Friday, 19 January, 2018, 7:25 PM
Home জাতীয়
জনমতের চাপ ছাড়া কি আইন কাজ করবে না?
মশিউল আলম লিখেছেন প্রথম আলোতে
Published : Sunday, 21 May, 2017 at 4:35 PM, Count : 0

জনমতের প্রবল চাপের মুখে বনানীতে ধর্ষণ মামলায় আইন প্রয়োগকারীদের পক্ষে নিষ্ক্রিয় থাকা সম্ভব হয়নি। এই মামলার পাঁচজন আসামির প্রত্যেকেই শেষ পর্যন্ত গ্রেপ্তার হয়েছেন। বলার অপেক্ষা রাখে না যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও মূলধারার সংবাদমাধ্যমের প্রবল চাপের ফলেই এটা সম্ভব হয়েছে। কখনো কখনো কোনো কোনো ঘটনায় জনমতের চাপ এত প্রবল হয়ে ওঠে যে তা উপেক্ষা করা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলোর পক্ষে সম্ভব হয় না। এই সত্য জাতির জন্য যেমন স্বস্তিদায়ক, তেমনি এর একটা উল্টো দিকও আছে। সেটা হলো, জনগণ বিক্ষুব্ধ না হলে, তাদের বিক্ষোভ-প্রতিবাদ ও বিচারের দাবি বিরাট আকারে সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিফলিত না হলে, সর্বোপরি অন্যায়-অপরাধের প্রতিকারের দাবিতে সংবাদমাধ্যম উঠেপড়ে না লাগলে আমাদের আইন প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষের টনক নড়ে না। অপরাধের শিকার মানুষের কান্না-আহাজারি ও ন্যায়বিচারের দাবি যেন-বা বাতাসে হারিয়ে যায়, যতক্ষণ পর্যন্ত না বিপুলসংখ্যক মানুষ তাঁর পক্ষে সোচ্চার হয়ে ওঠে। অপরাধীরা বিত্তবান, প্রভাবশালী ও ক্ষমতাধর হলে তো কথাই নেই।
বনানীর রেইনট্রি হোটেলে ধর্ষণের শিকার দুই তরুণীর ভাগ্য এই অর্থে ভালো যে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও মূলধারার সংবাদমাধ্যম তাঁদের পক্ষে দাঁড়িয়ে প্রচণ্ড আওয়াজ তুলেছে। সব ভুক্তভোগীর ভাগ্য এ রকম হয় না। এই সময়ের মধ্যেই সারা দেশে আরও অনেক ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। সেসব ঘটনার শিকার মেয়েদের দুর্ভাগ্য হলো, একই রকমের আওয়াজ তাদের পক্ষে উচ্চারিত হয়নি। কারও কারও ধর্ষণ কিংবা আত্মহত্যার খবর সংবাদমাধ্যমে খুব সামান্য জায়গা পেয়েছে। বনানীর ঘটনার আওয়াজ এত উচ্চকিত যে অন্য অনেক ঘটনাই সে আওয়াজের নিচে চাপা পড়ে গেছে। প্রথাগত সংবাদমাধ্যম বলি আর বিপ্লবী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বলি, কোনো মাধ্যমেই আমাদের দৃষ্টি ও মনোযোগ খুব প্রসারিত নয়। উভয় মাধ্যমে কিছু সময় ধরে নির্দিষ্ট একটা বিষয়েই প্রায় সব আলোচনা কেন্দ্রীভূত থাকে। বেশির ভাগ আলোচনা হয় নেতিবাচক ঘটনা নিয়ে: গুরুতর কোনো অপরাধ কিংবা বড় ধরনের কোনো কেলেঙ্কারি কিছু সময় ধরে আমাদের সব মনোযোগ অধিকার করে থাকে।
সন্দেহ নেই যে বনানীর ঘটনাটি ভীষণ ধিক্কারজনক। বড় ঘটনাই বটে। তবে ঘটনাটা নৃশংস ছিল না, সেখানে কারও মৃত্যু ঘটেনি, অনেক ধর্ষণের ঘটনায় যেমনটা ঘটে। এই ঘটনার তুলনায় গাজীপুরের কর্ণপুর গ্রামের দরিদ্র হজরত আলী ও তাঁর আট বছর বয়সী মেয়ের ঘটনাটি অনেক বেশি মর্মান্তিক। কিন্তু আমাদের অনেকেই জানেন না, আসলে তাঁদের কী ঘটেছে। যাঁরা খবরটা শুনেছিলেন, তাঁদের কেউ কেউ হয়তো ইতিমধ্যে ভুলেও গেছেন। আসুন, স্মরণ করি।
২৯ এপ্রিল হজরত আলী তাঁর বাচ্চা মেয়েটিকে নিয়ে চলন্ত ট্রেনের সামনে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। কেন? খবরের কাগজে ছোট্ট করে হলেও তা লেখা হয়েছে। তাঁর এই বাচ্চা মেয়েটি মাত্র প্রথম শ্রেণিতে পড়ত। বিদ্যালয়ে যাওয়ার সময় তাকে উত্ত্যক্ত করত ফারুক নামের এক বখাটে যুবক। হজরত আলী ফারুকের বাবার কাছে নালিশ করেছিলেন। কাজ হয়নি। হজরত আলী স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের এক সদস্যের কাছে গিয়েও ধরনা দিয়ে বলেছিলেন, তাঁর বাচ্চা মেয়েটিকে বখাটে যুবকটার উপদ্রব থেকে বাঁচাতে কিছু যেন করা হয়। সেই ইউপি সদস্য নাকি হজরত আলীকে পাগল ঠাউরেছেন, তাঁর কথায় ভ্রুক্ষেপই করেননি, বরং দূর দূর করে তাড়িয়ে দিয়েছেন
তাঁকে। অবশেষে হজরত আলী গিয়েছেন থানায়। কিন্তু থানা-পুলিশ কি গরিব মানুষকে পাত্তা দেয়? তারাও তাঁর আকুতি-মিনতি উপেক্ষা করেছে।
দুর্বৃত্ত ফারুকের উপদ্রব থেকে শিশু মেয়েটিকে বাঁচানোর আশায় হজরত আলীর এই দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়ানোর একটা ফল হলো: ফারুক ও তার দোস্তরা হজরত আলীর একটা গরু নিয়ে গিয়ে জবাই করে খেয়ে ফেলেছে।
তারপর হজরত আলীর হয়তো মনে হয়েছিল, এ পৃথিবীতে তাঁর সহায় বলতে কেউ নেই। তাঁর বাচ্চা মেয়েটিকে বাঁচানোর সব পথ ফুরিয়ে গেছে। তারপর ফারুক মেয়েটিকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল, ধর্ষণ করে উঠতে পেরেছিল কি না, তা ঠিক পরিষ্কার নয়, তবে এমন গুরুতর কিছু একটা ঘটেছিল যে হজরত আলীর জীবন ও জগতের ওপর চূড়ান্ত বিতৃষ্ণা চলে এসেছিল। মেয়েকে নিয়ে তিনি চলে গেলেন এমন এক জগতে, যেখানে ফারুকের মতো শ্বাপদেরা নেই।
হজরত আলী ও তাঁর শিশু মেয়েটির এই মর্মান্তিক ঘটনায় আমাদের সমাজ সেই মাত্রায় সোচ্চার হয়নি, যতটা হলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার টনক নড়ে, তাদের নিষ্ক্রিয়তা দূর হয়। গাজীপুরের পুলিশ এখনো ফারুককে গ্রেপ্তার করতে পারেনি, তারা বলছে ফারুক গা ঢাকা। তারা তাকে গ্রেপ্তার করার জন্য ‘অভিযান’ চালিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু ফারুককে কোথাও খুঁজে পাচ্ছে না। হজরত আলী ইউপি সদস্যের কাছে ধরনা দিয়ে যেমন পাত্তা পাননি, তেমনি পাত্তা পাননি পুলিশের কাছে ধরনা দিয়েও। কিন্তু হজরত আলী মেয়েকে নিয়ে আত্মহত্যা করার পর পুলিশ ওই ইউপি সদস্যের ওপর চড়াও হয়েছে: জনপ্রতিনিধি হয়ে তিনি কেন হজরত আলীর নালিশ আমলে না নিয়ে উল্টো তাঁকে তাড়িয়ে দিয়েছেন? পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করেছে। কিন্তু পুলিশ নিজেও যে হজরত আলীর সঙ্গে একই ধরনের আচরণ করেছে, তার বিচার কে করবে?
ঢাকার জুরাইনের এক কিশোরী ধর্ষণের ঘটনা আরও গুরুতর। ২৮ এপ্রিল রাতে তাকে দলবদ্ধভাবে ধর্ষণ করা হয়েছে। মেয়েটি স্বামীর সঙ্গে ঝগড়া করে বাসা থেকে বের হয়ে যাচ্ছিল, তখন এক পরিচিত তরুণ তাকে সহযোগিতা করার ভান করে নিয়ে যায় একটি স্কুলে। স্কুলটির এক নিরাপত্তাকর্মীর সহযোগিতায় সেই তরুণ ও তার চার-পাঁচজন বন্ধু মিলে মেয়েটিকে নিয়ে যা করে, তার বিবরণ বিভীষিকাময়। কিন্তু স্কুলের নিরাপত্তাকর্মীটি ছাড়া আর কোনো ধর্ষককে পুলিশ গ্রেপ্তার করতে পারেনি। কদমতলী থানার পুলিশ বলছে, আসামিদের খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কিন্তু বিস্ময়ের কথা হলো, ধর্ষকেরা ওই মেয়ের বাবাকে মুঠোফোনে ফোন করছে। তারা তাঁকে বলছে, মামলা চালিয়ে কী হবে? অর্থাৎ, মামলা তুলে নাও।
গাজীপুরের হজরত আলীর মেয়ে কিংবা জুরাইনের এই মেয়ের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তোলপাড় হচ্ছে না, মূলধারার সংবাদমাধ্যমেও তেমন হইচই নেই। তাই এই দুটি মামলার আসামিদের গ্রেপ্তার করার ব্যাপারে আইন প্রয়োগকারীদের বিশেষ তাগিদ নেই। অন্তত আমরা তা দেখতে পাচ্ছি না। বনানীতে সংঘটিত অপরাধের শিকার দুই তরুণীর পক্ষে সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সোচ্চার হওয়া এবং তার ফলে আইন প্রয়োগকারীদের টনক নড়া ও সক্রিয় হয়ে ওঠার ঘটনায় স্বস্তিদায়ক দিকের উল্টো পিঠেই আছে হতাশাব্যঞ্জক দিক। সেটা হলো, আমাদের আইন প্রয়োগের ব্যবস্থা সাধারণভাবে অকার্যকর, এর কার্যকর হয়ে ওঠা ব্যতিক্রমী ব্যাপার। গাজীপুর ও জুরাইনের ঘটনা দুটি সাধারণ; বনানীর ঘটনাটি ব্যতিক্রমী।
কিন্তু ব্যতিক্রম দিয়ে রাষ্ট্র ও সমাজ চলে না। আইনের প্রয়োগ হতে হয় পরিস্থিতি-নির্বিশেষে সব সময়ের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, ব্যতিক্রমী কিছু নয়। প্রতিটি অপরাধের ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষ অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগের জন্য সর্বোচ্চ গুরুত্ব ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে সক্রিয় হয়ে না উঠলে আকস্মিক একটা-দুটো ঘটনায় ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত অপরাধ দমনে কিংবা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় কোনো কাজে আসবে না। বনানীর ধর্ষণের ঘটনায় আইন প্রয়োগকারীরা অতি-বিত্তশালী আসামিদেরও শেষ পর্যন্ত গ্রেপ্তার করতে বাধ্য হয়েছেন—এতে সংবাদমাধ্যমকর্মী ও অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট জনতার আত্মশ্লাঘা বোধ হতে পারে এই ভেবে যে জনমতের চাপ কাকে বলে তা দেখিয়ে দেওয়া হলো। কিন্তু আমাদের আইন প্রয়োগব্যবস্থা জনমতের চাপ ছাড়া কাজ করবে না—এটা তো মেনে নেওয়া যায় না। এই ব্যবস্থার ব্যতিক্রমী সক্রিয়তাকে সব সময়ের স্বাভাবিক সক্রিয়তায় পরিণত করতে হবে।
কিন্তু সেটা কীভাবে সম্ভব? প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে শুরু করে খোদ রাজধানী পর্যন্ত সারা দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিনিয়ত খুন-ধর্ষণসহ নানা রকমের গুরুতর অপরাধ ঘটে চলেছে। প্রতিটি অপরাধের ঘটনা সংবাদমাধ্যমে কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমান গুরুত্ব পাচ্ছে না, পাওয়া সম্ভব নয়। প্রতিটি ঘটনায় দেশের মানুষ বিচারের দাবিতে একই মাত্রায় সোচ্চার হয়ে উঠবে—এ রকম আশা করা যায় না। তাহলে কি অপরাধের শিকার মানুষদের ন্যায়বিচার পাওয়ার কোনো স্বাভাবিক ব্যবস্থা আদৌ থাকবে না? জনগণের করের টাকায় যে আইন প্রয়োগ ব্যবস্থা পরিচালিত হয়, জনমতের প্রচণ্ড চাপ ছাড়া তা নিষ্ক্রিয়ই থেকে যাবে?
মশিউল আলম: সাংবাদিক ও সাহিত্যিক।
mashiul.alam@gmail.com





« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: info@iportbd.com, বার্তা বিভাগ: newsiport@gmail.com