Friday, 19 January, 2018, 7:24 PM
Home জাতীয়
বাংলাদেশ পুলিশের সক্ষমতা ও জনপ্রত্যাশা
ড. এম এ সোবহান
Published : Monday, 29 May, 2017 at 3:49 PM, Count : 0

এ দেশের পুলিশ শত বছরের পুরনো এক বাহিনী। যার সৃষ্টি ব্রিটিশ কলোনিয়াল শাসন আমলে। যদিও বলা হয়ে থাকে এদেশের পুলিশ ব্রিটিশ আমলের আইন, রেগুলেশনস ও কর্মপদ্ধতি নিয়ে কাজ করছে। কিন্তু বাস্তবিক অর্থে বাংলাদেশ পুলিশ বর্তমানে অনেক অত্যাধুনিক প্রযুক্তি, কৌশল ও তথ্য ব্যবহার করছে এবং অসামান্য সাফল্য, যোগ্যতা, সক্ষমতা ও বিরল গুণাবলি প্রদর্শন করে চলেছে। সাম্প্রতিক সময়ের সাফল্য বিশেষ করে জঙ্গি-বিরোধী অভিযান ও বনানীর রেপ কেইসের আসামি ধরা পুলিশের বিরাট সাফল্য। এটা বাংলাদেশ পুলিশের সক্ষমতা প্রকাশ করে। কিন্তু জনগণের প্রত্যাশা পুলিশের কাছে অনেক বেশি। এখনও পুলিশ সম্পর্কে মিথ আছে: “পুলিশ সব পারে”। আসলে পুলিশ সব পারে না। তবে জনসাধারণ যদি সহায়তা করে, তাহলে পুলিশ অনেক কাজই করতে পারে। এজন্য পুলিশকে আরো বেশি কমিটেড হতে হয়। হতে হয় আরো বেশি জনসম্পৃক্ত।

বাংলাদেশ পুলিশের ভালো দিক হলো এখানে বিভিন্ন ব্যাকগ্রাউন্ডের অফিসার আছে। যেমন- কেউ আসে জীববিজ্ঞান, কেউ বিশুদ্ধ বিজ্ঞান আবার অনেকে সমাজবিজ্ঞান, আইন, অর্থনীতি ও ইতিহাস থেকে। এমনকি অনেক প্রকৌশলী ও ডাক্তারও আছে। যার ফলে এখানে মিশ্র জ্ঞান ও তথ্যের সমন্বয় হয়। এছাড়া বাংলাদেশ পুলিশের আছে তিনটি এন্ট্রি। প্রথমত কনস্টেবল, দ্বিতীয়ত. সাব ইন্সপেক্টর/সার্জেন্ট ও সর্বশেষটি হলো এএসপি; যারা বিসিএস কর্মকর্তা। কনস্টেবল ও সাব-ইন্সপেক্টর/সার্জেন্ট দিয়ে যারা চাকরি শুরু করে তারা দীর্ঘদিন ফিল্ডে চাকরি করার সুবাদে এক বিশাল অভিজ্ঞতার অধিকারী হয়। এএসপি যদিও নতুন কর্মকর্তা; কিন্তু তাদের থাকে সর্বশেষ ও আধুনিক লেখাপড়া ও প্রযুক্তির সঙ্গে যোগাযোগ। এতদভিন্ন পুলিশ একাডেমির কারিকুলামও বেশ সমৃদ্ধ। মাঠের প্রশিক্ষণের পাশাপাশি অপরাধবিজ্ঞান, আইন-কানুন, মানবাধিকার, মেডিক্যাল জুরিসপ্রুডেন্স, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, দাঙ্গা দমন, জনতা ব্যবস্থাপনা প্রভৃতি বিষয় পড়ানো হয়। সারদা পুলিশ একাডেমিতে শারীরিক প্রশিক্ষণের সঙ্গে অন্যান্য একাডেমিক বিষয়ে শিক্ষণে এক একজন প্রশিক্ষণার্থী হয়ে উঠে বিজ্ঞ, আত্মবিশ্বাসী ও গতিশীল। তাছাড়া রয়েছে জেলা ও থানা পর্যায় থেকে বাস্তব প্রশিক্ষণ। যার ফলে দু’ধরনের পুলিশ সদস্যদের অভিজ্ঞতা, আধুনিক লেখাপড়া ও প্রযুক্তির সমন্বয়ে এক অসাধারণ যোগ্যতা, জ্ঞান, কর্মকৌশল ও কর্মদক্ষতা তৈরি হয়। এরূপ সমন্বয় ও সম্মিলিত প্রয়াসের কারণে বাংলাদেশ পুলিশের আজকের এ সফলতা।

আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ ও সমাজে শান্তি আনয়নে ডিটেকশন, কনভিকশন, ইন্টারএ্যাকশন, প্রিভেনটিভ পেট্রোল, ক্লোজ মনিটরিং ও জনবান্ধবতার গুরুত্ব অপরিসীম। ডিটেকশনে বর্তমানে জনসহায়তার পাশাপাশি প্রযুক্তির ব্যবহার করা হচ্ছে। এসবের সমন্বয়ে দ্রুতসময়ে আসামি ধরা ও মামলার ঘটনা উদঘাটন করা যাচ্ছে। বাংলাদেশ পুলিশ যে জনসম্পৃক্ত ও প্রযুক্তির ব্যবহারে দক্ষ ইতোমধ্যে বিভিন্ন ঘটনা ডিটেকশনে (উদঘাটনে) তার প্রমাণ পাওয়া গেছে।  এছাড়া বাংলাদেশ পুলিশের রয়েছে মিথস্ক্রিয়া (ইন্টারএ্যাকশন) করার এক বিরল যোগ্যতা। জাতিসংঘে বাংলাদেশ পুলিশের এতো জনপ্রিয়তার মূলে রয়েছে এ ইন্টারএ্যাকশন ক্ষমতা। একসময় ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ডিবির ডাকাত প্রতিরোধ টিমের দায়িত্বে ছিলাম। শেওড়াপাড়া, মিরপুরে একটি ডাকাতির ঘটনাস্থলে গেলাম। বাড়িটিতে ঢুকলাম। বাড়িওয়ালার ড্রইংরুমে ঢুকে দেখি দুই ব্যক্তি ভাত খাচ্ছে। আমি আমার পরিচয় দেয়ার পর ভাত খাওয়া থেকে বিরত হয়ে একজন উঠে দাঁড়ান এবং এটেনশন হন। আমি একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেলাম এবং বললাম আপনি কে ? উনি বললেন- আমি সাব-ইন্সপেক্টর। মামলা দেখতে এসেছি। এত দ্রুত একজন পুলিশ কর্মকর্তা কী করে মালিকের সঙ্গে সম্পর্ক করে ভাত খেতে পারে তা আমার বোধগম্য হয় না। পরে জানতে পারলাম আমার পূর্বেই ঐ সাব-ইন্সপেক্টর ডাকাতি মামলা ডিটেকশন করে ফেলেছে। এক্ষেত্রে মিথস্ক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

অপরাধীরা মূলত ভিতু প্রকৃতির হয়ে থাকে। অনেকে বলে থাকেন, অবৈধ অস্ত্রধারী মানসিকভাবে দুর্বল থাকে। তাইতো দেখা যায়, টহলরত পুলিশ দেখলে সন্ত্রাসীরা দৌড়ে পালায়। পুলিশ পেট্রোল অপরাধ সংগঠনে ও জনগণের বিশ্বাস এবং আস্থা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে। পুলিশ পেট্রোল ও নজরদারি বাড়ালে আইন-শৃঙ্খলা উন্নয়নে ভালো ভূমিকা রাখে। ক্লোজ মনিটরিং বা অপরাধীর উপর নিবিড় নজরদারি অপরাধ দমনে ভালো ফল নিয়ে আসে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের থানার সংখ্যা বৃদ্ধি এবং বিট পুলিশিং-এর মাধ্যমে মানুষের আরো কাছাকাছি যাওয়া ও ক্লোজ মনিটরিং করা হচ্ছে।

প্রায় একযুগ পূর্বে মালয়েশিয়াতে পুলিশ স্টাফ কলেজে একটা কোর্সে গিয়েছিলাম। সেখানে মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদের অর্থ উপদেষ্টা আমাদের একটা ক্লাস নিয়েছিলেন। ক্লাসে তিনি বলেছিলেন মানুষ পুলিশের কাছ থেকে দ্রুততম সময়ে ঘটনাস্থলে যাওয়া, আসামি ধরা, ভিকটিমকে সাপোর্ট দেয়া, মানুষকে সম্মান করা, নিরপেক্ষতা এবং জনগণের পাশে দাঁড়ানো আশা করে। এটা সত্য যে, বাংলাদেশ পুলিশের সদস্যরা দিন দিন জনবান্ধব হচ্ছে।

পুলিশকে তার প্রতি জনগণের যে প্রত্যাশা তা পূরণ করতে হবে। সেবামূলক মানসিকতা নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। নিজেদের  আরো সক্ষম করে গড়ে তুলতে হবে। বর্তমান পুলিশের কাজে প্রযুক্তির প্রয়োগ হচ্ছে। হচ্ছে ইনফরমেশন বেইজড পুলিশিং। বাংলাদেশে অনেক বিশেষায়িত ইউনিট হয়েছে। আরো বিশেষায়িত ইউনিট ও প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। প্রযুক্তির পাশাপাশি চলমান কার্যকর মৌলিক পদ্ধতি এবং জনগণকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করলে অপরাধ ও অপরাধী দমনে আশানুরূপ ফল পাওয়া যাবে। তাহলেই টেকসই আইন-শৃঙ্খলার উন্নয়ন, নিজেদের ভাবমূর্তি উন্নয়ন ও জন প্রত্যাশা পূরণ করা সম্ভব হবে।

লেখক :অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, স্পেশাল সিকিউরিটি অ্যান্ড প্রটেকশন ব্যাটালিয়ন-১, বাংলাদেশ পুলিশ





« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: info@iportbd.com, বার্তা বিভাগ: newsiport@gmail.com