Wednesday, 23 August, 2017, 10:24 AM
Home জাতীয়
চালের দাম বৃদ্ধি : মানুষের চরম ভোগান্তি
ড. আর এম দেবনাথ লিখেছেন ইত্তেফাকে
Published : Thursday, 15 June, 2017 at 2:40 PM, Count : 0

আর কয়েকদিন পরেই ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেট সংসদে পাস হয়ে যাবে। ইতোমধ্যে বাজেটের আলোচনা একটি বিষয়ের ওপর কেন্দ্রিভূত হয়ে গেছে। আর বিষয়টি হচ্ছে আবগারি শুল্ক বা এক্সাইজ ডিউটি। অথচ সংসদে বাজেট পেশের পূর্বে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল ‘ভ্যাট’ যা সর্বব্যাপী হতে যাচ্ছে এবং যা মূল্যস্ফীতি উসকে দেবে বলে সবার ধারণা। না, সংসদে এখন আলোচনা/সমালোচনার বিষয় হচ্ছে আবগারি শুল্ক। আবগারি শুল্ক ব্যাংক আমানতের ওপর আগে থেকেই ছিল। এক লাখ এক টাকা থেকে ১০ লাখ টাকার আমানতে এখন আবগারি শুল্ক ৮০০ টাকা। আগে ছিল ৫০০ টাকা। তিনশত টাকা বৃদ্ধি। বছরে একবার। এর প্রভাব মূল্যস্ফীতিতে কতটুকু? বরং উল্টো এর প্রভাব আয় হ্রাসে। মধ্যবিত্তের, নিম্নবিত্তের সুদ আয় হ্রাস পাবে। এর ওপর এত আলোচনা যে, অন্য বিষয় এখন চাপা পড়ে যাচ্ছে। অথচ তা হওয়া উচিত ছিল না। দৃশ্যত মনে হচ্ছে মিডিয়াও এতে তা দিচ্ছে। তা না হলে আরো অনেক বড় বড় ইস্যু আছে যা আলোচিত হওয়া দরকার। যেমন দ্রব্যমূল্য, চালের মূল্য ইত্যাদি। আমি বাজেটের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের দিকে গেলাম না। কারণ সাধারণ মানুষের কাছে এবারের বাজেট একটা ভীতির জন্ম দিয়েছে। বাজেট আবির্ভূত হয়েছে তার প্রতিপক্ষ হিসেবে। দেখা যাচ্ছে বাজেট পেশ হয়েছে এবার পবিত্র রমজান মাসে। এই মাসটি আবহাওয়ার দিক থেকে এবার শান্তির মাস। কিছু কিছু বৃষ্টি হচ্ছে। গরম কিছুটা কম। ঠান্ডা বাতাসও মাঝে-মাঝে বইছে। রোজাদারদের জন্য প্রকৃতি এবার দারুণ সদয়। কিন্তু বাজেট আবহাওয়াকে গরম করে তুলেছে। বাজেটের পূর্বে রমজান শুরুর প্রাক্কালে আমাদের ব্যবসায়ীদের একটা অংশ যথারীতি জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়ে দিতে শুরু করেন। অবশ্য এর আগেই চালের দাম, বিশেষ করে মোটা চালের দাম বাজারে বাড়তে শুরু করে। কী কারণ তা বোঝা দায়! ব্যবসায়ীরা একটা সুযোগও পেয়ে যান। বৃহত্তর সিলেট, কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোনায় অকাল বন্যা ও অতিবৃষ্টিতে বিস্তীর্ণ অঞ্চল হঠাত্ ভেসে যায়। কৃষকের ফসল যায়, গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি ভেসে যায়। লক্ষ লক্ষ কৃষক হয় ছিন্নমূল এবং তারা এখন সরকারের আনুকূল্যে বেঁচে আছে। বলাবাহুল্য, এই অতিবৃষ্টিতে ৪-৬ লাখ টন খাদ্যশস্য বা ধান নষ্ট হয়। আর যায় কোথায় বর্ধিষ্ণু চালের দাম আরো বাড়তে থাকে। গুজব ছড়ানো হয়। বলাবাহুল্য, চালের বাজারের এই অবস্থার মধ্যেই রমজান উপলক্ষে ব্যবসায়ীরা ডাল, তেল, ছোলা, সয়াবিন, চিনি, পিঁয়াজ, রসুন ইত্যাদির দামও বাড়িয়ে দেয়। এটা যেন এক বাত্সরিক ও নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিবছর রমজান মাসে যেখানে ব্যবসায়ীদের উচিত রোজাদারকে একটু শান্তি দেওয়া সেখানে আমাদের দেশে ঘটছে উল্টো। সবজি বাজারেও তাই। দর্জির দোকান, কাপড়ের দোকান, বাসের টিকিট, স্টিমারের টিকিট, বিমানের টিকিট, ইফতারের খাদ্যদ্রব্য সবকিছুতেই যেন আগুন। রুটিন করে। এমন কী একজন রিকশাওয়ালাও সুযোগ ছাড়ছে না। বাজেটপূর্ব এই মূল্যস্ফীতি যখন মানুষকে নাজেহাল করছে তখন এল বাজেট, এল এক আতঙ্ক নিয়ে। সর্বত্র আলোচনা ‘ভ্যাট’ নিয়ে। এবারের ‘ভ্যাট’ হবে ১৫ শতাংশ। বিদ্যুতের বিলে ভ্যাট ১৫ শতাংশ, ওয়াসা ও গ্যাসের বিলে ভ্যাট ১৫ শতাংশ। সর্বত্র ভ্যাট বসবে ১৫ শতাংশ। এই আলোচনার পাশাপাশিই চলছে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির আরেক দফা পাঁয়তারা। এখনো বাজেট পাস হয়নি। কাগজে ছাপা হচ্ছে কোন্ কোন্ জিনিসের দাম বাড়তে পারে। আর সেই সুযোগেই, সেই অজুহাতেই বাজার গরম। সর্বত্র পণ্যমূল্য বৃদ্ধির পাঁয়তারা। সবাই বন্দুক তাঁক করে বসে আছে কীভাবে ফায়দা লুটা যায়। এতে সাধারণ মানুষ, মধ্যবিত্ত  সন্ত্রস্ত, তটস্ত হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে সাধারণ মানুষ ভীত হয়ে পড়েছে চালের দামের ঊর্ধ্বগতিতে। চালের দাম ইদানীংকালে বেড়েছে সর্বোচ্চ হারে। এ খবর প্রতিদিন কাগজে ছাপা হচ্ছে। বাড়ার কারণ কী? দৃশ্যত কোনো কারণ নেই। সরকারি তথ্যে দেখা যাচ্ছে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে খাদ্যশস্য উত্পাদনের পরিমাণ হবে ৩৯৬ লক্ষ ৯০ হাজার টন। পূর্ববর্তী বছরে উত্পাদনের পরিমাণ ছিল ৩৯০ লক্ষ মেট্রিক টন। সিলেট অঞ্চলের ফসল ক্ষতির পরও উত্পাদন কিন্তু কমেনি। তাহলে বোঝা যাচ্ছে উত্পাদনে কোনো ঘাটতি নেই। ২০১৪-১৫ অর্থবছরের তুলনায় ২০১৫-১৬ অর্থবছরেও খাদ্যশস্য উত্পাদন বেড়েছিল ৬ লক্ষ মেট্রিক টন। বর্তমান অর্থবছরেও খাদ্যশস্য উত্পাদন বেড়েছে ৬ লক্ষ মেট্রিক টন। তথ্যে কোনো সমস্যা নেই। দেখা যাচ্ছে স্পষ্টতই খাদ্যশস্য উত্পাদনে কোনো ঘাটতি নেই যদিও সিলেট অঞ্চলে কিছু খাদ্যশস্য নষ্ট হয়েছে। তাহলে বাজারে এমন গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যশস্য নিয়ে কারা ফায়দা লুটার চেষ্টা করছে? তা পারতো না যদি না আমাদের প্রচুর খাদ্যশস্য স্টকে থাকতো। দশ বারো লক্ষ টন খাদ্যশস্য সবসময়ই আমাদের স্টকে থাকে। এই স্টকটা কেন? এই স্টকটা থাকে বাজারে হস্তক্ষেপ করার জন্য। যখনই বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা হয় তখন সরকার ‘ট্রাক সেল’, ওপেন মার্কেট অপারেশন করে বাজারকে স্থিতিশীল করে। এটা শুধু চালের ক্ষেত্রে সত্যি নয়, প্রায় সকল ভোগ্যপণ্যের ক্ষেত্রেই সত্যি। এতে কাজ হয়। ব্যবসায়ীদের ডর, ধমক দেখিয়ে কোনো লাভ কোনো দিন হয়নি। প্রশাসনিক পদক্ষেপেও জিনিসপত্রের দাম স্থিতিশীল রাখা যায় না। দরকার পর্যাপ্ত সরবরাহ। সরবরাহে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করা হলে তা সামাল দেয়া হয় মার্কেট অপারেশন করে। খবরের কাগজে দেখা যাচ্ছে বাজারে হস্তক্ষেপ করার মত স্টক সরকারের নেই। এটা কী করে হল? প্রতি বছর প্রচুর খাদ্য স্টক থাকে। এবার এমন কেন হল তা খতিয়ে দেখা দরকার। ঘটনাটা এমন সময়ে ঘটছে যখন বিশ্ববাজারে চালের সরবরাহ কম বলে কাগজের প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে। চীনে ফসল ঘাটতি হয়েছে। চীনারা চাল কিনলে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যের উল্লস্ফন ঘটবেই। কারণ তাদের ক্রয় হবে বিশাল পরিমাণের। এমনতর গুজবে আন্তর্জাতিক বাজারে চালের দাম বেড়ে গেছে। তবে এরই মধ্যে সরকার চাল আমদানির জন্য তত্পরতা শুরু করেছে। চালের উত্স এখন থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, ভারত ইত্যাদি দেশ। তবে আমদানিকারক দেশের সংখ্যাও এবার বেশি। এমতাবস্থায় চালের বাজারে একটা অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতিটা ২০০৮ সালের মত কীনা তা বোঝা যাচ্ছে না। ঐ সময়ে টাকা দিয়েও আন্তর্জাতিক বাজারে চাল মিলেনি। ভীষণ খারাপ দিন গেছে বাংলাদেশের জন্য। মানুষকে গোল আলু খাওয়ার জন্য পরামর্শ দেয়া হয়েছিল। আমার মনে আছে গানও বানানো হয়েছিল। তারপর পরিস্থিতি আমাদের জন্য পাল্টেছে। বাংলাদেশ খাদ্যশস্য উত্পাদনে সর্বোচ্চ দৃষ্টি দেয়। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)সহ বহু আন্তর্জাতিক খবরদারি প্রতিষ্ঠানের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে বর্তমান সরকার কৃষিতে বিপুল হারে ভর্তুকির ব্যবস্থা করে। সার, বীজ, কীটনাশক ও সেচের পানি থেকে শুরু করে কৃষি যন্ত্রপাতি পর্যন্ত সকল উপকরণেই প্রচুর ভর্তুকির ব্যবস্থা করা হয়। বলা বাহুল্য এর সুফল দেশবাসী পায়। তথ্যে দেখা যাচ্ছে ২০০৮-০৯ অর্থবছরের তুলনায় ২০১৬-১৭ অর্থবছরে খাদ্যশস্য উত্পাদন বেড়েছে ৫০ লক্ষ টন। উত্পাদন বৃদ্ধির দিক থেকে এটা বড় ধরনের সাফল্য। শুধু খাদ্যশস্য নয়, মাছ, আম, পিয়ারা ও শাক সবজি ইত্যাদিতেও আমাদের সাফল্য প্রশংসার যোগ্য। প্রশ্ন এত খাদ্যশস্য উত্পাদনের পরও, অধিকন্তু এবারও খাদ্যশস্য উত্পাদন বৃদ্ধি পাওয়ার পর কেন এই সংকটাবস্থা? তাহলে কি আমাদের পরিসংখ্যানে কোনো ভুল আছে। চাহিদা, জনসংখ্যার হিসাব, মাথাপিছু প্রয়োজনীয় খাদ্য, খাদ্যশস্য উত্পাদন ইত্যাদির তথ্যে কি আমাদের কোনো ভুল আছে? মানুষের খাদ্য চাহিদার পরিবর্তন হচ্ছে। শহুরে মধ্যবিত্ত এখন এক বেলা রুটি খায়  যা স্বাধীনতার পূর্বেও সত্যি ছিল না। গ্রামাঞ্চলেও অনেক লোক সকালের নাস্তায় রুটি খায়। অথচ দেশে গম উত্পাদনের মতো আবহাওয়া জলবায়ু নেই। মোটা চালের চাহিদা কমছে। নিম্ন মধ্যবিত্তরাও চিকন চাল খেতে পছন্দ করে। অথচ কৃষক মোটা চাল উত্পাদন করতে উত্সাহী নয়। কারণ এতে সময় বেশি লাগে। উত্পাদন খরচ বেশি। দেখা যাচ্ছে এখানে একটা ‘মিসম্যাচ’ তৈরি হচ্ছে। এদিকে সবজি উত্পাদনও বেশ বেড়েছে। বছরের সব সময় নানা ধরনের সবজি পাওয়া যায়। ফলমূলের চাষ বেড়েছে। মাছের চাষ বেড়েছে। এতদসত্ত্বেও আজকের দিনের সংকটের কারণ কি? চাতালের মালিক, চালের ব্যবসায়ীরা কি চাল ধরে রেখেছে? তাদের হাতে কত স্টক আছে বলে সরকার মনে করে? এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে এই আড়তদার, চাতাল মালিকদের কাছে ব্যাংক ঋণ কত? আমার জানা নেই। ব্যাংক ঋণের তথ্য অবিলম্বে নেওয়া হোক। এসব ঋণ যাতে এই ব্যবসায়ীরা ফেরত দেয় তার ব্যবস্থা করা হোক। এতে তারা বাধ্য হয়ে ধরে রাখা চাল বাজারে ছাড়বে। সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গৃহীত হোক। কিন্তু কোনো কিছুতেই কিছু হবে না যদি সরবরাহে বৃদ্ধি ঘটানো না যায়।

এর জন্য আমদানির ব্যবস্থা করতে হবে সর্বাগ্রে এবং তা যে কোনো মূল্যে। সামনে নির্বাচন। রাজনীতি গরম হচ্ছে। অশুভ শক্তি সব সময়ই সুযোগের সন্ধানে থাকে। কাউকে সুযোগ দেওয়া যাবে না। বড় কথা মানুষের জীবন-মরণের বিষয়। চাল এমন একটা বস্তু যা ছাড়া আমাদের হবে না। এবারের সংকটাবস্থায় একটা জিনিস পরিষ্কার ছোট-খাট পরিস্থিতির মোকাবিলায়ও আমরা সেভাবে প্রস্তুত নই। গত ৮-৯ বছরের মধ্যে চাল নিয়ে আলোচনা এবারই প্রথম। এর প্রকৃত কারণ কি তা তলিয়ে দেখা দরকার। বিষয়টিকে হেলাফেলা করা মোটেই ঠিক হবে না। ইত্যবসরে আরেকটি কথা। সব কিছুতেই কিন্তু উত্থান-পতন থাকে। অর্থনীতিতে থাকে, ব্যবসা-বাণিজ্যে থাকে, পরিবারে থাকে, সমাজে থাকে। আমাদের অর্থনীতিতে ৮-৯ বছর ক্রমাগতভাবে উন্নতি হচ্ছে। কিন্তু ইদানীংকালে কিছু কিছু সমস্যা দৃশ্যমান। ‘রেমিটেন্স’ আগের মতো আসছে না। রপ্তানি আশানুরূপ বাড়ছে না। অথচ এ দুটোই আমাদের “লাইফ লাইন”। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ছিল। এখন আবার বৃদ্ধির দিকে। বিনিয়োগ হচ্ছে, জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশের ওপরে কিন্তু সেই অনুপাতে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হচ্ছে না। লোকের চাকরি যাচ্ছে। দেশের বড় দুটো ‘এনজিও’ ছাঁটাই করছে লোকজন- এই হচ্ছে খবর। এসব আলামত ভালো নয়। শক্তির মধ্যেও অনেক সময় দুর্বলতা লুকিয়ে থাকে। আত্মবিশ্বাস, বিশেষ করে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস অনেক সময় বিপদ ডেকে আনে। আমি সকলকে এ ব্যাপারে সাবধান থাকতে বলবো। পচা শামুকে যাতে পা না কাটে।

লেখক :অর্থনীতিবিদ ও সাবেক শিক্ষক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়





« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: info@iportbd.com, বার্তা বিভাগ: newsiport@gmail.com