Saturday, 24 June, 2017, 2:40 PM
Home আন্তর্জাতিক
ভারত কি ‘ভালো দর্শক’ হয়ে থাকবে?
এ কে এম জাকারিয়া লিখেছেন প্রথম আলোতে
Published : Saturday, 20 May, 2017 at 12:00 AM, Update: 20.05.2017 7:21:40 PM, Count : 2

চীনের নতুন রেশম পথের উদ্যোগ ‘এক অঞ্চল, এক পথ’ (ওয়ান বেল্ট, ওয়ান রোড বা ওবিওআর) সম্মেলনকে সফল হিসেবে বিবেচনা না করার কারণ নেই। দুই দিনের এই সম্মেলনে বিশ্বের ৩০টি দেশের নেতাদের বেইজিংয়ে জড়ো করতে পেরেছিল দেশটি। এই সম্মেলনের ঘোষণাপত্রে তাঁরা সই করেছেন। আর সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন ১০০টিরও বেশি দেশের প্রতিনিধিরা। নতুন রেশম পথের উদ্যোগ সব অর্থেই এক বড় উচ্চাভিলাষী উদ্যোগ। এই পথ এশিয়াকে ইউরোপ ও আফ্রিকার সঙ্গে সংযুক্ত করবে। কিন্তু এই যে এত বিশাল উদ্যোগ, উদ্যোক্তা দেশ চীনের প্রেসিডেন্টের ভাষায় যা ‘শতাব্দীর পরিকল্পনা’, সেখানে এশিয়ার আরেক আঞ্চলিক শক্তি ভারত নেই। চীনের তরফে এরই মধ্যে এটা পরিষ্কার করা হয়েছে যে ভারত থাকুক বা না–থাকুক, তাতে তাদের নতুন রেশম পথের উদ্যোগ ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। বিষয়টি কি আসলেই তাই? এ অঞ্চলের জটিল ভূরাজনীতির হিসাব–নিকাশ কি তা–ই বলে?
‘এক পথ, এক অঞ্চল’ ধারণাটি একান্তভাবেই চীনের। দেশটির প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং ২০১৩ সালে এই ধারণা তুলে ধরেছিলেন। প্রাচীন যুগে চীন ও পূর্ব এশিয়ার অধিকাংশ অঞ্চল যে পথ দিয়ে বাকি বিশ্বের সঙ্গে যুক্ত ছিল, সেটাই চীনের তখনকার সবচেয়ে বড় রপ্তানি পণ্য সিল্ক বা রেশমের নামে সিল্ক রোড হিসেবে পরিচিত ছিল। ‘এক পথ, এক অঞ্চল’ ধারণার লক্ষ্য হচ্ছে বর্তমান সমুদ্রপথ প্রাচীন রেশম পথের অর্থনৈতিক অঞ্চলের মধ্যে সমন্বয় করা। এটা সাধারণভাবে একটি অর্থনৈতিক উদ্যোগ, তবে এর মধ্যে যে বিশ্বরাজনীতিতে চীনের কৌশলগত প্রভাব বিস্তারের আকাঙ্ক্ষা রয়েছে, তাতে সন্দেহ নেই। দেখা গেল, এ ধারণা প্রকাশের চার বছরের মাথায় বেইজিং সম্মেলনের মধ্য দিয়ে চীন এই এই উদ্যোগের অন্তত একটি বাস্তব আকার দিতে পেরেছে। বিশ্বপরিস্থিতি এর মধ্যে অনেক পাল্টে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশ এখন বিশ্বায়নবিরোধী অবস্থানে চলে গেছে। ফলে এই ধারণা যখন নেওয়া হয়, তখন চীনের যে রাজনৈতিক ও কৌশলগত চাওয়া কাজ করেছিল, বর্তমান বিশ্ববাস্তবতা তা অর্জনের পথকে আরও সহজ করে দিয়েছে।
ভারত এই প্রকল্প থেকে সরে দাঁড়িয়েছে, কারণ নতুন এই রেশম পথের একটি অংশ চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর (সিপিইউ) পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত জম্মু ও কাশ্মীরের মধ্য দিয়ে গেছে। বেইজিংয়ে সম্মেলন শুরুর আগের দিন ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে, দেশের সার্বভৌমত্ব ও ভূখণ্ডগত অখণ্ডতাকে ক্ষুণ্ন করে এমন কোনো প্রকল্পে ভারত থাকতে পারে না। ভারতের এই অবস্থান চীনের কাছে ‘দুঃখজনক’, তবে একই সঙ্গে চীনের বক্তব্য হচ্ছে, ভারত অংশ না নিলেও এই উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হবে না।
তবে চীন মুখে যা-ই বলুক, এমন একটি উদ্যোগে ভারতকে যুক্ত করতে না পারা চীনের জন্য সত্যিই অস্বস্তির বিষয়। বেইজিং সম্মেলনের দলিলে ফ্রান্স, জার্মানি, গ্রিস, পর্তুগাল ও এস্তোনিয়ার মতো দেশ সই করেনি। যুক্তরাজ্য এই উদ্যোগে এখনো যুক্ত হয়নি। কিন্তু এসব ছাপিয়েও এই উদ্যোগ থেকে ভারতের বাইরে থাকা যে চীনের জন্য সবচেয়ে বড় খচখচের বিষয়, তা বোঝা যায় সম্মেলন শেষ হওয়ার পর প্রকাশিত চীনের গ্লোবাল টাইমস পত্রিকার সম্পাদকীয়তে। এর শিরোনামটিই ভারতকে নিয়ে: ‘চীনের সঙ্গে বিরোধ ছাপিয়ে ভারতকে সামনে দেখতে হবে’।
ভারতের অংশগ্রহণ না করা প্রশ্নে সম্পাদকীয়টিতে বলা হয়েছে, জোরালো হয়ে ওঠা জাতীয়তাবাদী ডামাডোলে ভারতের জনমত চীনের ব্যাপারে চরম সংবেদনশীল হয়ে উঠছে। ভারত উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক মর্যাদার ব্যাপারে চীনের সঙ্গে নিজেকে তুলনা করতে চায়। অন্যদিকে পাকিস্তানের সঙ্গে চীনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কোন্নয়নে ভারতের প্রবল আপত্তি আছে। মূলত অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে জাতীয়তাবাদের প্রদর্শনী করতে ভারত এই প্রকল্পের ব্যাপারে আপত্তি জানিয়েছে।
সম্পাদকীয়টিতে বলা হয়েছে, ‘সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন-ভারত সম্পর্কে নতুন সমস্যা সৃষ্টি হওয়ার পাশাপাশি পুরোনো সমস্যাও জিইয়ে আছে। যেমন নয়াদিল্লি আশা করে, বেইজিং জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ কর্তৃক পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গিগোষ্ঠী আর্মি অব মোহাম্মদকে কালো তালিকাভুক্তির উদ্যোগে সমর্থন করবে। আবার ভারত নিউক্লিয়ার সাপ্লায়ার্স গ্রুপে যোগ দিতে চায়। তারা আশা করে, চীন এ ব্যাপারেও তাদের সমর্থন করবে। কিন্তু চীন ভারতের চাওয়া অনুযায়ী কাজ করে না। ভারত আশা করে, তারা আরও সক্রিয়ভাবে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে গড়েপিটে নিতে পারবে। তারা আশা করে, চীন ভারতের স্বার্থের ব্যাপারে বিশেষ মনোযোগ দেবে। কিন্তু আন্তদেশীয় সম্পর্ক ঠিক এভাবে কাজ করে না।
ভারত যদি নিজেকে বড় শক্তি হিসেবে দেখতে চায়, তাহলে চীনের সঙ্গে তার যেসব অমিল আছে, সেগুলোর সঙ্গে তাকে মানিয়ে নিতে হবে। অর্থাৎ, এটা তাকে সামাল দিতে হবে। বড় দেশের কূটনীতি বহুমুখী। দুটি বড় দেশ সব বিষয়ে একমত হবে, তা প্রায় অসম্ভব। চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার পার্থক্য থেকে ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে যায়। কিন্তু চীন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মসৃণ সম্পর্ক বজায় রেখেছে, নয়াদিল্লি যেখান থেকে শিখতে পারে।’
আমরা জানি যে চীন সরকারের রাষ্ট্রীয় নীতির প্রতিফলন ঘটে রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত গ্লোবাল টাইমস পত্রিকায়। এর সম্পাদকীয় মানে সরকারেরই বক্তব্য। এতে স্পষ্টতই ভারতের প্রতি খোঁচা রয়েছে। একটি ‘বড় শক্তি’ হতে হলে ভারতের কী করা উচিত, সে বিষয়ে রাখঢাক না করেই পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এবং এটাও বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে যে চীন ভারতকে তার মতো ‘বড় শক্তি’ হিসেবে বিবেচনা করে না।
চীনের এই ‘এক অঞ্চল, এক পথ’ উদ্যোগ ও বেইজিং সম্মেলনের সফলতা আঞ্চলিক ভূরাজনীতির প্রতিযোগিতায় ভারতকে স্বাভাবিকভাবেই চাপে ফেলেছে ও ফেলবে। ভারত এই সম্মেলনে যোগ দেয়নি কিন্তু ভারতে ঘিরে থাকা প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে ভুটান ছাড়া বাকি সব দেশই এই উদ্যোগের সঙ্গে আছে এবং সম্মেলনে যোগ দিয়েছে। দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের ভূমিকায় অসন্তুষ্ট এবং দেশটিকে আধিপত্যবাদী মনে করে এমন এশীয় দেশগুলোও (ভিয়েতনাম ও জাপান) সম্মেলনে প্রতিনিধি পাঠিয়েছে। এমন একটি সর্বএশীয় উদ্যোগ থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন রাখা কৌশলগতভাবে ভারতকে কী দেবে? নতুন এই বাস্তবতাকে ভারত কীভাবে মোকাবিলা করবে, তা–ও এক বড় প্রশ্ন।
ভারতীয় সাংবাদিক পি কে বালাচন্দ্রন সাউথ এশিয়া মনিটরে এক প্রবন্ধে (ইন্ডিয়া আইসোলেটেড ইটসেলফ অ্যাজ দ্য রেস্ট অব এশিয়া জয়েনস চায়নাস ওবিওআর সামিট) লিখেছেন, চীনের ‘এক অঞ্চল, এক পথ’ উদ্যোগ থেকে দূরে থেকে ভারত বাকি এশিয়া থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে। দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর একচেটিয়া প্রভাব রয়েছে বলে দিল্লি দাবি করে, কিন্তু সেই দেশগুলো এ ক্ষেত্রে ভারতের সঙ্গে নেই। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো তাদের অবকাঠামোগত উন্নয়নে চীনের আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সুবিধা কাজে লাগাতে চায়। তিনি লিখেছেন, মোদি দূরে সরে থাকলেও পাকিস্তান, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা ও নেপাল চীনের এই উদ্যোগ থেকে সুবিধা পাবে বলে এগিয়ে গেছে।
ভারত ওবিওআর থেকে সরে যাওয়ার কারণ হিসেবে ‘সার্বভৌমত্ব’ ও ‘ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা’ ক্ষুণ্ন হওয়ার কথা বলেছে। কিন্তু বিষয়টি কি শুধুই তাই? আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে ভারত নিজেকে চীনের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচনা করে। চীনের কোনো উদ্যোগের সঙ্গে থাকার অর্থ হচ্ছে চীনের ‘সহযোগী’ হওয়া। ভারত যাকে প্রতিদ্বন্দ্বী বা সমকক্ষ মনে করে, তার ‘সহযোগী’ সম্ভবত দেশটি হতে চায় না। ভারতীয় বিশ্লেষক রাজা মোহন এক প্রবন্ধে লিখেছেন, চীনের এই উদ্যোগ ভারতের প্রতিবেশীদের ওপর চীনের বাণিজ্যিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত প্রভাবকে আরও জোরালো করবে, যা দিল্লির প্রভাবকে দুর্বল করবে। এই উদ্যোগে চীন শুধু অর্থনৈতিকভাবেই লাভবান হবে না, বরং সামরিকভাবেও সুবিধা পাবে। তিনি লিখেছেন, দিল্লি নিজেকে বেইজিংয়ের সমকক্ষ হিসেবে বিবেচনা করে। তার পক্ষে চীনের সহযোগী হিসেবে খেলা বেশ কঠিন। এই উদ্যোগের দীর্ঘমেয়াদি পরিণতি নিয়ে দেশটির মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। কিন্তু এর পক্ষে যে হাওয়া রয়েছে, তাতে ভারতের বিরোধিতা খুব ভূমিকা পালন করবে বলে মনে হয় না।
চীনের এই প্রকল্প যে ভারতের জন্য বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে ও দাঁড়িয়েছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। গ্লোবাল টাইমস–এর প্রতিবেদক ওয়াং জাইমি এক প্রতিবেদনে লিখেছেন, চীন আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতকে এই উদ্যোগে যুক্ত হওয়ার অনুরোধ করেছে। ভারত যদি তাতে অংশ নিতে না চায়, তবে দেশটির উচিত এ ক্ষেত্রে ভালো দর্শকের ভূমিকা পালন করা। ভারত যদি অবস্থান পরিবর্তন করে, তবে দেশটির ভূমিকা রাখার সুযোগ এখনো আছে, খুব বেশি দেরি হয়ে গেলে সে সুযোগ কমে আসবে।
আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে চীন ও ভারতের মধ্যে সম্পর্কটি স্পষ্টতই প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, চীনের যে উদ্যোগ দেশটিকে অর্থনৈতিক সুবিধা দেওয়ার পাশাপাশি বিশ্বরাজনীতিতে তার প্রভাব-প্রতিপত্তি বাড়াবে, সামরিক সুবিধা নিশ্চিত করবে এমন একটি কার্যক্রমের ব্যাপারে ভারত কি শুধু ‘ভালো দর্শক’ হয়ে থাকবে? নাকি শেষ পর্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বী চীনের উদ্যোগের ‘সহযোগী’ হবে? নাকি নতুন কোনো কৌশল নিয়ে অপেক্ষায় আছে ভারত? যা পরিষ্কার হতে হয়তো আরও সময় লাগবে।
এ কে এম জাকারিয়া: সাংবাদিক।
akmzakaria@gmail.com

 









« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: info@iportbd.com, বার্তা বিভাগ: newsiport@gmail.com