Friday, 19 January, 2018, 7:27 PM
Home জাতীয়
প্রতিবাদের লেটেস্ট স্টাইল!
চিররঞ্জন সরকার লিখেছেন ইত্তেফাকে
Published : Sunday, 21 May, 2017 at 12:00 AM, Update: 21.05.2017 4:30:08 PM, Count : 1
প্রতিবাদ। ব্যক্তি কিংবা সমষ্টির অসন্তোষ, নরম করে বললে অপছন্দের প্রকাশ। মোটা দাগে। এটা যেকোনো প্রাণীর সহজাত প্রবৃত্তি। প্রকাশ ভঙ্গিমা পৃথক। মানুষের ক্ষেত্রে এর স্বরূপ নানা মাত্রিক। কখনো মূক, কখনো মুখর। কখনো বাঙ্ময়, কখনো প্রতীকী। অন্যায়, অসাম্য, পরাধীনতা, শোষণ ও নিপীড়ন, হত্যা আর লুণ্ঠন সবকিছুর বিরুদ্ধেই সরব হয়েছে বিবেকবান মানুষ। রাজপথে নেমেছে। জীবন দিয়েছে। সবকিছুরই সাক্ষী ইতিহাস। একুশ শতকেও অব্যাহত সেই ধারা।

হরতাল, ঘেরাও, অবরোধ, আন্দোলন, জ্বালাও-পোড়াও-ভাঙচুর, সরকারি স্থাপনায় হামলা, পুলিশের উপর হামলা, টায়ার জ্বালানো, রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া ইত্যাদি সহিংস কর্মসূচি আছে। নিরীহ মানুষের উপর পেট্রোল বোমা মারা, গুলি করে মানুষ মারা এগুলোও আমাদের দেশে প্রতিবাদের ভাষা! আবার মিছিল, স্লোগান, আলাপ-আলোচনা, স্মারকলিপি দেওয়া, অনশন, অবস্থান এগুলোও প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে বেশ জনপ্রিয়। পশ্চিমারা অনেক সময় নগ্ন হয়ে প্রতিবাদ করেন। আমাদের দেশে একসময় লালপাড় সাদা শাড়ি লাল টিপ পরে সংস্কৃতিকর্মীরা পাকিস্তানি শাসকদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। এখন অবশ্য দিন বদলেছে। মানুষ খুবই আয়েশী হয়ে উঠেছে। কিন্তু নিজের সমর্থনে যুক্তি দেওয়ার প্রবণতা ব্যাপকহারে বাড়ছে। রাস্তায় প্রতিবাদ জানানো মানে অনেক হাঙ্গামার ব্যাপার। এজন্য অনেক সময় ও এনার্জি ব্যয় করতে হয়। পুলিশের লাঠিপেটা-টিয়ারগ্যাস এমনকি ধরে নেওয়ারও শঙ্কা থাকে। তবে বর্তমানে ঢাকার রাজপথে প্রতিবাদ-আন্দোলনের আরেকটি ভয়ঙ্কর দিকও আছে। ঢাকা শহর হচ্ছে পৃথিবীর ব্যস্ততম শহর। এখানকার মানুষকে সারাক্ষণই দৌড়ের উপর থাকতে হয়। এখানকার রাস্তাঘাটে কোথাও একটু ছন্দপতন ঘটলে জীবনে একটা বড় ছন্দপতন নেমে আসে। অনেক ক্ষেত্রেই ‘প্রতিবাদ-আন্দোলন’ ঢাকা শহরের নতুন আপদের নাম। এখন দেশে অসংখ্য পেশাজীবী গ্রুপ রয়েছে। প্রত্যেক গ্রুপেরই রয়েছে আলাদা আলাদা সমস্যা এবং সংগঠন। দাবি-দাওয়া আদায় করতে তারা প্রায়ই রাজপথে নেমে যায়। আর ঢাকা শহরে দশটা লোকও যদি একযোগে রাস্তায় নামে, তাহলেই রাস্তা বন্ধ! আর যদি ওই পথটা পাঁচ মিনিটের জন্যও বন্ধ থাকে, তাহলে অন্তত ৫০ হাজার মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হয়। একটা সড়ক কিছুক্ষণের জন্য আটকে দেওয়া মানেই হচ্ছে অন্য রোডগুলোতে বাড়তি চাপ সৃষ্টি হওয়া। বিচিত্র সব যানবাহনে সয়লাব নগরীতে যদি কোনো কারণে স্বাভাবিক যান চলাচলে ছন্দপতন ঘটে তাহলে অনেক সময় ঘন্টার পর ঘন্টা লাখ লাখ মানুষকে সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হয়।

সম্প্রতি বেসরকারি মেডিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট ট্রেনিং স্কুলের (ম্যাটস) শিক্ষার্থীরা শাহবাগে নানা দাবি-দাওয়া নিয়ে রাস্তা অবরোধ করলে পুলিশ বাধা দেয়। একপর্যায়ে পুলিশের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ বাধে। এর ফলে পুরো অঞ্চলে বেধে যায় সীমাহীন যানজট। গ্রীষ্মের এই তপ্ত গরমে বিভিন্ন মুড়ির-টিন মার্কা যানবাহনে বসে যারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা গরমে সিদ্ধ হন তারা কিন্তু ম্যাটস শিক্ষার্থীদের দাবির যৌক্তিকতা বিচার করেন না। তারা আন্দোলন বা প্রতিবাদকারীর চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করে গালাগাল করেন (গালাগাল আর অভিশাপের যদি তেজ থাকতো, তাহলে আন্দোলনকারীদের চৌদ্দগুষ্টি ভস্ম হয়ে যেতো)! রাজধানীতে অনেক মহত্-আন্দোলনও যানজটে আটকা ভুক্তভোগী মানুষের গালাগাল ও অভিসম্পাতের কারণে পরিণত হয়। কাজেই ঢাকা শহরে সড়ক বন্ধ করে আন্দোলন মানেই হচ্ছে অসংখ্য মানুষের অভিশাপ কুড়ানো। কাজেই বাস্তব কারণেই ট্রাডিশনাল প্রতিবাদ-আন্দোলনকে অনেকে এখন আর যৌক্তিক মনে করেন না। এখন সবচেয়ে নিরাপদ ও জনপ্রিয় প্রতিবাদ হচ্ছে ফেসবুক প্রতিবাদ। যুগের হাওয়া বলে কথা! এরও আবার বিভিন্ন ধরন আছে। নিচে এর কয়েকটি উল্লেখ করা হলো:

ব্যক্তিগত প্রতিবাদ: জীবনে যা ঘটছে ফেসবুকে চুপচাপ লিখে ফেলাকে বলে ব্যক্তিগত প্রতিবাদ। রমনা পার্কে কিংবা চন্দ্রিমা উদ্যানে হাওয়া খেতে-খেতে লাইভ আপডেট দিলে, সেটা বায়ুদূষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ।

প্রাকৃতিক প্রতিবাদ: ব্যক্তিগত প্রাকৃতিক কাজকর্মকে এখানে প্রতিবাদের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ‘পেটটা খারাপ, এখন কমোডে’, কিংবা ‘কী ঝাল, নাকের পানি পড়ছে’, এ ধরনের অমোঘ উচ্চারণ প্রাকৃতিক প্রতিবাদের উদাহরণ। এসব ফেসবুকে অনর্গল লিখে চলা আসলে প্রাইভেসির ট্যাবুর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, সাড়ে ১৫শ’ লাইক দেখলেই যার কার্যকারিতা বোঝা যায়। পেট খারাপের খবরের সঙ্গে কমোডের ভিজুয়াল দিতে পারলে এই বিদ্রোহের জোর বাড়ে।

আছে শক-থেরাপি নামে এক ধরনের ভার্চুয়াল প্রতিবাদ। বোরিং জনসংযোগের পরিবর্তে পাবলিককে শর্টকাটে শক-দানই লক্ষ্য বলে এটির পোশাকি নাম শক-থেরাপি।

আসুন আমরা প্রতিবাদের লেটেস্ট স্টাইল ‘ফেসবুকীয় প্রতিবাদ’কে জীবনের ধ্রুবতারা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করি!

লেখক :রম্য লেখক








« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: info@iportbd.com, বার্তা বিভাগ: newsiport@gmail.com