Friday, 19 January, 2018, 7:27 PM
Home জাতীয়
‘বাজেট কখনো জাগায় আশা, কখনো নিরাশা’
ড. শামসুল আলম লিখেছেন ইত্তেফাকে
Published : Monday, 29 May, 2017 at 3:37 PM, Update: 29.05.2017 3:56:52 PM, Count : 2

উপরের শিরোনাম একটি বেসরকারি টিভির এক উপস্থাপিকার। উপস্থাপিকা এভাবেই বাজেট আলোচনা শুরু করেছিলেন গত ২৫ মে রাতে বাজেট পর্যালোচনা বিষয়ক ‘টক-শো’ কথামালায়। একটা সময় ছিল বাজেট ঘোষণার পূর্বে একট চাপা আতঙ্ক নাগরিক সমাজের বিশেষভাবে স্বল্পবিত্ত, নিম্নবিত্ত ও ব্যবসায়ী শ্রেণি সকলের মধ্যেই সংক্রমিত হতো। উপস্থাপিকার উদ্বোধনী বাক্যে মুহূর্তের জন্য হলেও আমি হতচকিত হয়েছিলাম, আসলে বাজেটে নিরাশার অংশ কোনটি খুঁজতে চেষ্টা করছিলাম।

বাজেট অবধারিত বাত্সরিক আয়-ব্যয়ের বর্ণনা। বরাদ্দ প্রক্ষেপণ এবং জনগণের করের টাকায় সরকার পরিচালিত হয় বিধায় সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতায় জনপ্রতিনিধিদের দ্বারা সকল বরাদ্দ পাস করিয়ে নিতে হয়। সেই পাস করিয়ে নেবার প্রক্রিয়ায় তা সংসদে পেশ করা হয় এবং ৩০ জুনের মধ্যে তা সংসদ অনুমোদন করে। বাজেটের ব্যয় নিয়ে মতামত থাকতে পারে, বিশেষভাবে উন্নয়ন ব্যয়। ব্যয়ের আরেক দিক হলো রাজস্ব ব্যয় বা পৌনঃপুনিক ব্যয়। আমলাতন্ত্র বা শাসনকাঠামো রক্ষায় ব্যয় করতে হয়। উন্নয়ন ব্যয়ের ১৭টি খাত নির্ধারণ করেছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়। সকল বাস্তবায়নকারী মন্ত্রণালয় এই ১৭টি খাতের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। সংসদে মূল বাজেট যখন পেশ করা হয় তখন তা ১৪টি খাতে বরাদ্দ বণ্টন দেখানো হয়। শিক্ষাখাতে তিনটি মন্ত্রণালয়, খাত হিসাবে শিক্ষাখাত। উন্নয়ন বাজেট অংশে, শিক্ষা ও ধর্ম নিয়ে একটি খাত। এতে বাজেট বিশ্লেষণে একটি জটিলতা তৈরি হয় বটে, তবে উন্নয়ন বাজেট বরাদ্দে কোনো ব্যাপক বা আকস্মিক পরিবর্তন হয় না। উন্নয়ন বাজেটে পরিবহন বড় খাত। কেননা এখানে তিন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের ব্যয় বরাদ্দ একত্রে দেখানো হয়, যেমন; সড়ক-জনপথ, নৌ পরিবহন এবং রেলওয়ে। ফলে টাকার অঙ্কে তা কৃষি কিংবা বিদ্যুত্ ও জ্বালানি খাত থেকে সব সময়ই বেশি হবে। তবে উন্নয়ন বাজেটে বরাদ্দের শতকরা হার হিসেবে বিদ্যুত্ ও জ্বালানি গত কয়েক বছর যাবত্ বেশিই পেয়ে আসছিল। মন্ত্রণালয় হিসেবে ব্যয় দেখালে, সবচেয়ে বেশি উন্নয়ন ব্যয় বরাদ্দ পায় স্থানীয় সরকার বিভাগ। কৃষি খাতের বরাদ্দ উন্নয়ন বাজেটের সাড়ে চার থেকে সাড়ে পাঁচ শতাংশের মধ্যে উঠা-নামা করে। এবার শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে উন্নয়ন ব্যয় উন্নয়ন বাজেটের শতকরা হিসেবে বাড়ছে। তবে এই বরাদ্দগুলোতে যা হয় তা ধারাবাহিক ব্যয় থেকে বড় রকমের কোনো উল্লম্ফন হয় না। কাজেই উন্নয়ন বাজেটের এই অংশে ‘নিরাশার’ কোনো উপাদান দেখি না। রাজস্ব বাজেটে থাকে মূলত বেতন ভাতা ও ভর্তুকি। বেতন-ভাতা কী পায় আমলাদের তা পূর্ব থেকেই জানা। এখানেও হতাশার কোনো উপাদান থাকে না। ভর্তুকি ও পুনর্ভরণ (ক্যাপিটেলাইজেশন অব দ্য লস মেকিং পাবলিক ব্যাংক) অংশে কৃষি নিয়ে ভর্তুকি বা প্রণোদনা দেবার পক্ষেই জনমত বেশি। কৃষিতে ও রপ্তানিতে প্রণোদনা কমছে না। নিরাশার কিছু নেই। পুনর্ভরণ যা তা হলো, সরকারি ব্যাংকগুলো পরিচালনায় লোকসান সামলাতে করের টাকায় মূলধন সহায়তা দেওয়া হয়। এটা নিয়ে নাগরিক শ্রেণি ও অর্থনীতিবিদদের সমালোচনা বরাবর ছিল। ৫৭টি বেসরকারি ব্যাংক বাজারে থাকার পর এতগুলো লোকসানমুখী সরকারি ব্যাংক প্রয়োজন আছে কি না, অর্থনীতিবিদগণ এ প্রশ্ন বরাবর করে আসছেন। তবে এই পুনর্ভরণের বিষয়টি নতুন নয়, গতানুগতিকতার অনুক্রম।

বাজেটে যে আয়ের অংশ, সেটি আসে এনবিআর কর্তৃক সংগৃহীত কর রাজস্ব ও সরকারের অন্যান্য আয় থেকে । কর কাঠামো আরো প্রগতিশীল করার দাবি আছে এবং সেটা সঙ্গত। আমাদের ধনাঢ্য শ্রেণি বড় হচ্ছে। বিদেশে বিনিয়োগে যাচ্ছে দেশি তারা। দ্রুত বিকাশমান বেসরকারি খাতকে প্রবৃদ্ধির জন্য সরকার বড় সহায়ক শক্তি মনে করে। সেই কারণে অনেক ‘গণপণ্যে’ বেসরকারি খাতকে অংশগ্রহণের সুযোগ করে দিয়েছে সরকার। যেমন শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, পর্যটন, ব্যাংকিং, বীমা, পিপিপির মাধ্যমে সড়ক জনপথ, উড়াল সড়ক গড়ে তুলবার সুযোগ দিচ্ছে। করের হার না বাড়িয়ে বরং করজাল বিস্তারের প্রয়াসই চালিয়ে যাচ্ছে বিগত সাত-আট বছর যাবত্। কর কমানো হচ্ছে কৃষি উপকরণ, পোল্ট্রি, গবাদি, ওষুধ, যন্ত্রপাতি, নিত্য ব্যবহার্য পণ্যে। নব্বই দশকের শুরুতে ভ্যাট (মূল্য সংযোজনী কর) চালু হলে ১৫% হার দিয়ে তা শুরু হয়েছিল, যা চলেছে বিগত ২৬-২৭ বছর যাবত্। এটা মূলত আসে ভোক্তা শ্রেণির কাছ থেকে, ব্যবসায়ীরা সেটা আদায় করে দেন। ব্যবসায়ীরা দাবি তুলেছেন ভ্যাট হার কমাতে হবে। ব্যাপক মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির পরেও এ দাবি দুর্বোধ্য। শোনা যায়, করপোরেট কর হার কমানো হবে। আয়করের ক্ষেত্রেও কর হার বাড়ছে না। কাজেই বাজেটে নিরাশার উপাদান খুঁজে পাওয়া কঠিন। বাজেট অর্থনীতিবিবর্জিত বে-খেয়াল কোনো দলিলও নয় । বাজেটে রাজস্ব আদায়ের যে লক্ষ্যমাত্রা, প্রবৃদ্ধির হার ঘোষণা, কোন কোন খাতগুলোকে প্রাধান্য দেওয়া হবে, কী পরিমাণ কর্মসংস্থান বৃদ্ধির লক্ষ্য থাকবে প্রতিবছর তা পঞ্চবার্ষিক দলিলে (৭ম পঞ্চম বার্ষিক পরিকল্পনা) পূর্বাহ্নেই গৃহীত হয়ে আছে। সেটিই পাঁচটি বাজেটে ক্রমান্বয়ে প্রতিফলিত হয়ে আসছে। এই বাজেটের দিকচিহ্ন, ৭ম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় অঙ্কিত হয়েই আছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় রাজনৈতিক অঙ্গীকারের পুনঃঘোষণা। সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার প্রথম বছরে প্রবৃদ্ধির হার প্রক্ষেপণ করা হয়েছিল (২০১৫-১৬) ৭ শতাংশ, অর্জিত হয়েছে ৭.১১ শতাংশ, দ্বিতীয় বর্ষে (২০১৬-১৭) প্রক্ষেপণ করা হয়েছে ৭.২ শতাংশ, প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী অর্জিত হবে ৭.২৪ শতাংশ, তৃতীয় বর্ষে (২০১৭-১৮) প্রক্ষেপণ ৭.৪ শতাংশ যা বাজেটেও প্রতিফলিত হচ্ছে। অবস্থার আকস্মিক কোনো হেরফের না হলে বাজেটে (২০১৮-১৯) সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রবৃদ্ধির প্রক্ষেপণ থাকবে ৭.৬ শতাংশ। পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা হচ্ছে লক্ষ্য অর্জনের মাইল ফলক ও নীতি কাঠামো। বাজেট হচ্ছে সেই মাইলফলক অর্জনে পথনকশা ও বাস্তবায়নের মাঠ-কৌশল। মধ্য-মেয়াদি ও সুদূরপ্রসারী নীতি-কাঠামো নিয়েই সরকার এগুচ্ছে। সেই কারণে বাজেট বাস্তবমুখী, সুবিন্যস্ত এবং লক্ষ্য অর্জনে সফল। সর্ব-প্রশংসিত পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা সামনে থাকায় বাজেট প্রণয়ন সহজতর হয়েছে শুধু তাই নয়, জনমুখী বাজেট প্রণয়নে দক্ষতার ছাপ এখন স্পষ্ট। আর একারণেই বাজেটের পর পর এখন আর জিনিসপত্রের দাম বাড়ে না। বাজেটকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে ব্যবসায়ীরা আমদানি-রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ কিংবা মজুদদারির মতো কূটকৌশলের আশ্রয় নিতে পারে না। কোনো জিনিস বা পণ্য হঠাত্ বাজার থেকে উধাও হয়ে যায় না। আর এ কারণেই প্রকৃত অর্থে বাজেটে কোনো নিরাশার দিক খুঁজে পাওয়া যাবে না। আমাদের বাজেটের মূল সমস্যা হলো, এটি ছোট আকারের বাজেট। বাংলাদেশে বাজেটের ব্যয় এমনকি দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যেও সবচেয়ে ছোট। আমাদের বাজেটের আকার এবার দেশজ আয়ের ১৮ শতাংশ, ভারতে ২৮ শতাংশ, পাকিস্তানে তাদের দেশজ আয়ের ২০ শতাংশ, আফগানিস্তানে ২৭ শতাংশ এবং নেপালে ২২ শতাংশ। আমাদের বাজেটের আকার বিশেষভাবে উন্নয়ন ব্যয় আরো বৃদ্ধি পাওয়া অপরিহার্য। প্রবৃদ্ধির হার বাড়াতে, ব্যয় দক্ষতা বাড়াতে সুনির্দিষ্টভাবে এবং জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ এখন অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।

উপস্থাপিকার আরেকটি প্রশ্ন ছিল, এ বছরের বাজেটের ‘বিউটি কী’ বা কোনো চমক থাকবে কী? বাজেটের প্রথম সৌন্দর্য হলো, এটি বিগত আটটি বাজেটের মতোই একটি প্রেক্ষিত পরিকল্পনার স্বপ্নপূরণে প্রণীত ও সপ্তম পঞ্চমবার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সামঞ্জস্য রেখে তৈরি। পরিকল্পনা ছাড়াও নিছক আয়-ব্যয়কে প্রাধান্য দিয়ে বাজেট প্রণীত হতে পারে। যেমন— আমাদের দেশে হয়েছিল ২০০৩ থেকে ২০০৮-০৯ পর্যন্ত। সেখানে দারিদ্র্য বিমোচন কৌশলপত্র নামে ২টি পত্র  (পেপার) তৈরি হয়েছিল যা পরিকল্পনা ছিল না। ওতে প্রবৃদ্ধির হার কী অর্জিত হবে, তেমন লক্ষ্যও ঘোষিত ছিল না। যা ছিল সংবিধানে বর্ণিত ১৫ (ক-গ) ধারার পূর্ণ পরিপন্থি। ঐ (১৫-ক) ধারায় বলা হয়েছে, রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব হবে পরিকল্পিত পথ অনুসারে প্রবৃদ্ধি অর্জন। এই ধারা অব্যাহত রেখে, পরিকল্পনা  না করা ছিল অসাংবিধানিক। (‘It shall be fundamental responsibility of the state to attain through  planned economic growth’) বাজেটের চমক হলো, রোজা ও বর্ষার আগমনে মূল্যচক্রের যে স্বাভাবিক বৃদ্ধি হয়ে থাকে, বাজেট ঘোষণার পর তার বাইরে মূল্যস্ফীতি না বাড়া। কুশলীপনা হলো— দারিদ্র্য সংবেদনশীল খাতে ও জেন্ডার সমতায় ব্যয় বৃদ্ধি। ভারসাম্যমূলক উন্নয়ন লক্ষ্যে গ্রামীণ কর্মসংস্থান ও তুলনামূলক অনুন্নত অঞ্চলগুলোর জন্য বিশেষ বরাদ্দ রাখা। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে ব্যাপক বরাদ্দ বৃদ্ধিতেও বাজেট নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে অগ্রসরমান। এর ফলে শিক্ষাখাতে বিশেষভাবে মাধ্যমিক ও ডিগ্রি পর্যায়ে কলেজগুলোতে আরো জনবল ও মান বৃদ্ধিতে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে। চমকের মধ্যে যুক্ত হচ্ছে অবশেষে ভ্যাট আইন অনুমোদন করিয়ে নেওয়া। আমাদের দেশে বাজেট ঘোষণার পূর্বেই মিডিয়ায় অনেক তথ্যাদি চলে আসে। আমাদের আলোচনা সেসবের উপর ভিত্তি করে। আনুষ্ঠানিক বাজেট ঘোষণা হলে আমরা হয়ত আরো নতুনতর চমকের সন্ধান পেতে পারি। সে জন্য ১ জুন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রণীত এ ‘বাজেটও হতে যাচ্ছে আবারও একটি আশা জাগানিয়া বাজেট’।

লেখক :অর্থনীতিবিদ ও কৃষি অর্থনীতির অধ্যাপক





« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: info@iportbd.com, বার্তা বিভাগ: newsiport@gmail.com