়, তাদের বিরাট ব্যয়সাপেক্ষ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মতো সামর্থ্য নেই। তবে এর মধ্যে সামান্যসংখ্যক সৎ, আদর্শবান, ভদ্রলোক এবং সীমিত সম্পদের মালিক যে নির্বাচিত হন না, তা নয়। তবে সেটা ব্যতিক্রম। অনেক ক্ষেত্রে দুর্নীতিবাজ এবং পেশিশক্তিধারীদের দাপটে সৎ, ভদ্র এবং বিবেক-বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষকে দলে নীরব ভূমিকা পালন করতে হয়।

আগেই বলা হয়েছে, গণতন্ত্রের জন্য নির্বাচন দরকার। কারণ জনগণের সম্মতি নিয়ে শাসনের নামই এক অর্থে গণতন্ত্র। কিন্তু আমাদের মতো দেশে নির্বাচন যতই বিশ্বাসযোগ্য এবং গ্রহণযোগ্যই হোক না, পূর্ববর্ণিত সরষের মধ্যে ভূত তথা নির্বাচনী দলের মধ্যে দুরভিসন্ধিমূলক বা দুষ্ট লোকের অবস্থান নির্বাচনের আসল উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করে দেয়। তবু নির্বাচন দরকার। তাতে অন্তত মানুষ তাদের সাংসদ ও সরকার পছন্দ করার একটি সুযোগ পায়। আর বৈধ বা নিয়মতান্ত্রিকভাবে শাসন ক্ষমতা বদল বা হস্তান্তর করতে পারে। আর অনেক সময় নির্বাচন ভালো দল বা জোটও উপহার দেয়, যেমন বিগত ১০ বছর ধরে বিদ্যমান জননেত্রী শেখ হাসিনার ১৪ দলীয় জোট সরকার। অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে এ জোট সরকার প্রশংসনীয় সাফল্য প্রদর্শন করেছে। কয়েক বছর আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দুই পণ্ডিত তাদের বিখ্যাত গবেষণাকর্ম Why Nations Fails বা জাতিসমূহ ব্যর্থ হয় কেন শীর্ষক পুস্তকে স্পষ্টতই দাবি করেন যে, একটি জাতি ব্যর্থ হয় নেতৃত্বের ব্যর্থতার কারণে। বাংলাদেশের বিগত দশ বছরের উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার মন্ত্রীরা এবং উপদেষ্টাদের সৎ এবং দক্ষ নেতৃত্বই এটা প্রমাণ করে। তবে আগামীতে আশা করব অর্থনৈতিক উন্নয়নসহ দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন তথা সুশাসন এবং গণতন্ত্র তথা জনগণের ক্ষমতায়নের সম্প্রসারণ তারা ঘটাবেন, যার অভাব আমরা বেজায় বোধ করি।

একটি বিশ্বাসযোগ্য এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আমরা চাই। কিন্তু নির্বাচনের খাতিরে নির্বাচনই আমাদের একমাত্র চাওয়া নয়। মনে রাখতে হবে নির্বাচন শুধু একটি উদ্দেশ্য অর্জনের উপায় মাত্র। নির্বাচন শেষ বা চূড়ান্ত উদ্দেশ্য নয়। সেই চূড়ান্ত উদ্দেশ্য হচ্ছে নির্বাচিত সরকারের হাতে দেশের ১৭ কোটি মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের দায়িত্ব অর্পণ। এমন সরকার যতটা দেশে গণতন্ত্র, সুশাসন ও উন্নয়নের প্রসার ঘটাবে ততই নির্বাচন অর্থপূর্ণ ও সার্থক হবে। নির্বাচন বিজয়ী দলকে বিরাট দায়িত্ব অর্পণ করে। এটা তাদের কাছে জনগণের অর্পিত বিরাট আমানত। সেই আমানতের যারা খেয়ানত করে, তারা যেমন জনগণের অভিশাপ থেকে মুক্তি পাবে না, তেমনি ইতিহাসের ধিক্কারের হাত থেকেও রেহাই পাবে না। পরিশেষে বলব, নির্বাচন শুধু আবেগ, উন্মাদনা বা উল্লাসের খেলা নয়। পাঁচ বছরের জন্য দেশের ভাগ্য নির্ধারণের পরীক্ষা। তাই ভেবেচিন্তে ভোট দিন।

মো. মইনুল ইসলাম : সাবেক অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়





« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: [email protected], বার্তা বিভাগ: [email protected]