Tuesday, 24 October, 2017, 4:27 AM
Home ফিচার
'লজ্জা আমি পাব কেন, লজ্জা তো সমাজের-রাষ্ট্রের'
কল্যাণ ভৌমিক, উল্লাপাড়া (সিরাজগঞ্জ)থেকে লিখেছেন সমকালে
Published : Wednesday, 31 May, 2017 at 3:55 PM, Count : 0
দৃঢ় মনোবল আর নিজের প্রতি অবিচল আস্থায় সব বাধা ডিঙিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন উল্লাপাড়ার বহুল আলোচিত নির্যাতিত পূর্ণিমা। ২০০১ সালের অক্টোবরের নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার বিজয়ী হওয়ার পর অমানিশার অন্ধকার নেমে এসেছিল তার জীবন ও পরিবারের ওপর। সেই পূর্ণিমা প্রত্যন্ত গ্রামের পিছিয়ে থাকা বড় পরিবারটিকে একাকী ধীরে ধীরে টেনে তুলছেন। নিজে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেছেন। ভাইবোনদেরও শিখিয়েছেন লেখাপড়া। মাথা গোঁজার ঠাঁই হয়েছে তাদের। শত প্রতিবন্ধকতার মধ্যে ঘুরে দাঁড়ানো এই মেয়েটি ১৭ বছর ধরে বয়ে বেড়াচ্ছেন যন্ত্রণার জ্বালাও। তবে সাহসী পূর্ণিমা বলেন, 'লজ্জা আমি পাব কেন? এই লজ্জা সমাজের, রাষ্ট্রের।'

সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার পূর্বদেলুয়া গ্রামের অনিল চন্দ্র শীলের মেয়ে পূর্ণিমা রানী শীল। চার বোন ও পাঁচ ভাইসহ বাবা-মায়ের সংসার ছিল সুখের। হেসে আনন্দে কাটছিল ওদের জীবন। ২০০১ সালের ১ অক্টোবর দেশে অনুষ্ঠিত হয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন। পূর্ণিমা সে সময় উল্লাপাড়া হামিদা পাইলট বালিকা

উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্রী। বয়স ১৪ বছর। ভোটের দিন সিরাজগঞ্জ-৪ (উল্লাপাড়া) আসনে আওয়ামী লীগ মনোনীত সংসদ সদস্য প্রার্থী প্রয়াত আব্দুল লতিফ মির্জা পূর্বদেলুয়া উচ্চ বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে তার দলের মহিলা এজেন্ট নিয়োগ দিয়েছিলেন পূর্ণিমাকে। বিএনপি প্রার্থী এম আকবর আলীর কর্মী ও সমর্থকরা ভোট চলাকালে জোর করে কেন্দ্রে ঢুকে ব্যালট পেপার নিয়ে ধানের শীষে সিল দেওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় প্রতিবাদ করেন এই সাহসী মেয়ে। বচসা হয় প্রতিপক্ষের সঙ্গে। বিষয়টি উপজেলা নির্বাচন অফিস ও প্রশাসনকে অবহিত করেন তিনি। এটাই ছিল পূর্ণিমার অপরাধ। ওই নির্বাচনে হেরে যান আওয়ামী লীগ প্রার্থী আব্দুল লতিফ মির্জা। নির্বাচনের এক সপ্তাহ পর ৮ অক্টোবর বিএনপি জোটের নেতা ও সমর্থক মিলে দেড় শতাধিক মানুষ লাঠিসোটা নিয়ে সন্ধ্যার পর আকস্মিক হামলা চালায় পূর্ণিমাদের বাড়িতে। ১৫-২০ যুবক বাড়ি থেকে পূর্ণিমাকে জোর করে তুলে পাশের মাঠে নিয়ে যায়। এখানে তার ওপর চালানো হয় নিষ্ঠুর নির্যাতন। আক্রমণকারীরা পূর্ণিমার বাবা, মা, ভাইবোনদের বেধড়ক পেটায়। পূর্ণিমার মায়ের ডান হাত ভেঙে যায়। গুরুতর আহত হন তার বাবা অনিল শীল, মেঝো বোন গীতা রানী শীল, ভাই গোপাল চন্দ্র শীল ও অর্জুন শীল। সন্ত্রাসীরা লুটপাট চালায় তাদের বাড়িতে। ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় তাদের বাড়ি।

পূর্ণিমা শীল জানান, ওই সময় উল্লাপাড়া থানায় কর্মরত উপ-পরিদর্শক মো. ইকবাল মাঠ থেকে তাকে উদ্ধার করেন। পরে মুক্তিযোদ্ধা খোরশেদ আলম তাকে কোলে করে নিয়ে বাড়ির পাশের রাস্তায় ভ্যানে তোলেন। উল্লাপাড়া থানায় মামলা দেওয়ার ব্যাপারে আব্দুল লতিফ মির্জার সঙ্গে সাবেক সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম শফি, সিরাজগঞ্জের সাংবাদিক আমিনুল ইসলাম চৌধুরী, উল্লাপাড়া হিন্দু ধর্মীয় নেতা গৌতম কুমার দত্তসহ অনেকেই তাদের সাহায্য করেন। আমিনুল ইসলাম চৌধুরী উল্লাপাড়া ২০ শয্যা হাসপাতাল থেকে ডাক্তারি পরীক্ষার জন্য তাকে সিরাজগঞ্জ সদর হাসপাতালে নিয়ে যান। পূর্ণিমা তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। ওই সময় পূর্ণিমার বাবা অনিল চন্দ্র শীল বাদী হয়ে উল্লাপাড়া থানায় ১০ অক্টোবর মোট ১৬ জনের বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও লুটপাটের মামলা দায়ের করেন। পূর্ণিমা রানী জানান, সে সময় চরম নিরাপত্তাহীনতায় তাদের পরিবারের সবাইকে গ্রামের বাড়ি থেকে উল্লাপাড়ার শ্যামলীপাড়ায় একটি ভাড়া বাসায় নিয়ে আসা হয়। তার বর্তমান অবস্থার উত্তরণে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির ভূমিকার কথা স্মরণ করেন কৃতজ্ঞচিত্তে। এই কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ওয়াহিদুল হক তার ওপর নির্যাতনের ক'দিন পরেই তাকে দেখতে ঢাকা থেকে উল্লাপাড়ায় আসেন। পূর্ণিমা একটু সুস্থ হলে তাকে ঢাকায় নিয়ে যান তারা। এর পর শাহরিয়ার কবিরের উদ্যোগে পূর্ণিমা ও তার পরিবারের ওপর অমানুষিক নির্যাতনের কাহিনী দেশ-বিদেশের বিভিন্ন সংবাদপত্র ও টিভি চ্যানেলে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়।

পূর্ণিমা তার অতীত ও বর্তমান কাহিনীর বিবরণ দিতে গিয়ে দেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তার পরিবারের চরম দুর্দিন ও অসহায় অবস্থায় তাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী উল্লাপাড়ার আদর্শগ্রামে তাদের বসবাসের জন্য পাঁচ শতক জমি দিয়েছেন। ঘর তুলে দিয়েছেন। তাকে একটি বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি দিয়েছেন। তার ভাই গোপাল চন্দ্র শীলকে বাংলাদেশ টেলিভিশনে একটি চাকরির ব্যবস্থা করেছেন। লেখাপড়া করার সুযোগ করে দিয়েছেন পূর্ণিমার। তিনি প্রধানমন্ত্রীর এ অবদানের কথা কোনোদিন ভুলবেন না।

গত ২৬ মে পূর্ণিমাদের আদর্শ গ্রামের ওই বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, সরকারের দেওয়া টিনের ঘরের পাশে একটি একতলা ভবন। পূর্ণিমার মা বাসনা রানী শীল তার দুই ছেলে, ছেলে বউ ও নাতি-নাতনি নিয়ে এই বাড়িতে এখন বসবাস করেন। বাসনা রানী জানালেন, তার স্বামীর মৃত্যুর পর সংসার পরিচালনার ভার তার ওপর এসে পড়ে। তিনি পূর্বদেলুয়া গ্রামে তাদের মূল বসতভিটা বিক্রি করে দিয়ে আদর্শগ্রামে একতলা ভবনটি করেছেন। তার একটি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ছেলে রয়েছে। ২০০১ সালের ঘটনার পর প্রতিপক্ষের লোকজন রাখাল চন্দ্র শীল নামের তার এই ছেলেটিকে রাস্তায় চরম মারধর করে। এ সময় তার দুই চোখেও আঘাত করা হয়। শেষ পর্যন্ত অন্ধ হয়ে যায় সে। এই ছেলেটিকে নিয়ে বৃদ্ধ বয়সে তিনি খুব সমস্যায় রয়েছেন। শেষ পর্যন্ত অন্ধ এই ছেলেটির কী হবে এটা ভেবে তিনি আকুল।

পূর্ণিমা তখন বাড়িতে ছিলেন না। পরে তার সঙ্গে আলাপ হলে বলেন, জোট সরকারের সময় তার বাবার করা মামলা নিয়ে পুলিশ টালবাহানা শুরু করেছিল। ফলে ২০০১ সালেরই ২৪ অক্টোবর পূর্ণিমা রানী শীল ১৬ জনকে আসামি করে সিরাজগঞ্জ জেলা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আদালতে আবারও মামলা দায়ের করেন। ওই মামলায় পুলিশ ২০০২ সালের ৯ মে ১৭ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দায়ের করে। পরে আদালত ওই অভিযোগপত্র আমলে না নিয়ে আবারও চার্জশিট দেওয়ার নির্দেশ দেন। এই নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ দ্বিতীয় দফায় ১১ জনকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট দেয়। আদালতের ২০১১ সালের ৪ মে অভিযুক্ত ১১ জনকে দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। সে সঙ্গে এক লাখ টাকা করে জরিমানা, অনাদায়ে আরও এক বছর করে সাজা দেন। তাদের মধ্যে ছয় জন রয়েছেন জেলে।

পূর্ণিমা মামলার রায়ে সন্তুষ্ট হতে পারেননি। তিনি বলেন, মামলার রায়ে সবার না হলেও অন্তত ১ ও ২ নম্বর আসামি তার গ্রামেরই বাসিন্দা আলতাব হোসেন ও আব্দুল জলিলের ফাঁসি দেওয়া উচিত ছিল। রায় ঘোষণার পর আসামি পক্ষ রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করেন এবং আপিলের পর সাজাপ্রাপ্তদের চার জনের জামিন হয়ে যায়। এতে আবারও নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়েন পূর্ণিমা ও তার পরিবার। পরে অ্যাটর্নর্ি জেনারেল মাহবুবে আলমের আন্তরিক সহযোগিতায় জামিন বাতিল হয় এবং তাদের নতুন করে গ্রেফতার করে পুলিশ।

পূর্ণিমার এগিয়ে যাওয়া নিয়ে তার গ্রামের ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য বাবলু রায় জানান, পূর্ণিমা ছোটবেলা থেকেই প্রতিবাদী মেয়ে। সে হাজারো নির্যাতন সয়ে আবারও ঘুরে দাঁড়িয়েছে সত্যের পথে। পূর্ণিমা রানীর মামলায় তিনি এবং তার গ্রামের সাধন কুমার সাক্ষী ছিলেন। সাক্ষী হওয়ার কারণে প্রতিপক্ষ তাদের বাড়ি ভাংচুর করে এবং আগুন ধরিয়ে দেয়। প্রাণের ভয়ে তারা দু'জনই দু'বছরের বেশি সময় অন্যত্র পালিয়ে ছিলেন।

চরম দুর্দিনে পূর্ণিমার পাশে দাঁড়ানো উল্লাপাড়া মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার খোরশেদ আলম বলেন, সংগ্রামী চেতনায় উদ্বুদ্ধ পূর্ণিমা উল্লাপাড়ার গৌরব। একজন নারী হিসেবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে সে। পূর্ণিমা একদিন নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে অনেক বড় হবে।







« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: info@iportbd.com, বার্তা বিভাগ: newsiport@gmail.com