Tuesday, 12 December, 2017, 5:54 PM
Home বিবিধ
জলবায়ু পরিবর্তন ও লবণাক্ততার প্রভাব
নেহা থিরানি বাগরি লিখেছেন ইত্তেফাকে
Published : Monday, 5 June, 2017 at 12:00 AM, Update: 05.06.2017 3:46:26 PM, Count : 3

২০৫০ সালের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশে নদী ও ভূগর্ভস্থ পানির লবণাক্ততা আরো বৃদ্ধি পাবে। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলে দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠবে সুপেয় খাবার পানি। প্রকট হবে সেচ সমস্যা। এতে করে এই অঞ্চলের কমপক্ষে ২৯ লাখ দরিদ্র মানুষের জীবন-জীবিকায় নেমে আসবে চরম দুর্দশা। বর্তমানে এই অঞ্চলের প্রায় ২৫ লাখ মানুষ সুপেয় পানির জন্য সংগ্রাম করে যাচ্ছে। শঙ্কা জাগানিয়া এই তথ্যগুলো জানা যায় বিশ্বব্যাংকের সমপ্রতি প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদন থেকে।

দেশের উপকূলীয় গ্রামগুলোর মাটিতে ক্রমশ লবণাক্ততার পরিমাণ এভাবে বৃদ্ধি পেলে শুধু নিরাপদ পানীয় জলেরই সংকট তৈরি হবে না; এটির ক্ষতিকারক প্রভাব ছড়িয়ে পড়বে ধান চাষসহ বিভিন্ন ফসল উত্পাদনের ওপর। চাষ ব্যবস্থার এ অচলাবস্থা বিরূপ প্রভাব ফেলবে ঐ অঞ্চলের মানুষের ঐতিহ্যবাহী পেশায়। বেকারত্ব তখন এক রকম মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে বলা যায়। যদিও লবণাক্ত পানিতে চিংড়ির খামারগুলো টিকে থাকবে। কিন্তু শুধু চিংড়ির খামার দিয়ে এই অঞ্চলের অসংখ্য কর্মহীন মানুষের কর্মসংস্থান করা সম্ভবপর হয়ে উঠবে না কোনোভাবেই। কাজের অভাবে তখন এই অঞ্চলের বেকার জনগোষ্ঠী পাড়ি জমাবে রাজধানী শহর ঢাকায়। ফলে শহরটি হয়ে উঠবে আরো জনবহুল। তৈরি হবে বসবাস এবং চলাচলজনিত বিশৃঙ্খলা ও বিড়ম্বনার। তবে বেঁচে থাকার তাগিদে স্থানান্তরিত হয়ে আসা জনগোষ্ঠীর অনেকে বিভিন্ন গার্মেন্টসে শ্রমিকের চাকরি নিবে, কেউবা রিকশা চালক হবে এবং কেউ কেউ নিরাপত্তা রক্ষীর দায়িত্ব নিবে। বিশ্ব ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী লবণাক্ততার প্রভাবে উপকূলীয় এলাকার প্রাপ্ত বয়স্ক শ্রমিকদের মধ্যেই এই অভিবাসন ঘটবে অধিক হারে।

বিশেষত ভূমিহীন শ্রমিকদের মাঝে এই অভিবাসনের বাস্তবতা পরিলক্ষিত হবে বেশি মাত্রায়। কেননা, তাদের জন্য জীবনধারণের প্রয়োজনীয় অর্থ সংকুলান করা খুবই কঠিন। তবে অভিবাসনযোগ্য প্রায় শতকরা ৯০ শতাংশ শ্রমিকই হবে পুরুষ। নিজেরা স্থানান্তরিত হলেও স্ত্রী এবং পরিবারের অন্য সদস্যদের তারা নিজ বাসস্থানেই রেখে যাবে। বিশ্বব্যাংকের হিসেব অনুযায়ী বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থান থেকে প্রতিবছর ঢাকায় প্রবেশ করে প্রায় চার লাখ মানুষ। ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর মাইগ্রেশন-এর পরিচালিত একটি গবেষণা প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ঢাকার ১৬০টি অভিবাসী পরিবারের মধ্যে ৬৬ শতাংশেরই স্থানান্তরের কারণ হলো জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশগত ঝুঁকি।

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ সেন্টারের এমিরেটস অধ্যাপক আইনুন নিশাত বলেন, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় সবাইকেই প্রাত্যহিক ব্যবহারের জন্য পানি ক্রয় করতে হয়। এতে তাদের আয়ের প্রায় ১০ শতাংশ পানি কেনার পিছনে ব্যয় হয়ে যায়। পরিস্থিতির সুবিধা নিতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অনেক উদ্যোক্তা পানি ফিল্টার করে এই এলাকায় এনে বিক্রি করতে শুরু করেছে।

২০০৯ সালে ঘূর্ণিঝড় আইলা আঘাত হানার পর ঐ অঞ্চলে পানির চাহিদা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পায়। এতে সাম্প্রতিক সময়ে আগের তুলনায় পানির দামও বেড়েছে অনেক। সঙ্গত কারণে যারা ইতোপূর্বে বিনামূল্যে পানি পান করত, তারাও এখন পানির জন্য অর্থ ব্যয় করতে বাধ্য হচ্ছেন। বিশেষ করে গ্রীষ্মকালীন সময়ে যখন পানি তোলার পাম্প দিয়ে পানি ওঠে না, তখনই এলাকাবাসীর মধ্যে পানি কেনার হিড়িক পড়ে যায়। তারা তখন পানির প্রয়োজন মেটাতে ড্রামভর্তি পানি কিনতেই বেশি ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়েন। প্রতিটি নীল প্লাস্টিকের ড্রাম পানি তারা ১০ টাকা (১২ সেন্ট) করে ক্রয় করে থাকেন। প্রতি সপ্তাহে একটি পরিবারের জন্য এরকম কয়েক ড্রাম পানির প্রয়োজন হয়। এতে ক্রমশই অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে ঐ এলাকার জনগণ।

ইউনাইটেড ন্যাশনস ওম্যান অ্যান্ড দ্য বাংলাদেশ সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড স্টাডিজের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলে বসবাসকারী মহিলাদের মধ্যে প্রাথমিকভাবে মৌলিক সমস্যা হলো খাদ্য ও পানি। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট এই মৌলিক চাহিদাগুলোর জোগান নিশ্চিত করতেই বলা যায় এইসব পরিবারের গৃহকর্তাদের সাময়িকভাবে বাড়ি ছাড়তে বাধ্য হতে হয়।

গবেষণাটি থেকে আরো জানা যায়, উপার্জনের জন্য পুরুষ সদস্যরা নিজেদের বাড়ি ছাড়লেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা তাদের স্ত্রীদের পর্যাপ্ত অর্থ পাঠাতে পারে না। কোনো কোনো বিবাহিত নারী তাদের স্বামীর নিকট থেকে মোটেই কোনো আর্থিক সহযোগিতা পায় না। উপরন্তু এইসব অঞ্চলের নারীরা শিকার হন নানা ধরনের ভোগান্তির। বিশেষ করে পরিবারের পুরুষ সদস্যদের অনুপস্থিতিতে চোরের উপদ্রবজনিত ভয়ের বিষয়টিই এই ক্ষেত্রে অন্যতম।

ইউএন ওমেন-এর জেন্ডার অ্যান্ড ক্লাইমেট চেঞ্জ বিষয়ক বাংলাদেশ শাখার কর্মসূচি সমন্বয়কারী দিলরুবা হায়দার বলেন, পুরুষদের দূরে থাকার বাস্তবতায় বিধবা বা তালাকপ্রাপ্ত না হওয়া সত্ত্বেও, এই এলাকার নারীরাই মূলত গৃহস্থালী পরিচালনা করে থাকেন। তাদের প্রতিনিয়ত ছেলেমেয়েদের দেখাশুনা এবং পরিবারকে রক্ষণাবেক্ষণের জন্য করতে হচ্ছে সংগ্রাম। পুরুষ সদস্যরা পাশে না থাকার বাস্তবতায় তাদের নিরাপত্তার অনুভূতি যে কত প্রকট—তা সরেজমিনে প্রত্যক্ষ না করলে বোঝা যায় না।

ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ডায়রিয়াল ডিজিজ রিসার্চ ইন বাংলাদেশ এবং লন্ডনের ইম্পিরিয়াল কলেজের যৌথ একটি গবেষণা প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের নারীরা দেশের অন্যান্য অ-উপকূলীয় অঞ্চলের নারীদের তুলনায় গর্ভাবস্থায় অধিক সংখ্যক হারে প্রি-ক্ল্যাম্পাসিয়া এবং উচ্চ রক্তচাপে ভোগে। গবেষণাটিতে তথ্য সংগ্রহের জন্য দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় ১৫০০ জন নারীর ওপর জরিপ চালানো হয়। এইসব মহিলা গর্ভাবস্থায় তাদের হাত এবং পা ফুলে যাওয়ার ব্যাপারটিও গবেষকদের নিকট তুলে ধরেন।

বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে বিশ্বব্যাংকের পরিচালিত ২০১৫ সালের একটি গবেষণা প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের পানিতে লবণাক্ততার মাত্রা অত্র সংস্থা কর্তৃক নির্ধারিত গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে অনেক বেশি। সঙ্গত কারণে গর্ভাবস্থার চূড়ান্ত সময়ে এসে শিশু মৃত্যু এবং নানান রোগে আক্রান্ত হওয়ার বাস্তবতা যেন ঐ অঞ্চলে এক রকম চেপেই বসে। বিশেষ করে দুুর্যোগ পরবর্তী সময়ে এইসব অঞ্চলে দূষিত পানি পান করার কারণে ডায়রিয়া, আমাশয়, পেটের পীড়া, চর্মরোগ এবং অপুষ্টির সমস্যাতো নিত্য-নৈমিত্তিক ব্যাপারে পরিণত হয়।

বিশ্বব্যাংকের হিসাবমতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশে সবচাইতে ঝুঁকির মুখে আছে উপকূলীয় সম্প্রদায়ের জনগণ। ভবিষ্যতে এই সম্যসাটি এতটাই প্রকট হবে যে, ঐ অঞ্চলের মানুষের অস্তিত্ব রক্ষার্থে তখন সবচাইতে বেশি প্রয়োজন হয়ে উঠবে পরিবেশ-পরিস্থিতির সঙ্গে তাদের অভিযোজন সক্ষমতার। শুধু বাংলাদেশেই নয় ২১০০ সালের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অনুরূপ অস্তিত্ব সংকটের মুখে পড়বে বিশ্বের আরো শত কোটি পরিবার।

আল জাজিরা থেকে সংক্ষেপিত অনুবাদ : মো. সহিদুল ইসলাম

লেখক : রাজনীতি, উন্নয়ন ও আবহাওয়া বিষয়ক গবেষক









« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: info@iportbd.com, বার্তা বিভাগ: newsiport@gmail.com