Friday, 22 September, 2017, 1:50 PM
Home জাতীয়
অর্থনীতির জ্ঞান যেখানে টনটনে!
অজয় দাশগুপ্ত
Published : Thursday, 22 June, 2017 at 12:00 AM, Count : 0
আপনি যদি বাজারে বিক্রয়ের জন্য কোনো পণ্য উৎপাদন করেন, আপনাকে বিপণন কৌশল জানতে হবে। বাজেটও একটি 'বিক্রয়যোগ্য' পণ্য। এতে সরকারের উন্নয়ন নীতি ও কৌশল তুলে ধরা হয়। আরও থাকে সরকারের আয়-ব্যয়ের হিসাব, যা কমবেশি দেশের প্রায় সব নাগরিককে ছুঁয়ে যায়। আগামী অর্থবছরের জন্য অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত গত ১ জুন জাতীয় সংসদে যে বাজেট পেশ করেছেন, তা উপস্থাপনের জন্য পাঠ করেছেন ১৩৮ পৃষ্ঠা। অনেকেই বলছেন, অর্থমন্ত্রী বাজেটের পাঠে রীতিমতো রেকর্ড করে ফেলেছেন। কিন্তু এত বাক্য ও শব্দের সমাহার ঘটিয়েও তিনি তার পণ্য কেন বিপণন করতে পারলেন না? তার প্রোডাক্ট কেন সেলঅ্যাবেল হলো না?

অর্থমন্ত্রী শুধু নয়, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের শীর্ষ ব্যক্তিদেরও এই বিপণন ব্যর্থতা নিয়ে ভাবতে হবে। তাদের এটাও ভাবতে হবে যে, কেন দিনের পর দিন চার লাখ ২৬৬ কোটি টাকার বাজেট আলোচনা মূলত মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট এবং ব্যাংক হিসাব থেকে আবগারি শুল্ক কেটে নেওয়ার প্রস্তাবের মধ্যে সীমিত থেকে গেল? নতুন ভ্যাট আইন ২০১২ সাল থেকেই আলোচনায়। ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিরা বারবার সময় নিচ্ছিলেন অর্থমন্ত্রীর কাছে। তারা এ বছর বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেছিলেন। আমরা এটাও জানি যে, এফবিসিসিআইসহ শিল্প-বাণিজ্যের বিভিন্ন চেম্বারের নেতৃত্ব পদে সরকারের পছন্দের ব্যক্তিদেরই ঠাঁই হয়। শেষ পর্যন্ত নিজেদের লোকদের কাছে আরও একবার নতি স্বীকার করতে হলো অর্থমন্ত্রীকে। তিনি দলের মধ্যে কিংবা মন্ত্রিসভার সহকর্মীদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সমর্থন পেলেন না কেন? এটা কি কেবল তার মাঝে মধ্যে মেজাজ হারিয়ে ফেলা কিংবা রূঢ় সত্য ভাষণ প্রদানের কারণে? অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে অর্থ মন্ত্রণালয় ছাড়াও পরিকল্পনা, শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জড়িত। এ চারটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে যারা রয়েছেন তাদের মধ্যে দু'জন আমির হোসেন আমু ও তোফায়েল আহমেদ ষাটের দশক থেকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয়ভাবে জড়িত। পরিকল্পনামন্ত্রীর প্রধান পরিচয়- ব্যবসায়ী। অর্থমন্ত্রী যদিও ছাত্রজীবনে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন এবং ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণের কারণে জেল খেটেছেন; তবে তাকে মূলত সাবেক আমলা হিসেবে গণ্য করা হয়। সামাজিক পর্যায়ে একান্ত আলোচনায় একটি প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছি এভাবে- অর্থ, কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য ও পরিকল্পনামন্ত্রী নিজেদের মধ্যে অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে কি নিয়মিত মতবিনিময় করেন? তারা কি অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান, অর্থ সচিব এবং এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের কাছ থেকে অর্থনীতির হালচাল সম্পর্কে অবহিত হন? এমন প্রশ্নের উত্তর যদি 'হ্যাঁ-সূচক' হয়ে থাকে, সেটা অবশ্যই দেশের জন্য শুভ; কিন্তু যদি উত্তর হয়- 'না'?

১৮ জুন সমকালে একটি খবরের শিরোনাম ছিল- 'আবারও কোরাম সংকটে সংসদ।' ১৭ জুন সকাল সাড়ে ১০টায় সংসদ অধিবেশন শুরুর কথা ছিল। সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অধিবেশন কক্ষে হাজির; কিন্তু তখন মাত্র ১৬ জন সদস্য সেখানে উপস্থিত। সংসদে কোরাম পূর্ণ হতে ৬০ জন সদস্য উপস্থিত থাকতে হয় এবং এ ম্যাজিক ফিগারে পেঁৗছাতে প্রায় আধঘণ্টা সময় চলে যায়।

সংসদে কোরাম সংকট নতুন নয়। টেলিভিশনে নিয়মিত সংসদ অধিবেশন কার্যক্রম প্রচার করা হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক যে, মন্ত্রিসভার সদস্যদের জন্য নির্ধারিত অনেক আসন নিয়মিত ফাঁকা থাকে। তারা কি সংসদ কার্যক্রমের বিষয়ে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন?

বাংলাদেশে স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়ে থাকেন। সংসদে ৩০০ আসনে সরাসরি নির্বাচন হয়। নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসন রয়েছে ৫০টি। জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়ার জন্য সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত পদের নাম জাতীয় সংসদ সদস্য। বাংলাদেশে এখন হাজার হাজার নারী-পুরুষ পাওয়া যাবে, যাদের একটি ইচ্ছা প্রবল- সংসদ সদস্য পদ পাওয়া। এ পদে নির্বাচিত হতে পছন্দের দুটি দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। সামরিক শাসনের সময় জিয়াউর রহমান ও এইচএম এরশাদ ক্ষমতায় থেকে রাজনৈতিক দল গঠন করেছিলেন। তারা জাতীয় সংসদ নির্বাচন দিয়েছিলেন; তবে কলকাঠি এমনভাবে নেড়েছেন, যাতে নিজ দলের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত হয়। অন্যথায় সামরিক শাসন জারির ঘোষণা যে বৈধতা প্রদান করা যায় না! আওয়ামী লীগ থেকে এখন যারা সংসদ সদস্য পদটি পেতে চান তাদের অনেকের সুপ্ত বাসনা_ ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির যেন পুনরাবৃত্তি হয়। বিএনপির অনেক নেতার মনে বাসনা প্রবল যে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির মতো যেন ফাঁকা মাঠে গোল দেওয়ার ব্যবস্থা হয়। বিএনপি ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারিতে নির্ধারিত নির্বাচনেও কিন্তু ফাঁকা মাঠে গোল দেওয়ার আয়োজন করেছিল। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন কয়েকটি দল নির্বাচন বয়কট করে। বিএনপির ১৭ জন এ নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন, যাদের মধ্যে ছিলেন খালেদা জিয়া, তারেক রহমান ও সাইফুর রহমান। আরও ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর আমির মতিউর রহমান নিজামী।

এখন সংসদে অতিসহজে যারা যেতে চান তারাও কিন্তু সংসদ অধিবেশনে হাজির হতে আগ্রহ দেখান না? তাহলে এটা কি ধরে নিতে পারি যে, একাদশ সংসদ নির্বাচনে তারা মনোনয়ন পেতে আগ্রহী নন!

আগামী অর্থবছরের বাজেটে রাজস্ব আয় ধরা হয়েছে প্রায় দুই লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে (২০১৬-১৭) আয় ধরা হয়েছিল প্রায় দুই লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। কিছুদিন পর তা সংশোধন করে ধরা হয় দুই লাখ সাড়ে ১৮ হাজার কোটি টাকা। সংসদে আলোচনা হতে পারত- চলতি বছরের চেয়ে যে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা বেশি আয় করতে চাইছেন অর্থমন্ত্রী, তা কীভাবে অর্জিত হবে? চলতি অর্থবছরে বৈদেশিক ঋণ-অনুদান সূত্রে পাওয়ার কথা প্রায় ২৯ হাজার কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরে কোন জাদুর কাঠিতে তা ৫২ হাজার কোটি টাকায় পেঁৗছাবে? এসব বিষয় নিয়ে শিল্প, বাণিজ্য, অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী নিজেদের মধ্যে দফায় দফায় বৈঠক করতে পারতেন, সংসদে সমস্বরে তারা কথা বলতে পারতেন। আগামী বছর উন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছে এক লাখ ৫৯ হাজার কোটি টাকা। ২০১৫-১৬ অর্থবছরের উন্নয়ন ব্যয় ছিল এর ঠিক অর্ধেক। শিল্প, বাণিজ্য, অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা চাই এ বাজেট বাস্তবায়নের জন্য। কিন্তু সংসদে উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়নের সমস্যা নিয়ে কার্যকর আলোচনা হতে শুনি না। পদ্মা সেতু আমাদের স্বপ্নের প্রকল্প। এ প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে বিশ্বব্যাংক যে প্রতিবন্ধকতা গড়ে তুলেছিল, তা সাহসের সঙ্গে মোকাবেলা করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আমাদের কাছে পদ্মা সেতু একটি চেতনার নাম, একটি স্পিরিট। এ প্রকল্প একটি পরনির্ভর দেশের নিজের পায়ে দাঁড়ানোর ঐকান্তিক প্রচেষ্টার অনন্য নজির। কিন্তু জাতীয় সংসদে এ সেতু এবং এ ধরনের আরও বড় প্রকল্পের ব্যয় নিয়ে আলোচনা হয় না কেন? বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিস থেকে বলা হয়েছে, প্রতি বর্গকিলোমিটার সড়ক নির্মাণে ভারত ও চীনের তুলনায় অনেক বেশি অর্থ ব্যয় হয় বাংলাদেশে। এই বাড়তি ব্যয়ের কারণ দুর্নীতি, নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়া এবং দরপত্রে প্রতিযোগিতা না থাকা। বিশ্বব্যাংক হিসাব দিয়েছে এভাবে- চার লেনের রংপুর-হাটিকুমরুল মহাসড়ক নির্মাণে প্রতি বর্গকিলোমিটারে বাংলাদেশের ব্যয় পড়েছে ৬৬ লাখ ডলার। ঢাকা-মাওয়া সড়কে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় পড়েছে এক কোটি ১৯ লাখ ডলার। ঢাকা-চট্টগ্রাম সড়কে এ ব্যয় তুলনামূলক কম- ২৫ লাখ ডলার। অথচ ভারত ও চীনে চার লেনের এক কিলোমিটার মহাসড়ক নির্মাণে ব্যয় পড়ে ১১ থেকে ১৬ লাখ ডলার। সব দেশে সড়কের জন্য ভূমি দখলের সমস্যা এক নয়। অন্য সমস্যাও থাকতে পারে; কিন্তু তাই বলে ব্যয়ে এত পার্থক্য কেন? সংসদ সদস্যরা জাতীয় বাজেট আলোচনায় সঞ্চয়পত্রের সুদের হার ও ব্যাংক হিসাবে আবগারি শুল্কের মতো ইস্যুতে নিজেদের আটকে না রেখে বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের সমস্যার প্রতি মনোযোগ দিতে পারতেন। তারা এটাও বলতে পারতেন যে, এ বছর হাওরে ফসলহানির জন্য সর্বোচ্চ ১০ লাখ টন খাদ্য ঘাটতি হতে পারত। এমনটি দেশের কোথাও শোনা যায়নি যে, বাজারে গিয়ে ক্রেতারা চাহিদা অনুযায়ী চাল কিনতে পারেনি। তাহলে খাদ্যের বাজার এভাবে চড়ে গেল কেন? কেন ক্রেতাদের এভাবে পকেট কাটতে দেওয়া হলো? আমাদের মন্ত্রিসভায় অভিজ্ঞ রাজনীতিকের সংখ্যা কম নেই। চালের বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে যারা রাতারাতি অঢেল সম্পদের মালিক হলো, তাদের কারও বিরুদ্ধেই কেন সরকার ব্যবস্থা নিতে পারল না?

সরকার চালের আমদানি শুল্ক কমিয়েছে। এর ফলে আগামী অর্থবছরে সরকারের রাজস্ব আয়ে প্রভাব পড়বে। ভ্যাট বা মূল্য সংযোজন করহার যদি কমানো হয় কিংবা আরও কিছু পণ্যে ভ্যাট ছাড় পায়, তাহলেও বাজেটে প্রভাব পড়বে। অর্থাৎ বাজেট পাস হওয়ার আগেই ভিতটা নড়বড়ে হয়ে গেল। কিন্তু অর্থমন্ত্রীর দুর্ভাগ্য, তিনি নিজেও নিজের প্রস্তাবের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিতে পারলেন না কিংবা তার ঘনিষ্ঠ সহকর্মীরাও কেউ তেমনভাবে তার পাশে দাঁড়াল না। আমাদের কিন্তু এমন চিত্রও দেখতে হতে পারে- চালের আমদানি শুল্ক বিপুলভাবে কমানোর পরও বাজারে চালের দাম তেমন কমলো না এবং এর সুফল চলে গেল চাল ব্যবসায়ীদের পকেটে।

সব শেষে সেই পুরনো কথাটাই বলি- বাংলাদেশের রাজনীতিকরা দেশের অর্থনীতি নিয়ে মাথা ঘামাতে তেমন আগ্রহ দেখান না; কিন্তু নিজের অর্থনীতি, পরিবার ও ঘনিষ্ঠজনের অর্থনীতি খুব ভালোই বোঝেন। নিজের আয় কীভাবে বাড়িয়ে নিতে হয় সে বিষয়ে তাদের জ্ঞান যে একেবারে টনটনে! হায়! এর সামান্য জ্ঞানও যদি দেশের জন্য কাজে লাগাতেন, আমরা বর্তে যেতাম। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে মধ্যম আয়ের দেশে পেঁৗছাতে হলে দেশের স্বার্থকে সবার ওপরে স্থান দেওয়ার যে বিকল্প নেই।

সাংবাদিক

ajoydg@gmail.com







« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: info@iportbd.com, বার্তা বিভাগ: newsiport@gmail.com