Tuesday, 24 October, 2017, 4:28 AM
Home ভ্রমণ
চলো যাই শ্রীমঙ্গল
হুমায়ূন কবীর ঢালী
Published : Tuesday, 20 June, 2017 at 2:29 PM, Update: 20.06.2017 2:30:48 PM, Count : 1
হুট করেই সিদ্ধান্ত হল শ্রীমঙ্গল বেড়াতে যাব। ছেলেমেয়েদের বায়না আর প্রতিনিয়ত তাগাদার কারণে। ওদের ইচ্ছে চা-বাগান দেখবে। আমি বললাম, ঠিক আছে দেখাতে নিয়ে যাব।
বৌদ্ধ পূর্ণিমার ছুটি। বৃহস্পতিবার। সঙ্গে সাপ্তাহিক ছুটি শুক্রবার। অফিসে কাজের চাপ আর বড় ছুটি না পাওয়ার কারণে কোথাও যাওয়া হয় না। ছেলেমেয়েদের বায়নাও পূরণ করা হয় না। এবার না গেলেই নয়। গেট রেডি। কাপড়-চোপড় গোছাও। দেখি আমি টিকিটের ব্যবস্থা করতে পারি কিনা।
তখন সকাল নয়টা। টিকিটের জন্য বেরিয়ে গেলাম। ছেলেমেয়ে বাসে যাবে না। ট্রেনে যাবে। গেলাম কমলাপুর। কোনও টিকিট নেই। ফার্স্ট ক্লাস, সেকেন্ড ক্লাস, কেবিনÑ কোনওটারই না। বরং টিকিট চেয়ে যেন মহা অপরাধ করে ফেলেছি, এমন ভাব টিকিট বিক্রেতার।
আরে ভাই, সাত দিন আগে এসেই টিকিট পায় না, আপনি আইছেন আজকের টিকিট নিতে। জানেন না, বিষুদবার বৌদ্ধ পূর্ণিমার ছুটি? শুক্রবার বন্ধ। শনিবার সরকারি ছুটি। পাবলিক তিন দিনের ছুটি পাইছে। বুঝতে পারছেন?
জি, বুঝতে পেরেছি। বাসায় ফোন করে জানালাম ট্রেনের টিকিট হবে না।
না হয় বাসের টিকিট নিয়ে আসো। বাসা থেকে বলল।
বুঝতে পারলাম, যেভাবেই হোক ছেলেমেয়েরা আজ শ্রীমঙ্গল যাবেই।
ফোনে কথা বলতে শুনে এক ভদ্রলোক যেচে বললেন, ইউনিকে চইলা যান, ট্রেনের চে ভালা। খুব আরাম।
তাই নাকি? থ্যাঙ্কস। ইউনিকের কাউন্টার কোথায়?
রাজারবাগ।
দেরি করা ঠিক হবে না। রিকশা নিয়ে সোজা রাজারবাগ।
ইউনিকের কাউন্টারে খোঁজ নিয়ে জানা গেল। সিলেটের কোনও টিকিট নেই।
শ্রীমঙ্গল?
আমাদের গাড়ি শ্রীমঙ্গল যায় না।
কী করা? ভাবলাম।
শ্রীমঙ্গল যেতে হানিফের গাড়ি এভেলেবেল। কেউ একজন বলেছিল।
ফের কমলাপুর।
এই রিকশা যাবে?
কমলাপুর গিয়ে হানিফের টিকিট পেলাম। দুটোয় গাড়ি। পেছনের সিট। উপায় নেই। পাবলিক বড় ছুটি পেয়েছে। ঘরে না ফিরে পারে!
 
অপেক্ষার প্রহর
আমার বাসা ফরিদাবাদ হওয়ায় কমলাপুরের বদলে সায়েদাবাদ থেকে বাসে উঠতে হবে।
দুটোয় গাড়ি। আমরা দেড়টায় গিয়ে হাজির। হানিফের কাউন্টার ইনচার্জ জানাল, আরে ভাই, দুইডা কইলেই কি দুইডায় ছাড়ন যায়? কমলাপুর থন দুইডায় ছাইড়া আইবো। ছায়দাবাদ পোছতে পোছতে আড়াইডা পোনে তিনডা তো বাজবোই।
বাজুক ভাই। যা খুশি বাজান। শ্রীমঙ্গল যেতে পারলেই হয়। মনে মনে বললাম।
মেজাজটা একটু খারাপও হলো।
আমার চার বছরের ছেলে বলল, আব্বু বাস আসতে দেরি হবে, চলো না রিকশায় চলে যাই। আমার বাসে যেতে ভালো লাগে না।
কোথায়?
শ্রীমঙ্গল।
ছেলের কথা শুনে না হেসে পারলাম না।


 
পথে যেতে যেতে
পোনে তিনটার দিকে আমাদের গাড়ি ছাড়ল। গাড়ি ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জ্যাম নামক যন্ত্রণার শুরু। গুনে গুনে গাড়ি এগোতে লাগল। সায়েদাবাদ থেকে কাঁচপুর ব্রিজ পর্যন্ত যেতে লাগল দেড় ঘণ্টা। প্লাস কাঁচপুর ব্রিজ পার হতে আধঘণ্টা।
ব্রিজ পেরিয়ে গাড়ি চলতে লাগল আপন গতিতে। ধীরে ধীরে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে শুরু করলাম। ঢাকার অসহনীয় জ্যাম, ভেঁপুর যন্ত্রণা পেছনে ফেলে আমাদের বাস যখন ভুলতা পৌঁছল, ভালোলাগার পুরো আবেগ ভর করল তখন। গ্রীষ্মের কারণে রাস্তার দু’পাশের গাছগাছালি গায়ে সবুজ রঙ মেখে আমাদের ডাকাডাকি করছিল। রাধাচূড়া, স্বর্ণচূড়ারা সবুজ ডালে ফুল ফুটিয়ে যেন মাথায় রাজকন্যার মুকুট পরে আমাদের অভ্যর্থনা জানাচ্ছিল। কী দারুণ! কী দারুণ। গাড়ি এগোচ্ছে। আকাশে মেঘের উঁকিঝুঁকি। যে কোনও সময় বৃষ্টি হয়ে ভিজিয়ে দেবে দু’পাশের সবুজ পাথার আর আমাদের বহন করা যানটিকে। বাসের জানালা খোলা থাকায় ঠাণ্ডা বাতাস জোর করে গাড়ির ভেতর ঢুকে পড়ছিল। মন্দ লাগছিল না। শরীর জুড়িয়ে দিচ্ছিল শীতল আবেশে। প্রকৃতি সহায় হলে এমন যাত্রা প্রতিদিন হলেই বা কী।
যাত্রা হয়ে ওঠে তখন কাব্যময়। বাক্সময়।
এক ভালোলাগার আবেশে ডুবে গেলাম। বুঝতেই পারিনি আমাদের বাস কখন বাংলাদেশের চায়ের দেশ শ্রীমঙ্গল এসে গেছে । সুপারভাইজার যখন জানিয়ে দিল আমাদের গন্তব্যস্থলে চলে এসেছি, নেমে গেলাম।
সন্ধ্যা হয়ে গেছে। বন্ধু সেলিম হাসান বলেছিল নেমেই যেন ফোন দেই। দিলাম। ফোন পেয়ে দ্রুত ছুটে এলো। শ্রীমঙ্গলে ভালো আবাসিক হোটেল আছে কিনা, জানতে চাইলে বন্ধু সেলিম রেগে আগুন। তার বাসা থাকতে হোটেল কেন?
তার ধমক খেয়ে দ্বিরুক্তি করার সাহস পেলাম না। একটা স্কুটার করে আমাদের নিয়ে গেল তার বাড়িতে।
শ্রীবর্ধক শ্রীমঙ্গল
অনেকদিন পর বন্ধুকে পেয়ে আর্ধেক রাত গেল কথা আর আড্ডায়। ঘুম যখন ভাঙল সকাল দশটা। ঘুম ভাঙতেই দেখি বাইরে ঝিরঝিরে বৃষ্টি। আশঙ্কা জাগল মনে, শ্রীমঙ্গলের শ্রী দেখা হবে কিনা কে জানে!
প্রকৃতি বোধহয় মানুষের মন বোঝে। আশঙ্কার পরপরই বৃষ্টি থামতে শুরু করল। একসময় আকাশ একেবারে ফকফকা। সূর্যের মুচকি হাসি। একচিলতে রোদ। যেন নববধূর চিকন হাসি শাড়ির ফাঁক গলে ভেজা জমিনে আছড়ে পড়েছে।
তাহলে বেরোনো যায়। বেরিয়ে পড়লাম। মণিপুরী পাড়ার কাছেই বন্ধুর বাড়ি। তাই রামনগরে অবস্থিত মণিপুরী পাড়া হয়ে চা বাগানে ঢোকার প্রস্তাব পেতেই অনায়াসে রাজি হয়ে গেলাম।
বাংলাদেশের একটি ক্ষুদ্র ও বৈশিষ্ট্যপূর্ণ জনগোষ্ঠীর নাম মণিপুরী। এদের আদি নিবাস ভারতের মণিপুরী রাজ্যে। মণিপুরীদের রয়েছে নিজস্ব ভাষা, বর্ণমালা, সাহিত্য এবং সমৃদ্ধ সংস্কৃতি।
মণিপুরী পাড়ায় ঢুকতেই প্রথমে চোখে পড়ল সাঙাই মণিপুরী হ্যান্ডিক্র্যাফট্স ও ট্রেনিং সেন্টারের একটি সাইনবোর্ড। হাতে বোনা কাপড় তৈরিতে মণিপুরীরা খুবই দক্ষ। প্রায় প্রতিটি ঘরেই রয়েছে তাঁত। মণিপুরী হস্তশিল্প বিশ্বজুড়ে সমাদৃত।
নিজেদের চাহিদা পূরণ করে বাঙালি ও পর্যটকদের মাঝে সরবরাহের লক্ষ্যে রামনগর মণিপুরী পাড়ায় রয়েছে একাধিক কাপড়ের দোকান। দোকানে ঢুকে দেখতে পেলাম দৃষ্টিনন্দন ডিজাইন ও মজবুত বুননের বাহারি সব কাপড় ও পোশাক। দোকানে ঢুকলে লোভে পড়তেই হয়। আমার ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি।
 
রাম গৌড়ের সাতরঙা চা
মণিপুরী পাড়ার রাস্তা ধরে সামনের দিকে এগিয়ে গেলেই ফিনলের চা বাগান। ডান দিকে তাকালে দৃষ্টিনন্দন রাবার বাগান চোখে পড়বে। চা বাগানে ঢোকার আগে একটু চা খেয়ে নিলে কেমন হয়? তাও যদি হয়, বিশেষ কোনও চা। বিশেষ চা বলতে নীলকণ্ঠ চা কেবিনের রমেশ রাম গৌড়ের সাত লেয়ারের চা। সাত লেয়ার বলতে একই গ্লাসে সাত রঙের চা। দাম সত্তর টাকা। ছয় লেয়ার হলে ষাট টাকা। এভাবে প্রতি লেয়ারে দশ টাকা করে কমবে।
দাম যতই হোক, শ্রীমঙ্গল গিয়ে নীলকণ্ঠ কেবিনে ঢুঁ না মারলে কি হয়? এককাপ চা না খেয়ে শ্রীমঙ্গল ত্যাগ করা কি ঠিক হবে?
একেবারেই না। সত্তর টাকা দিয়ে সাত লেয়ারের এককাপ চা খেয়ে নিলাম। দশ লেয়ারের চা খেতে চাইলাম। রাম গৌড় বলল, আবিষ্কার করলেও এখনও বাণিজ্যিকভাবে চালু করেনি।
রমেশ রাম গৌড়ের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেল, দশ লেয়ার পর্যন্ত আবিষ্কার করেছে সে। ইতিমধ্যে তার এই আবিষ্কারের কথা দেশ-বিদেশ ছড়িয়ে পড়েছে। বিভিন্ন দেশ থেকে অফার এসেছে, আমন্ত্রণ এসেছে যাওয়ার জন্য। কিন্তু সরল রমেশ রামের ভয়, বিদেশে নিয়ে গিয়ে যদি তার এই আবিষ্কারের ফর্মুলা জোর করে নিয়ে নেয়। সে তার ফর্মুলা কাউকে দিতে চায় না। তবে তার তিন সন্তানকে শিখিয়েছে এই ফর্মুলা। যাতে তার অবর্তমানে ছেলেরা সবাইকে খাওয়াতে পারে।
আপনি শ্রীমঙ্গল আসবেন, রাম গৌড়ের হাতের এক কাপ রঙিন চা খাবেন না, তা কী করে হয়!
 
চা বাগানে
রাম গৌড়ের হাতের চা খেয়ে সোজা ঢুকে গেলাম চা বাগানে। আমরা যে বাগানটায় ঢুকলাম, তা ফিনলের। বেশ পুরনো। শ্রীমঙ্গলে রয়েছে তাদের অনেক চা বাগান।
চা বাগানে ঢুকেই ছেলেমেয়েরা আনন্দে লাফিয়ে উঠল। বাগানের সৌন্দর্য, সারিসারি-পরিপাটি চা গাছ দেখে কার না মনে আনন্দ ভর করে। এই বাগানটি সমতলভূমিতে থাকার কারণে বাগানে গাছের উপরিভাগটা মনে হচ্ছিল চা পাতায় সাজিয়ে রাখা শীতলপাটি। ইচ্ছে করছিল গড়াগড়ি যাই। অন্বয় তো বলেই বসল, বাবা আমাকে গাছের উপর শুইয়ে
দাও না?
ওর কথা শুনে হাসলাম। আমার মনের কথা ছেলে জানল কী করে?
আমরা যখন বাগানে ঢুকলাম, তখন বাগানের শ্রমিকরা গাছ থেকে চা উত্তোলন করছিল। সংখ্যায় তারা আট-দশ জন। তাদের দেখাশোনা করার জন্য রয়েছে একজন সুপারভাইজার। যতিন ব্যানার্জী। তার সঙ্গে আলাপ করে জানা গেল এক একটা চা গাছের বয়স প্রায় ষাট থেকে সত্তর বছর। লম্বায় তিনচার ফুট। যদিও নিয়মিত ছেঁটে রাখার কারণেই গাছগুলো তিন-চার ফুট থেকে যায়। বড় হলে চা উত্তোলনে অসুবিধা।
শ্রমিকদের কাজ হচ্ছে চা গাছের কুঁড়ি উত্তোলন করা। উন্নত চা পাওয়ার জন্য সাধারণত চা গাছের অগ্রভাগের আড়াইপাতা উত্তোলন করা হয়। কিন্তু শ্রমিকদের দেখা গেল গাছের অগ্রভাগের তিন বা চার পাতা পর্যন্ত উত্তোলন করছে।
শ্রমিকদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেল, সুপারভাইজারদের নির্দেশের বাইরে কিছুই করার নেই তাদের। প্রতিদিন তেইশ কেজি চায়ের সবুজ কুঁড়ি উত্তোলন করতে পারলে পাবে আটচল্লিশ টাকা। যদি বাইশ কেজি উত্তোলন করে তবে টাকা কমে যাবে। তবে চব্বিশ কিংবা তার অধিক উত্তোলন করলে টাকা বাড়বে না। টাকা বাড়বে তখনি, যদি কোনো শ্রমিক ছেচল্লিশ কেজি উত্তোলন করতে পারে। সে ক্ষেত্রে তার মজুরি বেড়ে ছিয়ানব্বই টাকা হয়ে যাবে।
বাগানে কাজ করছিল কিশোরী স্মৃতি। বয়স বারো কী তেরো। অনতিদূরে বাগানের সুপারভাইজার থাকায় আমার সঙ্গে কথা বলতে ভয় পাচ্ছিল মেয়েটা।
ও বাগানের নিয়মিত শ্রমিক নয়। মায়ের জ্বর থাকায় ওকে আসতে হয়েছে। মায়ের হাজিরা না থাকলে চাকরি যাওয়ার ভয় আছে। এছাড়া সংসার চলে ওর মায়ের রোজগারের টাকায়। সংসার চালাতে হলে কারও না কারও শ্রম দিতেই হবে।
এর বেশি কিছু জানা সম্ভব হয়নি।
কারণ, আমাকে কথা বলতে দেখে অনতিদূর থেকে ছুটে এলো সুপারভাইজার যতিন ব্যানার্জী।
দাদা, ওকে ডিস্ট্রাব করবেন না।
আমার হাতে ক্যামেরা দেখে বলল, প্লিজ ওর ছবি তুলবেন না।
ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও স্মৃতির সঙ্গে আর কথা বলা হল না। ওর সম্পর্কে, ওদের সংসার ও মায়ের অসুখ সম্পর্কে বিস্তারিত না জেনেই বেরিয়ে এলাম বাগানের ভেতর থেকে।
চা বাগানে অনুপম সৌন্দর্য কিছুটা হলেও থিতু হয়ে এলো স্মৃতিলাপে। 






« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: info@iportbd.com, বার্তা বিভাগ: newsiport@gmail.com