Friday, 19 January, 2018, 7:26 PM
Home জাতীয়
রমনা অঞ্চলটি অধিকতর যত্নের দাবি রাখে
আলী ইমাম মজুমদার লিখেছেন প্রথম আলোতে
Published : Tuesday, 23 May, 2017 at 12:00 AM, Update: 23.05.2017 5:48:20 PM, Count : 1
ঢাকা মহানগরের প্রাণকেন্দ্র রমনা। এর ফুসফুসও এই অঞ্চলটি। বহু ইতিহাসের সাক্ষী। গৌরবগাথাও অপরিমেয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামের ইতিহাস লিখতে হলেও চলে আসে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার কথা। ১৯৬৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে সে মামলায় কারাগার থেকে মুক্তিলাভের পর তখনকার রেসকোর্স ময়দানে জননন্দিত নেতা শেখ মুজিবকে বঙ্গবন্ধু খেতাবে ভূষিত করা হয়। আর বঙ্গবন্ধু সে নাগরিক সংবর্ধনাতেই ওই ময়দানের নাম সোহরাওয়ার্দী উদ্যান রাখেন। দ্বিতীয় রাজধানী বা আইয়ুব নগরের নাম পাল্টে দেন শেরেবাংলা নগর বলে। তিনি সেদিন এ দুটো নাম না দিলে এই মহান নেতা দুজনের স্মৃতিচিহ্ন রাজধানীতে অপাঙ্‌ক্তেয়ই থাকত বলে ধারণা করা হয়। এই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানেই স্বাধীনতাযুদ্ধের প্রাক্কালে বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চের নীতিনির্ধারণী ভাষণ দেন। এখানেই ১৬ ডিসেম্বর যৌথ বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ড।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, রমনা পার্ক, শাহবাগ আর তৎসংলগ্ন স্থাপনাগুলো নিয়েই রমনা অঞ্চল। উদ্যান দুটি ছাড়া সবই গেছে নগরায়ণের দাপটে। অবশ্য সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নির্মিত হয়েছে স্বাধীনতাস্তম্ভ ও শিখা চিরন্তন। উদ্যানের এক প্রান্তে রয়েছে তিন নেতার মাজার। এ ছাড়া আছে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন ও রমনা কালীবাড়ি। আরেক অংশে রয়েছে শিশুপার্ক ও পুলিশ কন্ট্রোল রুম। রমনা অঞ্চলের যুগল উদ্যানের অপরটির নাম রমনা পার্ক। এরই এক প্রান্তে আছে বিশ্ব তাবলিগ জামাতের সমন্বয়কারী মসজিদ কমপ্লেক্স। এই যুগল উদ্যান আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ছাড়াও মহানগরের পরিবেশের জন্য অপরিহার্য স্থাপনা। তবে ধীরে ধীরে এর বৈশিষ্ট্য বিনষ্ট হওয়ার আশঙ্কা করছেন কেউ কেউ। অনেকেরই মতে, কিছু স্থাপনা এখান থেকে অন্যত্র স্থানান্তর করা যায়। আর কয়েকটির ক্রমসম্প্রসারণ প্রবণতাও বন্ধ করা অত্যন্ত সংগত। অথচ স্পর্শকাতর বিবেচনায় এর রক্ষণাবেক্ষণকারীরা এড়িয়ে যাচ্ছেন তাঁদের দায়িত্ব।

যতটুকু জানা যায়, এই রমনা অঞ্চলটি সপ্তদশ শতকে সুবেদার ইসলাম খান কর্তৃক উন্নয়ন করা হয়। এর পাশেই ছিল ঢাকার নবাবদের বাগানবাড়ি শাহবাগ। তবে ঢাকা রাজধানী হিসেবে পরিত্যক্ত হওয়ার পর অঞ্চলটি ঝোপ-জঙ্গলে পরিণত হয়। ১৮২৫ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকার ব্রিটিশ কালেক্টর কারাগারের দণ্ডিত আসামিদের দিয়ে এই জঙ্গলাকীর্ণ স্থান পরিষ্কার ও সংস্কার করেন। একটি বেষ্টনীও দেন। চালু করেন নিয়মিত ঘোড়দৌড়। ১৯৪৭-এ দেশ ভাগের পর রেসকোর্সের পাশের অংশে ৮৮ দশমিক ৫০ একর জমি নিয়ে তৈরি হয় আজকের নয়নাভিরাম রমনা পার্ক। গণপূর্ত বিভাগ এর উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নেয়। এখন দুটো যুগল উদ্যানের দায়িত্বেই আছে তারা। তবে তারা এত সব স্পর্শকাতর স্থাপনা নিয়ে কাজ করতে হিমশিম খাচ্ছে, এমনটাই দেখা যায়।

প্রথমেই আমরা শিশুপার্কটির বিষয়ে আলোচনা করতে পারি। এই নগরে শিশুদের বিনোদনের ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। তার জন্য পাকিস্তান বাহিনীর আত্মসমর্পণের স্থানটিকে কেন বেছে নেওয়া হলো, তা দুর্বোধ্য। এটা স্থানান্তর করা কোনো অসাধ্য বিষয় নয়। নগর কেন্দ্রে রেলের অব্যবহৃত কিছু জমি এখনো আছে। এখানেও চলছে আইনি দখলদারি। আর তা অনেকটাই করছেন যাঁদের ভূরি ভূরি আছে তাঁরাই। তাই সরকার দৃঢ় হলে এটা স্থানান্তর অসম্ভব নয়। তেমনি অসম্ভব নয় পুলিশ কন্ট্রোল রুম স্থানান্তর। পুলিশ যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন পুলিশ কন্ট্রোল রুম। এর জন্য কাছাকাছি ভিন্ন জায়গায় ব্যবস্থা করাও সম্ভব। এই স্থানটি তো পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের হৃদয়বিদারক ঘটনার পরই ট্যাংক রাখা ও সেনা নিয়ন্ত্রণকক্ষের জন্য জরুরি ভিত্তিতে অস্থায়ীভাবে নির্মিত হয়েছিল। ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন এবং এ-সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানগুলো অনেকটা জায়গা নিয়ে আছে। এর পরিপূর্ণ ব্যবহার হয় বলে মনে হয় না। তাদের পরিপূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। নতুবা স্থানান্তর করতে হবে কিছু।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের রমনা কালীবাড়ী একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা। এটা ২ দশমিক ২২ একর জায়গাজুড়ে ছিল। একাত্তরের স্বাধীনতাযুদ্ধের সূচনাতেই এখানে হামলা করে পাকিস্তানি বাহিনী। গুঁড়িয়ে দেয় এর সবকিছু। হত্যা করে সেবায়েতসহ শতাধিক লোককে। স্বাধীনতার পরপর কোনো কারণে সরকার সেই জমি বাজেয়াপ্ত করে। আইনি লড়াইয়েও মন্দির কর্তৃপক্ষ হেরে যায়। তবে হিন্দু সম্প্রদায়ের অব্যাহত আন্দোলনের ফলে এর জন্য অনেক বছর পর ২ দশমিক ১৪ একর জায়গা বরাদ্দ দেওয়া হয়। ঠিক তেমনি বিশ্ব ইজতেমার আয়োজক তাবলিগ জামায়াতের একটি স্থাপনা ও মসজিদ রমনা পার্কের এক প্রান্তে চলছিল। এটাকেও ১ দশমিক ১৯ একর জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়। ধর্মীয় এই স্থাপনা দুটি সরকার কর্তৃক বরাদ্দ করা স্থানেই সীমাবদ্ধ থাকবে, সেটাই প্রত্যাশিত।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানসহ রমনা অঞ্চলের জমিজমা নিয়ে হাইকোর্টেও মামলা-মোকদ্দমা হয়েছে। স্বাধীনতাসংগ্রামের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে একে নতুনভাবে সাজাতে এবং এর সঙ্গে সংগতিহীন প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্থানান্তরের জন্য নির্দেশও আছে। স্বাধীনতাস্তম্ভ ও শিখা চিরন্তন নির্মাণ করা হয়েছে বটে। তবে পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণ ও বঙ্গবন্ধুর সাতই মার্চের ভাষণের স্থানে উপযুক্ত ভাস্কর্য নির্মাণ করার কাজটিই হয়নি। যাঁরা বরাদ্দের অতিরিক্ত জমি ব্যবহারে নিচ্ছেন, সে বিষয়ে স্বচ্ছ কোনো বক্তব্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নেই। নেওয়া হচ্ছে না কোনো পদক্ষেপও। শুধু বলা হয় স্পর্শকাতর। এভাবে চলতে থাকলে এ অঞ্চলটির বৈশিষ্ট্য অনেকটাই হারিয়ে যাবে। কোনো এক সরকার এসে একদিকে বিশাল একটি স্থায়ী বইমেলার জন্য বিশাল স্থাপনা নির্মাণ করে বসবে না, এর নিশ্চয়তা কোথায়? অবাক হওয়ার কিছুই নেই। একটি সময়ে এ ধরনের ফিসফাসও শুনেছিলাম। তবে নাগরিক সমাজের সতত নজরদারির কারণে আঁতুড়ঘরেই ধারণাটির মৃত্যু হয়েছে। ইতিহাস-ঐতিহ্য সম্পর্কে আমরা খুব সচেতন জাতি, এমনটা দাবি করা যাবে না। অন্তত আমাদের কার্যক্রমে তার সপক্ষে কোনো নজির মেলে না। বরং নিজদের মনগড়া ইতিহাস চাপিয়ে দেওয়ার দিকেই আমাদের প্রচণ্ড ঝোঁক। তাই উদ্যান দুটো নিরাপদ বলে মনে করার কোনো কারণ নেই। রাজনৈতিক দলগুলোকেও সভা-সমাবেশ করতে হয়। আর নগর কেন্দ্রে এর প্রধান স্থান তো সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। এই অঞ্চলের নগরবাসীর সকাল-সন্ধ্যা হেঁটে বেড়ানোর স্থানও এগুলো।

রমনা এলাকার ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে কিছু আলোচনা হয়েছে। তবে আলোচনা প্রাসঙ্গিক যে, বিশ শতকের সূচনা থেকেই রমনার অংশ শাহবাগ এ দেশের এমনকি উপমহাদেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে আছে। সময়ে সময়ে গতি পাল্টে দিয়েছে ইতিহাসের। এমনকি মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলাগুলো বিচারের একপর্যায়ে এই শাহবাগেই আরেক প্রাণের জোয়ার আমরা দেখলাম। সেটাও এখন ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছে। এখানে ঘটে যাওয়া সব ঘটনা সবার পছন্দের না-ও হতে পারে। তবে বাস্তবতাকে তো অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। সে রমনা অঞ্চলেরই দুটো উদ্যান অনেক ঝড়-ঝঞ্ঝার মাঝে আজও সগৌরবে টিকে আছে। তবে সচেতন প্রয়াসে মূলধারায় ফেরাতে হবে এগুলোকে। হাইকোর্টের নির্দেশ অনুসারে এই স্থানের জন্য অপ্রাসঙ্গিক স্থাপনা অন্যত্র স্থানান্তরের ব্যবস্থা করতে কোনো উদ্যোগ কেন নেওয়া হচ্ছে না, তা বোধগম্য নয়। আর দুটো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বহাল থাকুক তাদের জন্য বরাদ্দকৃত জমিতে। এদের আরও জমির প্রয়োজন হতে পারে। সরকারও প্রয়োজন মনে করতে পারে তাদের তা দেওয়ার। তবে তা করতে হবে অন্যত্র। নগর কেন্দ্রের ঐতিহাসিক স্মৃতিবিজড়িত উদ্যান দুটোকে নিয়ে হেলাফেলার কোনো সুযোগ নেই।

আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব।

majumderali1950@gmail.com


 





« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: info@iportbd.com, বার্তা বিভাগ: newsiport@gmail.com