Friday, 22 September, 2017, 1:52 PM
Home ফিচার
পাখির জন্য ভালোবাসা
আমিরুল আলম খান লিখেছেন সমকালে
Published : Tuesday, 23 May, 2017 at 12:00 AM, Update: 23.05.2017 5:41:31 PM, Count : 1
নিভৃত পল্লীতে জন্মেছি; তাই পাখির সঙ্গে আবাল্য সখ্য আমাদের। কৃষক পরিবারে অনেক কাজের মধ্যে আমাদের উঠোনের ধান বা অন্য কোনো শস্য পাহারা দিতে হতো ঘরে পোষা হাঁস-মুরগি আর বনের পাখি থেকে।
হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগলই কৃষকের বড় সম্পদ। তাদের আবাস তৈরি আর খাবার জোগান দেওয়ার দায়িত্ব গৃহস্থের। তাই বলে পঞ্চাশ-ষাটের দশকে সেই ভীষণ আকালের কালে হাঁস-মুরগি বা বনের পাখি উঠোনের ধান খেয়ে যাবে, তা তো মেনে নেওয়া যায় না। তাহলে যে নিজের ভাঁড়ারেই টান পড়বে।
আমরা তাই যে যখন পারতাম, এ কাজে বাবা-মাকে সাহায্য করতাম। হাতে থাকত একটা লম্বা কঞ্চি, তা দিয়েই তাড়াতাম ক্ষুধার্ত হাঁস-মুরগি আর বনের পাখি।
আমি আমার দাদিকে দেখিনি। তিনি আমার জন্মের বহু আগেই পরপারে পাড়ি দেন। ছিলেন আমার নানি। তার ছিল মাত্র দুই সন্তান, আমার মা আর বড় খালা। নানি বিধবা হন অল্প বয়সেই। দুই মেয়েকে নিয়েই তার বাকি জীবন কেটেছে। প্রায়ই আসতেন আমাদের বাড়িতে। তিনি রসিক মানুষ ছিলেন। তার ছিল পাখ-পাখালির প্রতি অসীম দরদ। ভাদ্রের গুমোট গরমে আমরা হয়তো হাঁসফাঁস করছি আর কঞ্চি নিয়ে হাঁস-মুরগি বা বনের পাখি তাড়িয়ে ধান শুকাচ্ছি। তিনি এসে বসলেন পাশে। হেসে হেসে বললেন, অনেকক্ষণ ধরে ওই বাঁশের ভারী লাঠিটা নিয়ে দৌড়ে দৌড়ে তো হাঁপিয়ে গেছিস। দে, আমার হাতে। বলেই তিনি কঞ্চিটার দখল নিয়ে নিতেন। আর আমরা ছুটি পেয়ে আনন্দে লাফিয়ে বেড়াতাম। মিনিট খানেকের মধ্যেই উঠোনে একসঙ্গে এক পাল হাঁস-মুরগি আর পাখি এসে মজা করে ধান খেতে শুরু করত। তাদের তো ভয় নেই আর। তারা জানত, এই বুড়ি তাদের পরম বন্ধু; তাদের খিদের কষ্ট বোঝে। তাই দুষ্টু ছেলেদের মতো তাড়িয়ে দেবে না। হাঁসগুলো গলা বাড়িয়ে এত দ্রুত খেত যে, মুহূর্তেই বেশ খানিক জায়গার ধান সাবাড় হয়ে যেত। আর নানি একটু ঝিমানোর ভান করতেন। খানিক পরে মা ছুটে এসে বলতেন, খোকাকে বললাম ধান দেখতে; তোমাকে পেয়ে পালিয়েছে বুঝি? আর তুমি...। নানি ফোকলা দাঁতে হেসে বলতেন, একটু ঝিমানি আইল, রাজিয়া। তা, কটা ধানই-বা খেয়েছে ওরা! ওদেরও তো খিদে লাগে, না রে! ততক্ষণে অতিথিদের পেট প্রায় ভরে গেছে। তারা আনন্দে নাচতে নাচতে চলে যেতে শুরু করেছে।
নানি আমাদের জিজ্ঞেস করতেন, এই, তোদের খিদে পায়? কষ্ট হয়? আমরা মাথা নেড়ে বলতাম, হঁ্যাঁ, খুব কষ্ট হয় খিদে পেলে। তা তুমি জানো না, খিদে পেলে কষ্ট হয় কি-না? নানি আবার হাসতেন। মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করতেন, সেদিন তুই চুরি করে মুড়ি খাচ্ছিলি, না? আমি মাথা নিচু করে বলি, খিদে পেয়েছিল।
তাই বল। তা এই হাঁস-মুরগি-পাখিগুলো, ওদের খিদে পায় না বুঝি? আমি চুপ করে যাই।
আমাদের বাড়িতে দুটি বড় তেঁতুলগাছ ছিল। তাতে বসত রাজ্যের পাখি। সংখ্যায় বেশি ছিল পানকৌড়ি। বিল থেকে এসে তারা এখানে রাত কাটাত তাদের বানানো বাসায়। তালগাছে শত শত বাবুই পাখির শৈল্পিক বাসা আর তাদের কিচিরমিচির আমাদের মুগ্ধ করত। বটের লাল লাল ফল খেতে আসত কত রকমের পাখি! তাদের মধ্যে সবচেয়ে নজর কাড়ত সবুজ রঙের বড় বড় হোরেল ঘুঘু। বটগাছে ঝুলত বড় বড় মৌচাক, তাতে মধু যেন টলটল করত। গাছে গাছে কাঠবিড়ালির ছোটাছুটি। আমবনেও কত কত পাখির বাস ছিল! পুকুরপাড়ে মাছরাঙাদের শ্যেনদৃষ্টি। ডাহুক আর ডোমকুড়ের ডাক আমরা খুব উপভোগ করতাম। ঘরের পাশে বউ কথা কও পাখি 'বউ কথা কও' বলে ডেকে উঠত।
আমার এক চাচা ছিলেন মমিনুর রহমান খান। জমিদারি উচ্ছেদ হলেও তার আভিজাত্যে টান পড়েনি কখনও। আমার আব্বা তবিবর রহমান খানের আবাল্য বন্ধু। এক ঘরে দুই বন্ধু গল্প করে কাটিয়েছেন বহু রাত। চাচার পাখিপ্রেম ছিল কিংবদন্তিতুল্য। জমিদার বাড়িটি ছিল বেতনা নদীর ধারে। বড় বড় দীঘির চারপাশে শরিকদের বড় বড় দালান। চাচা নদীর ওপারে একটা বাগানবাড়ি বানিয়েছিলেন। খুব সাদামাটা আটচালা ঘর। সেখানে তার প্রমোদসঙ্গী ছিল রাজ্যের পাখি। ভোরে ঘুম থেকে উঠে তিনি বাঁশের চালির সাঁকো পার হয়ে চলে যেতেন তার বাগানবাড়িতে, বনের বন্ধুদের কাছে। যেয়ে ডাকতেন পাখিদের নাম ধরে। কই রে, কোথায় গেলি ময়না আমার, আয়, আয়...। অমনি ছুটে আসত দু'তিনটি ময়না। এসেই মিষ্টি কণ্ঠে বলে উঠত, সালাম, সালাম, জমিদার বাবা, সালাম। ভালো আছ তো? তারপর উড়ে উড়ে বসত তার হাতে, কাঁধে, মাথায়। শুনেছি, ময়না নাকি পোষ মানে না। কিন্তু চাচার ময়না পোষ মেনেছিল বনে থেকেই। ময়নার সঙ্গে মিনিট দুই কথা বলে এবার ডাকতেন, আয়রে আমার শালিক সোনা, ভাত শালিকের দল। সঙ্গে সঙ্গে এক ঝাঁক শালিক এসে পায়ের কাছে নেচে নেচে কিচিরমিচির করত। এবার ডাক দোয়েলের। এক জোড়া, দু'জোড়া দোয়েল এসে শিস দিয়ে গান ধরত। কই গেলি রে পেঁচার দল...আয়, আয়, আয়! এমনি করে একে একে ডেকে নিতেন তার প্রমোদসঙ্গীদের। ঘুঘু, কবুতর, পেঁচা, শ্যামা, টিয়া, কাক, কোকিল...। সবাই এলে খবরাখবর নেওয়া, হেঁটে বেড়ানো চলত মিনিট দশেক। চাচা যেদিকে যাবেন, তার আগে-পিছে পাখির দলও। কেউ মাথায় বসে চুল বিলি করে ঠোঁট দিয়ে; কেউ হাতে বসে আদর করে, আদর নেয়। কত যে কথা, যেন শেষই হয় না!
খিদে পেয়েছে বুঝি? চাচা জিজ্ঞেস করতেন। সঙ্গে সঙ্গে সব পাখি উড়ে গিয়ে গোল হয়ে মাটিতে বসে পড়ত। এবার চাচা তাদের মাঝে খাবার ছড়িয়ে দিতেন। আর সবাই আনন্দে বাগবাগ হয়ে খাবার খেত। কেউ যদি দুষ্টুমি করত, চাচা দিতেন আচ্ছা ধমক। অমনি থেমে যেত দুষ্টুমি!
এই পাখিদের সঙ্গে চাচার কথা হতো অনেকক্ষণ। তিনি যেদিকে যাবেন দল বেঁধে পাখি যাবে সেদিকে। চাচা ঘুরে ঘুরে তার আম-জাম-লিচু-কাঁঠালের বাগান দেখবেন। পাখিরাও সঙ্গে সঙ্গে ঘুরবে। চাচা ময়নাদের অনেক কিছু শিখিয়েছিলেন। কোনো ভুল হলে ময়নাগুলো শুধরে দিত। হয়তো জিজ্ঞেস করলেন, ভুলো, এই ফজলি কোথা থেকে আনা রে? অমনি ময়না ভুলো বলে উঠত, সুন্দরপুর, সুন্দরপুর।
ল্যাংড়াটা মহম্মদপুরের, না?
হলো না, হলো না। মনিরামপুরের, আর ওইটা সাতক্ষীরার।
তুই দেখি সব মনে রাখিস।
রাখিই তো। যদি তুমি ভুলে যাও।
এমন কথোপকথন হতো চাচার সঙ্গে ময়নাদের। আমরা ডিহি ইউনিয়ন পাবলিক লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করি ১৯৭৭ সালে। আশির দশকে আমাদের লাইব্রেরির সভাপতি হলেন মমিন চাচা। আমৃত্যু সভাপতি ছিলেন তিনি। আজ বাংলাদেশে পাখির বড় অভাব। চাচা বলতেন, তোরা ফসলের ক্ষেতে বিষ ঢেলে ফসল ফলাচ্ছিস। তা-ই খেয়ে পাখি সব মরে যাচ্ছে।
চাচা আমাদের বলতেন, গাছ লাগাবি হরেক রকম; ফুল-ফল-ভেষজ-কাঠের জন্য। শুধু মানুষের জন্যই না; পশুপাখির জন্যও। তোরা শুধু মানুষের খাদ্যাভাবের কথা ভাবিস; পাখিদের কথা ভাববে কে? ওরা মরে গেলে তোরাও বাঁচবি নে।
এখন বাংলাদেশ প্রায় পাখিশূন্য। আমাদের বাড়ির দুটি তেঁতুলগাছও উন্নয়নের বলি হয়েছে। মা বাধা দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, পাখিরা চলে গেলে অমঙ্গল হয়। আমরা শুনিনি মায়ের কথা। আমবাগানটা আর আগের মতো পাখিদের আবাস নেই। সেখান থেকে টক আমের গাছ সাবাড় করে এখন কলমের মিষ্টি আমের চাষ। হিমসাগর, বোম্বাই, ল্যাংড়া, ফজলি, আম্রপালি...। আর পেয়ারা, লিচু রক্ষায় আগে টিন পিটিয়ে পাখি তাড়ালেও এখন জাল দিয়ে ঢেকে দিয়ে পেয়ারা, লিচু রক্ষাই রেওয়াজ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। সেই জালে আটকে মরছে পেয়ারা, লিচুভোগী হরেক পাখি। খুদে জাম, বুনো আমড়া, টক আম, বট, নিম, পেঁপে, ডেউয়া, ডুমুর_ পাখিদের প্রিয় খাদ্যের কথা আমরা বিবেচনা করি না। দেশটা মেহগনি, একাশিয়া, ইউক্যালিপটাসে ভরে দিয়েছি।
চাষিরা এখন সবজিতে মাত্রাতিরিক্ত বিষ ঢালে। ফসল রক্ষার নামে সবজি ক্ষেতে জাল পাতে। জাল পেতে পাখিদের খাবার থেকে বঞ্চিত করে, মেরে ফেলে। আমাদের কৃষি বিভাগ শুধু ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি আর লাভের কথা শোনায়। জগতে মানুষই যে একমাত্র জীব নয়_ সে কথা ভুলে যায়।
আমার নানি লেখাপড়া জানতেন না; চাচাও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েননি। কিন্তু প্রকৃতির কোলে বড় হয়ে তারা অভিজ্ঞতা থেকে শিখেছিলেন। 'জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর'_ তারা তা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন। জীবের প্রতি দয়া ছিল তাদের ইবাদত।
যে দেশ পাখিশূন্য হয়; চিল, কাক, শকুনশূন্য হয়, সে দেশে প্রকৃতি রুদ্র হয়ে ওঠে, প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে ওঠে।
পাখির জন্য কি আমাদের হৃদয়ে কোনো ভালোবাসা জন্মাবে না?
amirulkhan7@gmail.com
সাবেক চেয়ারম্যান, যশোর শিক্ষা বোর্ড প্রকৃতিপ্রেমী









« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: info@iportbd.com, বার্তা বিভাগ: newsiport@gmail.com