Friday, 24 May, 2019, 9:56 AM
Home আন্তর্জাতিক
ট্রাম্পের ‘দুর্বৃত্ত’ যুক্তরাষ্ট্র
জোসেফ ই স্টিগলিৎস
Published : Monday, 5 June, 2017 at 5:13 PM, Count : 0

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তরকালে অনেক কষ্টের বিনিময়ে যে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে উঠেছে, ডোনাল্ড ট্রাম্প তাতে হ্যান্ডগ্রেনেড ছুড়েছেন। নিয়মনীতি-ভিত্তিক বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থা তিনি ধ্বংস করার চেষ্টা করছেন, যার সর্বশেষ বহিঃপ্রকাশ হচ্ছে ২০১৫ সালের প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নিজেকে প্রত্যাহার করে নেওয়া। মূল্যবোধ ও প্রতিষ্ঠানসমূহ নিয়ে আমাদের যে মৌলিক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল, তার ওপর হামলা চালালেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।

পৃথিবী কেবলই ধীরে ধীরে ট্রাম্প প্রশাসনের দুর্বল অ্যাজেন্ডার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে শুরু করেছে। তিনি ও তাঁর সাঙাতরা মার্কিন গণমাধ্যমকে ‘জনগণের শত্রু’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন, অথচ এটি মার্কিন স্বাধীনতা, অধিকার ও গণতন্ত্র রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এই গোষ্ঠী আমাদের জ্ঞান ও বিশ্বাসের ভিত্তি এবং জ্ঞানতত্ত্ব খাটো করতে চেয়েছে। যা কিছুই তাদের লক্ষ্য ও কথার প্রতি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছে, তাকেই তারা ভুয়া আখ্যা দিয়েছে। এমনকি এরা বিজ্ঞানকেও খারিজ করেছে। যে ভুয়া ধারণার বশে ট্রাম্প প্যারিস জলবায়ু চুক্তি বাতিল করলেন, তাতে এটা স্পষ্ট।

১৮ শতকের মধ্যভাগের আগ পর্যন্ত সহস্রাব্দকাল মানুষের জীবনযাত্রার মান স্থবির ছিল। আলোকায়নের সঙ্গে যুক্তি-বুদ্ধি ও বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের আগমন ঘটল, যার কারণে পরবর্তী আড়াই শতকে মানুষের জীবনযাত্রার মানে ব্যাপক উন্নতি এল। এর মাধ্যমে মানুষ সংস্কারের স্বরূপ আবিষ্কার ও তাকে আমলে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিল। মানুষের সমতার আদর্শ ও তার আনুষঙ্গিক মৌলিক ব্যক্তি অধিকারের ধারণা ছড়িয়ে পড়লে সমাজ বর্ণ ও লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য দূর করতে হিমশিম খেতে শুরু করে। ট্রাম্প এর সবকিছুই উল্টে দিতে চান। তিনি তো বিশেষ করে জলবায়ুবিজ্ঞান খারিজ করতে চান, এতে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি হুমকির মুখে পড়বে। আর নারী, হিস্পানিক, মুসলিমদের (তাঁর পছন্দের তেল ধনকুবের ছাড়া) ব্যাপারে তাঁর যে অন্ধত্ব, তাতে মার্কিন সমাজ ও অর্থনীতির কার্যকারিতা হুমকির মুখে পড়বে। তিনি ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা খাটো করছেন।

জনতুষ্টিবাদী হিসেবে ট্রাম্প বিগত কয়েক বছরে অর্থনীতিতে যে হতাশা বিরাজ করছিল, সেটা কাজে লাগিয়েছেন। ব্যাপারটা এত মারাত্মক হয়ে গিয়েছিল যে অনেক মার্কিন নাগরিকই ক্রমবর্ধমান অসমতার মধ্যে পতিত হয়ে খাবি খেয়েছে। কিন্তু তিনি কর ও স্বাস্থ্যসেবার যে পরিকল্পনা করেছেন, তাতে তাঁর মূল উদ্দেশ্য পরিষ্কার হয়ে যায়: যাঁরা তাঁকে সমর্থন দিয়েছিলেন, তাঁদের বঞ্চিত করে নিজেসহ অন্যান্য ভাড়া খেকোদের লাভবান করা।

ট্রাম্পের প্রস্তাবিত কর সংস্কারের এখন পর্যন্ত মনে হচ্ছে, এটি জর্জ ডব্লিউ বুশের চেয়েও বেশি প্রতিক্রিয়াশীল (ওপরের তলার মানুষদের লাভবান হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে)। যে দেশে মানুষের গড় আয়ু ইতিমধ্যে কমতে শুরু করেছে, সেখানে তাঁর এই স্বাস্থ্যসেবা সংস্কারে আরও ২ কোটি ৩০ লাখ মানুষ স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হবে। ট্রাম্প ও তাঁর মন্ত্রিসভার চুক্তি করার সক্ষমতা থাকলেও একটি অর্থনীতি সামগ্রিকভাবে কীভাবে কাজ করে, সে ব্যাপারে তাঁদের বিন্দুমাত্র ধারণা নেই। প্রশাসনের সামষ্টিক অর্থনীতির নীতি যদি বাস্তবায়িত হয়, তাহলে বাণিজ্য ঘাটতি যেমন বাড়বে, তেমনি উৎপাদন আরও কমে যাবে। ট্রাম্পের অধীনে যুক্তরাষ্ট্রকে ভুগতে হবে। প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসার আগেই যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক নেতৃত্বের ভূমিকা ধ্বংস হয়েছে। এই পর্যায়ে সেই নেতৃত্বস্থানীয় স্থান পুনরায় পেতে হলে সত্যিকার অর্থেই বীরোচিত প্রয়াস লাগবে। আমরা একই পৃথিবীতে থাকি। যে কঠিন পথে আমাদের চলতে হবে এবং একত্রে কাজ করতে হবে, পৃথিবী তার দিশা পেয়েছে। আমরা এটাও শিখেছি, সহযোগিতার মাধ্যমে সবাই লাভবান হতে পারে।

এখন এ রকম একজন শিশুতোষ জোরজবরদস্তিকারীকে নিয়ে পৃথিবী কী করবে, যার সঙ্গে যুক্তি করা যায় না। পৃথিবী কী করে ‘দুর্বৃত্ত’ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে খাপ খাওয়াবে? গত মাসে জি৭ নেতৃত্ব ও ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাতে জার্মান চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেল বলেছেন, ইউরোপ এখন আর ‘পুরোপুরি অন্যের ওপর নির্ভর করতে পারে না।’ তাকে এখন ‘নিজের ভবিষ্যতের জন্য নিজেকেই লড়াই করতে
হবে।’ এখন ইউরোপের একত্র থাকার সময়, আলোকায়নের মূল্যবোধের প্রতি তাকে আবারও অঙ্গীকারবদ্ধ থাকতে হবে। ইমানুয়েল ম্যাখোঁর সঙ্গে করমর্দন করার সময় ট্রাম্প পুরুষালি কায়দায় ক্ষমতার কসরত করার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু তিনিও করমর্দন দিয়ে তা প্রতিহত করেছেন।

নিরাপত্তার জন্য ইউরোপ ট্রাম্প-নেতৃত্বাধীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করতে হবে। কিন্তু একই সঙ্গে তার এটা স্বীকার করা উচিত, স্নায়ুযুদ্ধের যুগ শেষ, যদিও যুক্তরাষ্ট্রের শিল্প-সামরিক কমপ্লেক্স এটা বিশ্বাস করতে চায় না। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করা গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যয়বহুল হলেও বিমানবাহী রণতরি ও সুপার ফাইটার বিমান বানানো এর উত্তর নয়। ইউরোপকে নিজেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তার ব্যয় কতটা হবে। সামরিক স্বার্থের প্রতি তার নতজানু হওয়া চলবে না, যারা জিডিপির ২ শতাংশ বরাদ্দ চায়। সামাজিক-গণতান্ত্রিক অর্থনৈতিক মডেলের প্রতি আবারও অঙ্গীকারবদ্ধ হওয়ার মধ্য দিয়ে সে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জন করতে পারে।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আমরা যে অস্তিত্বের হুমকিতে পড়ে গিয়েছি, তা মোকাবিলায় পৃথিবী আর যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করতে পারে না। ইউরোপ ও চীন সবুজ ভবিষ্যতের প্রতি অঙ্গীকার গভীরতর করে ঠিক কাজটিই করেছে। এটা যেমন গ্রহের জন্য সঠিক, তেমনি অর্থনীতির জন্যও ঠিক। প্রযুক্তি ও শিক্ষায় বিনিয়োগের কারণে জার্মানি উচ্চতর উৎপাদনে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে আছে, তেমনি ইউরোপ ও এশিয়া ভবিষ্যতে সবুজ প্রযুক্তিতে অনতিক্রম্য সুযোগ পেয়ে যাবে। কিন্তু বাকি পৃথিবী দুর্বৃত্ত যুক্তরাষ্ট্রকে এই গ্রহ ধ্বংস করতে দিতে পারে না। একইভাবে তারা আলোকায়নবিরোধী ও আলোহীন ‘যুক্তরাষ্ট্রই প্রথম’ নীতির মাধ্যমে তাকে লাভবান হতে দিতে পারে না। বাকি পৃথিবীর উচিত হবে, যুক্তরাষ্ট্রের যেসব রপ্তানি পণ্য বৈশ্বিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, তার ওপর কার্বন-সমন্বয় কর আরোপ করুক।

ভালো খবর হচ্ছে, সিংহভাগ মার্কিন নাগরিক ট্রাম্পের সঙ্গে নেই। অধিকাংশ মার্কিন আলোকায়নের মূল্যবোধে বিশ্বাস করে। তারা বৈশ্বিক উষ্ণায়নের বাস্তবতায় বিশ্বাস করে এবং কাজ করতে চায়। কিন্তু ট্রাম্প থাকলে যে যুক্তি-তর্ক হতে পারে না, তা ইতিমধ্যে পরিষ্কার হয়ে যাওয়া উচিত। এখন কাজের সময়।

অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন, স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট।

জোসেফ ই স্টিগলিৎস: নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত মার্কিন অর্থনীতিবিদ।





« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: [email protected], বার্তা বিভাগ: [email protected]