Sunday, 19 November, 2017, 3:20 AM
Home ধর্ম
মহাযোগী বাবা লোকনাথ
বিষ্ণু পদ ভৌমিক লিখেছেন ইত্তেফাকে
Published : Friday, 2 June, 2017 at 2:05 PM, Count : 0

 বহুকাল ধরে তপস্যা করবার পর বাবা লোকনাথ বুঝেছিলেন যে জীবে জীবে ঈশ্বর অধিষ্ঠান হয়ে আছেন। তাঁর প্রচারিত দর্শন ছিল স্বামী বিবেকানন্দের ভাষায় ‘জীবে প্রেম করে যেই জন সেই জন সেবিছে ঈশ্বর।’ বাবা আরও বলেছিলেন- ‘তোদের ভগবানের সঙ্গে আমার দেখা হয়নি-আমি দেখেছি আমাকে। আমি  বদ্ধ আছি কর্মে, কর্ম বদ্ধ আছে সংসারে, সংসার বদ্ধ আছে জিহ্বা আর উপস্থে- যে এই দুটিকে সংযম করতে পেরেছে সেই মুক্ত হয়েছে।’

কত মানুষ যে বিভিন্নভাবে ঠাকুরের পরীক্ষা নিয়েছেন তার কোন ইয়ত্তা নেই। একবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এসেছিলেন বি.এ এবং এম. এ. ক্লাসের ছাত্র বাবার আশ্রমে। কিন্তু বাবার অপলক চোখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করার সাহস তাদের ছিল না। ছাত্ররা অতি নম্রভাবে বলল- ‘আমরা আপনার কাছে এসেছি ব্রহ্মকে জানতে-এর বিষয়ে কিছু উপদেশ দিন।’

অন্তর্যামী বাবা লোকনাথ মনে মনে  হাসলেন। তিনি বললেন-

অখণ্ড মণ্ডলাকরং ব্যাপ্তং যেন চরাচরম/তত্পদংদর্শিতং যেন তস্মৈ শ্রী গুরুবৈনম:

‘তোমাদের নিকট ব্রহ্মা কী জান? টাকা, কারণ টাকা গুলিও অখণ্ড এবং মণ্ডলাকার সারা বিশ্বে এর প্রভাব ও প্রভুত্ব চলছে। তোমরা সেই টাকা ব্রহ্মের পিছনে ছুটে চলেছ। অধ্যাপক নামক গুরু তোমাদের টাকা ব্রহ্ম লাভ করার পথ প্রদর্শক। যদি কোন দিন টাকা ব্রহ্মকে ছেড়ে অন্য ব্রহ্ম দর্শনের অভিলাষ হয়-তখন বিস্তারিত বুঝিয়ে দিবে।’

বিষয় চিন্তা হতে আসক্তি আসে আবার ঈশ্বর চিন্তা হতেও আসক্তি আসে। তাই ভগবত্ প্রেমের পথে চলবার জন্য গুরুর প্রয়োজন-সেই দিকেই বাবা লোকনাথ প্রকারান্তরে ইঙ্গিত দিচ্ছেন।

বর্তমানে যারা ছাত্র আগামী দিনে এরাই হবে দেশ ও জাতির কাণ্ডারী। তাদের নৈতিক মানদণ্ড বজায় রাখাই প্রকৃত শিক্ষা

এ প্রসঙ্গে স্বামী বিবেকানন্দ বলেছিলেন- ‘রাজনীতি, সমাজনীতি, অর্থনৈতিক পরিবর্তন যতই হউক না কেন, কেবল আধ্যাত্মিক উন্নতি নিশ্চিত করিতে পারিলেই সকল প্রকার অসামাজিক ও অনৈতিক কার্যক্রমের পথ রুদ্ধ হইবে।’

কাজেই আধ্যাত্মিক ও নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত না হলে অসত্ প্রকৃতির মানসিক প্রবণতা বোধ করা যাচ্ছে না। মানুষ বিভ্রান্ত বিপর্যস্ত হয়ে আত্মবিশ্বাস হারিয়ে আজও ভোগের মধ্যে সাধনার পথ খুঁজে অশান্তি দূর করতে ব্যর্থ প্রয়াস চালায়।

ত্যাগের মূর্ত প্রতীক পরম পুরুষ বাবা লোকনাথ নিজে আজন্ম ব্রহ্মচারী ও সন্ন্যাসী হয়েও কোনো সন্ন্যাসী সম্প্রদায় গড়ে তোলেননি। তিনি অসাম্প্রদায়িক মুক্ত চেতনার জীবন্ত বিগ্রহ। বাবা বলতেন, সত্যকে অবলম্বন করলে আত্মজ্ঞান তথা আত্মনুভূতি জাগ্রত হবেই হবে।

সর্বময় ব্রহ্মর্ষি বাবা লোকনাথ এর ভাবনা— ইন্দ্রীয়দের মোড় ঘুরিয়ে দিলেই সব হয়— যেমন কাম আমাদের শত্রু, তাকে মিত্রের পথে ঘুরিয়ে দেওয়া ঈশ্বরকে কামনা করলেই হলো।

ক্রোধ আমাদের দ্বিতীয় শত্রু। ঈশ্বর কামনায় বাধা হলে ক্রোধ প্রকাশ করে তাড়িয়ে দেওয়া।

লোভ-ঈশ্বরের জন্য লোভ করা।

মোহ-ঈশ্বরের জন্য মোহ হোক।

শ্রদ্ধাযুক্ত হূদয় আর বিবেক যুক্ত বুদ্ধিই হোক আমাদের প্রত্যাশা

একটি সত্য ঘটনার প্রকাশ না করলেই নয়।

একদিন সকালে রাস্তায় খুব হট্টগোল শোনা গেল, নিকটে যেতেই বুঝা গেল ঘটনা- এক যুবক এক যুবতীর সঙে অনৈতিক কাজে লিপ্ত হয় বিধায় তাদের সাজা হবে। সাজা হলো পাথর ছুঁড়ে মেরে ফেলা।

ঐ সময় রাস্তা দিয়ে এক সাধু হেঁটে যাচ্ছিলেন। উনি ঘটনা জেনে বললেন- তোমাদের মাঝে যে কোনো দিন অপরাধ করনি সেই প্রথম পাথর ছুঁড়বে। তখন সবাই একে অপরের দিকে তাকিয়ে হতবাক- কে প্রথম পাথর ছুঁড়বে? যে কোনো অন্যায় কাজ করেনি এমন নিরপরাধ লোক কোথায়? এভাবে কিছু সময় অতিক্রম হয়ে গেল কেউ আর নিজেকে নিরপরাধী ভাবতে না পারায় ঐ যুবক-যুবতী ঐ যাত্রায় সাধুর হস্তক্ষেপে বিপদ হতে পরিত্রাণ পেয়ে গেল। কাজেই সত্যবান, সংযমী ও পরার্থপরতা অনুশীলন না করলে এভাবে অনৈতিক কাজকেও প্রতিবাদ করে প্রতিরোধ করা যায় না, ফলে বিবেকবর্জিত রাস্তা প্রসারিত হবে।

মানুষের জীবন দুর্লভ। এ জীবনে কেবল পথ চলার; থেমে থাকার উপায় নেই। অসত্ থেকে সত্ এর দিকে, মিথ্যা থেকে সত্যের দিকে, অপূর্ণ থেকে পূর্ণের দিকে, অজ্ঞান থেকে জ্ঞানের দিকে, অন্ধকার থেকে আলোর দিকে।

বহুকাল ধরে এই ধারণা আছে যে, ভগবান আমাদের থেকে অনেক দূরে পৃথক এক সত্তা। কত চিন্তা কত ভাবনা কত পাঠ কত শ্রবণ কত অনুভূতিই পুষ্টি দিয়েছে এই ভ্রান্ত ধারণাকে। এগুলিই আমাদের অনেক জমানো সংস্কার। এই সংস্কারই অভ্যাসের সূত্রপাত ঘটায়। অভ্যাসই অবচেতন মনে বাসা বাঁধে। তাইতো সংস্কারমুক্ত হওয়া কঠিন অবস্থায় পরিণত হয়। এই  ভ্রান্ত সংস্কার থেকে মুক্ত হতে হলে চাই আত্মবিশ্বাস, চাই ধৈর্য ও অধ্যবসায়। নিজের অন্তরের সত্যকে ভুলে থাকার মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে। নিজকে জানা ও উপলব্ধি করার উপায় হচ্ছে আত্মজ্ঞান; এই আত্মজ্ঞান আসে যোগের পথে। হাজার মাইল দূরে নয় আত্মদর্শন হয় আত্মজ্ঞানে। কোনো পাহাড়ে, জঙ্গলে নয় আমাদের মধ্যেই ঈশ্বর আত্মগোপন করে আছেন। তাঁকে ঘরে বসে পাওয়ার রাস্তা দেখিয়েছেন মহাযোগী ত্রিকাল দর্শী মহাতাপস বাবা লোকনাথ। সনাতন ধর্ম মানব সমাজকে এই শাশ্বত সত্যের বাণী শোনাচ্ছে- অনাদিকাল থেকে আদি নেই, অন্ত নেই,  নেই কোনো প্রবর্তক, তাই তো সনাতন।

কলি অবতার বাবা স্মরণ মঙ্গল

তাঁহার স্মরণ জীব পায় মোক্ষফল।

লেখক: সাধারণ সম্পাদক, শ্রী শ্রী লোকনাথ ব্রহ্মচারী আশ্রম ও মন্দির, ঢাকা





« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: info@iportbd.com, বার্তা বিভাগ: newsiport@gmail.com