Tuesday, 12 December, 2017, 6:04 PM
Home জাতীয়
বারোটার ট্রেন যেন বারোটাতেই ছাড়ে
মো. আনছার আলী খান লিখেছেন যুগান্তরে
Published : Sunday, 6 August, 2017 at 8:13 PM, Count : 0
সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্রবার। এ দিনটি কর্মজীবী মানুষের জন্য সবচেয়ে ব্যস্ততম দিন। সরকারি কর্মচারীদের শুক্র ও শনিবার দু’দিন ছুটি থাকলেও অধিকাংশ বেসরকারি দফতরে শুধু শুক্রবারেই সাপ্তাহিক ছুটি। বাকি দিনগুলোতে অফিসের কাজে রাত অবধি ব্যস্ততা শেষে ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত শরীর ও মন সমাজ ও পরিবারকে সময় দেয়ার ক্ষেত্রে খুব একটা সহায়ক অবস্থায় থাকে না। সামাজিক যোগাযোগ রক্ষায় ফেসবুক কিছুটা কাজে আসে। দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর মতো হলেও ফেসবুক খাটো করে দেখার মতো নয় কোনোভাবেই। শুক্রবারের সকালটা পার হয়ে যায় সাপ্তাহিক বাজার করার কাজে। কারওয়ান বাজারে যে সবজি ১০০ টাকায় ৫ কেজি পাওয়া যায়, মহল্লার দোকানে তা ৪০-৫০ টাকা কেজি। এমনিভাবে সোয়ারিঘাটের মাছ বা তুলনামূলক অন্য কোনো সস্তা বাজারের খোঁজে সীমিত আয়ের মানুষকে ছুটতে হয় খুব ভোরে। তবে সেসব বাজারে একটু সাবধানে না থাকলে ওজনে কম, পকেটমারের কারসাজি, ব্যাগ থেকে মাছ লাপাত্তা হওয়া বা বাজারের ঝাকি নিয়ে মিন্তির উধাও হওয়ার শিকার হলে শূন্য হাতে বাসায় ফিরে আনাড়ি উপাধিটি পেতে হয় বউয়ের কাছ থেকে আরেকবার। দুপুরে জুমার নামাজ, অতঃপর খাওয়া শেষে একটু আড়মোড়া দেয়ার সাধ কার না জাগে। তবে তার জন্য সময় বের করতে হবে ব্যস্ততম সিডিউলের মধ্য থেকে।

নিয়মানুবর্তিতার অভাবে অনেক উপসর্গের মধ্যে রক্তে বাড়তি সুগারের কারণে ইনসুলিনের ব্যবহার মাত্রাতিরিক্তভাবে বেড়ে গেছে। এ অবস্থায় বিনা ইনসুলিনে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে রোগ নিয়ন্ত্রণের কোনো বিজ্ঞাপন নিঃসন্দেহে চমক দেয়ার মতো। এরূপ এক বিজ্ঞাপনে আকৃষ্ট হয়ে সম্প্রতি কোনো এক শুক্রবার সকালের বাজার করা বাদ রেখে সস্ত্রীক যথাসময়ে অর্থাৎ সকাল ৯টায় উপস্থিত হই জাতীয় ক্রীড়া কমপ্লেক্স মিলনায়তনে। বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ না থাকলেও রেজিস্ট্রেশন বাবদ দু’জনের ১০০০ (এক হাজার) টাকা নগদ দিয়ে হলের মধ্যে প্রবেশান্তে দেখা যায় আমাদের আগেই স্বাস্থ্যসচেতন মানুষের ভিড়ে হাউসফুল হওয়ার অবস্থা। পকেটে টাকাটা না থাকলে এ সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়ে ফেরত যাওয়ার মতো বিড়ম্বনায় পড়তে হতো। হাউসফুল দেখে স্ত্রীর কটূক্তি থেকে বাঁচা গেল। তারই বা দোষ কী! কোনো অনুষ্ঠানে যেনতেনভাবে তো যাওয়া যায় না। একদিকে তার প্রস্তুতি গ্রহণ, অন্যদিকে ঘন ঘন ঘড়ি দেখে তাগিদ প্রদান। একরকম টানাটানি করে অনুষ্ঠানস্থলে উপস্থিত হয়ে যদি দেখা যায় অনুষ্ঠানের হোস্ট তখনও অনুপস্থিত, তখন আমার সময়ানুবর্তিতাকে ব্যঙ্গ করে কোনো কথা বললে বিনা বাক্যে হজম করা ছাড়া কিইবা করার থাকে।

স্বাস্থ্যসচেতন মানুষে যথাসময়ে মিলনায়তন ভর্তি হলেও ‘কিছুক্ষণের মধ্যেই অনুষ্ঠান শুরু হবে’ আনাড়ি কণ্ঠের এরূপ ঘোষণায় উপস্থিত জনতা বিরক্ত। ৩০ মিনিট অতিক্রান্ত হল। ব্যানারে উল্লিখিত সম্মানিত প্রধান অতিথি, বিশেষ অতিথি কারও কোনো খবর নাই। ৪০ মিনিটের মাথায় ঘোষণা এলো প্রধান অতিথি রাস্তায়, কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি সভাস্থলে উপস্থিত হয়ে পড়বেন। প্রধান অতিথি অত্যন্ত সম্মানীয় এক ব্যক্তিত্ব। তা সত্ত্বেও সমাবেশ থেকে হৈ চৈ শুরু হয়ে গেল। দাবি, প্রধান অতিথির প্রয়োজন নাই। অনুষ্ঠান শুরু করা হোক। মানুষকেই বা দোষ দেয়া যায় কিভাবে। অনুষ্ঠান শেষে বাসায় ফিরে জুমার নামাজের তাড়া অধিকাংশকেই অস্বস্তিতে ফেলেছে। কাজেই প্রধান অতিথির সুবিধা-অসুবিধার কথা বিবেচনা করার সুযোগ কোথায়? অপ্রীতিকর অবস্থা এড়াতে জনতার দাবির মুখে প্রধান অতিথি ছাড়াই অতিথিবক্তা, বিদেশের বিশিষ্ট চিকিৎসক তার বক্তব্য শুরু করলেন। তার বক্তব্যের প্রথম ভাগেই প্রধান অতিথি এলেন। অনুষ্ঠান রিওয়াইন্ড করা হল। অতঃপর প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে দর্শকদের করতালির সঙ্গে অতিথিদের উত্তরীয় পরানোসহ ফুল দিয়ে বরণ করা হল। সংক্ষিপ্ত বক্তৃতা শেষে অনুষ্ঠানের শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করে প্রধান অতিথি চলে গেলেন। কী কারণে তার বিলম্ব হল তা কেউ জানতে পারলেন না। কারণটা গ্রহণযোগ্য কিনা সে বিষয়টিও অজ্ঞাত থেকে গেল। আমাদের দেশে অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রধান অতিথির এরূপ বিলম্ব একটি অতি স্বাভাবিক ঘটনা। তাই এ নিয়ে কারও কোনো উৎসাহ না থাকায় অতিথি বক্তার ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের উপদেশাবলি শ্রোতৃমণ্ডলী গোগ্রাসে গিলতে থাকলেন।

প্রধান অতিথির যথাসময়ে সভাস্থলে উপস্থিত না হওয়ার বিষয়টি শুধু এই একটি ঘটনা তা নয়। এরূপ ঘটনায় হাজার হাজার মানুষকে অসহায়ের মতো অপেক্ষা করার দৃশ্য প্রায়ই দেখতে হয়। অপেক্ষা যে কী নিদারুণ যন্ত্রণা তা প্রধান অতিথিদেরও অজানা নয়। তিনি যখন দর্শক সারিতে বসেন তাকেও এরূপ বিরক্তিতে পড়তে হয়। কিন্তু তা থেকে শিক্ষা নিতে ব্যর্থ হন তিনি।

আমাদের দেশ একটি নির্দিষ্ট যাত্রাপথে উন্নত দেশের তালিকাভুক্ত হওয়ার পথে এগিয়ে চলেছে। উন্নত দেশে বলা হয় Time is money. পক্ষান্তরে আমাদের দেশে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সময়ের ব্যবস্থাপনা অর্থাৎ Time management-এর বিষয়টি একেবারেই গুরুত্বহীন। তাই বলা হয়ে থাকে, ১২টার ট্রেন ক’টায় ছাড়বে। শুধু তাই নয়, ৯টায় অফিস শুরু হওয়ার কথা থাকলেও প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু সচিবালয়ের ছোট-বড় কর্তাদের মধ্যে অফিসে সময়মতো উপস্থিত হয়ে বাহবা ক’জন নিতে পারবেন তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। অথচ সরকারি কর্মচারীদের ক্ষেত্রে বলবৎযোগ্য ‘সরকারি কর্মচারী নিয়মিত উপস্থিতি অধ্যাদেশ-১৯৮২’ অনুযায়ী ১ মিনিটের বিলম্বকেও বিলম্ব বলে সংজ্ঞায়িত করার বিধান রয়েছে। কোনো একসময় যথাসময়ে উপস্থিতি নিশ্চিত করার বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে স্বয়ং রাষ্ট্রপ্রধানের সচিবালয় গেটে উপস্থিত থাকার ঘটনা নিশ্চয় অনেকে স্মরণে আনতে পারেন। তারপরও কি এ বদভ্যাস থেকে আমরা মুক্ত হতে পেরেছি? অনেকে প্রশ্ন তুলতে পারেন, রাত করে অফিস থেকে ফেরার কারণে এক-আধটু বিলম্ব হলে কিইবা এমন ক্ষতি। কর্মঘণ্টা তো কমছে না। বরং বেশিই হবে হিসাব কষলে। এটাই যদি ঘটতে থাকে তাহলে বিলম্বের জন্য আইন কেন? যে আইনের কোনো প্রয়োগ নেই তা বিদ্যমান থাকা কি সংশ্লিষ্টদের আইন অমান্য করার ক্ষেত্রে উৎসাহী ভূমিকা পালন করে না? তাছাড়া সময় না মানার ক্ষেত্রে এরূপ বদভ্যাস বিধিবদ্ধ ব্যবস্থা বা পদ্ধতিকে নষ্ট করে দিচ্ছে। এভাবে যদি একটার পর একটা করে বিধিবদ্ধ বা সমাজে প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থা বা পদ্ধতি ভেঙে পড়তে থাকে, সে সমাজের ভবিষ্যৎ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা নিয়ে ভাবনার কেউ আছেন কি?

‘সময়ের এক ফোঁড়, অসময়ের দশ ফোঁড়’ প্রবচনটি একটি প্রতিষ্ঠিত সত্য। অথচ মানুষের সীমিত মেয়াদের জীবন থেকে এ সময় কীভাবে পার হয়ে যাচ্ছে তা অতীতের দিকে খেয়াল করলে অতি সহজেই হৃদয়ঙ্গম হবে। অতীতের সবকিছুই মনে হয় এই সেদিনের কথা। অথচ এর মধ্যে কতটা বছর কেটে গেছে তা টেরও পাওয়া যায়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪ বছরের শিক্ষাজীবন শেষ হতে লেগেছে ৭ বছর। যে ছেলেটি ২০-২২ বছরে কর্মজীবনে প্রবেশ করতে পারতেন, একই কাজে তার লেগে যায় ২৫-২৬ বা তারও বেশি। তার জীবন থেকে যে কয়টি বছর ঝরে গেল তার জন্য যদি তিনি কর্তৃপক্ষকে দায়ী করতে চান, তাহলে বিজ্ঞ বিচারক নিশ্চয়ই যুগান্তকারী রায় প্রদান করেছেন বলে ধরা যাবে। এমনিভাবে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কর্তৃপক্ষের দীর্ঘসূত্রতার বিষয়ে কারও কোনো উচ্চবাচ্য না থাকলেও কর্তৃপক্ষের সক্ষমতার বিষয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

প্রকৃতপক্ষে বর্তমানে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ক্যাডার, নন-ক্যাডার, এমনকি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগেও সরকারি কর্মকমিশনকে কাজে লাগানো হচ্ছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে ওই কমিশন সময়মতো কীভাবে তার ওপর অর্পিত সাংবিধানিক মূল দায়িত্ব পালন করবে? একটিমাত্র কমিশন থাকায় সময়মতো সবকিছু সম্পন্ন করা যাবে না এটাই সত্য। অথচ সংবিধানমতে, একাধিক সরকারি কর্মকমিশন গঠনের সুযোগ রয়েছে। কাজেই একজন যুবকের অতি মূল্যবান সময়কে মূল্যায়িত করার জন্য তাকে যথাসময়ে কর্মে নিয়োগ নিশ্চিত করতে হলে সরকারি কর্মকমিশনসহ সব নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নিতে হবে।

সক্ষমতার অভাবে অধিক সময়ের প্রয়োজন হলে ভিন্ন কথা। কিন্তু অভ্যাসজনিত কারণে বিলম্ব ঘটলে এর দায় বিলম্বকারীকেই বহন করতে হবে। কিন্তু কোনো ব্যক্তির অবহেলাজনিত কারণে হাজার লোকের সময় নষ্ট হলে এর দায় কি বিলম্বকারীর বহন করার রীতি চালু করা সম্ভব হয়েছে? নিদেনপক্ষে বিলম্বের কারণে দুঃখ প্রকাশের সৌজন্যতাও অনেক ক্ষেত্রে দেখানো হয় না। চাকরিতে থাকাকালীন দেখেছি, অনেক ক্ষেত্রে নির্ধারিত সময়েই উপস্থিত হওয়ার আগেই সভা শুরু হয়ে গেছে। তবে সেটা ওই দিনের প্রথম সভা। ইতিমধ্যে আরও দুটি সভার অংশগ্রহণকারীরা সভাকক্ষের বাইরে দণ্ডায়মান। তৃতীয় সভার অংশগ্রহণকারী হিসেবে নিজের দফতরের হাজারো কাজ ফেলে অলস সময় অতিবাহিত করা ছাড়া কিইবা করার থাকে। এ ধরনের ঘটনা একটি-দুটি নয়। এভাবে অনিয়মের কাছে নিয়মের আত্মসমর্পণ। তবে সর্বোচ্চ পর্যায়ে এরূপ অনিয়ম দেখা যায় না। মহামান্য রাষ্ট্রপতি বা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সব অনুষ্ঠান যথাসময়ে অনুষ্ঠিত হওয়ার দৃষ্টান্ত আমাদের দেশেই বিদ্যমান। এ ক্ষেত্রে কোনো হেরফের দৃশ্যমান নয়। সবচেয়ে ব্যস্ততম সিডিউল হওয়া সত্ত্বেও সেসব সিডিউল রক্ষা হয় কিভাবে? শৃঙ্খলা ভঙ্গের কারণেই সিডিউল বিপর্যয় ঘটে। একই বিমানবন্দর থেকে সব কটি এয়ারলাইন্সের বিমানের সিডিউল রক্ষা করা সম্ভব হলে বাংলাদেশ বিমানের ক্ষেত্রে সিডিউল বিপর্যয়ের কারণ ঘটবে কেন?

জীবন একটি নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য নির্ধারিত। এ নির্ধারিত মেয়াদের প্রতিটি ক্ষণকে যদি সুশৃঙ্খলভাবে সাজানো না যায় তাহলে পূর্ণ মেয়াদের অনেক কাজই অসমাপ্ত থেকে যাবে। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বিশ্ব যখন এগিয়ে চলেছে, তখন সময়কে গুরুত্ব না দেয়ার বিষয়টি অবহেলা করার মতো নয়। এ বিষয়ে নিজে যেমন সতর্ক হতে হবে, তেমনি বিলম্বকারীর বিরুদ্ধে প্রতিবাদীর ভূমিকা পালন করতে হবে। জনসচেতনতামূলক আরও অনেক কর্মসূচির মতো এ ক্ষেত্রেও সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে পারলে সময়ের কাজ সময়ে করার মাধ্যমে সময়ের যথাযথ মূল্যায়ন করার অভ্যাস গড়ে তোলা সম্ভব। বিষয়টি দেশের সার্বিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি নতুন পালক যুক্ত করবে। ১২টার ট্রেন তখন ঠিক ১২টাতেই ছাড়বে।

মো. আনছার আলী খান : অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব

khanvhi@gmail.com





« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: info@iportbd.com, বার্তা বিভাগ: newsiport@gmail.com