Tuesday, 12 December, 2017, 6:05 PM
Home জাতীয়
ভ্যাটের হার অপরিবর্তিত থাকুক, তবে...
ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী লিখেছেন ইত্তেফাকে
Published : Friday, 23 June, 2017 at 2:26 PM, Count : 0

বাজেট ঘোষণার বহু পূর্ব থেকেই ভ্যাটের হার নিয়ে কথাবার্তা হলেও বাজেট ঘোষণার পর সংসদে ও সংসদের বাইরে এই নিয়ে তুমুল বিতর্ক হচ্ছে। এই বিতর্কে বহু তিক্ত কথাবার্তা চলে আসছে এবং এর মাঝে কেউ কেউ ষড়যন্ত্রও খুঁজে বেড়াচ্ছেন। কারো কারো অভিযোগ যে রাজস্ব কর্মকর্তাদের কেউ কেউ জাতীয় স্বার্থ পরিপন্থি ও সরকার পরিপন্থি কাজে লিপ্ত রয়েছে। এই নিয়ে সারা জাতি ও সংসদ যে সুস্পষ্টভাবে দ্বিধাবিভক্ত তাতে সন্দেহ নেই। মানুষ সহজভাবে ভ্যাট আইনটি গ্রহণ করেনি বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এই সব পক্ষের মধ্যে সর্বশেষ সংবাদপত্র শিল্প যুক্ত হয়েছে। তারাও তথ্য-উপাত্ত দিয়ে প্রমাণ করেছেন যে ভ্যাট আইন কার্যকর হলে সংবাদপত্র শিল্প ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হবে। তারা সরকারকে ছেড়ে কথা বলবেন না। এ কারণে আগামী নির্বাচনে একটি নেতিবাচক ভোটার শ্রেণি জেগে উঠতে পারে যারা বর্তমান ক্ষমতাসীনদের প্রতি তেমন সদয় নাও হতে পারে।

এই সরকার বিশেষত সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা উন্নয়নে অনন্য ভূমিকা রেখেছেন। তাঁকে ছাড়া অন্যদের ব্যাপারে সারাদেশ যে ইতিবাচক হবেন তা আশা করা বৃথা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জনপ্রিয় হলেও তাঁর সহযাত্রীদের অনেকের ব্যাপারে জনগণের চোখ কিছুটা হলেও ক্লান্ত। তার সঙ্গে যদি ভ্যাট বা করের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়, তখন বিপদটা যে আসন্ন তা অনুমান করা যায়। নির্বাচনকে সামনে নিয়ে এ ঝুঁকি নেওয়া কতটা সঙ্গত?

আমি এক ধরনের অস্বস্তি ও আশঙ্কায় আছি। ব্যক্তিগতভাবে আমি এ সরকারের সকলের প্রতি না হলেও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতি অতিশয় ইতিবাচক। তার জনমুখী ও উন্নয়নমুখী কর্মকাণ্ডের আমি একজন সমর্থক। এমতাবস্থায় আমি অবশ্যই আশা করব যে তিনি যেন তার এই ভূমিকা আরো দীর্ঘদিন অব্যাহত রাখতে পারেন। এই কর্মকাণ্ড চালাতে হলে তাকে একটি সুষ্ঠু, সুন্দর, সুদৃঢ় ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় পুনঃপ্রত্যাবর্তন করতে হবে। জনগণ অর্থাত্ সাধারণ মানুষ ছাড়া তার কোনো গত্যন্তর নেই। তাই জনগণের নাড়ির স্পন্দন তাকে উপলব্ধি করতে হবে। আমার ধারণা হচ্ছে, তিনি জনপ্রত্যাশা মোতাবেক যা করবেন তার অন্যতম হচ্ছে যে বিদ্যমান ভ্যাটের হার অপরিবর্তিত রাখবেন; আগামী দেড় বছরের মাথায় তিনি ক্ষমতায় পুনঃপ্রত্যাবর্তনের পরই যেকোনো পরিবর্তনে হাত দেবেন।

তবে মানুষ যাতে ভ্যাট ব্যবস্থাটিকে আত্মস্থ করতে পারেন ও ভ্যাটের সঙ্গে জীবন-জীবিকা সংহত করতে পারেন, তার ব্যবস্থা করতে হবে। আর একটি কাজ প্রাসঙ্গিক বলে ভাবছি। দেশে আট লক্ষাধিক প্রতিষ্ঠান ভ্যাটের জন্য নিবন্ধিত কিন্তু ভ্যাট দেয় মাত্র ৩২ হাজার। এই সামান্য অংশ মানুষ থেকে প্রাপ্ত ভ্যাট আয় অবিশ্বাস্য। তাদের সংখ্যা যদি একটা জ্যামিতিক না হোক গাণিতিক হারে বৃদ্ধি করা যায় তাহলে বাজেটের অর্থায়ন নিয়ে অতটা ভাবতে হবে না। এসব বিতর্কিত আবগারী শুল্ক নিয়ে মাথা ঘামাতে হবে না। সঞ্চয়পত্রের বিদ্যমান বা বর্ধিত সুদটাকে মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবীদের জন্যে সরকারের পক্ষ থেকে এক ধরনের ভর্তুকি বা সামাজিক নিরাপত্তা বলে বিবেচনা করা যেতে পারে। তাদের কেউ কেউ সমাজে অতি প্রভাবশালী কিন্তু হাত পাততে লজ্জিত বা অনভ্যস্ত। তাদের মাঝে সৃষ্ট হাহাকার নিবৃত্ত না করলে তার নেতিবাচক প্রভাব সর্বত্র পড়বে। আগামী নির্বাচনে চোখ বুজে তারা ক্ষমতাসীনদের বিপরীতে ভোট দেবেন। সঞ্চয়পত্রের সুদের হার না কমিয়ে বরং বাড়িয়ে দিয়ে অভ্যন্তরীণ ঋণপ্রবাহ শুধু বৃদ্ধি নয়, একশ্রেণির পেনশনধারী বা অসহায় মানুষের স্বস্তিও বৃদ্ধি করা যাবে। এমনকি করমুক্ত আয়সীমাও বাড়ানো উচিত।

আমার প্রস্তাব আগামী দেড় বছর সময়সীমার মধ্যে ভ্যাটের আওতা শুধু বৃদ্ধি নয়, প্রতিটি ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের হাতে ক্যাশ রেজিস্টার তুলে দিতে হবে। প্রয়োজনে একটি আইনের মাধ্যমে ক্যাশ রেজিস্টার ক্রয় ও সংস্থাপন বাধ্যতামূলক করতে হবে। আয় উপার্জন না থাকলে কেউ খামাখা ভ্যাট নিবন্ধন নেয় না। তাই যারাই নিবন্ধিত হয় তারা কিছু না কিছু আয়-উপার্জন করে। অতএব ক্যাশ রেজিস্টার গ্রহণে তাদের আপত্তি থাকবে কেন? অভিযোগ আছে যে ব্যবসায়ীরা ক্রেতা বা ভোক্তার কাছ থেকে ঠিকই ভ্যাট আদায় করে কিন্তু তা সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়ে নিজেরাই পকেটস্থ করে। প্রতিটি নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানে ক্যাশ রেজিস্টার প্রবর্তিত হলে ব্যবসায়ীদের এই দুর্নাম ঘুচে যাবে। আয়কর বিভাগের দুর্নামও ঘুচবে।

বিশ্বব্যাংক মুখ বেজার করতে পারে। কৃষিতে ভর্তুকির বেলায়ও তারা মুখ বেজার করেছিল কিন্তু শেখ হাসিনার সাহসী নেতৃত্বে তা উতরে গেছে। সম্প্রতি শুনেছি বিশ্বব্যাংক বলছে ভ্যাট দ্রব্যমূল্য বাড়াবে না; যখন বিশ্বব্যাংক বলছে বাড়বে না, তখন নিশ্চিন্তে বলা যায় ভ্যাট আইন কার্যকর হলে বিশেষ সম্প্রদায় উপকৃত হলেও সাধারণ ভোক্তারা ভোগান্তির শিকার হবেন। তাদেরকে ভোগান্তিতে ফেলে, তাদের কাছ থেকে ইতিবাচক আচরণ অসম্ভব। তাই সামনে নির্বাচন মাথায় নিয়ে ভ্যাট আইন আগের মতোই হিমাগারে রাখা উচিত। ভ্যাটের ও আয়করের আওতা বৃদ্ধি প্রয়োজন এবং দুটোর সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বর্তমানে উচ্চারিত বিশাল বাজেটের অর্থায়ন সম্ভব হবে বলে আমার বিশ্বাস।

লেখক: উপাচার্য, ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ।





« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: info@iportbd.com, বার্তা বিভাগ: newsiport@gmail.com