Friday, 24 November, 2017, 11:19 AM
Home জাতীয়
জনসেবার ইজারা পেতে সবাই মরিয়া
মহিউদ্দিন আহমদ লিখেছেন প্রথম আলোতে
Published : Friday, 2 June, 2017 at 2:46 PM, Count : 0

আমাদের ইশকুলে ফি বছর একবার বিচিত্রানুষ্ঠান হতো। ওই অনুষ্ঠানের শেষ দিকে থাকত নাটক। তো একবার মঞ্চস্থ হলো অধ্যক্ষ। ইব্রাহীম খাঁর লেখা ভিস্তি বাদশাহ, তাঁরই উপস্থিতিতে।

নাটকের গল্পটি মজার। মোগল বাদশাহ হুমায়ুন পাঠান দলপতি ফরিদ খাঁর কাছে যুদ্ধে হেরে গেছেন। ফরিদ খাঁ শেরশাহ নাম নিয়ে দিল্লির মসনদে বসেছেন। অন্যদিকে হুমায়ুন পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। পথ চলতে গিয়ে তিনি তৃষ্ণায় কাতর। এক ভিস্তিওয়ালা তাঁকে জলপান করাল। কৃতজ্ঞ হুমায়ুন ভিস্তিওয়ালার কাছে জানতে চাইলেন, সে কী পুরস্কার চায়। ভিস্তিওয়ালা আমতা আমতা করে বলল, ‘যদি কোনো দিন মসনদ ফিরে পান, আমাকে এক দিনের জন্য বাদশাহ বানিয়ে দেবেন।’ পাঁচ বছর যাযাবরের জীবন কাটিয়ে হুমায়ুন আবার দিল্লি দখল করলেন। শেরশাহ তত দিনে গত হয়েছেন। খবর শুনে ভিস্তিওয়ালা এসে হাজির। হুমায়ুনকে তাঁর ওয়াদার কথা স্মরণ করিয়ে দিতেই হুমায়ুন তড়াক করে সিংহাসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন, তাঁর আলখেল্লাটা ভিস্তিওয়ালার গায়ে পরিয়ে তাকে সিংহাসনে বসিয়ে দিলেন। ভিস্তিওয়ালা সারা বেলা রাজকাজ চালাল এবং হাঁসফাঁস করল। বেলা শেষে হুমায়ুনকে গদি ফিরিয়ে দিয়ে বলল, ‘যথেষ্ট হয়েছে, এবার আমি যাই।’ হুমায়ুন তাকে অনেক উপহার দিয়ে বিদায় করলেন। কিশোর বয়সে ওই নাটক দেখার সময় খুব মজা পেয়েছিলাম। এক দিনের বাদশাহ হয়ে ভিস্তিওয়ালার সে কী অসহায় চাউনি, ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি অবস্থা।

সত্যি সত্যি এমনি ঘটনা ঘটেছিল কি না, জানি না। তবে রূপক হিসেবে আমরা উদাহরণটির সঙ্গে পরিচিত। পাঁচ বছর পরপর আমাদের দেশে ভোট হয়। আমরা যাঁরা ভোটার, এক দিনের জন্য হলেও বাদশাহ বনে যাই। যাঁরা দণ্ডমুণ্ডের কর্তা হবেন, তাঁদের বিগলিত হাসি, কাতর নয়ন এবং হাত জোড় করে ‘সেবা’ করার সুযোগ চাওয়া ভিক্ষা করতে দেখি। ওই এক দিনই। তারপর ভোটভিক্ষুকেরা স্বরূপে আবির্ভূত হন। তাঁরা আবার মালিক হয়ে যান। নাগরিকের কাছে নির্বাচন ভোটরঙ্গ ছাড়া আর কিছু নয়। এটাই আমরা অনেক রাজনীতিবিদ ও নাগরিকের মুখে শুনতে পাই এবং কাগজে শিরোনাম হয় নির্বাচন প্রহসনে পরিণত হয়েছে।

নাগরিকদের সামনে এক দিনের বাদশাহির মুলো ঝুলছে এখন। দেড় বছরের মাথায় নির্বাচন হবে বলে শোর উঠেছে। নির্বাচন কমিশন (ইসি) গত ২৩ মে একাদশ সংসদ নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা করেছে। সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগের ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করার পরিকল্পনা আছে। সরকারের মেয়াদ শেষ হবে ২০১৯ সালের ২৮ জানুয়ারি। ইসি ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে নির্বাচন করতে চায়। রোডম্যাপ অনুযায়ী আগামী জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপে বসবে ইসি (প্রথম আলো, ২৪ মে ২০১৭)।

ইসির রোডম্যাপ ঘোষিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই রাজনীতিতে গরম হাওয়া বইতে শুরু করেছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে বলা হয়েছে, তারা সময়মতো নির্বাচন চায় এবং এ জন্য ইসিকে তারা সব ধরনের সহায়তা দেবে। বিএনপি থেকে বলা হয়েছে, আগাম নির্বাচন বা নির্বাচনের উপযুক্ত সময় কখন, এ মুহূর্তে এটা বড় বিষয় নয়; মূল কথা হচ্ছে, দেশের নির্বাচনব্যবস্থা যে ভেঙে পড়েছে, মানুষের মধ্যে যে আস্থাহীনতা, সে ব্যাপারে পদক্ষেপ না নিয়ে নির্বাচনের রোডম্যাপ দিয়ে কোনো লাভ হবে না।

নির্বাচনে ইভিএম (ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন) ব্যবহার নিয়ে কমিশন তার অবস্থান স্পষ্ট করেছে। ইসি বলেছে, তারা এটা ব্যবহারের জন্য তৈরি, তবে সব দল যদি রাজি না হয়, তাহলে তারা ইভিএম ব্যবহার করবে না। ব্যাপারটার এখানেই ইতি হয়ে যাওয়ার কথা। ইভিএম নিয়ে কয়েকটি দল, বিশেষ করে বিএনপির ঘোর আপত্তি। বোঝা যাচ্ছে, ইসি এ ব্যাপারে জোর করবে না এবং বিএনপি নির্বাচনে আসুক, এটা ইসি চায়। তারপরও আওয়ামী লীগ থেকে ইভিএম ব্যবহারের পক্ষে জোর ওকালতি হচ্ছে। দলের সাধারণ সম্পাদক বলেছেন, ডিজিটাল বাংলাদেশে অ্যানালগ পদ্ধতিতে নির্বাচন করার সুযোগ নেই। বোঝা যাচ্ছে, ইভিএম নিয়ে ঝগড়াটা তিনি জিইয়ে রাখতে চান। ইভিএম নিয়ে বিএনপির শঙ্কা প্রযুক্তি নিয়ে নয়, মেশিনের সম্ভাব্য অপব্যবহার নিয়ে। বিএনপি ইসির ওপর পুরোপুরি আস্থা রাখতে পারছে না। তাদের আশঙ্কা, চাপাচাপি করে আওয়ামী লীগ যদি ইসিকে ইভিএম গেলাতে পারে, তাহলে বিএনপির জন্য তা সর্বনাশ ডেকে আনতে পারে।

এখন পর্যন্ত বিএনপি ‘নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের’ দাবি জানিয়ে আসছে। বিএনপি থেকে এ ধরনের সরকারের রূপরেখা এখনো ঘোষণা করা হয়নি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে অটল থেকে বিএনপি ২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জন করেছিল ও প্রতিরোধের ডাক দিয়েছিল। বিএনপি এখন আর ‘তত্ত্বাবধায়ক’ শব্দটি ব্যবহার করছে না। তাদের ভয় একটাই। শেখ হাসিনা যদি প্রধানমন্ত্রী থাকেন, তাহলে ইসি কাগজে-কলমে যতই স্বাধীন হোক না কেন, নির্বাচনকে ক্ষমতাসীন দল প্রভাবিত করবে। আওয়ামী লীগ মুখে না বললেও তাদেরও একটা ভয়ের জায়গা আছে। অর্থাৎ, শেখ হাসিনা যদি প্রধানমন্ত্রী না থাকেন, তাহলে নির্বাচন নিয়ে আওয়ামী লীগের তাবৎ আয়োজন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে পারে। সোজা কথায় বলা যায়, বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর অধীনে নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগের জয়ের সম্ভাবনা বেশি। অন্য কেউ অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী হলে আওয়ামী লীগের সেই সম্ভাবনা নষ্ট হবে। যতই বলা হোক না কেন, নির্বাচন হবে নির্বাচন কমিশনের অধীনে, আওয়ামী লীগের মন্ত্রী ও নেতারা বলেই যাচ্ছেন, শেখ হাসিনার অধীনেই নির্বাচন হবে। তাঁরা শেখ হাসিনাকেই তুরুপের তাস মনে করেন। তবে এটা ব্যক্তি শেখ হাসিনা নন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অর্থাৎ, হাসিনা প্রধানমন্ত্রী থাকলেই বিজয় সুনিশ্চিত। আর এখানেই বিএনপির আপত্তি।

দলীয় সরকার ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় বাংলাদেশে যে কয়টি সাধারণ নির্বাচন হয়েছে, তার স্মৃতি কোনোটাই সুখকর নয়। এটা ১৯৭৩, ১৯৭৯ ও ১৯৮৬ সালের নির্বাচন প্রসঙ্গে বলা যায়। ওই নির্বাচনগুলোতে কমবেশি কারচুপির অভিযোগ আছে। ২০১৪ সালের উদাহরণটা আর টানলাম না। ওটা তো অনন্য! ১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত চারটি নির্বাচনের ফলাফল নিয়েও বিতর্ক আছে, আছে কারচুপির অভিযোগ। তবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হওয়ায় ওই নির্বাচনগুলো গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে বেশি।

ইসি যেদিন রোডম্যাপ ঘোষণা করল, সেদিনই আরেকটি খবর সবার নজর কেড়েছে। ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা উপযাচক হয়ে বলেছেন, বাংলাদেশের অনুরোধ পেলে ভারত আগামী নির্বাচনে যেকোনো ধরনের সহযোগিতা দেবে। তবে কী ধরনের সহযোগিতা লাগবে, তা বাংলাদেশকে বলতে হবে।

বাংলাদেশের রাজনীতি এবং নির্বাচন নিয়ে বিদেশিদের আগ্রহের কমতি নেই। এ দেশে কোনো দল বিরোধী বেঞ্চে থাকলে তারা সরকারের বিরুদ্ধে বিদেশি কূটনীতিকদের কাছে প্রায়ই নালিশ জানায়, ফরিয়াদ করে। একই দল যখন সরকারে থাকে, তখন তারা বলে বিদেশিরা অহেতুক নাক গলাচ্ছে। বিদেশি কূটনীতিকেরা নিশ্চয়ই এ নিয়ে মজা পান, কৌতুক করেন।

ভারতীয় হাইকমিশনারের আগ্রহ এ দেশে অনেকের উদ্বেগের কারণ হয়েছে। অনেকেই ভারতকে ‘বিশ্বস্ত প্রতিবেশী’ মনে করেন না। সে জন্যই উদ্বেগ। দেশটা জাপান কিংবা কানাডা হলে হয়তো এমনটি হতো না। ২০১৪ সালের নির্বাচনের সময় ভারতের পররাষ্ট্রসচিব সুজাতা সিংয়ের ঢাকায় তশরিফ আনা এবং দলগুলোর সঙ্গে দূতিয়ালির বিষয়টি অনেকেই ভালো চোখে দেখেননি। ওই নির্বাচনে ভারতের পছন্দ-অপছন্দ প্রকাশ করার ক্ষেত্রে তিনি কোনো রাখঢাক করেননি। সে জন্য ভারতের সহযোগিতার আগাম ইচ্ছা সন্দেহ তৈরি করতেই পারে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে গত তিন-চার দশকে যে মেরুকরণ ঘটেছে, শিগগিরই তা থেকে বেরিয়ে আসা যাবে না। এখানে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুই মেরুর কাপ্তান। বাংলাদেশের মানুষকে সেবা করার ইজারা পেতে তারা মরিয়া। নির্বাচনের দিনটি যতই ঘনিয়ে আসবে, তাদের আচরণ ততই ধারালো এবং মারমুখী হবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবু আমরা কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করব, তারা যেন আবারও সংঘাতে জড়িয়ে না পড়ে, যেমনটি আমরা দেখেছি ১৯৯৬, ২০০১, ২০০৬ ও ২০১৩-১৪ সালে।

মারামারি-কাটাকাটি না করেও তো প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা যায়? যেমনটি হয় ক্লাসে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে? কিংবা খেলার মাঠে? আমাদের রাজনীতিবিদেরা প্রতিপক্ষ সম্পর্কে যে ভাষায় কথা বলেন, যে ধরনের আচরণ করেন, তা অনেক সময়ই ভব্যতার সীমা ছাড়িয়ে যায়। যে নেতা যত গুরুত্বপূর্ণ, তাঁর মধ্যে পরিমিতিবোধের ততই অভাব। কেন এমনটি হয়?

জনমনে একটা ধারণা আছে, রাজনীতিবিদেরা যা বলেন, তা করেন না। অর্থাৎ তাঁরা অভিনয় করেন। কিন্তু অভিনয় করলেও তো তাঁরা নায়কের ভূমিকা নিতে পারেন। এ জন্য খলনায়ক কিংবা ক্লাউন হতে হবে কেন? অনেকে মুখ ভেংচে, ঘাড়ের রগ ফুলিয়ে, তর্জনী তুলে যেভাবে হুংকার দেন, তা সভ্য সমাজের নিয়মনীতিতে পড়ে না।

মহিউদ্দিন আহমদ: লেখক ও গবেষক।

mohi2005@gmail.com





« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: info@iportbd.com, বার্তা বিভাগ: newsiport@gmail.com