Tuesday, 24 October, 2017, 4:25 AM
Home আন্তর্জাতিক
বিশ্ব জঙ্গিবাদের নেপথ্যে
ড. রাশিদ আসকারী লিখেছেন ইত্তেফাকে
Published : Monday, 5 June, 2017 at 12:00 AM, Update: 05.06.2017 3:03:14 PM, Count : 2

 ম্যানচেস্টারে অ্যারিয়ানা গ্রান্ডের কনসার্টে আত্মঘাতী বোমা হামলার নেপথ্য কারণ খোঁজার চেষ্টা চলছে। তার মধ্যেই আবারও হামলার ঘটনা ঘটেছে। স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে কনসার্টপ্রেমী কিশোর-কিশোরীদের হত্যার মধ্য দিয়ে কোন ‘মহান’ উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে চেয়েছে হত্যার দায় স্বীকারকারী জঙ্গি সংগঠন আইসিস। নাইন-ইলেভেনে নিউ ইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে আল কায়েদার আত্মঘাতী বিমান হামলার সময় খেলনার মতো ভেঙে পড়া যমজ টাওয়ারে নিহত তিন হাজার মানুষের মধ্যে এক সন্ত্রস্ত কিশোর অবাক বিস্ময়ে প্রশ্ন করেছিল, ওরা (হত্যাকারীরা) কী চায়? টুইন টাওয়ার হামলায় নিহত ভয়ার্ত কিশোরের সেই প্রশ্ন আজো তাড়া করে অগণিত শান্তিকামী মানুষকে। তারা জানতে চায় এই আত্মঘাতী জঙ্গিবাদের বীভত্স হত্যাযজ্ঞ এবং ধ্বংসলীলার নেপথ্য কারণ কী? এই পৈশাচিক প্রক্রিয়ায় কি কোনো মতাদর্শের পক্ষে জনসমর্থন অর্জন করা সম্ভব? আলকায়েদা, আইএসআইএস, বোকো হারাম, মুসলিম ব্রাদারহুড কিংবা সমজাতীয় অন্য জঙ্গিসংগঠনগুলো সাধারণ মানুষের মনে-মগজে, সমাজে ও সভ্যতায় যেভাবে কিলিং এজেন্ট হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং শান্তিপ্রিয় মানুষের আতঙ্ক ও ঘৃণার কারণ হয়ে উঠেছে তাতে তা খণ্ডাতে তাদের কত শতাব্দী লাগবে তা বলা মুশকিল।

ম্যানচেস্টার হামলাকারীকে শনাক্ত করা গেছে। পশ্চিমা মিডিয়া জনৈক সালমান আবেদির কথা বলছে। তাদের ভাষ্যমতে সিরিয়ায় সম্প্রতি পশ্চিমা বিমান হামলায় নিহত শিশুদের হত্যার প্রতিশোধ নিতে সালমান আবেদি ম্যানচেস্টার নাশকতার জন্ম দিয়েছে। এই ভাষ্যের সমর্থন দিয়েছে খোদ আবেদির বোন। আমেরিকার ওয়ার্ল্ড স্ট্রিট জার্নালে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে তিনি বলেন, আমার মনে হয় সে (আবেদি) শিশুদের— মুসলিম শিশুদের মরে যেতে দেখে প্রতিশোধ নিতে চেয়েছে। সন্ত্রাস-বিশ্লেষক মাইকেল এস স্মিথও ম্যানচেস্টার হামলাকে আইসিস-এর কাজ মনে করেন। তার যুক্তি হলো, বিশ্ব জিহাদি আন্দোলনে আলকায়েদা এবং আইসিস এক অঘোষিত কর্তৃত্বের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। সিরিয়া এবং ইরাকে আমেরিকা, রাশিয়াসহ অন্যান্য দেশের বিমান হামলায় নিহত মুসলিম শিশুদের হত্যার বিষয়টিকে পুঁজি করে তারা প্রতিশোধের নামে অমুসলিম শিশুদের হত্যাকে জায়েজ করে আইসিস-এর হত্যাযজ্ঞকে জায়েজ করার একটা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আল কায়েদার চাইতে নিজেদের অধিকতর গ্রহণযোগ্য করে তোলার চেষ্টা করছে।

একটি অপকর্ম আরেকটি অপকর্ম দিয়ে জায়েজ করা যায় না। পশ্চিমা বিমান হামলায় সিরিয়ায় যে নিষ্পাপ শিশু ও অসামরিক, অসহায়, প্রতিবাদহীন মানুষ মারা পড়ছে, প্রাণভয়ে দেশত্যাগী হতে গিয়ে আয়লান কুর্দির নিয়তি বরণ করছে তা কোনো সভ্য বিবেক সমর্থন করতে পারে না। এই অমানবিক কাজের সংঘটক বা অনুঘটকদের ধিক্কার জানায় সারা দুনিয়ার মানুষ। তাদের প্রতিহত করতে পারলে কিংবা শাস্তি দিতে পারলে সর্বাধিক জনসমর্থন লাভ করা যেত।

আমরা সাধারণ মানুষ এই ঢিল-পাটকেলের খেলা পছন্দ করি না। পশ্চিমা কর্তৃপক্ষ আধিপত্য বিস্তারের নেশায় উন্মত্ত হয়ে সিরিয়ার জল ঘোলা করে তাতে ঢিল ছুড়ছে। প্রতিক্রিয়ায় ম্যানচেস্টারে পাটকেল খাচ্ছে। যারা ঢিল ছুড়ছেন আর যারা পাটকেল ছুড়ছেন দ্বন্দ্ব তাদের মধ্যে কিন্তু সে দ্বন্দ্বের খেসারত দিতে হচ্ছে সিরিয়ার নিষ্পাপ শিশুদের। আর ম্যানচেস্টারের নিরীহ সংগীতপ্রেমী কিশোর-কিশোরীদের। রাজায় রাজায় যুদ্ধ, উলুখাগড়ার প্রাণ যায়। বিশ্বের শান্তিকামী সাধারণ মানুষ আর জঙ্গলের অযত্নে লালিত উলুখাগড়ার নিয়তি আজ একই সমতলে।

সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো যারা আজ পরস্পরের প্রতি ঢিল-পাটকেল ছোড়াছুড়ি করছে তারা সমধাতুজ গোষ্ঠী। মেরি শেলির গল্পের বিজ্ঞানী ফ্রাঙ্কেনস্টাইন যেমন নিজ হাতে গড়া দানবের দ্বারা আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারায় এই ঢিল পাটকেলওয়ালাদের অবস্থা প্রায় তাই। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য বিষধর সাপ নিয়ে খেললে ভয়ঙ্কর কেউটে একদিন স্বভাবদোষেই ওঝাকে কামড়ায়, তেমনি আজ আলকায়দা আর আইসিস-এর মতো বিষধর সাপেরা লালনকর্তা ওঝাদের কামড়াতে উদ্যত। ঝানু ওঝারাও সহজে ছাড় দেবার পাত্র নয়। সাপ মারার শত কৌশল তাদের জানা। সিরিয়ায় বিমান হামলায় শিশুমৃত্যু কিংবা ম্যানচেস্টারে কনসার্টে হামলা বস্তুত ওঝা আর সাপের দ্বন্দ্ব ছাড়া আর কিছু নয়। আর এর পেছনের মূল কারণ বিশ্বের ক্ষমতাধর দুই রাষ্ট্রের ছলে বলে কৌশলে আধিপত্য বিস্তারের উদগ্র বাসনা। আফগানিস্তানে রুশ আগ্রাসন ঠেকিয়ে স্বীয় আধিপত্য বিস্তারের জন্য আমেরিকা ভয়ঙ্কর আল কায়েদার জন্ম দিয়েছিল। সেই আল কায়েদা প্রধান ওসামা বিন লাদেন, যে কিনা সিআইএ’র বিশেষ প্রশিক্ষণে ভয়ঙ্কর জঙ্গি হয়ে ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের দানবের রূপ পরিগ্রহ করলে আমেরিকাই বিশেষ প্রশিক্ষিত কমান্ডো বাহিনী পাঠিয়ে তাকে হত্যা করে।

১৯৭৯ থেকে ১৯৮৯ পর্যন্ত দীর্ঘ এক দশক রাশিয়া আফগানিস্তানে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করেছে আর আমেরিকা চেষ্টা করেছে তা প্রতিহত করতে। ঠিক এর উল্টোটা এখন ঘটছে সিরিয়ায়। আমেরিকা তার পশ্চিমা মিত্রদের নিয়ে বিবদমান সিরিয়ায় নিজ আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করছে। এদিকে রাশিয়াও বসে নেই। আমেরিকার আধিপত্য বিস্তারের প্রচেষ্টা প্রতিহত করে আপন আধিপত্য প্রতিষ্ঠার নেশায় বুঁদ রাশিয়াও। সব মিলে সিরিয়া আজ এক ভয়ঙ্কর গৃহযুদ্ধের শিকার। সেই গৃহযুদ্ধ বিশ্বযুদ্ধে পরিণত হওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। সাম্প্রতিক কালের সকল জঙ্গিবাদী হামলার সঙ্গে কোনো না কোনো ভাবে সিরিয়া পরিস্থিতি যুক্ত থাকছে। সিরিয়া নিজে এক বিশাল বিস্ফোরণোন্মুখ বোমার ওপরে বসে আছে, আর বিশ্বকেও বসিয়ে রেখেছে সার্বক্ষণিক উত্কণ্ঠায়। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো সিরিয়ার এই অবস্থায় সিরিয়ার নিজের কিছুই করার নেই। সিরিয়াকে কেন্দ্র করে স্বীয় স্বার্থে দ্বন্দ্বমুখর রয়েছে যেমন পরাশক্তিগুলো, তেমনি বিশ্ব জঙ্গিসংগঠনগুলো। অশুভ স্রষ্টা কর্তৃক অশুভ উদ্দেশ্যে যতদিন অশুভ সৃষ্টি হতেই থাকবে ততদিন নিরীহ শিশু কিংবা সংগীত প্রেমী কিশোর-কিশোরী কেউই নিরাপদ নয়। ম্যানচেস্টার হামলা এই অমোঘ রসায়নের এক সাম্প্রতিক ভার্সন।

বিশ্ব জঙ্গিবাদ এবং এর পৃষ্ঠপোষক সংগঠনগুলো বিশেষ করে আল কায়েদা এবং আইসিস বস্তুত আমেরিকারই সৃষ্টি। সহিংসতার এই ভয়ঙ্কর অস্ত্রগুলো তৈরি করা হয়েছিল মূলত তেলসমৃদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যকে বিভক্ত এবং জয় করার জন্য। বস্তুত যুক্তরাষ্ট্রের এক দীর্ঘবাহিত ঐতিহ্য রয়েছে সন্ত্রাসী গ্রুপকে মদদদানের। স্নায়ুযুদ্ধের কালে সিআইএ সর্বপ্রথম চরমপন্থি ইসলামি গ্রুপগুলোর সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ত করে। তখন থেকেই আমেরিকা বিশ্বকে দুইভাগে ভাগ করে ফেলে। একদিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং তৃতীয় বিশ্ব, অন্যদিকে পশ্চিমা দেশগুলো এবং রাজনৈতিক ইসলাম যাকে আমেরিকা সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে সংগ্রামে এক যৌথ মৈত্রী জ্ঞান করে। ১৯৭০-এর দশকে সিআইএ আরব বিশ্বে সোভিয়েত আধিপত্য বিস্তার রোধ করতে এবং মার্কসবাদী আদর্শের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে মিশরের মুসলিম ব্রাদারহুডকে ব্যবহার করে। ইন্দোনেশিয়ায় সুকর্নের বিরুদ্ধে সারেকাত ইসলাম এবং পাকিস্তানে জুলফিকার আলী ভুট্টোর বিরুদ্ধে জামায়াতে ইসলামকে ব্যবহার করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। ১৯৮০-এর দশকে ওসামা বিন লাদেনের জন্ম দেয় তারা। ইসলামি স্টেট (ISIS) তাদের সর্বশেষ জঙ্গি ক্রীড়ার নাম। অতএব, পরাশক্তিগুলোর বোধোদয় না হলে কিংবা তাদের পরাক্রম শেষ বা সীমিত না হলে জঙ্গিবাদের প্রাণভোমরা মারা পড়বে না।

লেখক :অধ্যাপক ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক









« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: info@iportbd.com, বার্তা বিভাগ: newsiport@gmail.com