Wednesday, 23 August, 2017, 10:23 AM
Home খেলা
চাই খেলোয়াড়দের ভবিষ্যত্ জীবনের নিশ্চয়তা
ড. ইয়াসমীন আরা লেখা লিখেছেন ইত্তেফাকে
Published : Monday, 12 June, 2017 at 6:30 PM, Count : 0
নদ-নদী, খাল-বিল ও হাওর-বাঁওড়ের দেশ বাংলাদেশ। নদীমাতৃক এ দেশ যেমন সুজলা-সুফলা, শস্য-শ্যামলা তেমনি এ দেশের মানুষ চির সাহসী ও দুর্জয়। এ দেশের শিশুরা ছোটবেলা থেকে খাল-বিল-পুকুর-নদীতে ঝাঁপ দিয়ে সাঁতার কেটেই বড় হয়। সাঁতার অন্যান্য শিক্ষার মতোই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে শহুরে জীবনে এসে অনেকেই সেই সাঁতার শেখার কথা ভুলে যায়। এখন যাদের শুধু গ্রামের সঙ্গে সম্পর্ক তাদেরই কেউ কেউ সাঁতার কাটা শিখে এবং অনেক ক্ষেত্রেই সাফল্যের স্বাক্ষর রাখে।

সাঁতারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের রয়েছে অনেক সাফল্যের ইতিহাস। গর্ব করার মতো আমাদের আছে ইংলিশ চ্যানেল বিজয়ী প্রথম বাঙালি সাঁতারু ব্রজেন দাস (১৯৫৮) ও মোশাররফ খানের (১৯৮৮) মতো কৃতী সাঁতারু। আমাদের ঐতিহ্য এই সাঁতারকে কার্যকরভাবে ধরে রাখতে বর্তমান সরকার প্রথমবারের মতো প্রতিভাবান সাঁতারু অন্বেষণ প্রতিযোগিতা- ‘সেরা সাঁতারুর খোঁজে বাংলাদেশ’ নামে একটি অনন্য উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশ সুইমিং ফেডারেশন ও বাংলাদেশ নৌবাহিনীর যৌথ প্রযোজনায় ১৯ মে ২০১৬ রাজধানীর মিরপুরে সৈয়দ নজরুল ইসলাম জাতীয় সুইমিং কমপ্লেক্স সেজে ওঠে নতুন সাজে। প্রথম পর্বে প্রায় ৬ মাস ধরে পর্যায়ক্রমে চলে দেশের প্রতিটি জেলায় সেরা সাঁতারুর খোঁজ। ব্যাপক সাড়া জাগে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা প্রতিভাবান সাঁতারুদের মাঝে। শুরু হয় সাঁতারের নতুন জোয়ার।

বয়সভিত্তিক চারটি গ্রুপের এই প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের ৪৮৯টি উপজেলা থেকে প্রায় ২৫ হাজার সাঁতারু অংশগ্রহণ করে। দেশের নদ-নদী ও পুকুর জলাধারগুলো যেন আবার ফিরে পায় প্রাণের স্পন্দন। উচ্ছ্বাস জাগে সব বয়েসি মানুষের মনে। ৬৪টি জেলা থেকে মোট ১২৭৫ জন প্রতিভাবান সাঁতারু বাছাই করে তাদেরকে পুরস্কৃত করা হয়। দ্বিতীয় পর্বে তাদেরকে ঢাকায় এনে আবারও প্রতিযোগিতার মাধ্যমে ১৬০ জনকে নির্বাচিত করা হয়। তৃতীয় পর্যায়ে উত্তীর্ণ সাঁতারুরা বাংলাদেশ সুইমিং ফেডারেশনের তত্ত্বাবধানে দেশি-বিদেশি প্রশিক্ষকের মাধ্যমে ৩ মাস নিবিড় প্রশিক্ষণের সুযোগ পায়। উল্লেখ্য, বর্তমানে দুজন কোরিয়ান প্রশিক্ষক তেগুন পার্ক ও সেরম চৈ এর অধীনে এই সাঁতারুরা প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন।

২৫ মে ২০১৭ তারিখ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে চূড়ান্ত প্রতিযোগিতায় নির্বাচিত হয় সেরা ৬০ জন সাঁতারু। এদেরই খুঁজছিল বাংলাদেশ। এদের প্রত্যেকেই পুরস্কৃত করা হয় এবং ৪টি ইভেন্টের সেরা ৪ জন নারী ও ৪ জন পুরুষ সাঁতারুকে ৫ লক্ষ টাকা করে মোট ৪০ লক্ষ টাকার বিশেষ আর্থিক অনুদান দেওয়া হয়। এই কৃতী সাঁতারুরা দেশে-বিদেশে ৩ বছর দীর্ঘ মেয়াদি প্রশিক্ষণের সুযোগ লাভ করে। এদের শিক্ষাসহ ভবিষ্যত্ জীবন গড়ার সকল দায়িত্ব গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ সুইমিং ফেডারেশন। এরাই জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অনন্য প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে উজ্জ্বল করবে দেশের লাল সবুজের পতাকা। স্বপ্নজয়ী এই ছেলেমেয়েরাই আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আসর থেকে অসংখ্য স্বর্ণের পদক জয় করে আনবে বাংলাদেশে।

উল্লেখ্য, আমি যে প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সেই প্রতিষ্ঠানের ফিজিক্যাল এডুকেশন বিভাগের শিক্ষার্থী মাহফুজা খাতুন শিলা সম্প্রতি ভারতে অনুষ্ঠিত ১২তম এস এ গেমস-এ সাঁতারে মহিলাদের ১০০ মিটার ও ৫০ মিটার ব্রেস্ট স্ট্রোকে ২টি স্বর্ণপদক অর্জন করেন। এই গেমসে আরো মোট ১৭টি পদক জিতে আমাদের খেলোয়াড়রা বিদেশের মাটিতে দেশের সুনাম অর্জন করেছেন। এছাড়াও গত বছর অক্টোবর মাসে শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠিত সাউথ এশিয়ান অ্যাকুয়াটিকস চ্যাম্পিয়নশিপে আমাদের সাঁতারুরা ২টি স্বর্ণ ও ২টি রৌপ্যসহ ৯টি পদক পাওয়ার গৌরব অর্জন করে।

শুধু তাই নয়, আমাদের দেশের বিশেষ চাহিদা সম্পন্নরাও এক্ষেত্রে এগিয়ে আছে। তারাও ক্রীড়া ক্ষেত্রে অনেক অবদান রাখছে। আমেরিকায় স্পেশাল অলিম্পিক গেমসে আমাদের প্রতিবন্ধীরা ২১ টি স্বর্ণসহ প্রায় ৭১টি বিভিন্ন পদক বাংলাদেশের জন্য নিয়ে আসে। বাংলাদেশ সুইমিং ফেডারেশনের ‘সেরা সাঁতারুর খোঁজে বাংলাদেশ’ এই প্রতিযোগিতায় প্রতিবন্ধীরাও পৃথক গ্রুপে অংশগ্রহণ করে। একজন চাঁপাইনবাবগঞ্জের পল্লব কুমার কর্মকার। ১১ বছরের পল্লব একটি পা না থাকা সত্ত্বেও প্রতিবন্ধীদের পৃথক গ্রুপে কৃতীত্বের সঙ্গে চূড়ান্ত পর্যায়ে উন্নীত হয়। পাবনা জেলার খুশি খাতুন  এবং রোহান বুদ্ধি ও বাক প্রতিবন্ধী হওয়া সত্ত্বেও প্রতিবন্ধীদের পৃথক ইভেন্টে ১ম স্থান অধিকার করে। এই খুশি এবং রোহান ইতোমধ্যে ২০১৩ সালে অস্ট্রেলিয়ায় অনুষ্ঠিত স্পেশাল অলিম্পিক এশিয়া প্যাসিফিক গেমসে এবং ২০১৫ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লস এঞ্জেলসে অনুষ্ঠিত স্পেশাল ওয়ার্ল্ড অলিম্পিকে স্বর্ণ ও রৌপ্য পদক অর্জনের মতো বিরল গৌরব অর্জন করেছে। এমনকি প্রতিবন্ধীরা ক্রিকেট খেলা থেকে শুরু করে বিভিন্ন খেলাধুলায় তাদের মেধার পরিচয় দিচ্ছে। প্রতিবন্ধীদের মধ্যে লুকিয়ে আছে সুপ্ত প্রতিভা ও মেধা যার প্রমাণ প্রতিনিয়তই আমরা লক্ষ্য করি। তাই বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন প্রতিবন্ধীদের বিকশিত হওয়ার সুযোগ আমাদেরকেই করে দিতে হবে।

তবে আমাদের কিছু কিছু প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। আমাদের সাঁতার মাধ্যমকে আরো জনপ্রিয় করে তুলতে এই প্রতিবন্ধকতা দূর করতে হবে। আমাদের জেলা পর্যায়ের দক্ষ প্রশিক্ষকের অভাব রয়েছে। তৃণমূল পর্যায় থেকে ভালো খেলোয়াড় তুলে আনতে হলে প্রতিটি জেলার ক্রীড়া সংস্থাগুলোতে দক্ষ প্রশিক্ষক নিয়োগ দেওয়া জরুরি। বাংলাদেশ সুইমিং ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক এম বি সাইফ বলেন, “সারাদেশে মাত্র ২৪/২৫টি সুইমিং পুল রয়েছে তার মধ্যে জাতীয় সুইমিং পুলসহ মাত্র ৪/৫টি চালু রয়েছে। বাকীগুলো পরিকল্পনার অভাবে প্রায় পরিত্যক্ত অবস্থায় আছে। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ ও মন্ত্রণালয় থেকে যদি সুইমিং পুলগুলো সুইমিং ফেডারেশনের অধীনে নেওয়া যায় তাহলে আমরা এগুলো চালু করার ব্যবস্থা করব।” তাই বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা এবং সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে সুইমিং পুলের সংখ্যা কার্যকরভাবে বাড়ানো ও সার্বিক অবকাঠামোগত উন্নয়ন অপরিহার্য।

এছাড়া রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি পর্যায়ে এক্ষেত্রে অনুদান ও পৃষ্ঠপোষকতা বাড়াতে হবে। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ থেকে বছরে যে পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয় তাতে জেলা ক্রীড়া সংস্থার অফিস পরিচালনা করাটাই দুরূহ হয়ে পড়ে। আরেকটি বিষয় খুবই গুরুত্বের দাবি রাখে তা হলে— তৃণমূল ও স্কুল পর্যায় থেকে যারা উঠে আসছে তাদের প্রতি বিশেষ যত্নবান হওয়া। তাদের খেলাধুলার পাশাপাশি লেখাপড়ার দায়িত্ব নিতে হবে, প্রয়োজনবোধে তাদের চাকরির ব্যবস্থা করতে হবে। কারণ প্রতিটি মানুষের জীবনে শিক্ষা ও জীবিকার বিষয়টি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ভবিষ্যত্ জীবনের নিশ্চয়তা না পেলে একজন খেলোয়াড়ের কাছ থেকে যেমন ভালো ফল আশা করা যায় না তেমনি অভিভাবকরাও তাদের সন্তানদের খেলাধুলার বিষয়ে অনাগ্রহী হয়ে উঠবে। তবে ক্রীড়া ক্ষেত্রে আমাদের ঈর্ষণীয় সাফল্য রয়েছে। আমরা ক্রিকেটে অনেক এগিয়ে গেছি। আইসিসি ওয়াল্ড র্যাংকিং— এ বর্তমানে আমরা ষষ্ঠ স্থানে অবস্থান করছি। সম্প্রতি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে নিউজিল্যান্ডকে হারিয়ে আমরা সেমিফাইনালে উন্নীত হয়েছি। আমাদের ক্রিকেটাররা পেশাদার ক্রিকেট খেলতে পারছে এবং তাদের আর্থিক নিশ্চয়তা রয়েছে। এর ফলে আমাদের অভিভাবকরাও তাদের সন্তানটিকে ক্রিকেটার বানানোর স্বপ্ন দেখেন। তাই ক্রিকেটের মতো সাঁতারসহ অন্যান্য খেলায় আমরা যদি আরো মনোযোগী হই তাহলে নিশ্চয়ই সাফল্য ধরা দেবে এবং আগামীদিনে অভিভাবকরা সন্তানদের সাঁতারে পেশাদারিত্বের মধ্যে দেখতে প্রয়াসী হবেন।

আশার কথা বর্তমান সরকার সাঁতারকে এগিয়ে নিয়ে যেতে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, “সমগ্র বাংলাদেশের প্রতিটি উপজেলায় ১টি করে মিনি স্টেডিয়াম আমি করে দিচ্ছি। আমরা চাই খেলাধুলার মাঠ এবং এই মাঠে সবাই যখন খেলবে আশেপাশে যারা চলাফেরা করবে তারাও যেন দেখতে পারে এবং এই দেখার মধ্য দিয়ে তাদের ভিতরেও উত্সাহ-উদ্দীপনার সৃষ্টি হবে। সেইভাবে প্রতিটি উপজেলায় ১টি করে খেলার মাঠ এবং ছোট্ট করে একটু গ্যালারির ব্যবস্থা আমরা করে দিচ্ছি। যাতে করে উপজেলাভিত্তিক খেলাধুলার চর্চা হয়। জেলায় জেলায় আমরা সুইমিং পুল করে দিচ্ছি।”

সরকারের এই উদ্যোগ সত্যিই সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। এই সাঁতারুরাই আগামীতে বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করবে মাশরাফি, সাকিবদের মতো। বিশ্বরেকর্ড ভঙ্গ করে বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশকে সম্মানের আসনে বসিয়ে দিবে এবং প্রমাণ করে দেবে যে বাঙালিরাও পারে। আর এ কাজে আমাদের পরিবার ও সমাজ থেকে শুরু করে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। শুধুমাত্র লেখাপড়া নয় এর পাশাপাশি খেলাধুলাও অত্যন্ত জরুরি। খেলাধুলা করলে শরীর ও মন দুটোই ভালো থাকে। আমাদের সন্তানদেরকে লেখাপড়ার পাশাপাশি খেলাধুলা ও সুস্থধারার সংস্কৃতি চর্চায় উদ্বুদ্ধ করতে হবে। এতে করে মাদক, সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ ও অপসংস্কৃতির হাত থেকে আমাদের নতুন প্রজন্মকে রক্ষা করা সম্ভব। আর এই সুস্থ-সবল সংস্কৃতিমনা মানুষরাই গড়বে আগামীদিনের সন্ত্রাস ও জঙ্গিমুক্ত, অসাম্প্রদায়িক চেতনার সোনার বাংলাদেশ।

লেখক :প্রো-ভিসি, উত্তরা ইউনিভার্সিটি, ঢাকা





« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: info@iportbd.com, বার্তা বিভাগ: newsiport@gmail.com