Monday, 18 November, 2019, 6:55 AM
Home জাতীয়
বাংলাদেশে ধর্ষণপ্রবণতা ও প্রতিকার
ড. খুরশিদ আলম লিখেছেন সমকালে
Published : Monday, 5 June, 2017 at 3:31 PM, Count : 0

বর্তমান বিশ্বে ধর্ষণ নিয়ে ব্যাপক তোলপাড় হলেও এটি কোনো সমকালীন বিষয় নয়। এটি এমন একটি সামাজিক সমস্যা, যা যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। মানব সমাজে ধর্ষণের ইতিহাস বহু পুরনো তথা প্রাচীন ভারতীয় বা গ্রিক পুরাণেও এর বিবরণ পাওয়া যায়। এটি শুধু বিশেষ সময়ে বা সমাজে সীমাবদ্ধ নয়, তবে কোনো কোনো সমাজে এর প্রবণতা বেশি আর কোনো কোনো সমাজে কিছুটা কম। আর কিছু কিছু সমাজ বা সম্প্রদায় পাওয়া যায়, যাদের মধ্যে ধর্ষণ বলতে কোনো কিছু নেই।

কারও কারও মনে প্রশ্ন আসতেই পারে যে, ধর্ষণের প্রবণতা কি অনুন্নত দেশগুলোতেই বেশি? কিন্তু দেখা যায়, ধর্ষণের তালিকায় বিশ্বের শীর্ষে অবস্থান করছে যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ আফ্রিকা, সুইডেন ও যুক্তরাজ্যের মতো দেশ। ন্যাশনাল ভায়োলেন্স এগেনিস্ট উইমেন সার্ভের তথ্য অনুযায়ী প্রতি ছয়জনের মধ্যে একজন আমেরিকান নারী সারাজীবনে একবার অন্তত ধর্ষণের প্রচেষ্টা বা সম্পূর্ণ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। জাতিসংঘের একটি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রতি বছরে ধর্ষণের হার পাঁচ লাখ, চীনে ৩১,৮৩৩, মিসরে দুই লাখ ২৫ হাজার এবং যুক্তরাজ্যে ৮৫ হাজার ধর্ষণের শিকার হন। ২০১০ সালের তথ্য অনুযায়ী প্রতি লাখে যুক্তরাষ্ট্রে ২৭.৩ জন, দক্ষিণ আফ্রিকায় ১৩২.৪ জন, অস্ট্রেলিয়ায় ২৮.৬ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছে।

আবার অন্যদিকে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের ২০১৬ সালের রিপোর্টে গত এক বছরে বাংলাদেশে ধর্ষণের কিছু নমুনা পাওয়া যায়। তাতে দেখা যায়, ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৭২৪ জন নারী এবং ৬৫ জনকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছিল। ধর্ষিত নারীদের মধ্যে ১৪৪ (১৯.৮৮ শতাংশ) জনের বয়স ৭-১২ বছরের মধ্যে, ১৪৭ (২০.৩০) জনের বয়স ১৩-১৮ বছরের মধ্যে, ৫০ (৬.৯) জনের বয়স ছয় বছরের মধ্যে রয়েছে। বাংলাদেশে বিগত বছরগুলোর মধ্যে অনেক চাঞ্চল্যকর ঘটনা রয়েছে, এর মধ্যে বর্তমানের বহুল আলোচিত বনানীর দুই শিক্ষার্থী ধর্ষণের ঘটনা উল্লেখযোগ্য।

জাতিসংঘের এক জরিপে দেখা যায়, বাংলাদেশের ১৪.১ শতাংশ গ্রামীণ পুরুষ এবং ৯.৫ শতাংশ শহুরে পুরুষ (গড়ে ১০ শতাংশ) কোনো না কোনো সময়ে কোনো নারীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে সঙ্গম করেছে, যা তারা স্বেচ্ছায় স্বীকার করেছে। সামাজিক প্রবণতার হারের কথা বিবেচনায় নিলে বলা যায়, অন্তত আরও ২০ শতাংশ পুরুষ হয়তো তা করেছে; কিন্তু যা তারা স্বেচ্ছায় স্বীকার করেনি। তার অর্থ হচ্ছে, দেশের মোট প্রায় ১২ শতাংশ পুরুষ এ অপরাধ করেছে। এটি বোঝা যায় এ কারণে যে, ৬১.২ শতাংশ শহুরে পুরুষের এ কাজের জন্য কোনো অপরাধবোধ নেই এবং ৮৯.২ শতাংশ শহুরে পুরুষ বলেছে যে, যদি জোর করে সঙ্গম করা হয় আর যদি সে সময় নারী বাধা না দেয়, তাহলে তাকে ধর্ষণ বলা যাবে না। তার অর্থ হচ্ছে, যেসব পুরুষের এ কাজের জন্য অপরাধবোধ নেই বা যেসব নারী এ কাজের সময় শক্তি দিয়ে প্রতিহত করবে না, তাহলে তাকে ধর্ষণ বলা যাবে না। তাহলে প্রায় সকলে এটিকে গ্রহণযোগ্য কাজ মনে করতে পারে। তার অর্থ হচ্ছে, সংখ্যাতাত্তি্বকভাবে ৬১.২ শতাংশ পুরুষ এ কাজ করতে পারে এবং বাকি ২৯ শতাংশ এ কাজে বাধা না পেলে করতে পারে। এই পরিসংখ্যান যদি ঠিক হয়, তাহলে বাংলাদেশের ৯০ শতাংশ পুরুষই ধর্ষণ করতে পারে। এখানে শাস্তি দেওয়া যাবে কি-না নাকি তারা মনে করে, এ শাস্তি তাদের প্রতি অবিচার করা হচ্ছে। সম্ভবত এ কারণে বাংলাদেশে ৯৫.১ শতাংশ ধর্ষক কোনো আইনগত শাস্তির সম্মুখীন হয়নি। কারণ যারা তাদের শাস্তি নিশ্চিত করবে তারা নিজেরা ভাববে যে, এটাকে যারা অপরাধ মনে করে না তাদের শাস্তি দিলে কি সে এটিকে অপরাধ মনে করবে নাকি ভাববে, তার প্রতি অন্যায় করা হচ্ছে। তাই এই মনোভাব বা মূল্যবোধকে পরিবর্তন করতে হলে তার জন্য বিশেষ কিছু করা দরকার।

একই জরিপে দেখা যায়, গ্রামে ২.৭ শতাংশ এবং শহরে ০.৫ শতাংশ পুরুষ তার আগের বছর সে কাজটি করেছে। গ্রামীণ এলাকায় ৪৭.৪ শতাংশ ধর্ষণকারী একাধিকবার ধর্ষণ করেছে, ৩.৭ শতাংশ চার বা তার অধিক করেছে। এদের ৮২ শতাংশ গ্রামীণ এবং ৭৯ শতাংশ শহুরে পুরুষ তাদের তা প্রাপ্য হিসাবে করেছে। এ থেকে বলা যায়, প্রতি বছর প্রায় ৭.৫ লাখের মতো নারী ধর্ষিত হচ্ছে বা এক হাজারে একজনের তথ্য মিডিয়াতে প্রকাশ পাচ্ছে। উল্লেখ্য, বর্তমানের আলোচিত বনানীর দুই শিক্ষার্থীর ঘটনাটি পূর্বপরিকল্পিত ছিল বলে ধারণা করা যায়। ঘটনাটির ভিডিও করার কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম কারণ হচ্ছে, ওই দুই শিক্ষার্থীকে সমাজে হেয় করা যাকে পলিউশনের বা নষ্ট মেয়ের ধারণা দিয়ে বিশ্লেষণ করা যায়। সেই দুই শিক্ষার্থীকে চাপের মধ্যে রাখা এবং তাদের বারবার ভোগ করার সুযোগ তৈরি করাও তার উদ্দেশ্য হতে পারে। আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে এমন হয় যে, ধর্ষণকারী অনেকদিন ধরেই এ ধরনের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার কারণে তাদের কাছে এ ধরনের কাজকে অপরাধজনক কিছু মনে হয় না। পারিবারিক মূল্যবোধগত অনুকূল পরিবেশ থাকলে এ ধরনের ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা আরও বেশি থাকে।

কিছু কিছু দেশে ধর্ষণের পরিমাণ বাড়লেও কিছু কিছু দেশে আবার এর পরিমাণ কমেছে। গত ২০ বছরে আমেরিকায় ধর্ষণের ঘটনা অর্ধেকে নেমে এসেছে। ২০০৪-১০-এর পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০০৯ সালের তুলনায় ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় ৩.১৩, স্পেনে ২৩.০৬ এবং রাশিয়াতে ৯.০৯ শতাংশ কমে এসেছে, যা একটি ইতিবাচক দিক।

ধর্ষণ কমাতে হলে বহুমুখী পদক্ষেপ নিতে হবে। পর্দা করলেই যে ধর্ষণ কমবে এটা ঠিক নয়, যা তনু হত্যার ঘটনায় প্রমাণ করে। এটি কমাতে হলে প্রথমত এখানে পুরুষের মূল্যবোধে পরিবর্তন আনতে হবে। ধর্ষণ শুধু আইনের দৃষ্টিতে একটি অপরাধ তা নয় বরং তার আগে সামাজিক দৃষ্টিতে এটি যে একটি গুরুতর অপরাধ তা সমাজে আগে প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগ নিতে হবে। দ্বিতীয়ত, আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে তা সহজ করতে হবে। তৃতীয়ত, যেখানে যতটা সম্ভব নারীদের ঝুঁকি এড়িয়ে চলতে হবে; যেমন_ বর্তমানে প্রযুক্তির ব্যবহারের ফলে অপরিচিত মানুষের সঙ্গে পরিচয় কিংবা নম্বর আদান-প্রদান এ ধরনের ঝুঁকি বাড়াতে সহায়তা করে। তাই এই নম্বর আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে। চতুর্থত, ডিএনএ টেস্ট এ কাজে বেশ সহায়তা করতে পারে, যার ব্যবহার বাড়িয়ে অপরাধীদের বিচার দ্রুত করার চেষ্টা করা যেতে পারে।

চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব সোশ্যাল রিসার্চ ট্রাস্ট








« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: [email protected], বার্তা বিভাগ: [email protected]