Friday, 19 January, 2018, 7:25 PM
Home জাতীয়
ইতিহাসে সর্বনিম্ন আমানতের সুদ
রেজাউল হক কৌশিক
Published : Monday, 12 June, 2017 at 6:40 PM, Count : 0

দেশের বিনিয়োগে মন্দা অবস্থা বিরাজ করছে। উদ্যোক্তারা ব্যাংক থেকে ঋণ নিচ্ছেন না। আর খেলাপি ঋণের বোঝা তো আছেই। ফলে ব্যাংকিং খাতে অলস টাকা বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে পরিচালন ব্যয় কমাতে ব্যাংকগুলো আমানতের সুদহার কমাচ্ছে। যাতে নতুন করে আমানত না আসে সেটাই চাচ্ছে ব্যাংকগুলো। এতে ব্যাংকে আমানতের সুদহার দাঁড়িয়েছে ৫ শতাংশের নিচে। অন্যদিকে মূল্যস্ফীতির হার প্রায় সাড়ে ৫ শতাংশ। অর্থাত্ এক বছরে ব্যাংকে রাখা টাকার ক্রয়ক্ষমতা যতটুকু কমছে সে পরিমাণ সুদও পাচ্ছেন না আমানতকারী। এতে লোকসানে পড়ছেন তারা। এর উপরে এক্সসাইজ ডিউটি (আবগারি শুল্ক) ও অন্যান্য চার্জের খড়গ তো আছেই।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, এপ্রিল শেষে ব্যাংকিং খাতের আমানতের গড় সুদের হার চার দশমিক ৯৭ শতাংশে নেমে গেছে। দেশের ইতিহাসে আমানতে সুদের হার কখনো এত নিচে নামেনি। গত বছর এপ্রিল শেষে আমানতের গড় সুদহার ছিল পাঁচ দশমিক ৭৭ শতাংশ। আর তার আগের বছর ছিল সাত দশমিক ০৪ শতাংশ। অন্যদিকে, মার্চ শেষে মূল্যস্ফীতির হার দাঁড়িয়েছে পাঁচ দশমিক ৩৯ শতাংশ। এখনকার পরিস্থিতি বিষয়ে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, আমানতের সুদের হার শুধু নিচে নেমেছে—তাই নয়, মূল্যস্ফীতির থেকেও নিচে নেমে গেছে। যা খুবই বিপজ্জনক। এতে আমানতকারীরা ব্যাংকের আমানত রাখার ক্ষেত্রে বিমুখ হবেন। যা ব্যাংকিং খাতের জন্য ভাল নয়। আর মানুষের হাতে পুঁজি আটকে গেলে পুরো অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্থ হবে।

অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকাররা বলছেন, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আমানতের সুদের হার অনেক কম হলেও তাদের ওখানে বিভিন্ন ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ব্যাংকিং ব্যবস্থা চলে। অর্থনীতি সচল রাখতে বিভিন্ন পথ (টুলস) তারা ব্যবহার করে। কিন্তু আমাদের এখানে সে ধরণের কোন ব্যবস্থা নেই। ফলে এখানে আমানতের সুদের হার কমে গেলে তাতে অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়। এ পরিস্থিতির উন্নতি করতে না পারলে মানুষ বাড়ি-ঘর কেনার মত জায়গায় বিনিয়োগ করবে কেউ ব্যাংকে আমানত রাখবে না। এজন্য নতুন নতুন বিনিয়োগের  জায়গা খুঁজে বের করার পরামর্শ তাদের।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ব্যাংকগুলোর কাছে প্রচুর পরিমাণে অলস টাকা পড়ে আছে। বিনিয়োগ স্থবিরতার কারণে উদ্যোক্তারা ব্যাংক থেকে ঋণও নিচ্ছে না। আবার খেলাপি ঋণেও পরিমাণও বিশাল। অন্যদিকে সরকারও ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ না করে উল্টো ধার শোধ করছে। এমন পরিস্থিতিতে ব্যাংকের ব্যয় নির্বাহ করাই কঠিন হয়ে পড়ছে। এত সমস্যার পরও ব্যাংকগুলোতে বছর শেষে মুনাফা অর্জন করতে হবে। ব্যাংকের যে ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) যত বেশি মুনাফা অর্জন করতে পারে সে এমডি ভাল হিসাবে ধরা হয়। ফলে, সবকিছু মেনে নিয়ে বছর শেষে মুনাফা অর্জনই ব্যাংকগুলোর প্রধান লক্ষ্য থাকছে। এতে আমানতকারীরা ক্ষতিগ্রস্থ হলেও সেদিকে খেয়াল করছে না ব্যাংকগুলো।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্স ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, আমানতকারীদের জন্য অবস্থা খারাপ হবে। কারণ মূল্যস্ফীতির জন্য আমানত রাখলে রিটার্ন নেগেটিভ হয়ে যাবে। এর উপর এক্সসাইজ ডিউটি (আবগারি শুল্ক) ও অন্যান্য চার্জ তো আছেই। তিনি বলেন, ব্যাংক ঋণের সুদের হার যে কমেছে তা ব্যাংকের দক্ষতার কারণে কমেনি। অথচ এখন আমানতকারীদের সুদ কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এটি কাম্য নয়। ব্যাংকের দক্ষতা বাড়ানো এবং খেলাপি ঋণ কমানোও উচিত।  প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সব বোঝা আমানতকারীদের উপর চাপানো গ্রহণযোগ্য না। এটা ব্যাংকিং খাতের জন্যও ভাল হবে না ।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) মহাপরিচালক তৌফিক আহমেদ চৌধূরী বলেন, মানুষের টাকা রাখার জন্য বিকল্প নেই। যেখানে মানুষ বিনিয়োগ করতে পারে। সেজন্য মানুষ বাধ্য হয়ে ব্যাংকে টাকা রাখবে। আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। অথচ বাংলাদেশ ব্যাংক এ বিষয়ে কোন উদ্যোগ নিচ্ছে না। যেকোন মূল্যে আমানতে সুদের হার মূল্যস্ফীতির হারের উপরে রাখতে হবে। তা না হলে ফান্ড মবিলাইজ হবে না।

অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশ (এবিবি) এর চেয়ারম্যান ও মিউচ্যুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও আনিস এ খান বলেন, ব্যাংকগুলোর কাছে এখন অতিরিক্ত তারল্য (নগদ অর্থ) রয়েছে। আবার সরকারও ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ধার করছে না। সেজন্য ব্যাংক যদি নতুন করে তারল্য নেয় তাহলে ব্যাংকের লোকসান হবে। অন্যদিকে ব্যবসায়ীরা সবসময় চাচ্ছে তাদেরকে কম সুদে ঋণ দেওয়ার জন্য। সেটা করতে হলেও কম সুদে আমানত নিতে হবে। তা না হলে কিভাবে দেবে। এমন পরিস্থিতিতে ব্যাংকেও কিছু করার নেই বলে জানান তিনি।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র শুভঙ্কর সাহা বলেন, আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা করার জন্য আমানতের সুদের হার বেশি রাখতে হবে। যদিও মুক্তবাজার অর্থনীতিতে ব্যাংকগুলো নিজস্ব নীতিমালার আলোকে ঋণ ও আমানতে সুদহার নির্ধারণ করতে পারে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে কী করা যায় সেটা পর্যালোচনা করে দেখা হবে বলে জানান তিনি।

ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দেশের ব্যাংক খাতে এখন অতিরিক্ত তারল্য রয়েছে এক লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকারও বেশি। বিনিয়োগ পরিস্থিতি দেখলে দেখা যায়, পাঁচ বছর আগেও দেশে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবাহের প্রবৃদ্ধি ছিল ২৫ শতাংশের ওপরে। অথচ চলতি অর্থবছরের ডিসেম্বর শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ১৫ শতাংশে নেমে এসেছে। গত তিন মাসে (জানুয়ারি থেকে মার্চ) খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১১ হাজার ২৩৭ কোটি টাকা। মার্চ শেষে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭৩ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা। যা বিতরণ হওয়া ঋণের ১০ দশমিক ৫৩ শতাংশ। ডিসেম্বর শেষে  ছিল ৯ দশমিক ২৩ শতাংশ।

গত এপ্রিল শেষে ব্যাংকিং খাতে গড় আমানতের সুদহার দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৯৭ শতাংশ। আর ঋণের সুদহার দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৯৭ শতাংশ। এতে স্প্রেড দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৫৫ শতাংশীয় পয়েন্টে। একমাস আগে অর্থাত্ মার্চে ব্যাংকিং খাতে গড় আমানতের সুদহার ছিল ৫ দশমিক ০১ শতাংশ। আর ঋণের হার ছিল ৯ দশমিক ৭ শতাংশ। স্প্রেড বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও এখনও তা মানেনি দেশি-বিদেশি ১৫টি ব্যাংক।

২০১৬ সালের এপ্রিলে আমানতের সুদহার ছিল ৫ দশমিক ৭৭ শতাংশ এবং ঋণের হার ছিল ১০ দশমিক ৬৪ শতাংশ। এর আগের বছর ২০১৫ সালের এপ্রিলে আমানতের সুদহার ছিল ৭ দশমিক ০৪ শতাংশ। আর ঋণের হার ছিল ১১ দশমিক ৮৮ শতাংশ।





« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: info@iportbd.com, বার্তা বিভাগ: newsiport@gmail.com