Tuesday, 24 October, 2017, 4:26 AM
Home স্বাস্থ্য
রমজান মাসে কী খাবেন কী খাবেন না
ডা. জয়নাল আবেদীন টিটো
Published : Friday, 9 June, 2017 at 3:53 PM, Count : 0

 রোজার মাসে খাওয়া দাওয়া ও স্বাস্থ্যগত সমস্যা নিয়ে কম-বেশি অভিযোগ নেই এমন মানুষ পাওয়া মুশকিল। অ্যাসিডিটি, পেটের গোলযোগ আর দুর্বলতা নিয়ে কিছু মানুষের অভিযোগ লেগেই থাকে। সমস্যা আমাদের নিজেদের অভ্যাসের। রোজার সময় যদি আমরা প্রচলিত ভাজাভুজি বা বেশি মসলাযুক্ত খাবার খাওয়ার অভ্যাস বাদ দিয়ে খাবারের মেনুতে ও রান্নার প্রণালিতে একটু পরিবর্তন আনি, তাহলে পুরো রোজার মাস সুস্থভাবে কাটানো যাবে। অনেক অসুখ-বিসুখের সমাধান কিন্তু রোজা রাখা বা কম খাওয়া। রোজা অনেকগুলো রোগ-ব্যাধির চিকিত্সাও বটে। এখানে রোজার মাসে স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যাভ্যাস বিষয়ে কিছুটা আলোকপাত করা হলো।

সেহেরিতে যা খাওয়া উচিত :

সেহেরির খাবার এমন হওয়া উচিত যা দীর্ঘক্ষণ পেটে থাকে অর্থাত্ হজম হতে বেশি সময় লাগে। কেউ কেউ মনে করেন,  সেহেরিতে প্রচুর পরিমাণ আমিষ (Protein) জাতীয় খাবার খেলে সারাদিন একটু সবল থাকা যাবে। কেউ আবার ভাত (Carbohydrate) বেশি খাওয়ার পক্ষপাতি। আসলে এর কোনোটিই ঠিক নয়। সেহেরিতে খাবারের প্রত্যেকটি উপাদান যেন প্রয়োজনীয় পরিমাণে থাকে সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। বছরের অন্যান্য সময়ের মতো রোজার মাসে সুষম খাবার গ্রহণের দিকে বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে । আমিষ, শর্করা ও চর্বি জাতীয় খাবারের কোনোটিই যেমন খাদ্যতালিকা থেকে বাদ পড়া উচিত নয়, তেমনি কোনো বিশেষ খাবার পরিমাণে বেশি খাওয়াও ঠিক নয়।

শর্করাজাতীয় খাবার বেশি খাওয়ার ফলে অগ্ন্যাশয় বা প্যানক্রিয়াস থেকে ইনসুলিনের নিঃসরণ বেড়ে যায়। এই অতিরিক্ত ইনসুলিন গ্লুকোজকে রক্ত থেকে দ্রুত দেহকোষে প্রবেশ করিয়ে দেয়। অর্থাত্ অতিরিক্ত ইনসুলিনের কারণে রক্তে গ্লুকোজ বেশিক্ষণ থাকতে পারে না। অতিরিক্ত ইনসুলিন নিঃসরণের কারণে দেহের স্থূলতা বেড়ে যায়।  আমাদের প্রতিদিনের খাদ্যাভ্যাসের কারণে দৈনিক যে নির্দিষ্ট পরিমাণ আমিষ-হজমকারী এনজাইম পাকস্থলি থেকে নিঃসৃত হয়, তা দিয়ে অতিরিক্ত আমিষ হজম করা সম্ভব নয়। তাছাড়া অতিরিক্ত আমিষ গ্রহণের ফলে শরীরে ঝিমুনি আসে ও রক্তে ইউরিয়ার পরিমাণ বেড়ে যায়। এই ইউরিয়া আমাদের দেহের জন্য একটি ক্ষতিকারক বর্জ্য পদার্থ।

অনুরূপভাবে অতিরিক্ত চর্বিজাতীয় খাবার দেহকোষ ও রক্তে অনাকাঙ্ক্ষিত মেদ তৈরি ছাড়া আর কোনো উপকার করতে পারে না । যাদের পিত্তথলি বা লিভারের সমস্যা আছে তাদের জন্য অতিরিক্ত চর্বি অত্যন্ত ক্ষতিকর। সেজন্য  সেহেরিতে অন্য মাসগুলোর মতো স্বাভাবিক খাবার খাওয়াই শ্রেয়।

জটিল শর্করা (Complex carbohydrate) জাতীয় খাবার খুব ধীরে হজম হয়, তাই, এ ধরনের খাবার  সেহেরিতে খাওয়া ভালো। যেমন— ঢেঁকিছাঁটা চালের ভাত, লালরুটি, পাউরুটি, বার্লি, সব রকমের আলু, পাস্তা ইত্যাদি। এই খাবারগুলো পাকস্থলীতে দীর্ঘক্ষণ স্থিত থাকে, হজম হয় ধীরে ধীরে। তাই রোজাদারের ক্ষুধাভাব কম অনুভব হয়। এর সঙ্গে পছন্দ অনুযায়ী পরিমিত মাছ/ মাংস ও প্রচুর শাক-সবজি খাওয়া যেতে পারে।

একজন রোজাদারের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন যথেষ্ট পানি (দৈনিক অন্তত ২ লিটার ) ও তাজা ফলের রস পান করা। অনেকেই এ বিষয়টিকে খুবই সাধারণ মনে করে গুরুত্ব দেন না। পানি দেহকে সতেজ রাখে। শরীর নামের কারখানার বিভিন্ন রাসায়নিক কার্যকলাপের মূল উপাদান এই পানি। পানি কম খেলে মূত্র তৈরি হয় কম, তাই দেহের বর্জ্য পদার্থ বের হতে পারে না, ফলে দেখা দেয় নানাবিধ সমস্যা । স্বাস্থ্যবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে  সেহেরি খাওয়ার বেলায় আল্লাহ রাসূলের (সাঃ) নিয়ম অনুযায়ী খাওয়াই উত্তম। সে নিয়মটি হলো, পাকস্থলীর তিন ভাগের একভাগ খাবার ও তিন ভাগের একভাগ পানি দিয়ে পূরণ করতে হবে এবং বাকি এক-তৃতীয়াংশ খালি রাখতে হবে শ্বাস নেওয়ার জন্য। অনেকেই হয়ত ভাববেন, আমরা তো পাকস্থলী দিয়ে শ্বাস নেই না, তাহলে পাকস্থলীর এক-তৃতীয়াংশ শ্বাস নিতে সাহায্য করে কেমন করে ? উত্তরটা খুবই সহজ। পাকস্থলীর উপরে আছে ‘ডায়াফ্রাম’ নামের একটি বড় মাংসল পর্দা। আমরা যখন শ্বাস গ্রহণ করি, তখন ডায়াফ্রাম সংকুচিত হয়ে নিচের দিকে নেমে আসে এবং ফুসফুস স্ফীত হয়। খাদ্য দিয়ে পাকস্থলী পূর্ণ থাকলে শ্বাস গ্রহণের সময় নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের এই মূল পেশী - ডায়াফ্রাম সংকুচিত হয়ে নিচের দিকে নামতে পারে না, ফুসফুস পর্যাপ্ত স্ফীত হয় না ও পরিমাণমত অক্সিজেন দেহে প্রবেশ করতে পারে না। তাই খাবার গ্রহণের ব্যাপারে রাসূল (সাঃ) এর নিয়ম মেনে চলা শরীরের জন্য সবচেয়ে উপকারী ।

সেহেরিতে যা খাওয়া উচিত নয়:

ভাজাভুজি, অতিরিক্ত তেল বা মশলাযুক্ত খাবার সেহেরিতে খাওয়া উচিত নয় । এ ধরনের খাবার পেটে গোলযোগ তৈরি করে।  সেহেরিতে চা পান না করাই উত্তম। চায়ে থাকে মূত্র-বর্ধক উপাদান। চায়ের মূত্র-বর্ধকের প্রভাবে দেহের পানি প্রস্রাবের মাধ্যমে দ্রুত বের হয়ে যায়।

ইফতারে যা খাওয়া উচিত :

ইফতারে শরীরের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয় পানি এবং তরল জাতীয় খাবারের । সারাদিন রোজা রাখার পর পাকস্থলীতে এমন কিছু খাবার দেওয়া উচিত যা দ্রুত শরীরে শক্তি জোগায় ও বিভিন্ন ঘাটতি পূরণ করে। ইফতার হিসেবে সরল শর্করা উত্তম। কেননা এটি দ্রুত হজম হয় ও শক্তি যোগায়। দেহের শারীরবৃত্তীয় চাহিদা পূরণের জন্য কিছু অত্যাবশ্যক উপাদান গ্রহণ করা জরুরি। যেমন— মস্তিষ্কের খাদ্য হলো গ্লুকোজ । গ্লুকোজের অভাবে মস্তিষ্কের কাজ ব্যাহত হয়। সৃষ্টিকর্তা মস্তিষ্ককে এভাবে তৈরি করেছেন যে, ইন্সুলিনের সাহায্য ছাড়াই গ্লুকোজ মস্তিষ্ক কোষে ঢুকে যায়। শরীরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হলো কিডনি, যা পানির অভাবে মারাত্নকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ১২ ঘন্টায় ৩০০ মিলির কম প্রস্রাব উত্পন্ন হলে কিডনি ফেইলিউরের আশঙ্কা থাকে। দেহের স্বাভাবিক কার্যকারিতার জন্য বিভিন্ন খনিজ উপাদান যেমন— সোডিয়াম, পটাশিয়াম, ক্যালশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম ইত্যাদি অত্যাবশ্যক। ইফতারে এমন সব খাবার খাওয়া উচিত যে খাবারে প্রয়োজনীয় পরিমাণ পানি, গ্লুকোজ ও খনিজ উপাদান থাকে। তাতে মস্তিষ্ক, কিডনি ও ত্বকের কার্যক্রম ঠিক থাকবে ।

আল্লাহর রাসূল (সাঃ) বলেছেন— “যদি তোমাদের কেউ রোজা রাখে তাহলে সে যেন খেজুর দিয়ে ইফতার করে। যদি সে তা না পায় তাহলে পানি দিয়ে। নিশ্চয়ই পানি হলো পরিশোধক।” (বুখারি ও বায়হাকি। এদিক থেকে চিন্তা করলে পানি, শরবত ও ফলের রস ইফতার হিসেবে অতি উত্তম।

 খেজুরে আছে গ্লুকোজ ও নানা ধরনের খনিজ উপাদান। এতে রয়েছে সরল শর্করা যা দ্রুত শোষণ হয় এবং মস্তিষ্ক ও দেহে শক্তি জোগায়। উচ্চ রক্তচাপ, রক্তশূন্যতা, কোষ্ঠকাঠিন্য ও বিভিন্ন হূদরোগ প্রতিরোধে খেজুরের অবদান অপরিসীম। হাড়ের সুস্থতা বজায় রাখতে ও রক্তে কোলেস্টেরল কমানোর ক্ষেত্রেও এর ভূমিকা রয়েছে। ফলমূলে আছে প্রচুর গ্লুকোজ, ভিটামিন ও খনিজ উপাদান। বিশেষত তরমুজ, বাঙ্গী এ জাতীয় পানীয় ফল ইফতারের জন্য খুব ভালো। এছাড়াও ছোলা সিদ্ধ (পছন্দ অনুযায়ী এর সঙ্গে যয়তুনের তেল, শসা, টমেটো ইত্যাদি মিশিয়ে নিতে পারেন ), হালিম, পায়েশ, হালুয়া, দই-চিড়া, দুধ-সাগু, পুডিং, যেকোনো রকমের মিষ্টি, রকমারী ফলের চার্ট বা যেকোনো তাজা ফল, মুরগির স্যুপ বা স্যুপ নুডুলস, সবজির স্যুপ ইত্যাদি ইফতার হিসেবে শরীরের জন্য উপকারী।

ইফতারে যা খাওয়া উচিত নয়:

ভাজা-পোড়া ও অতিরিক্ত তৈলাক্ত খাবার শরীরের জন্য সবসময়ই ক্ষতিকর। বিশেষ করে শরীরের তাত্ক্ষণিক ঘাটতি পূরণ ও শক্তি জোগানের ক্ষেত্রে এদের ভূমিকা নেই বললেই চলে। এসব খাবারের উপরিভাগে তেলের আবরণ থাকার কারণে এরা পাকস্থলীতে পরিপাক হয় না। এ ধরনের খাবার পাকস্থলী অতিক্রম করতে অনেক সময় নেয় । তারপর অন্ত্রে গিয়ে শোষিত হয় এবং রক্তে মিশে। হজম প্রক্রিয়ার এই বিলম্বের কারণে এ ধরনের খাবার দেহে দ্রুত শক্তি জোগাতে পারে না। রোজার সময় দাঁতের যত্নের ব্যাপারে আমরা অনেকেই বেখেয়াল হয়ে যাই। রমজান মাসে  সেহেরির পর অবশ্যই টুথপেস্ট ও ব্রাশ দিয়ে দাঁত ও জিহ্বা পরিষ্কার করা উচিত। সম্ভব হলে একটু কুসুম গরম পানিতে লবণ মিশিয়ে কুলি করে নেওয়া যেতে পারে। ইফতারের পর আরেকবার ব্রাশ করে নেওয়া ভালো। এর মাঝে রোজা রাখা অবস্থায় মেসওয়াক অথবা শুধু ব্রাশ দিয়ে দাঁত পরিষ্কার করতে পারেন । তাতে মুখে দুর্গন্ধ কম হবে এবং দাঁত ও মাঢ়ির রোগ থেকে রেহাই পাওয়া যাবে।

লেখক: উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা, শ্রীমঙ্গল





« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: info@iportbd.com, বার্তা বিভাগ: newsiport@gmail.com