Wednesday, 23 August, 2017, 10:22 AM
Home ধর্ম
মক্কা বিজয় ভালোবাসা ও মানবতার জয়
শাঈখ মুহাম্মাদ উছমান গনী লিখেছেন প্রথম আলোতে
Published : Thursday, 15 June, 2017 at 2:37 PM, Count : 0
রমজান মাস তাকওয়ার জন্য। দীন ইসলাম মানবতার জন্য। ইসলাম শান্তি, সম্প্রীতি, মৈত্রী, সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য। ইসলাম সত্য, সুন্দর, ন্যায় ও কল্যাণের পক্ষে।ÿ মহানবী (সা.) মক্কা থেকে হিজরত করে মদিনায় আগমনের পর মদিনায় স্থিতিশীল সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। দ্বিতীয় হিজরিতে কুরাইশরা মদিনা আক্রমণ করলে বদর যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এতে তারা চরমভাবে পরাজিত হলেও অধর্মের পক্ষে যুদ্ধ করতে তারা প্রায় ৫০০ কিলোমিটার দূরে এসে পুনরায় মদিনা আক্রমণ করে। পঞ্চম হিজরি সনের ১৫ শাওয়াল শনিবার উহুদ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এখন সত্য ধর্মের চূড়ান্ত বিজয় প্রয়োজন। তা না হলে মানবতা সুরক্ষিত হবে না। ষষ্ঠ হিজরি জিলকদ মাস নবীজি (সা.) ওমরার উদ্দেশে মক্কা যাত্রা করলেন। কুরাইশরা বাধা দিলে হজরত (সা.) হুদায়বিয়া নামক জায়গায় অবস্থান করেন। এখানেই সম্পাদিত হয় বিশ্বের প্রথম লিখিত সন্ধি চুক্তি, যা ইতিহাসে ‘হুদায়বিয়ার সন্ধি’ নামে বিখ্যাত।

হুদায়বিয়ার সন্ধি চুক্তি অনুযায়ী মক্কার ‘বনু খোজা’ সম্প্রদায় হজরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর সঙ্গে এবং বনু বকর সম্প্রদায় কুরাইশদের সঙ্গে মৈত্রী চুক্তি করে। এ দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে পূর্বশত্রুতা ছিল। কুরাইশদের প্ররোচনায় ‘বনু বকর’ গোত্রের আবাসভূমি ‘ওয়াতির’-এর নিভৃত পল্লিতে রাতের অন্ধকারে অতর্কিত হামলা চালিয়ে অসহায় নারী, শিশুসহ নির্বিচার হত্যা ও লুণ্ঠন করে। প্রাণভয়ে কাবায় আশ্রয় নেওয়া নিরীহ মানুষকেও তারা হত্যা করে। এ ঘটনার প্রতিকারের জন্য খোজা সম্প্রদায় মদিনার মিত্র মুসলমানদের সহযোগিতা চায়। হজরত মুহাম্মাদ (সা.) এর প্রতিবিধানের জন্য দূত মারফত মক্কার কুরাইশ নেতাদের জানালেন: ১. তোমরা বনি খোজা গোত্রকে উপযুক্ত আর্থিক ÿক্ষতিপূরণ করো, ২. নয়তো বনু বকর গোত্রের সঙ্গে মৈত্রী চুক্তি বাতিল করো; ৩. না হলে হুদায়বিয়ার সন্ধির শর্ত লঙ্ঘনের ফলে এ চুক্তি বাতিল হয়েছে বলে পরিগণিত হবে। কুরাইশ নেতারা তৃতীয় পন্থাই গ্রহণ করল। পরে আবু সুফিয়ান মদিনায় গিয়ে শান্তিচুক্তি নবায়নের প্রস্তাব ঘোষণা করল। তখন হজরত মুহাম্মাদ (সা.) প্রথম দুটি শর্তের একটি মানতে প্রস্তাব করলে তাতে সে রাজি হলো না; সুতরাং তার প্রস্তাব কার্যকর হলো না।

অষ্টম হিজরি; বিশ্বমানবতার কেন্দ্রভূমি মক্কা পঙ্কিলতামুক্ত হওয়া এখন সময়ের দাবি। বিশ্বনবী নীরবে সে আয়োজন করলেন। এ জন্য পবিত্র মক্কা জয় করতে হবে। তবে ‘তিনি ধ্বংসাত্মক বিজয় চান না, তিনি কুরাইশদের রক্ষা করতে চান। তিনি চান প্রেম দিয়ে জয় করতে, ভালোবাসা দিয়ে জয় করতে। হজরত মুহাম্মাদ (সা.) ১০ রমজান ১০ হাজার সাহাবিসহ মদিনা থেকে মক্কার উদ্দেশে যাত্রা করলেন। মক্কার উপকণ্ঠে এসে ‘মারাউজ জাহরান’ নামক গিরি উপত্যকায় শিবির স্থাপন করলেন।

১৯ রমজান রাতে আবু সুফিয়ান হাকিম ইবনে নিজাম ও বুদাইলকে সঙ্গে নিয়ে গোয়েন্দাগিরি করার জন্য বের হলে হজরত উমর (রা.)-এর নেতৃত্বে টহলরত ছদ্মবেশী গেরিলা দলের হাতে বন্দী হয়ে নবীজি (সা.)-এর কাছে আনীত হলো। দীর্ঘ ২১ বছরের নিষ্ঠুরতার পুরোহিত লোকচক্ষুর অন্তরালে আঁধার রাতের বন্দী আবু সুফিয়ানকে রহমতের নবী (সা.) প্রেম-ভালোবাসার দীক্ষা দিলেন। পাষাণহৃদয় দয়ার সাগরে স্নাত হলো। সে ইমান আনল। স্বীকার করে নিল—‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’।

মক্কা জয়ের আগেই আল্লাহর প্রিয় হাবিব মক্কাবাসীর মন জয় করাকে বড় বিজয় মনে করলেন। এ সময় নবীজি (সা.)-এর চাচা হজরত আব্বাস, যিনি কৌশলগত কারণে মক্কাবাসীর কাছে তাঁর ইসলাম গ্রহণ গোপন রেখেছিলেন, তিনিও তা প্রকাশ করলেন। এ উভয় কুরাইশ নেতাকে নবীজি (সা.) শান্তির পয়গাম ঘোষণার জন্য প্রভাতে মক্কায় পাঠালেন এবং ঘোষণা দিতে বললেন: ১. যারা কাবাগৃহে আশ্রয় নেবে, তারা নিরাপদ, ২. যারা আবু সুফিয়ানের বাড়িতে আশ্রয় নেবে বা তার নাম বলবে, তারা নিরাপদ, ৩. যারা নিজ নিজ ঘরে অবস্থান করবে, তারাও নিরাপদ।

১৯ রমজান সকালে নবীজি (সা.) সাহাবায়ে কিরামের বিভিন্ন দলকে মক্কার বিভিন্ন দিক থেকে প্রবেশের নির্দেশ দিলেন এবং বললেন: কাউকে আক্রমণ করবে না। ইতিপূর্বে ‘মুতা’ অভিযানেও তিনি নির্দেশ দিয়েছিলেন: ১. কোনো সাধু-সন্ন্যাসীকে হত্যা করবে না, ২. বালক-বালিকা ও শিশুদের হত্যা করবে না, ৩. নারীদের হত্যা করবে না, ৪. বৃক্ষনিধন করবে না, ৫. শস্যক্ষেত্র ধ্বংস করবে না, ৬. ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ করবে না, ৭. আত্মসমর্পণকারীকে আঘাত করবে না।

সবার শেষে মহানবী (সা.) ক্রীতদাস উসাবা ইবনে জায়েদের সঙ্গে উটে চড়ে আনত মস্তকে মক্কায় প্রবেশ করলেন। আল্লাহর বাণী সত্য প্রমাণিত হলো: ‘আল্লাহ তাঁর রাসুলকে সত্য স্বপ্ন দেখিয়েছেন। আল্লাহ চাহেন তো তোমরা অবশ্যই মসজিদে হারামে প্রবেশ করবে নিরাপদে মস্তকমুণ্ডন অবস্থায় এবং কেশ কর্তিত অবস্থায়। তোমরা কাউকে ভয় করবে না। অতঃপর তিনি জানেন, যা তোমরা জানো না। এ ছাড়া তিনি দিয়েছেন তোমাদের একটি আসন্ন বিজয়। তিনিই তাঁর রাসুলকে হিদায়াত ও সত্য ধর্মসহ প্রেরণ করেছেন, যাতে একে অন্য সমস্ত ধর্মের ওপর জয়যুক্ত করেন। সত্য প্রতিষ্ঠাতারূপে আল্লাহ যথেষ্ট।’ (সুরা ফাৎহ, আয়াত: ২৭-২৮)।

নবীজি (সা.) কাবাগৃহে প্রবেশ করে ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনি দিয়ে বললেন: ‘সত্য এসেছে, মিথ্যা বিতাড়িত হয়েছে; বাতিলের বিনাশ অবশ্যম্ভাবী।’ (বনি ইসরাইল, আয়াত: ৮১)। জোহর নামাজের ওয়াক্ত হলে নবীজি (সা.)-এর নির্দেশে হজরত বিলাল (রা.) কাবার ছাদে গিয়ে আজান দিলেন। হজরত (সা.) সবাইকে নিয়ে নামাজ আদায় করলেন।

হজরত মক্কাবাসীকে নিয়ে একটি সভা করলেন। তিনি ভাষণে সাম্য, মৈত্রী ও একতার কথা বললেন: ‘হে কুরাইশগণ! অতীতের সকল ভ্রান্ত ধারণা মন থেকে মুছে ফেলো, কৌলীন্যের গর্ব ভুলে যাও, সকলে এক হও। সকল মানুষ সমান, এ কথা বিশ্বাস করো। আল্লাহ তাআলা বলেন, “হে মানুষ! আমি তোমাদের সকলকেই (একই উপাদানে) স্ত্রী-পুরুষ হতে সৃজন করেছি এবং তোমাদিগকে গোত্রে ও শাখায় পৃথক করেছি, যাতে তোমরা পরস্পরকে চিনতে পারো। নিশ্চয় তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সেই বেশি সম্মানিত, যে বেশি পরহেজগার।”’ (সুরা হুজুরাত, আয়াত: ১৩)।

এ সময় নাজিল হয় সুরা নাছর: ‘যখন আসে আল্লাহর সাহায্য ও বিজয়, আপনি মানুষকে দেখবেন দলে দলে আল্লাহর বিধানে প্রবেশ করছে। তখন আপনি আপনার রবের প্রশংসাসহ পবিত্রতা ঘোষণা করুন এবং ÿক্ষমা প্রার্থনা করুন। নিশ্চয়ই তিনি তওবা কবুলকারী।’ (সুরা নাছর, আয়াত: ১-৩)। (বিশ্বনবী, গোলাম মুস্তাফা, পৃষ্ঠা ২১৭-২৪৩)।

মুফতি মাওলানা শাঈখ মুহাম্মাদ উছমান গনী: যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতি, সহকারী অধ্যাপক, আহ্‌ছানিয়া ইনস্টিটিউট অব সুফিজম।

smusmangonee@gmail.com





« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: info@iportbd.com, বার্তা বিভাগ: newsiport@gmail.com