Wednesday, 23 August, 2017, 10:26 AM
Home স্বাস্থ্য
আর্সেনিক ঝুঁকির মুখে দুই কোটি মানুষ
হাসিন জাহান লিখেছেন ইত্তেফাকে
Published : Monday, 29 May, 2017 at 3:42 PM, Count : 0
বাংলাদেশে প্রতি বছর আর্সেনিকের বিষক্রিয়ায় মারা যায় কয়েক হাজার মানুষ। এর সমাধান আমরা জানি। এখন আর্সেনিক আক্রান্ত বা ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের প্রত্যেকে যাতে এই সমাধানগুলি জানতে পারেন তা নিশ্চিত করা দরকার।

আর্সেনিকের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক এই বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত মানুষ বাস করেন বাংলাদেশে। এখানকার দুই কোটিরও বেশি মানুষ আর্সেনিকজনিত দূষিত পানি গ্রহণের ঝুঁকিতে আছেন। প্রাকৃতিকভাবে ভূ-গর্ভস্থ পানিতেই আর্সেনিকের অস্তিত্ব মেলে। বাংলাদেশ, ভারত এবং নেপালের বিভিন্ন অঞ্চলে এই ধরনের পানির সরবরাহ ও ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। বাংলাদেশে আর্সেনিককে স্বাস্থ্যগত সমস্যা হিসেবে প্রথম চিহ্নিত করা হয় ১৯৮৭ সালে। কোনো কোনো অঞ্চলে এই সমস্যা এতটাই প্রকট যে, সেখানকার পানিতে আর্সেনিকের ঘনত্বের মাত্রা প্রতি লিটারে ৫০ মিলিগ্রামেরও বেশি। অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ অনুযায়ী, সুপেয় পানিতে আর্সেনিকের গ্রহণযোগ্য ঘনত্বের মাত্রা প্রতি লিটারে সর্বোচ্চ ১০ মিলিগ্রাম।

প্রতিবছর দেশে প্রায় ৪৩ হাজার মানুষ আর্সেনিকের বিষক্রিয়ায় মারা যায়। এই সমস্যার সমাধানে সরকার বেশকিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। সমস্যাটি নির্দিষ্টভাবে শনাক্ত করতে কিছু নীতিমালাও প্রণয়ন করা হয়েছে। সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি সামাজিক উন্নয়নমূলক প্রতিষ্ঠানও দেশব্যাপী এই নিয়ে পরিচালনা করেন গণসচেতনতামূলক প্রচারাভিযান। কিন্তু তাতেও খুব একটা আশানুরূপ ফল আসেনি। প্রত্যাশিতভাবে গড়ে উঠেনি এই বিষয়ক জ্ঞান ও সচেতনতার মাত্রা। এই সমস্যাটি থেকে কিভাবে সস্তায় এবং কার্যকরীভাবে জীবন রক্ষা করতে হয় তা আমরা জানি। তাই আমাদের এখন যা করা দরকার তা হলো- এই সম্ভাব্য সমাধানগুলো প্রয়োগ করে আক্রান্ত জনগোষ্ঠীকে প্রাণহানি এবং স্বাস্থ্য ঝুঁকির হাত থেকে রক্ষা করা। বিশেষ করে এই সংক্রান্ত কার্যক্রমে নিশ্চিত করতে হবে তাদের কার্যকর অংশগ্রহণ।

আর্সেনিক পানির স্বাদ বা রঙ পরিবর্তন করে না। তাই আমাদের সর্বপ্রথম কাজ হলো—এই বিষয়টি নিয়ে আর্সেনিক ঝুঁকির আওতায় থাকা লোকদের ভালোভাবে বোঝানো। চামড়ায় ক্ষত তৈরি, পেট ফাঁপা, ডায়রিয়া ও রক্ত বমি করা এবং মূত্রথলি, ফুসফুস, ত্বক ও কিডনির ক্যান্সারের মাধ্যমে আর্সেনিক বিষক্রিয়ার উপসর্গগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কিন্তু সঠিকভাবে নির্ণয়ের অভাবে অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে এই বিষের প্রভাব ভোগ করে চলে। আর্সেনিকের প্রভাব তাত্ক্ষণিক নয়, বরং সুদূরপ্রসারী। এই কারণে আর্সেনিক যে স্বাস্থ্যহানিসহ মৃত্যু ঘটাতে পারে, এটা জনগণকে বোঝানো খুব কঠিন হয়ে পড়ে। আমাদের সংস্থায় কর্মরত দেশের দক্ষিণ-পঞ্চিমাঞ্চলের জেলা বাগেরহাটের একটি মেয়ে জানান, আর্সেনিক বিষে আক্রান্তের প্রক্রিয়াটি এতটাই ধীর গতির যে, আক্রান্ত হওয়ার প্রাথমিক পর্যায়ে ব্যক্তি নিজে কিংবা তার আশে-পাশের লোকজন আপাত দৃষ্টিতে তা বুঝে উঠতে পারেন না। আর এই সুযোগেই বিষটি দিনে দিনে হয়ে ওঠে প্রাণঘাতী।

আর্সেনিক বিষক্রিয়ায় আক্রান্তদের অধিকাংশই দরিদ্র জনগোষ্ঠীর। উপসর্গ দৃশ্যমান হওয়াকালীন  কিংবা  চূড়ান্তভাবে আক্রান্ত হওয়ার পরও তাদের চিকিত্সা করানোর মতো অর্থনৈতিক সক্ষমতা থাকে না। তাছাড়া অনেকেরই নিজেদের প্রয়োজনীয় পানি সংগ্রহ করার জন্য পুকুর ও কূপ খনন কিংবা গভীর নলকূপ বসানোর মতো স্ব-মালিকানাধীন কোনো ভূমি নেই। সুতরাং বাধ্য হয়েই তাদেরকে প্রথাগত অগভীর নলকূপ থেকে পানি সংগ্রহ করতে হয়। তাছাড়া তাদের গৃহের ছাদগুলোও এতটা মজবুত বা উপযোগী নয়, যাতে বৃষ্টির পানি ধরে রাখা যায়। আর যারা সচ্ছল ও সচেতন, তারা পানিতে আর্সেনিকের দূষণ এড়াতে খুব একটা সময় নেন না। অপেক্ষা করেন না আক্রান্ত হওয়ার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত। আর্সেনিকমুক্ত নিরাপদ পানির জন্য নিজস্ব জমিতে গভীর নলকূপ স্থাপন করাসহ সম্ভাব্য অন্যান্য সূত্রগুলোরও প্রয়োগ করে থাকেন তারা।

সুতরাং আর্সেনিকের ভয়াল প্রকোপ থেকে রক্ষা পেতে আক্রান্ত এলাকাগুলিতে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করতে বাস্তবায়নযোগ্য পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি হয়ে পড়েছে। এই পদক্ষেপের আওতায় সরেজমিনে গিয়ে আর্সেনিক পরীক্ষার কিট প্রদান করতে হবে। পরীক্ষা করে যেখানে যেখানে আর্সেনিক ধরা পড়বে, সেখানে আর্সেনিক দূরীকরণ পদ্ধতি বা নিরাপদ পানির সংস্থান নিশ্চিত করতে হবে। আর্সেনিক দূরীকরণের ব্যবস্থা হিসেবে সরকারি প্রকল্পের মাধ্যমে চার চেম্বারের আর্সেনিক নিরোধক ফিল্টার প্রদান করতে হবে। তবে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে আর্সেনিক পরীক্ষার কিট সরবরাহে। কেননা, যদি সঠিকভাবে কিট সরবরাহ নিশ্চিত করা না যায়, তবে অনেকেই জানবে না আর্সেনিক নিরোধক ফিল্টারটি তাদের ব্যবহূত পানিকে দূষণমুক্ত করছে কী করছে না।

আর্সেনিক দূরীকরণ ব্যবস্থা সরবরাহকারীদের শুধু পদ্ধতিটি চালু করার মধ্য দিয়েই দায়িত্বের ইতি টানলে চলবে না, আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও পালন করতে হবে। বিশেষ করে ফিল্টারগুলিকে চালু করার পরবর্তী সময়ে তা মেরামত, পরিবর্তন এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ যোগানের মতো বিষয়গুলোও সহজলভ্য করতে হবে। বিশেষ করে লক্ষ্য রাখতে হবে এই ফিল্টারগুলো যাতে সংশ্লিষ্ট এলাকার জনগণের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে থাকে।

আর্সেনিকমুক্ত পানির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হলো বৃষ্টির পানি। কিন্তু বৃষ্টির পানি ধারণ করার উপযুক্ত নিরাপদ সরঞ্জামের অভাবে বলা যায়, পদ্ধতিটি সেভাবে কোনো কাজেই আসে না। তার প্রধান কারণ হলো বৃষ্টির পূর্বে পানি ধারণ করার সরঞ্জামগুলো পরিষ্কার না করার বাস্তবতা। সঙ্গত কারণে এই সব সরঞ্জামে ধারণ করা পানি ব্যবহারে দেখা দেয় পেটের পীড়া, ডায়রিয়াসহ নানান পানিবাহিত রোগ। তাই বৃষ্টির পানি ধারণ করার পূর্বে অবশ্যই ধারণ করার সরঞ্জামগুলো পরিষ্কার করে নিতে হবে।

বৃষ্টির পানি ধারণ করে তা ব্যবহার উপযোগী রাখা নিঃসন্দেহে একটি ঝামেলাপূর্ণ কাজ। এজন্য অধিকাংশ মানুষই তা এড়িয়ে চলেন। নির্ভর করেন ভূগর্ভস্থ পানির উপর। তাই জেলা-উপজেলা পর্যায়ে তো বটে; পাশাপাশি বিনামূল্যে পানির আর্সেনিক পরীক্ষা করার ব্যবস্থা রাখতে হবে স্থানীয় বিজ্ঞানাগারগুলোতেও। বিশেষ করে স্থানীয় বিজ্ঞান ক্লাব, মাধ্যমিক স্কুল ও কলেজের ল্যাবরেটরিগুলোতে এই সুবিধা রাখতে হবে। এতে আর্সেনিক নিয়ে তৃণমূল পর্যায়ে যেমন জনসচেতনতা বাড়বে, তেমনি আর্সেনিকযুক্ত পানি গ্রহণ করার প্রবণতাও কমে যাবে অনেকাংশে।

আর্সেনিক বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তির কাজ করার সামর্থ্য কমে যায় বহুলাংশে, ফলে হ্রাস পায় তাদের প্রাত্যহিক আয়। এতে পরিবারগুলোও ধীরে ধীরে পৌঁছে যায় দরিদ্রতার সবচেয়ে প্রান্তিক পর্যায়ে। তখন তাদের জন্য শুধু নিরাপদ পানির ব্যবস্থা করাই যথেষ্ট বলে বিবেচিত হয় না; উপযুক্ত চিকিত্সা ব্যয়ও জরুরি হয়ে পড়ে। তাই আর্সেনিক সমস্যার সমাধান যেহেতু আছে, সেহেতু এই নিয়ে অহেতুক কালক্ষেপণ করে দেশের দুই কোটি মানুষকে আরো ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া উচিত হবে না কোনোভাবেই।

দ্য গার্ডিয়ান থেকে অনুবাদ: মো. সহিদুল ইসলাম

লেখক :কান্ট্রি ডিরেক্টর, প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশন বাংলাদেশ





« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: info@iportbd.com, বার্তা বিভাগ: newsiport@gmail.com