Wednesday, 23 August, 2017, 10:22 AM
Home শিল্প ও বানিজ্য
ঈদবাজারের অবস্থা কী?
ড. আরএম দেবনাথ লিখেছেন ইত্তেফাকে
Published : Friday, 9 June, 2017 at 3:56 PM, Count : 0

দেখতে দেখতে পবিত্র রমজান মাস শেষ হয়ে যাচ্ছে। আসছে খুশির ঈদ। ঘরে ঘরে তার প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে অনেক আগেই। স্কুল-কলেজ বন্ধ। ছোট ছোট শিশুদের দারুণ অপেক্ষা ঈদের জন্য। এদিকে এবারের রোজা ও ঈদের প্রেক্ষাপট ততটা সুখকর নয়। বৃহত্তর সিলেট ও কিশোরগঞ্জ-নেত্রকোনার লক্ষ লক্ষ লোক ফসল, গাই-গরু, মাছ ইত্যাদি হারিয়ে সরকারের সাহায্যের ওপর বেঁচে আছে। চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে ঘটে গেছে ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডব। ঝড়ে লণ্ডভণ্ড হয়েছে হাজার হাজার ঘর-বাড়ি, পাহাড়ি ঢলে ক্ষতিগ্রস্ত অগণিত মানুষ। ঘটনাক্রমে একদিকে চলছে রোজা, আরেক দিকে দেশের বৃহত্তম অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেট ঘোষিত হয়েছে, চলছে এখন আলোচনা। ‘ভ্যাট’ আতঙ্কে মানুষ দিশেহারা। ব্যাংক আমানতে বসেছে বর্ধিতহারে আবগারি শুল্ক। এসবের ছায়া পড়েছে বাজারে। বহুদিন নিম্নমুখী থেকে মূল্যস্ফীতি আবার ঊর্ধ্বমুখী। রোজার পূর্ব মুহূর্তে এক শ্রেণির ব্যবসায়ী চাল, গম, নুন, তেল, ছোলা, পিঁয়াজ, রসুন, চিনি এবং খেজুরের মতো প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়েছে সরকারের ‘ধমক’ সত্ত্বেও। এর বিপরীতে মানুষের রোজগার কম, চাকরিচ্যুতি বেড়েছে, আগের মতো কর্মসংস্থান বাড়ছে না, সর্বোপরি প্রায় বছরব্যাপী রেমিটেন্স প্রবাহ হ্রাস পেয়েছে যার অর্থ গ্রামীণ মানুষের দুর্ভোগ। এই যে লম্বা একটা প্রেক্ষাপট রচনা করলাম তার কারণ কী? কারণ, বোঝা কী অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে এবারে পবিত্র রমজান পালিত হচ্ছে। দৃশ্যত অর্থনীতি কিন্তু ঊর্ধ্বমুখী। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৭ দশমিক ৪ ভাগ ‘জিডিপি’ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে অর্থনীতি চাঙ্গা থাকার কথা। তা থাকলে বাজারও চাঙ্গা থাকবে এটা নিয়মের কথা। দেখা যাক এবারের বাজারের অবস্থা কী?

বলাবাহুল্য, রোজার মাস ব্যবসার মাস। বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা এই মাসে বছরের ব্যবসা করে। কিছু ব্যবসা করে কোরবানির ঈদের সময়ে। বাকি সময়ে তারা ‘দোকান খরচ’ তোলে। এই ব্যবসা বা বিলিয়ন (শতকোটি) বিলিয়ন টাকার বেচা-কেনার ক্রয়ক্ষমতা কোত্থেকে আসে? আর আসলে কত টাকারই-বা লেনদেন হয়? কারো এই তথ্য জানা নেই। তবে বাজারে ক্রয়ক্ষমতা সরবরাহ হয় কয়েকটি উত্স থেকে। বেতন-ভাতা ও বোনাস নিঃসন্দেহে একটি বড় উত্স। এর সাথে যোগ হয় রেমিটেন্সের টাকা। লক্ষণীয়, এবার দীর্ঘদিন রেমিটেন্স হ্রাসের পর রোজার মাসে অর্থাত্ মে মাসে রেমিটেন্সের পরিমাণ বেড়েছে। নিঃসন্দেহে মন্দার বাজারে এই বর্ধিত পরিমাণ টাকা ঈদের বাজারকে কিছুটা হলেও চাঙ্গা করবে।  আজকাল ধনাঢ্য ব্যক্তিরা ঈদ উপলক্ষে বেশ দান-খয়রাত করেন। তারা ক্যাশ যেমন বিতরণ করেন, তেমনি জামা-কাপড়, শাড়ি, লুঙ্গিও বিতরণ করেন। এটা রোজার বাজারের নতুন একটা বড় দিক। গ্রামে টাকা যাবে, কারণ ঈদ উপলক্ষে লক্ষ লক্ষ ঢাকাবাসী এবং অন্যান্য শহরবাসীরা গ্রামে যাবে। ঢাকার রিকশাওয়ালা এবং শ্রমজীবীরাও গ্রামে যাবে। সঙ্গে তাদের রোজগারও যাবে। এসব সূত্রে বস্তুত ঈদে এবং পুরো রোজার মাসে গ্রামাঞ্চলে প্রচুর ‘ক্যাশ’ যায়। বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতিবছর হাজার হাজার কোটি টাকার নতুন নোট বাজারে ছাড়ে। এটা যেমন প্রয়োজন মেটায়, তেমনি আনন্দও ছড়ায়। ঈদে সবাই নতুন টাকার নোট চায়।

যে ‘ব্যাকগ্রাউন্ড’ দিলাম তার সাথে ঢাকার বাজারের অবস্থা কী? ঢাকার বাজারের মধ্যে দুই ধরনের বাজারের কথা বলতে হয়। এর মধ্যে পাইকারি বাজার একটি, আরেকটি হচ্ছে খুচরা বাজার। পাইকারি বাজারে বেচা-কেনা শুরু হয় রোজা শুরুর আগেই। নরসিংদী সংলগ্ন ‘বাবুরহাট’ বিশাল একটা বাজার। রয়েছে রূপগঞ্জের বাজার, নারায়ণগঞ্জের পাইকারি বাজার। সর্বোপরি রয়েছে ঢাকাস্থ ইসলামপুরের পাইকারি বাজার যেখানে ১০৯টি মার্কেটই আছে। দোকান ১০-১৫ হাজার। বিশাল বাজার। সবসময় লোকে গমগম করে। পাইকারি বাজার আগে জমে, তারপর খুচরা বাজার, গ্রামের বাজার। গ্রামাঞ্চলের খুচরা দোকানদাররা মাল কিনে স্টক করে। মানুষের পছন্দ মতো কাপড় তারা দোকানে তোলে। রোজার পুরো মাসে বিক্রি। দেখা যাচ্ছে ইসলামপুরের বাজার এবার ১০ রোজার দিনেও জমেনি। একই খবর বড় বড় পাইকারি বাজারের। তারা কয়েকটি কারণের কথা উল্লেখ করেছেন। সিলেটের অকাল বন্যা, চট্টগ্রামের ঢল, বাজেটে ভ্যাট আরোপ ইত্যাদি। কাগজগুলোর খবর এসব। দোকানিরা হতাশ। তবে কি বাজার জমবে পরে? দেরিতে জমবে বাজার? এর উত্তর মিলবে অনেক পরে। ইসলামপুর বাজারের দোকানিরা বলছেন, কাগজে দেখলাম, গত ৪০ বছরেও এমন খারাপ অবস্থা তারা দেখেননি। কিন্তু ‘জিডিপি’ প্রবৃদ্ধির হারের সাথে ব্যবসায়ীর এই কথার কোনো মিল পাওয়া যায় না।

এদিকে খুচরা বাজারে কিন্তু একটা ঢেউ লেগেছে। বড়টা দিয়েই শুরু করি। বিমানের কোনো টিকিট নেই। বিদেশের গন্তব্যগুলোর কোনো টিকিট নেই। তার মানে মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্তরা এবার বাইরে যাবে ভালো করেই। দেশের ভেতরেও ভ্রমণপিয়াসীদের জন্য ভালো কোনো খবর নেই। সর্বত্রই টিকিটির হাহাকার। রেল, স্টিমার, বাস ইত্যাদিতে  বরাবরই এটাই ঘটে। আসলে এই সময়টাতে ঢাকা খালি হয়ে যায়। সেই তুলনায় টিকিট কোত্থেকে মিলবে? পর্যটন শিল্প অর্থাত্ বাস, ট্রেন, স্টিমার-লঞ্চ এবং হোটেল ব্যবসা মনে হচ্ছে জমেছে এবং জমবে ভালো। এই ঈদে প্রদানত ক্রেতারা জামা-কাপড়, শাড়ি, লুঙ্গি, পায়জামা, কুর্তা, জুতা-মোজা কিনতে আগ্রহ দেখায়। কেনে অনেক প্রসাধনী সামগ্রী। সারা মাস তো চলে ইফতারের বাজার। এবারে ইফতারের বাজার গরম। নামি-দামি হোটেল-রেস্টুরেন্টগুলো বিশেষ বিশেষ প্যাকেজ চালু করেছে। বেশ দামি প্যাকেজ। ভালো ভালো দেশি-বিদেশি প্যাকেজের খাবার। এবার নানা রকমের ডিসকাউন্টও দিচ্ছে। খবরের কাগজে ঈদ উপলক্ষে বেচাকেনার বিজ্ঞাপনও ছাপা হচ্ছে। নতুন নতুন পণ্যের খবর পাওয়া যাচ্ছে। বড় বড় প্রতিষ্ঠান রমজান ঈদ উপলক্ষে বিজ্ঞাপন দেবে, শুভেচ্ছা জানাবে। মতিঝিল, গুলশান, বনানী, উত্তরা ও ধানমন্ডির বড় বড় প্রতিষ্ঠান লক্ষ লক্ষ শুভেচ্ছা কার্ড ছাপাবে— যার কাজ ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। কোনো প্রিন্টিং প্রেসেই এখন নতুন কাজ নেওয়া হয় না। দর্জিদের দিন এ মাস। দর্জি দোকানগুলো জমে উঠেছে। রোজ ভিড় সর্বত্র। নতুন অর্ডার নেওয়া প্রায় বন্ধ। বড় বড় মল, শপিং সেন্টার, বাহারি বাজারগুলোতে ক্রেতাদের ভিড় এখনও সেভাবে নেই।

মাত্র ১০-১২ রোজা। বড় বড় দোকানিরা আশা করছেন, এবার বাজার ভালোই হবে। তারা ভারতীয় ও পাকিস্তানি নানা ধরনের ডিজাইনের পোশাক সংগ্রহ করে রেখেছেন। এতে আছে সর্বশেষ ডিজাইনের পোশাক। সর্বশেষ সিনেমার নায়ক-নায়িকার নামের পোশাক তাদের সংগ্রহে। ‘বাহুবলী, রইস এবং সুলতান’ নাকি এবারের ক্রেইজ। দোকানিরা আশা করছেন বাজার জমবে থ্রিপিছেরও। ঢাকায় শপিংমলের সংখ্যা কত? কারো কাছে কি তথ্য আছে? মনে হয় না। এটা আমাদের দুর্ভাগ্য। দেশে পাইকারি এবং খুচরা বাজারে মাসিক বিক্রি কত, বছরে বিক্রি কত তার কোনো তথ্য নেই। তবে তথ্য পাওয়া যায় আমদানির। তাও ভোগ্যপণ্যের। বছরে তেল, গম, চিনি, ছোলা, পিঁয়াজ, রসুন ইত্যাদি কত পরিমাণে আমদানি হয় তার তথ্য পাওয়া যায়। কিন্তু জামা-কাপড়, শাড়ি, লুঙ্গি, জুতা, প্রসাধনী সামগ্রীর তথ্য চাইলেই পাওয়া যায় না। বিশেষ করে বিক্রির তথ্য। এটা পাওয়া গেলে ভোগের (কনজামশন) তথ্য পাওয়া যেত যা সরাসরি ‘জিডিপি’ প্রবৃদ্ধির হারের সঙ্গে সম্পর্কিত।

আমি লিখছি ১১ রোজার দিকে। এ সময়ে বেচাকেনার পুরো চিত্রটি পাওয়া যায় না। তবে গ্রামের বাজার এবার মন্দা হওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা। এর কারণ কয়েকটি। কয়েকটি জেলা সরাসরি অকাল বন্যায় আক্রান্ত। তাদের নুন আনতে পান্তা ফুরোয় অবস্থা। গ্রামের মানুষ মূল্যস্ফীতিতে আক্রান্ত। সর্বোপরি হঠাত্ করে গত দুই-তিন মাসের মধ্যে মোটা চালের দাম ৫০ শতাংশ বেড়ে গেছে— যা গরিব মানুষকে বিপদে ফেলে দিয়েছে। মোটা চাল এখন কৃষকরা উত্পাদন করতে চায় না। এতে উত্পাদন খরচ বেশি। মোটা চাল উত্পাদনে সময়ও বেশি লাগে। এ প্রেক্ষাপটে চালের একটা ঘাটতি দেখা দিয়েছে। সরকার চাল আমদানি করছে অবশ্য। আরেকটি কারণ রেমিটেন্স হ্রাস। রেমিটেন্সের ওপর নির্ভরশীল প্রায় ৪ কোটি মানুষ। তাদের রেমিটেন্স আয় গত এক বছর যাবত্ কম। যদিও মে মাসে কিছুটা বেড়েছে। কিন্তু কাতারের নতুন সংকটাবস্থা বাংলাদেশের বিপুল সংখ্যক শ্রমিককে বিপদে ফেলে দিতে পারে। এ প্রেক্ষাপটে গ্রামে রোজার মাস ও ঈদ এবার কম জোলুস্পূর্ণ হবে। এই ঈদে সোনার অলংকার বেচা-কেনা বাড়ে। কিন্তু শোনা যাচ্ছে,  সোনার দাম বাড়বে। এতে এই বাজারও সংকুচিত থাকবে রোজার মাসে। ভ্যাটে অনেক জিনিসের দাম বেড়েছে। মানুষকে এখন হিসাব করে চলতে হচ্ছে। সার্বিকভাবে রোজা এবং ঈদের ধর্মীয় ও সামাজিক দিক অক্ষুণ্ন থাকবে। আনন্দের কোনো কমতি হবে না। কিন্তু অর্থনীতি কিছুটা মন্দাক্রান্ত থাকবে বলে মনে হয়।

লেখক : সাবেক অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।





« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: info@iportbd.com, বার্তা বিভাগ: newsiport@gmail.com