Tuesday, 24 October, 2017, 4:33 AM
Home সাহিত্য-সংস্কৃতি
রৌমারী চিলমারীর কথা কলকাতায়
শেখ রোকন লিখেছেন সমকালে
Published : Friday, 23 June, 2017 at 2:41 PM, Count : 0

মে মাসের শেষ সপ্তাহে আক্ষরিক অর্থেই ঝটিকা সফরে গিয়েছিলাম কলকাতা। উদ্দেশ্য ব্রহ্মপুত্র নদ বিষয়ক একটি বাংলাদেশ-ভারত যৌথ নাগরিক সভায় যোগ দেওয়া। ভারত-বাংলাদেশ নদী সম্পর্কের ক্ষেত্রে ব্রহ্মপুত্র গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই নদী বহন করে দুই দেশের মোট যৌথ প্রবাহের পঞ্চাশ শতাংশেরও বেশি। এ ছাড়া ফারাক্কার কারণে গঙ্গার ঐতিহাসিক নৌপথ যখন দ্বিখণ্ডিত হয়ে গেছে, তখন ব্রহ্মপুত্র-যমুনা এখনও 'নির্বিঘ্ন'। বস্তুত দেশ বিভাগের পরও কলকাতা থেকে জাহাজ গৌহাটি পর্যন্ত যেত মেঘনা-যমুনা-ব্রহ্মপুত্র হয়ে। কিন্তু ১৯৬৫ সালের তৎকালীন পাক-ভারত যুদ্ধে নৌরুটটি সেই যে 'স্থগিত' হয়েছিল, আর খোলেনি।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে ইন্দিরা-মুজিব চুক্তিতে নৌ ট্রানজিটের কথা বলা হয়েছিল। সেখানে কলকাতা থেকে হলদিয়া সমুদ্রবন্দর হয়ে রায়মঙ্গল, পশুর, মেঘনা, পদ্মা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র হয়ে গৌহাটি যাতায়াতের কথাও ছিল। পরে এ বিষয়ে একটি প্রটোকল স্বাক্ষরিত হয়; কিন্তু আলোর মুখ দেখেনি। ২০১৫ সালে এ বিষয়ে একটি প্রটোকল স্বাক্ষরিত হয়। মেয়াদ বাড়িয়ে তিন থেকে পাঁচ বছর করা হয়। কোনো পক্ষের আপত্তি না থাকলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নবায়ন হতে থাকবে। আগে প্রটোকলটি দ্বিপক্ষীয় ছিল, এখন তৃতীয় দেশের অন্তর্ভুক্তির সুযোগ রয়েছে। সে অনুযায়ী সম্প্রতি ভুটানের সঙ্গে বাংলাদেশের নৌ ট্রানজিট চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। মানস বা সঙ্কোশ নদী বয়ে ভুটনা ব্রহ্মপুত্র ও যমুনায় নামবে।
নৌপথটি বাস্তবায়নে পর্যাপ্ত নৌবন্দরও প্রয়োজন হবে। একসময় কুড়িগ্রামের চিলমারী ছিল এই রুটের অন্যতম প্রধান বন্দর। সেটা প্রায় পরিত্যক্ত হয়ে গিয়েছিল। কিছুদিন আগে বন্দরটি নতুন করে সংস্কার হয়েছে। ওদিকে নৌরুটটি ব্যবহার না হতে হতে ব্রহ্মপুত্র বা যমুনার প্রাচীন 'আসাম চ্যানেল' বিনষ্ট হয়েছে। গভীরতা কমে যাওয়ার কারণে এখন শুকনো মৌসুমে সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়ি পর্যন্তই সারবাহী মাঝারি জাহাজ যেতে সমস্যা হয়। সে ক্ষেত্রে কলকাতা থেকে সামুদ্রিক জাহাজ গৌহাটি যাবে কীভাবে? যমুনা এখন প্রবাহিত হয় পাঁচ থেকে সাতটি চ্যানেলে। এগুলো কমিয়ে দুই-তিনটি চ্যানেলে আনা গেলে যেমন প্রবাহ, তেমনই গভীরতা বাড়বে।
এ জন্য বাংলাদেশ অংশে অন্তত সীমান্ত থেকে সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত ড্রেজিং করতেই হবে। অন্যথায় শুকনো মৌসুমে জাহাজ চালানো মুশকিল। এতে প্রয়োজন হবে বিপুল অর্থের। কলকাতার যৌথ সভায় যোগ দেওয়ার আগেই ভারতের হিন্দু বিজনেসলাইন পত্রিকায় প্রতিবেদন দেখেছিলাম, দৈ খাওয়া থেকে সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত ড্রেজিংয়ের একটি যৌথ প্রকল্প হাতে নেওয়া হচ্ছে। ভারত এর ৮০ শতাংশ খরচ বহন করবে, বাকি ২০ ভাগ বাংলাদেশের। ওদিকে ধুবড়ির পর অরুণাচল সীমান্তবর্তী সাদিয়া পর্যন্ত ড্রেজিংয়ের একটি প্রকল্প ভারতীয় পক্ষ ইতিমধ্যেই বাস্তবায়ন করছে। বাংলাদেশের অংশ ড্রেজিং হলেই জাহাজ চলাচলে আর কোনো প্রতিবন্ধকতা থাকবে না। পাঁচ দশকের বেশি সময় পর প্রাচীন নৌরুটটি ফের সচল হবে।
কাকতালীয় ব্যাপার হচ্ছে, কলকাতার যৌথ সভাটি ছিল এই নৌরুটের ড্রেজিং সম্পর্কেই। ভারত ও বাংলাদেশে নৌরুট এলাকার নাগরিকদের মতামত তুলে ধরতে। কারণ জাহাজ চলাচল মানে নিছক দুই দেশের চুক্তি নয়; এর সঙ্গে নৌপথটি ব্যবহারকারী ও নদীনির্ভর জনগোষ্ঠীর সুবিধা-অসুবিধার প্রশ্নও জড়িত। ড্রেজিংও পরিবেশ-প্রতিবেশের জন্য ঠিক স্বাস্থ্যকর নয়। কারণ এর ফলে মাছের আবাস ও প্রজননস্থল বিনষ্ট হতে পারে। নদীর একপাশে ড্রেজিংয়ের কারণে অন্যপাশে চর পড়তে পারে বা ভাঙন দেখা দিতে পারে। ড্রেজিংয়ের বিপুল বালু কোথায় রাখা হবে, সেটাও একটি বড় প্রশ্ন। আবার জাহাজ চলাচল শুরু হলে নদীটিতে এখন চলাচলকারী ছোট ও মাঝারি নৌযানগুলোর সুবিধা-অসুবিধার ব্যাপার আছে। মৎস্যসম্পদ ও নৌযাননির্ভর জনগোষ্ঠীর জীবিকার স্থিতিশীলতার প্রশ্ন আছে। নাগরিক পরামর্শ সভা এসব নিয়েই।
গৌহাটি-গোয়ালন্দ নৌপথ পুনরুদ্ধারের প্রভাব যেসব জনপদে পড়বে, তার অন্যতম কুড়িগ্রামের রৌমারী ও চিলমারী। কলকাতার সভায় যোগ দেওয়ার আগে আমরা রৌমারীর প্রত্যন্ত বলদমারা ঘাটে গিয়েছিলাম, স্থানীয়দের মতামত জানতে। অন্য কয়েকজন গিয়েছিলেন চিলমারীতে। আমাদের কাজ ছিল রৌমারী ও চিলমারীর এসব চিত্রই কলকাতার সভায় তুলে ধরা।
এই দুই জনপদের প্রধান সংকট ভাঙন। চিলমারী ভাঙতে ভাঙতে এখন সামান্যই অবশিষ্ট আছে। গত কয়েক বছর ধরে ভাঙন শুরু হয়েছে রৌমারীতেও। স্বভাবতই দুই জনপদের মানুষের প্রধান দাবি ভাঙন ঠেকানো। ড্রেজিংয়ে সেটা হয়তো নিয়ন্ত্রণে আসবে। কিন্তু সেখানকার মৎস্য সম্পদের কী হবে? কী হবে ছোট নৌযাননির্ভর পেশাজীবীদের? আবার ড্রেজিংয়ে যদি ভারসাম্য রক্ষা না হয়, তাহলে চিলমারীর মতোই পরিণতি হতে পারে রৌমারীর। কারণ বন্দরটি যেহেতু ডান তীরে, সেদিকেই নদীশাসনের কাজ বেশি হবে। তার প্রভাব পড়বে অপর পাড়ে। সেক্ষেত্রে ডান ও বাম তীরেই নদীশাসনমূলক কাজের বিকল্প নেই। হাজার বছর ধরে ওই অঞ্চলের মানুষ বাঁশসহ লোকায়ত উপকরণের 'বান্ডেলিং' পদ্ধতিতে দুরন্ত ব্রহ্মপুত্রকে বশে রেখেছে। নদীশাসনের বিপুল খরচ ও বরাদ্দের দীর্ঘসূত্রতা এড়াতে লোকায়ত এই প্রযুক্তির পুনঃবাস্তবায়ন হতেই পারে।
ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ূক, সবাই চায়। নদীপথে বাড়লে আরও ভালো, কারণ নৌপথ সাশ্রয়ী ও পরিবেশসম্মত। নৌ যোগাযোগ বৃদ্ধির মধ্যে লুক্কায়িত রয়েছে নদীতে পর্যাপ্ত প্রবাহ সংরক্ষণের সম্ভাবনাও। কিন্তু সেটা হতে হবে পরিবেশ, প্রতিবেশ ও মৎস্যসম্পদ অক্ষুণ্ন রেখে; দুই তীরের জনসাধারণের জীবন ও জীবিকা স্থিতিশীল রেখে; স্থানীয় জনসাধারণের মতামত নিয়েই। কারণ দেশে দেশে যোগাযোগ বৃদ্ধি দিনের শেষে তো জনসাধারণের জন্যই।

লেখক ও নদী-গবেষক
skrokon@gmail.com





« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: info@iportbd.com, বার্তা বিভাগ: newsiport@gmail.com