Saturday, 24 June, 2017, 2:42 PM
Home আন্তর্জাতিক
আরব বসন্ত যখন পশ্চিমা বিশ্বকে ছুঁয়ে যায়
শিবলী নোমান লিখেছেন ইত্তফাকে
Published : Monday, 29 May, 2017 at 3:45 PM, Count : 0

 ২ ০১০ সালের ১৮ ডিসেম্বর তিউনিসিয়ার তরুণ ফল বিক্রেতা মোয়াম্মের বাউজ্জি নিজের শরীরে আগুন ধরিয়ে আত্মহত্যা করেন। এর মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্য তথা আরব বিশ্বে যে আগুন ছড়িয়ে পড়ে তার জনপ্রিয় নাম ‘আরব বসন্ত’। অর্থাত্ আরব বসন্ত নামেই এই আগুন তথা আন্দোলনের সাথে আমরা পরিচিত হয়েছি বা আমাদের পরিচিত করা হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে মূলত দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে এবং সাধারণ মানুষের ক্ষমতায়ন, জনপ্রিয় ভাষায় যাকে আমরা গণতন্ত্র বলে থাকি তার আশায় বা কামনায় গড়ে ওঠা স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনকে পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমগুলোই পরিচিত করে তুলে আরব বসন্ত নামক চমকপ্রদ একটি নাম দিয়ে। মূলত ১৯৬৮ সালে সাবেক চেকোস্লোভাকিয়ার রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংস্কার ও উদারীকরণের আন্দোলন ‘প্রাগ স্প্রিং’ বা প্রাগ বসন্তের অনুকরণেই আরব অঞ্চলে গড়ে ওঠা আন্দোলনের নাম দেয়া হয় ‘আরব স্প্রিং’ বা আরব বসন্ত।

আরব বসন্ত একে একে ছুঁয়ে গিয়েছে তিউনিসিয়া, মিশর, লিবিয়া, সিরিয়া, লেবানন, বাহরাইন, সৌদি আরব, ইয়েমেনসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রকে। দীর্ঘদিন পর ক্ষমতার মসনদ ছাড়তে হয়েছে জাইন এল আবেদীন বেন আলী, হোসনি মুবারক, মোয়াম্মার গাদ্দাফির মতো রাষ্ট্রনায়ক কিংবা স্বৈরশাসকদের। ক্ষমতার চূড়া থেকে স্বৈরশাসকদের ছুঁড়ে ফেলে দিতে সক্ষম হয়েছে আরব বসন্ত নিশ্চিতভাবেই। কিন্তু পেরেছে কি সাধারণ মানুষকে ক্ষমতায়িত করতে? এর উত্তর একটাই, না, পারেনি। মিশরে আরব বসন্তের ফলাফল প্রথমে গিলে খেয়েছে মুসলিম ব্রাদারহুড, এখন গিলে খাচ্ছে জেনারেল আবদেল ফাতাহ আল সিসি তথা সেনাবাহিনী; কর্নেল গাদ্দাফির অধীনে একত্রিত থাকা লিবিয়া এখন শত শত গোষ্ঠী-উপগোষ্ঠীর ক্ষমতার লড়াইয়ের এক উন্মুক্ত রণক্ষেত্র। অন্যদিকে সিরিয়ায় বাশার আল আসাদের পক্ষে রাশিয়া ও বিপক্ষে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অবস্থান গ্রহণ করে সিরিয়াকে পরিণত করেছে একবিংশ শতাব্দীর প্রক্সিযুদ্ধের ময়দান হিসেবে।

জাতিসংঘ বলছে ইরাকের মতো লিবিয়াও ধ্বংসের পথে এগুচ্ছে। ইয়েমেনে গৃহযুদ্ধ বর্তমান পরিস্থিতির মতো অব্যাহত থাকলে অচিরেই সেখানে শুরু হবে দুর্ভিক্ষ। আর আগামীকাল থেকে সিরিয়ায় পুনর্গঠনের কাজ শুরু হলে অন্তত ৩০ বছর সময় লাগবে সিরিয়াকে ২০১১ সালের অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে যেতে।

এসব তো গেলো ধ্বংসের পরিসংখ্যান। মানবসম্পদহানির পরিসংখ্যান এর চেয়ে মর্মান্তিক ও ভয়াবহ হবে তা বলাই বাহুল্য। তার চেয়ে আসুন দুইটি শিশুকে মনে করি। ২০১৫ সালে ভূমধ্যসাগরের তীরে পড়েছিল তিন বছর বয়সী সিরিয়ান শিশু আয়লান কুর্দির মৃতদেহ। আর গতবছর বোমার আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়ে অবাক নয়নে নিষ্পলক দৃষ্টিতে  আমাদের দিকে তাকিয়েছিল পাঁচ বছর বয়সী সিরিয়ান শিশু ওমরান দাকনিশ।

এক কথায় যদি আয়লান কুর্দি বা ওমরান দাকনিশের পরিণতির জন্যে কাউকে দায়ী করতে হয় তখন হয়ত সবার আগেই আসে ইসলামিক স্টেট বা আইএস-এর নাম। কিন্তু এক কথায় সব উত্তর দেয়া যায় না। কারণ গতবছর প্রকাশিত চিলকট রিপোর্টের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে যে ২০০৩ সালে ইঙ্গ-মার্কিন জোটের ইরাক আক্রমণ ছিল যুদ্ধাপরাধ। খুব সহজেই যুদ্ধ এড়িয়ে অন্য কোনোভাবে সেই সময়ে বিদ্যমান সমস্যার সমাধানে পৌঁছানো যেতো। কিন্তু পশ্চিমা রাষ্ট্রপ্রধানরা বা বিশ্বনেতারা বেছে নিয়েছিলেন একটি যুদ্ধকে। কথিত আছে গণবিধ্বংসী অস্ত্রের হুজুগ তুলে ইরাকের বিপুল তেল সম্পদ হস্তগত করাই ছিল এই অন্যায় যুদ্ধের গোপন নীতিগত কারণ। সিরিয়ার উপর যুদ্ধটি চাপিয়ে দেয়া হয়েছে একইভাবে গণবিধ্বংসী অস্ত্রের স্থলে রাসায়নিক অস্ত্রের কথা বলে।

ইঙ্গ-মার্কিন জোটের ইরাক আগ্রাসন ইরাককে শুধুমাত্র ধ্বংসই করেনি, আফগান যুদ্ধের ফলে মার্কিনিদের সহায়তায় বিশ্ব যেমন পেয়েছিল তালেবানদের, ঠিক একইভাবে ইরাক যুদ্ধের ফলাফল হলো ইসলামিক স্টেট। ইরাক দখল করে কিভাবে ক্যাম্প বুকা নামক এক বন্দি শিবিরকে সুন্নি বিদ্রোহীদের আদর্শিক প্রশিক্ষণস্থলে পরিণত করা হয়েছিল তা আজ সবাই জানে। সবাই জানে কিভাবে তাদেরকে মুক্ত করে দিয়েছিল মার্কিন বাহিনী। আর মার্কিন বাহিনীর হাত থেকে ছাড়া পেয়েই এই ক্যাম্পে আটক থাকা আবু বকর আল বাগদাদী প্রতিষ্ঠা করেন আইএস।

২০১৪ থেকে ইসলামিক স্টেটের উত্থানের ফলে বিশ্বব্যাপী আল-কায়েদার একক জঙ্গি আধিপত্য শেষ হয়। বরং নির্মমতা ও নিষ্ঠুরতা দিয়ে বিশ্বব্যাপী নতুন ত্রাসের জন্ম দেয় আইএস। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো আমাদের প্রাণপ্রিয় বাংলাদেশও মুক্ত থাকতে পারেনি এই অশুভ হাওয়া থেকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মদদপুষ্ট তালেবানরা একসময় পরিণত হয়েছিল ফ্রাঙ্কেনস্টাইনে। এখন নতুন ফ্রাঙ্কেনস্টাইন হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে ইসলামিক স্টেট বা আইএস নামক হুজুগ। আইএস-এর উত্থানের ফলে পশ্চিমা শিক্ষিত মুসলিম সমাজের সদস্যরাও কথিত ইসলামিক রাষ্ট্রে গিয়েছে। অনেকে এর আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে নিজেদের দেশে থেকেই চালাচ্ছে জঙ্গি তত্পরতা। সর্বশেষ গত ২২ মে যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টারের কনসার্টে ভয়াবহ আত্মঘাতী বোমা হামলা কেড়ে নিলো ২২টি তাজা প্রাণ। আরব বসন্ত যখন ম্যানচেস্টারকে ছুঁয়ে যায় তখন রক্তে রঞ্জিত হয়েছে ম্যানচেস্টার, যুক্তরাজ্য এবং বিশ্ব মানবতা।

ম্যানচেস্টারে নিহত ২২ জনের ভিতর অন্তত ১০ জনের বয়স ২০ বছরের নিচে। অন্তত একজন আট বছরের শিশু নিহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গিয়েছে। কিন্তু পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো আয়লান কুর্দি বা ওমরান দাকনিশের ছবির মতো ব্যাপক প্রচারণা করেনি ম্যানচেস্টারে নিহতদের ছবি নিয়ে। করা উচিতও নয়। উচিত ছিল না যেমন আয়লান কুর্দি বা ওমরান দাকনিশের ক্ষেত্রেও। এই প্রচারণার মাধ্যমে আরব বসন্তের ফলাফল হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান নিজেদের কর্মকাণ্ডের প্রতি পশ্চিমা দেশগুলো সাধারণ মানুষের ভিতর এক ধরনের সম্মতি উত্পাদন বা সম্মতি আদায় করে নিচ্ছিলো, যা আদতে তাদের মূল উদ্দেশ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কিন্তু যখন নিজেরা এর দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে তখন আর সম্মতি উত্পাদনের প্রয়োজন হয়নি। কারণ তারা বুঝতে পেরেছে এতদিন ধরে অন্য দেশের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে তাদের কারণেই যে প্রাণহানি হয়েছে তার আঁচ লেগেছে নিজেদের দেশেও, যা ছিল অনাকাঙ্ক্ষিত।

আরব বসন্ত যে বসন্ত ছিল না তা বহু আগেই প্রমাণিত হয়ে গিয়েছে। আরব বসন্তের নামে যা হয়েছে তার ফলাফল হয়েছে মর্মান্তিক, দুঃখজনক ও বিশ্ববিবেকের জন্যে লজ্জাজনক। আজ ম্যানচেস্টার ছাড়াও পশ্চিমা বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে যখন আরব বসন্তের আঁচ লাগছে বা আরব বসন্ত যখন পশ্চিমা বিশ্বকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে তখনো তার পরিণাম ঐ একই, মর্মান্তিক, দুঃখজনক ও বিশ্ববিবেকের জন্যে লজ্জাজনক। কারণ মর্মান্তিকতা, দুঃখ বা বিশ্ববিবেকের প্রতি লজ্জাজনক ঘটনা দেশে দেশে আলাদা হতে পারে না। আরব বসন্ত নামক মর্মান্তিকতার শিকার প্রতিটি মানুষ, তিনি যে দেশেরই হোক না কেন, তার বা তাদের প্রতি জানাই গভীর সমবেদনা।

লেখক :শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়





« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: info@iportbd.com, বার্তা বিভাগ: newsiport@gmail.com