Sunday, 19 November, 2017, 3:08 AM
Home জাতীয়
ব্যাংকে টাকা রাখলে কমে যাবে!
সোহরাব হাসান লিখেছেন প্রথম আলোতে
Published : Monday, 5 June, 2017 at 5:05 PM, Count : 0

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত জাতীয় সংসদে ২০১৭-২০১৮ অর্থ বছরের যে বাজেট প্রস্তাব করেছেন, তা নিয়ে বিস্তর সমালোচনা হচ্ছে। তিনি নিজে যতই এই বাজেটকে উত্তম বলে দাবি করুন না কেন, জনগণের বৃহত্তর অংশ মনে করছে এটিই তাঁর জীবনের সবচেয়ে খারাপ বাজেট। বাজেট সরকারের কেবল আয় ও ব্যয়ের হিসাব নয়। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দর্শনের দলিলও। এখানে দর্শনটা পাওয়া যায় না। অর্থনীতির নীতি-কাঠামোয় সংস্কারেরও উদ্যোগ নেই।

চাওয়া-পাওয়ার ব্যবধান সত্ত্বেও অর্থমন্ত্রী আগের বাজেটগুলোতে একটি গণমুখী চেহারা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু এবারে তার লক্ষণও দেখছি না। তিনি প্রত্যক্ষ করের চেয়ে অপ্রত্যক্ষ কর বাড়িয়ে সমাজের বৃহত্তর অংশের ওপরই দায় চাপিয়ে দিলেন। এটি হলো ধনীকে আরও ধনী এবং গরিবকে গরিব রাখার কৌশল।
আগে যেকোনো বাজেট ঘোষণার পর সরকারি ও বিরোধী দল অবধারিতভাবে রাজপথে সরব থাকত। একপক্ষ ‘গরিব মারার বাজেট’ মানি না মানব না বলে স্লোগান দিত। আরেক পক্ষে গণমুখী বাজেট হিসেবে তাকে অভিনন্দন জানাত। বাজেট নিয়ে এবারে রাজপথে মিছিল-পাল্টা মিছিল বের না হলেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তোলপাড় চলছে। অর্থমন্ত্রী মহোদয় অনুগ্রহ করে সেসব প্রতিক্রিয়া দেখলে বুঝতে পারতেন, সত্যি সত্যি বাজেটটি গণবান্ধব না গণ-অবান্ধব।
এই বাজেটে এমন কিছু প্রস্তাব করা হয়েছে, যা সরকারি দলের নেতা, সাংসদেরাও সুনজরে দেখেননি। অর্থনীতিবিদদের মতে, ব্যাংকে সঞ্চিত অর্থের ওপর আবগারি কর বসানো খুবই অনৈতিক কাজ হয়েছে। নীতিনির্ধারকদের কেউ কেউ ব্যাংকে গচ্ছিত অর্থের ওপর বাড়তি কর থাকবে না বলেও আশ্বস্ত করেছেন। বিষয়টি আশ্বাসের নয়, নৈতিকতার।
একজন নাগরিক তাঁর উপার্জনের যে অর্থ ব্যাংকে রাখেন, প্রথমত (বার্ষিক আয় আড়াই লাখ টাকার ওপর হলেই তাঁকে আয়কর দিতে হয়। আর বার্ষিক আয় আড়াই লাখ টাকা না হলে কারও পক্ষে ব্যাংকে এক লাখ টাকা সঞ্চয় করা সম্ভব নয়) তিনি আয়কর দিয়েই ওই অর্থ লাভ করেন। সে ক্ষেত্রে ব্যাংকে গচ্ছিত অর্থের সুদ বা মুনাফার ওপর সরকার কর বসাতে পারে। মূল টাকার ওপর নয়। আমরা দেখলাম, আগেই এটি আরোপ করা হয়েছিল স্বল্প হারে। এবারে হারটি বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। অর্থমন্ত্রীর প্রস্তাব অনুযায়ী, ১ লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ৫০০ টাকার পরিবর্তে ৮০০ টাকা আবগারি শুল্ক দিতে হবে। ১০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত দেড় হাজারের পরিবর্তে আড়াই হাজার টাকা দিতে হবে। ১ কোটি টাকা থেকে ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত আবগারি শুল্ক সাড়ে ৭ হাজার থেকে বাড়িয়ে ১২ হাজার টাকা করা হয়েছে। আর ৫ কোটি টাকার বেশি থাকলেই ২৫ হাজার টাকা দিতে হবে।
এর ফলে খুদে সঞ্চয়ীদের আয় কমে যাবে। যেমন বর্তমানে ব্যাংকে এক লাখ টাকা রাখলে বছরে লাভ বা মুনাফা পাওয়া যায় তিন হাজার টাকার মতো। হিসাব ব্যবস্থাপনায় ব্যাংক খরচ হিসেবে কেটে নেবে প্রায় অর্ধেক। এটিএম কার্ড, অনলাইন ব্যাংকিং হিসাব ইত্যাদি ধরলে আরও বেশি টাকা কাটা যাবে। এরপর সরকার ৮০০টাকা আবগারি কর নিলে তাঁর মুনাফা ৫০০ টাকার বেশি থাকবে না। অথচ অর্থমন্ত্রী নিজেই মূল্যস্ফীতি ধরেছেন ৫.৫ শতাংশ। সে ক্ষেত্রে এক লাখ টাকা ৫.৫ শতাংশ কমে দাঁড়াবে ৯৪. ৫ হাজার টাকা। অর্থাৎ তার প্রকৃত আয় কমে যাবে।
এ অবস্থায় মানুষ কেন ব্যাংকে টাকা রাখবে? সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একজন লিখেছেন, তিনি ব্যাংকে টাকা না রেখে এখন থেকে মাটির ব্যাংকে রাখবেন এবং তিনি এর চেয়ারম্যান ও তাঁর স্ত্রী এমডি এবং ছেলে-মেয়েরা পরিচালক হবেন। বাংলাদেশের অনেক বেসরকারি ব্যাংকে এই রীতিটি চালু আছে।
আমরা এত দিন দেখে এসেছি, তামাক মদসহ বিভিন্ন পণ্যের ওপর আবদারি কর বসানো হয়, ওসব পণ্য গ্রহণে ভোক্তাদের নিরুৎসাহিত করতে। মাননীয় অর্থমন্ত্রীও কি চান নাগরিকেরা ব্যাংকে টাকা না রাখুন। না হলে তিনি কেন ব্যাংকের টাকার ওপর আবগারি কর বসালেন? ব্যাংকের সাধারণ গ্রাহকদের ওপর জুলুম না করে যদি তিনি গত আট বছরে সরকারি ব্যাংক থেকে যে বিপুল পরিমাণ অর্থ লোপাট হয়েছে, সেটি উদ্ধারে কোনো পদক্ষেপ নিতেন, তাতে দেশ ও জনগণ উপকৃত হতো।
অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ব্যাংকিং খাতে চুরিচামারি, জালিয়াতি নাকি অন্য দেশেও হয়। তাঁর এই বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত করে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেছেন, ‘বাংলাদেশের মতো ব্যাংক ডাকাতির ঘটনা বিশ্বের আর কোথাও হয় না। তবে কোথাও থাকলেও সেটা হচ্ছে মন্দ বা খেলাপি ঋণ। তাও বড়জোর এক থেকে দু’শতাংশের মধ্যে। অথচ আমাদের ব্যাংকিং সিস্টেমে বড় অংশই হচ্ছে মন্দ এবং খেলাপি ঋণ। তিনি বলেন, বেসিক ব্যাংকে লুটপাট হয়েছে। এখনো এর ৬০ শতাংশের বেশি মন্দ ঋণ। বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (বিডিবিএল) ক্ষেত্রেও মন্দ ঋণের হার একই।’
অন্যান্য দেশে অর্থ লোপাট বা চুরি চামারির ঘটনা ঘটলে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। অর্থ লোপাটকারীরা শাস্তি পান। আর আমাদের দেশে তার বুক ফুলিয়ে হাটেন। পার্থক্য এটুকুই। ২০১০সালের শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি উদ্‌ঘাটনে খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদের নেতৃত্বে গঠিত কমিটি বাজার কারসাজির জন্য যাদের দায়ী করেছিল, তাদের বিরুদ্ধে অধিকতর তদন্তের সুপারিশ করলেও রহস্যজনক কারণে সেটি হয়নি। দুই একজন ছাড়া কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নেওয়া হয়নি।
এবারের বাজেট গরিব, নিম্নমধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত মারার না হলেও ধরার বাজেট। অর্থমন্ত্রী মহোদয় যেহেতু অর্থনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের হোতাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছেন না, তাই দায়টা চাপিয়েছেন নিরীহ মধ্যবিত্তের ওপরই।
মাননীয় অর্থমন্ত্রী, ব্যাংকে সঞ্চিত অর্থের ওপর কেবল বর্ধিত নয়, সম্পূর্ণ আবগারি কর প্রত্যাহার করুন। এতে অন্তত আপনার ‘উত্তম’ বাজেটের একটি ‘মধ্যম’ ভুল সংশোধন হবে।









« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: info@iportbd.com, বার্তা বিভাগ: newsiport@gmail.com