Friday, 19 January, 2018, 7:24 PM
Home জাতীয়
নারীর জীবিকা নারীর সম্মান
উম্মে মুসলিমা লিখেছেন প্রথম আলোতে
Published : Tuesday, 23 May, 2017 at 12:00 AM, Update: 23.05.2017 5:46:14 PM, Count : 2
একসময় নারীকে ঘরের কাজে দেখতেই অভ্যস্ত ছিল সমাজ। রাজায় করিছে রাজ্য শাসন, রাজারে শাসিছে রানি—আহ! নারীর কী প্রাপ্তি! এ উপমহাদেশে এক নূরজাহান ব্যতীত আর কেউ রাজাকে শাসন করেছেন বলে আমাদের জানা নেই। কিংবা জাহাঙ্গীর হয়তো শাসিত হওয়ারই যোগ্য, না হলে কতশত আনারকলির কবর খুঁজে পেতেন ইতিহাসবিদেরা, তা কে জানে!

রবীন্দ্রনাথের ‘মুক্তি’ কবিতায়

‘রাঁধার পরে খাওয়া, আবার খাওয়ার পরে রাঁধা

বাইশ বছর এক চাকাতেই বাঁধা’র নারী মৃত্যুতে মুক্তি পেতে চেয়ে বলছেন—

‘দাও খুলে দাও দ্বার

ব্যর্থ বাইশ বছর হতে পার করে দাও কালের পারাপার।’

সংসারের ঘানি টানতে গিয়ে যে নারী দুয়ারে আসা বসন্ত দেখতে পাননি বলে ত্রিশ বছর বয়সে জীবনের শেষ প্রান্তে এসে দুঃখে মৃত্যু আহ্বান করছেন, সেই নারীর এ যুগে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ত্রিশ। ত্রিশের মধ্যে চাকরিতে ঢুকতে না পারলে তাঁদের মরে যেতে ইচ্ছে করে।

একটি জনপ্রিয় এফএম রেডিও সফল নারীদের নিয়ে অনুষ্ঠান করে। সন্ধ্যায় প্রাত্যহিক হাঁটার সময় তা শুনতে থাকি। একজন সফল নারী নারীদের চাকরির ধরন নিয়ে কথা বলছিলেন। তিনি উল্লেখ করলেন একদিন অন্য একটি রেডিওতে রেডিও জকি গান শোনানোর মাঝে মাঝে কৌতুক পরিবেশন করছিলেন। বিমানবালাকে নিয়ে একটি কৌতুকে তিনি এ রকম বলছিলেন, ‘ক্যাপ্টেন বলল, আজকের ফ্লাই শেষ হলে সন্ধ্যায় এক কাপ চা নিয়ে বিমানবালার সঙ্গে চুটিয়ে প্রেম করব।’ যেন বিমানবালাদের সঙ্গে ক্যাপ্টেনরা প্রেম করেই থাকেন। বিমানবালাদের চাকরির ধরনটাই এ রকম।

নার্স, ব্যক্তিগত সহকারী, সেলস গার্ল, অভ্যর্থনাকারীর পেশা নিয়েও অনেক কৌতুক রয়েছে। সেসব কৌতুকে এসব পেশাজীবীকে অত্যন্ত অসম্মানজনকভাবে উপস্থাপন করা হয়। শিল্প-সাহিত্যের স্রষ্টারাও এ পেশার চরিত্র চিত্রণে তাঁদের নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন রেখে যান। সামাজিকভাবেও এদের বাঁকা চোখে দেখা হয়। আর যাত্রা, নাটক, সিনেমার নায়িকা বা মডেলিং পেশায় নিয়োজিত এমনকি মিডিয়ায় কাজ করা নারীদের সম্পর্কেও অনেকে যথেষ্ট সম্মান দেখিয়ে কথা বলেন না। এসব পেশার নারীদের নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষও (বেশির ভাগই পুরুষ, যাঁরা পুরুষ নন তাঁরাও পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার) তাঁদের সম্পর্কে অশ্রদ্ধা পোষণ করে থাকেন।

আজ থেকে পঞ্চাশ-ষাট বছর আগে চাকরিজীবী নারীদের প্রতি সাধারণ মানুষের মনোভাব খুব সম্মানজনক ছিল বলে জানা যায় না। আর যাঁরা বিনোদনের জগতে ছিলেন। যেমন নাচ, গান, অভিনয় ইত্যাদি, তাঁদের সম্পর্কে সমাজে নানা কটু কথা প্রচলিত ছিল। কিন্তু এখন সময় পাল্টাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী একজন নারীর সঙ্গে কথা হচ্ছিল। তাঁর একটাই মেয়ে। মেয়েটি যুক্তরাষ্ট্রের একটা ভালো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে খুব ভালো গ্রেড নিয়ে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করেছেন। মা ভেবেছিলেন মেয়ে মাস্টার্সের জন্য প্রস্তুতি নেবেন। ওমা! মেয়ের শখ এয়ার হোস্টেস হওয়া। রীতিমতো প্রশিক্ষণ-ট্রশিক্ষণ শেষ করে মেয়ে উড়তে চলে গেলেন। মা হতাশ হয়েছেন কি না জানতে চাইলে তিনি একগাল হেসে বললেন, ‘যত দিন ভালো লাগে করুক। ওর চ্যালেঞ্জকে আমি শ্রদ্ধা করি।’

একসময় হোস্টেলে থাকা মেয়েদের নিয়েও অনেক বাজে কৌতুক প্রচলিত ছিল। উচ্চশিক্ষিত মেয়েদের বিয়ের সমস্যা হতো। চাকরিজীবীদের নারী হিসেবেই গণ্য করা হতো না। এখন সময় পাল্টেছে। নারীদের জন্য প্রচলিত চাকরির বাইরে নারীরা সব ধরনের চাকরিতে সমানতালে এগিয়ে চলেছেন। শিক্ষিতরা যে যাঁর ইচ্ছেমতো পেশা বেছে নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। ইংরেজি মাধ্যম থেকে পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে ভর্তি হওয়া এক চৌকস ছাত্রী তাঁর জীবনের লক্ষ্য হিসেবে ‘কালিনারি’তে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে মাস্টার শেফ হওয়ার আশা ব্যক্ত করছিলেন। পোশাকশিল্পের একজন শ্রমিক নারী নিরাপত্তাবলয়ের মধ্যে কাজ করার অধিকার নিয়ে সোচ্চার। বিদেশে গৃহকর্মী হিসেবে নিয়োজিত নারীরা তাঁদের প্রতি অনাচার দেখলে প্রতিবাদের সুযোগ হাতছাড়া করেন না। যদিও তাঁদের রক্ষা করার ব্যবস্থা নিতে সরকারি সংস্থাগুলোর তৎপরতা অনুল্লেখযোগ্য। মডেলিং তো মেয়েদের খুব পছন্দের একটা পেশায় পরিণত হয়েছে। অনেক মেয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের পাশাপাশি মডেলিংয়ে নাম করছেন, দেশে-বিদেশে বিভিন্ন শোতে অংশ নিয়ে দেশীয় পণ্যের প্রসার বৃদ্ধি করে চলেছেন। বিবি রাসেলের মতো আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মডেল আমাদের উজ্জ্বল অগ্রদূত। আমাদের এক বন্ধু তাঁর ছেলেকে কোন কলেজে ভর্তি করাবেন, এ নিয়ে পাগল হয়ে যাচ্ছিলেন। ছেলেটির মধ্যম মানের মেধা। পেটা শরীর। খেলায় দারুণ আগ্রহ। ছেলেটিকে বিকেএসপিতে দিতে পরামর্শ দেওয়া হলে বন্ধু খুব মাইন্ড করলেন। তাঁর ছেলের মেধা খেলাধুলার মতো ছেলেখেলায় কেন বিনিয়োগ করবেন, তা তাঁর বোধগম্য হচ্ছিল না। শুনেছি ছেলেটি পরে উল্লেখযোগ্য কিছু করতে পারেনি। কত পিএইচডিধারী দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছেন, তাঁদের কতজনকে আমরা চিনি? তাঁরা ভেতরে-ভেতরে দেশ-মানুষের উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছেন ঠিকই কিন্তু সাকিব-মুশফিক-মাশরাফিরা যেন আমাদের নয়নের মণি। আমরা রাত-দিন তাঁদের জন্য প্রার্থনা করি।

‘শ্রমের মর্যাদা’ নামে রচনা মুখস্থ করতে হতো আমাদের একসময়। কোনো কাজই ছোট নয়। ছোট হচ্ছে দৃষ্টিভঙ্গি। আমাদের দেশে যে ছেলেটি মুটে হতে বা রাস্তাঘাট পরিষ্কার করতে লজ্জা পান, তিনিই তাঁর যাবতীয় স্থাবর-অস্থাবর বিক্রি করে বা রাজ্যের ধারদেনা করে বিদেশে গিয়ে ওই একই কাজ করেন। আত্মকর্মসংস্থানে সহায়তা করার জন্য সরকারি-বেসরকারি হাজারটা সংস্থার আমন্ত্রণ উপেক্ষা করে বিদেশে পাড়ি জমানোতেই যেন সব মর্যাদা। একটা বিদেশি টিভি শোতে বিভিন্ন পেশার দর্শক উপস্থিতির মাধ্যমে শ্রমের মর্যাদা নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল। একজন দৃঢ়তার সঙ্গে ‘আমি একজন যৌনশ্রমিক’ বলে তাঁর কথা শুরু করলেন। সবাই মনোযোগ দিয়ে তাঁর সুবিধা-অসুবিধার কথা শুনলেন।

সৎ পরিশ্রমের কোনো কাজই অমর্যাদার নয়। তবে নারীর নিরাপত্তায় ঝুঁকি আছে বলে যেসব পেশা চিহ্নিত করা হয়, সেসব পেশার নিরাপত্তারক্ষকদের অর্বাচীন দৃষ্টিভঙ্গি, দরিদ্র মানসিকতা পরিত্যাগ করা বাঞ্ছনীয়। না হলে গৎবাঁধা জীবিকার বাইরে পা ফেলে হাঁটতে নারীর অনেক রক্ত ঝরবে।

উম্মে মুসলিমা: কথাসাহিত্যিক।

muslima.umme@gmail.com







« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: info@iportbd.com, বার্তা বিভাগ: newsiport@gmail.com