Tuesday, 12 December, 2017, 6:02 PM
Home জাতীয়
এই বাংলাদেশ সেই বাংলাদেশ নয়
জাস্টিন গোমেজ লিখেছেন ইত্তেফাকে
Published : Monday, 19 June, 2017 at 2:57 PM, Count : 0
এই বাংলাদেশ সেই বাংলাদেশ নয়। সারা বিশ্ব এখন বাংলাদেশের অর্থনীতিকে বিস্ময়কর বলে মনে করে। কারণ দেশের অর্থনীতি অবিশ্বাস্যভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। এখন দেশের অর্থনীতি অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে সমৃদ্ধ, বিস্তৃত, স্থিতিশীল ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে যুক্ত। স্বাধীনতার পর বিগত ৪৫ বছরে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দেশের অর্থনীতির চালিকা শক্তিগুলো পাল্টাচ্ছে। লক্ষণীয় বিষয় হলো, কৃষিনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে এসে ক্রমশ শিল্প ও সেবাখাতমুখী হচ্ছে আমাদের অর্থনীতি। আর এটি অর্থনীতির মৌলিক কাঠামো বদলে দিয়েছে যা ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। লন্ডনের জাতীয় দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান মন্তব্য করেছে, ২০৫০ সালে বাংলাদেশ প্রবৃদ্ধির বিচারে পশ্চিমা দেশগুলোকেও ছাড়িয়ে যাবে। আর যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান উইন ও গ্যালাপ ইন্টারন্যাশনাল সূচকে বিশ্বের শীর্ষ ১০ আশাবাদী দেশের তালিকায় প্রথম স্থানটি নিশ্চিত করেছে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতি সম্পর্কে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি ঢাকা সফরে এসে বলেছেন, ‘বাঙালি জাতির মেধা, পরিশ্রম আর একাগ্রতার মাধ্যমে বাংলাদেশ আজ সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাচ্ছে।’ বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম সম্প্রতি বাংলাদেশ সফরে এসে মন্তব্য করেছেন, বাংলাদেশে যত কম সময়ে এগিয়েছে, অন্য কোনো দেশ এত কম সময়ে এগিয়ে যেতে পারেনি। বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ পল রোমান বলেছেন, বাংলাদেশ এমন এক অভিনব উন্নয়ন কৌশল গ্রহণ করেছে যার ফলে একদিকে দ্রুত প্রবৃদ্ধি ঘটছে, অন্যদিকে বৈষম্য বাড়ছে না। বাংলাদেশ দেখিয়েছে কীভাবে চরম দারিদ্র্যকে দূর করতে হয়, কীভাবে প্রাথমিক শিক্ষাকে নাগালের মধ্যে আনতে হয়, নারী ও পুরুষের মধ্যে বিদ্যমান বৈষম্য কমাতে হয়। তাই তো সমৃদ্ধি আর উন্নয়নের ধারাবাহিকতা নিয়ে এখন শুধু এগিয়ে যাচ্ছে সামনের দিকে। দেশের রপ্তানি আয় বেড়েছে। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়েছে। পোশাক রপ্তানি খাতে বিশ্বে বাংলাদেশ এখন দ্বিতীয়। এছাড়াও জনসংখ্যা বৃদ্ধি, কৃষিজমি কমতে থাকাসহ জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে বন্যা, খরা, লবণাক্ততা এবং বৈরী প্রকৃতিতেও খাদ্যশস্য উত্পাদনেও বাংলাদেশ এখন বিশ্বের কাছে অনুসরণীয় উদাহরণ।

বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বিশ্ব অর্থনৈতিক সূচকে বলা হয়েছে, বিশ্ব অর্থনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান এখন ১৪ ধাপ এগিয়ে ৪৪তম। অবিশ্বাস্য বিষয় হলো, বাংলাদেশের ওষুধ এখন ইউরোপ, আফ্রিকা ও এশিয়ার আরো অনেক দেশে রপ্তানি হচ্ছে। জনশক্তি রপ্তানির ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ দেশ। জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা মিশনে বাংলাদেশের যে অগ্রণী ভূমিকা তা সকলেরই জানা। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ৩ হাজার কোটি টাকা— যা বিশ্বের ৪০তম বৃহত্তম মজুত। প্রযুক্তির জগতে দেরিতে প্রবেশ হলেও গুটি-গুটি পায়ে প্রযুক্তি জগতে এগিয়ে যাচ্ছে। আমাদের দেশের তৈরি সফটওয়্যার এখন বিদেশের বাজারে ক্রমশ দ্বার উন্মোচন করছে। ইতোমধ্যে বছরে ১০ কোটি ডলার ঘরে তোলা সম্ভব হচ্ছে সফটওয়্যার রপ্তানি করে। এতে কর্মসংস্থানেরও সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে অনেক যুবার। ২০০৯ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে এ খাতে রপ্তানি বেড়েছে সাড়ে সাত গুণ। আর প্রবৃদ্ধির এ ধারা অব্যাহত থাকলে ২০১৮ সাল নাগাদ সফটওয়্যার রপ্তানি ১০০ কোটি মার্কিন ডলারে উন্নীত করা সম্ভব বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট খাতের ব্যক্তিরা।

তথ্য অনুযায়ী, গত সাত বছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ক্রমবর্ধমান হারে বেড়েছে। ২০১৫-১৬ অর্থ বছর শেষে প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৭.০৫% যা আগের টানা পাঁচ অর্থ বছরে প্রবৃদ্ধি ৬%-এর ওপরে। সামষ্টিক অর্থনীতিতে এখন প্রায় সবগুলো সূচকেই ভালো অবস্থা। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। সম্প্রতি আমাদের প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরে বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্ক আরো ঘনিষ্ঠ হয়েছে। এর আগে চীনের প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশ ভ্রমণ করে গেছেন। তার সফরে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি হয়েছে। জাপানও আমাদের সঙ্গে বিভিন্ন চুক্তি করেছে যা সুসম্পন্ন হলে দেশ যাবে উন্নতির চূড়ায়। ধীরে-ধীরে এই ইতিবাচক পরিবর্তনের ছোঁয়া স্তরে স্তরে উন্মোচিত হচ্ছে। সামাজিক নিরাপত্তা ও উন্নয়ন নিয়ে বিশ্ব নেতারা রীতিমতো প্রশংসা করছেন। সরকারের বাজেটীয় উদ্যোগগুলোর পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংক সকল ব্যাংককেই উন্নয়নধর্মী কাজে ব্রতী করছে। ফলে দেশীয় চাহিদা ও বাজার যেমন বাড়ছে, তেমনি সরবরাহও বাড়ছে।

দেশের প্রত্যাশিত আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য আধুনিক টেকসই, নিরাপদ, সাশ্রয়ী এবং পরিবেশবান্ধব যোগাযোগ ব্যবস্থায় আমাদের দেশ আজ নিজস্ব অর্থায়নে এদেশের সর্ববৃহত্ সড়ক অবকাঠামো পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছে এবং ভালোভাবেই চলছে। ২০১৮ সাল নাগাদ যানবাহন চলাচলের জন্য খুলে দেয়ার লক্ষ্য নিয়ে এ সেতুর কাজের অগ্রগতি ইতিবাচক। এ সেতু বাস্তবায়িত হলে জাতীয় জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ১.২% বৃদ্ধি পাবে এবং প্রতি বছর ০.৮৪% হারে দারিদ্র্য নিরসনে অবদান রাখবে। ঢাকা মহানগরীর যানজট নিরসনে প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে উত্তরা থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক পর্যন্ত ২০ কিঃ মিঃ দীর্ঘ বাংলাদেশের প্রথম মেট্রোরেল বাস্তবায়নের কাজ পুরোদমে চলছে। চীন সরকারের সহযোগিতায় চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তলদেশ দিয়ে প্রায় সাড়ে ৩ কিঃ মিঃ দীর্ঘ টানেল নির্মাণ কাজ উদ্বোধন করা হয়েছে। ১৩৪.৬৪ কোটি টাকা ব্যয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে উন্নতমানের কম্পিউটারাইজড কন্টেইনার টার্মিনাল ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা প্রবর্তন করা হয়েছে। এছাড়াও দেশের তৃতীয় বাণিজ্যিক সমুদ্র বন্দর হিসেবে সীমিত আকারে পায়রা বন্দরের কাজ শুরু হয়েছে যা ২০২৩ সাল নাগাদ পুরোদমে চালু হবে।

সত্তরের দশকে পুরোপুরিই সাহায্যনির্ভর থাকা দেশটি নব্বইয়ের দশকে ধীরে-ধীরে পাল্টে যেতে শুরু করে। আর তখনকার সাহায্যনির্ভর বাংলাদেশ বাণিজ্যনির্ভর বাংলাদেশের দিকে যাত্রা শুরু করে। আর এ সাহায্যনির্ভর থেকে বাণিজ্যনির্ভর হওয়াটাও স্বাধীন বাংলাদেশের গত ৪৫ বছরের অন্যতম একটি অর্জন। বর্তমান সরকারের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, সর্বোপরি জনগণের সার্বিক সমর্থন ও সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে আজ বাংলাদেশের প্রতিটি সূচকে-সূচকে অগ্রগতি। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের অর্থনীতি যেভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে তা অবশ্যই প্রশংসনীয়। স্বাধীন বাংলাদেশের ৫০ বছর পূর্তি হবে আগামী ২০২১ সালে। আর সে সময়ের মধ্যে গোটা বিশ্বের মধ্যে অন্যতম লক্ষণীয় একটি স্থান নিশ্চিত করে নেয়া, ২০৩০ সলের মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নকে ছাড়িয়ে যাওয়া এবং ২০৫০ সালের মধ্যে পশ্চিমা বিশ্বকে ছাড়িয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছে বাংলাদেশ।

লেখক : শিক্ষার্থী, নটর ডেম কলেজ, ঢাকা





« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: info@iportbd.com, বার্তা বিভাগ: newsiport@gmail.com