Monday, 18 November, 2019, 7:24 AM
Home জাতীয়
শিশুর জন্য বিনিয়োগ বাড়ান
স.ম. শামসুল আলম লিখেছেন ইত্তেফাকে
Published : Wednesday, 31 May, 2017 at 2:52 PM, Count : 0
শিশুদের মনোজগতে প্রবেশ করা বড়দের জন্য একটি দুরূহ কাজ। যারা শিশুদের নিয়ে কাজ করেন বা শিশুর বিকাশে গবেষণা করেন তারা বিষয়টি কিছুটা অনুধাবন করতে পারেন। এটা অজ্ঞতার ব্যাপার নয়, অভিজ্ঞতার ব্যাপার। এই অভিজ্ঞতা নিজের জ্ঞান দিয়েও অনেক সময় উপলব্ধি করা সম্ভব হয় না। কারণ আমরা যখন শিশু ছিলাম তখন আমাদের মনে কী কী বিষয় উপেক্ষার ছিল বা কী কী বিষয় গ্রহণের ক্ষমতা ছিল তা অনুভব করা এখন কষ্টসাধ্য ব্যাপার। বাঁশের সাঁকোর ওপর চড়ে আমরা পানিতে ঝাঁপ দিয়ে পড়েছি, স্রোতে ভেসেছি, উজানে সাঁতার কেটেছি, ডুব দিয়ে মাটি ছুঁয়েছি। আবার ডাঙায় উঠে রোদে শরীর শুকিয়েছি। কিন্তু আমাদের সন্তানদের ক্ষেত্রে একটা দৌড় পর্যন্ত দেওয়াতে চাই না ঘেমে যাওয়ার ভয়ে। এইসব ছোট-খাট ব্যাপারে সতর্ক নই বলে অনেক বড় ব্যাপার ঘটে যাচ্ছে। নেটের কল্যাণে শিশুদের কাছে পৃথিবী হাতের মুঠোয় এসে গেছে। জাতিসংঘের নিয়মানুযায়ী ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত শিশু ধরা হলে এই শিশুরা ফেসবুক-ইউটিউব ইত্যাদি ব্যবহার করছে এবং ঋণাত্মক বিষয়গুলোই তাদের মস্তিষ্কে অধিক অনুপ্রবেশ করছে। কোনো কোনো শিশু মাদকাসক্তের পাশাপাশি নানা অপরাধকর্মেও জড়িত হয়ে পড়ছে। নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্ত বলে কথা নেই— অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে সকল স্তরের সকল শ্রেণির শিশুরাই কিছু অংশ পথভ্রষ্ট হয়ে পড়ছে। এই সামান্য অংশ শিশুরাই বড় হয়ে সমাজের জন্য খুব ক্ষতিকর একটি গোষ্ঠীতে পরিণত হচ্ছে। এইসব শিশুকে সঠিক পথ দেখানো আমাদের নৈতিক ও সামাজিক দায়িত্ব। সেটা ব্যক্তি পর্যায়ে হতে পারে, সাংগঠনিকভাবে হতে পারে বা সরকারিভাবে হতে পারে।

শিশুর সামনে একটি আলোর দুয়ার খুলে দিতে পারেন মা-বাবা, প্রশস্ত দরজা খুলে দিতে পারেন শিক্ষক, সুন্দর পথের দরজা খুলে দিতে পারেন সমাজের যে-কেউ। পাশাপাশি, রাষ্ট্র নিতে পারে সকল শিশুর জন্য একটি মহাপরিকল্পনা। কিন্তু আমাদের দেশে সবচেয়ে অবহেলিত আছে শিশুর বিকাশে অবদান রাখার বিষয়টি।

গত বাজেটে শিশু বাজেট হিসেবে ১০০ কোটি টাকা থোক বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল যার অনেকাংশই খরচ করা হয়নি। শিশুর শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও জীবনমান উন্নয়নে বরাদ্দকৃত এই ১০০ কোটি টাকা নাকি পরিকল্পনার অভাবে ব্যয় করা সম্ভব হয়নি। এটা আমাদের কাছে বিব্রতকর মনে হয়েছে, দুর্ভাগ্যজনক মনে হয়েছে। তার আগে ২০১৪-১৫ অর্থ বছরে ৬০ কোটি টাকা বরাদ্দ করে চারটি মন্ত্রণালয়কে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সে টাকাও ব্যয় করা হয়নি। এবার মন্ত্রণালয় সংখ্যা বাড়িয়ে সাতটি করা হয়েছে অথচ কোনো মন্ত্রণালয়ই কোনো পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারেনি। পরিকল্পনা গ্রহণ না করার কারণে নাকি বরাদ্দকৃত অর্থ কোনো কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি। আমাদের কাছে মনে হয়েছে শিশুদের প্রতি দায়বদ্ধতার প্রশ্নে মন্ত্রণালয়গুলো উদাসীন। এই আমলাতান্ত্রিক উদাসীনতা থেকে পরিত্রাণ জরুরি। এমতাবস্থায় যে বিষয়টি দাঁড়াল তা হলো গত দুটি বছর বাজেটে থাকা সত্ত্বেও শিশুরা তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা থেকে বঞ্চিত হলো। এই বঞ্চিত হওয়ার বিষয়টির অবসান জরুরি। সেই সঙ্গে নতুন বাজেটে শিশুদের জন্য অধিক অর্থ বরাদ্দ কামনা করছি এবং সেই অর্থ যাতে যথাযথ ব্যবহার হয় তাও নিশ্চিত করার তাগিদ দিচ্ছি। প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নেওয়ার ব্যাপারে সচেষ্ট হতে অনুরোধ করছি। আমরা জানি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও শিশুদেরকে অত্যধিক ভালোবাসেন। সুতরাং, আসছে অর্থবছরে শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ হবে এ আশা করতেই পারি।

শুধু সরকারি বাজেটের অর্থে দেশের সকল শিশুকে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব নয়। প্রয়োজন শিশুর প্রতি সকলের সদয় হওয়া। যেমন বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স এতিম শিশুদেরকে উড়োজাহাজে চড়ে আকাশে ওড়ার আনন্দ দিয়েছে। নিশ্চয়ই এই শিশুদের মনে নতুন জগত্ সৃষ্টি হয়েছে। কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো পাঁচ বছরের একটি মেয়ে বেলা থমপসনকে নিয়ে একটা দিন কাটিয়েছেন অর্থাত্ একদিনের জন্য মেয়েটিকে প্রধানমন্ত্রী বানিয়েছেন। নিশ্চয়ই এই মেয়েটির মনে নতুন স্বপ্নের বীজ বপন করা হয়েছে এবং এমন হাজারো শিশু সেই স্বপ্নে বিভোর থাকবে।  সমাজের বিত্তবান ব্যক্তিবর্গ বা ব্যবসায়ীরা যদি শিশুদের কল্যাণে এগিয়ে আসেন তাহলে আমাদের দেশ আগামীতে সুনাগরিকে ভরে উঠবে। শিশুদের জন্য বই প্রকাশ করে শিশুদের হাতে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা, শিশুদের জন্য চলচ্চিত্র বা নাটক নির্মাণ করে তা প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা, এনিমেশন-কার্টুন-তথ্যচিত্র ইত্যাদি তৈরি করে তা প্রচারের ব্যবস্থা করা জরুরি। এসবই শিশুর বিকাশে সহায়ক ভূমিকা রাখবে। পড়ালেখার পাশাপাশি তারা এসব বিষয় নিয়ে মশগুল থাকলে বিপথে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকবে না। কেউ হয়ত শিশুপার্ক গড়ে দিলেন যেখানে  নিম্নবিত্তের শিশুরা বিনামূল্যে পার্কে ঘোরা বা রাইডে চড়ার সুযোগ পেল। কেউ হয়ত একটি শিশু হাসপাতাল গড়ে দিলেন যেখানে শিশুদের বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ থাকবে। কেউ হয়ত স্কুল প্রতিষ্ঠা করে দিলেন যেখানে গরিব শিশুদের বিনামূল্যে লেখাপড়ার সুযোগ থাকল। আমাদের শিশুরাজ্য সমৃদ্ধ হলে দেশ সমৃদ্ধ হবে। আসুন সকলেই শিশুদের জন্য ভাবি।

লেখক :শিশু সাহিত্যিক ও শিশু সংগঠক





« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: [email protected], বার্তা বিভাগ: [email protected]