Sunday, 19 November, 2017, 3:21 AM
Home
রাজনীতি দেশ বদলাতে চায়, নিজে বদলায় না
সোহরাব হাসান লিখেছেন প্রথম আলোতে
Published : Saturday, 20 May, 2017 at 12:00 AM, Count : 0
ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের দাবি, তারা বাংলাদেশকে বদলে দিয়েছে। স্বল্পোন্নত দেশকে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করেছে; শিগগিরই মধ্যম আয়ের দেশ হয়ে যাবে। অন্যদিকে বিরোধী দল বিএনপি বলেছে, বদলের যা বাকি আছে, তারা সেটি ২০৩০ সালের মধ্যে সম্পন্ন করে ফেলবে।
রাজনৈতিক নেতৃত্ব দেশবদলের কথা বলবেন, দেশের উন্নয়নের নতুন কর্মসূচি ও রূপরেখা দেবেন—এটাই স্বাভাবিক। অর্থনীতি যেকোনো দেশের উন্নয়নের মাপকাঠি হলেও তার মূল চাবিটি থাকে রাজনৈতিক দল বা নেতৃত্বের কাছেই। রাজনৈতিক নেতৃত্বই দেশ স্বাধীন করেছেন এবং সামরিক শাসনের সময়টা বাদ দিলে তাঁদের দ্বারাই দেশ পরিচালিত হয়ে আসছে। গত ৪৬ বছরে বাংলাদেশের অর্জনের কৃতিত্ব যেমন তাঁদের প্রাপ্য, তেমনি মন্দের দায়ভারও তাঁরা এড়াতে পারেন না।
জেনারেল জিয়াউর রহমান ও হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শাসনকাল বাদ দিলাম। তাঁরা বন্দুকের জোরে ক্ষমতায় এসে নিজেদের গণতান্ত্রিক চরিত্র দেওয়ার চেষ্টা করলেও দেশের সর্বোচ্চ আদালত সেই শাসনকে অবৈধ ঘোষণা করেছেন। তবে এতে রাজনৈতিক নেতৃত্বের খুব আহ্লাদিত হওয়ার কিছু আছে বলে মনে হয় না।
এক-এগারোর সেনাসমর্থিত সরকারের আমলে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে গোয়েন্দা সংস্থা কর্তৃক কর আদায়সংক্রান্ত মামলায় মাননীয় সুপ্রিম কোর্ট যে রায় দিয়েছেন, তা সংশ্লিষ্ট সবার জন্যই সতর্কবার্তা হয়ে থাকবে। রায়ে বলা হয়, ‘একটি গণতন্ত্রে দুই ধরনের বিপদ থেকে সশস্ত্র বাহিনীসহ রাষ্ট্রকে বাঁচাতে সাংবিধানিক গ্যারান্টি (সুরক্ষা) থাকা উচিত। দুই বিপদের একটি হলো রাজনীতিবিদগণ, যাঁদের সামরিক উচ্চাভিলাষ রয়েছে এবং অন্যটি হলো সামরিক বাহিনীর সদস্য, যাঁদের রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ রয়েছে।’ (প্রথম আলো, ১৮ মে, ২০১৭) এই রায় যেমন এক-এগারোর কুশীলবদের কঠোর সমালোচনা করেছে, তেমনি সাবেক রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ সংবিধানের বিধানাবলি লঙ্ঘন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হয়ে যে তার প্রেক্ষাপট তৈরি করেছেন, তা–ও জানিয়ে দিতে কসুর করেনি।
এই রায়ে যে ছয় দফা নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, তা যেকোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য অপরিহার্য বলে মনে করি। অন্যান্য নির্দেশনা নিয়ে অন্য কোনো সময়ে আলোচনা করা যাবে। এখানে কেবল ৫ নম্বর নির্দেশনার কথা উল্লেখ করছি। এতে বলা হয়, গণতান্ত্রিক দেশে ‘গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানসমূহ এবং তার মূল্যবোধের প্রতি আস্থাশীল একটি উন্নত নাগরিক সমাজ থাকবে এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ হিসেবে জাতির সামরিক বাহিনীর মধ্যে একটি মতৈক্য থাকবে।’ (প্রথম আলো ১৮ মে, ২০১৭) স্বীকার করতে হবে, গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানসমূহ অতীতের চেয়ে আরও দুর্বল হয়েছে। রাজনৈতিক দলও একটি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান। রাজনীতিকেরা সেই প্রতিষ্ঠানটিকে আরও বেশি ব্যক্তিনির্ভর ও কর্তৃত্ববাদী করে তুলেছেন। আর দেশে শক্তিশালী দূরের কথা, একটি দুর্বল নাগরিক সমাজের অস্তিত্বও তাঁরা স্বীকার করতে চান না। রাজনৈতিক নেতৃত্ব নাগরিক সমাজের কাছ থেকে কেবল বাহ্বা পেতে চান। কেউ সমালোচনা করলে, কিংবা ভুলত্রুটি ধরলে কপালে দেশদ্রোহীর তকমা বসিয়ে দেন। রাজনীতিকেরা ভাবেন—দেশপ্রেম, গণতন্ত্রপ্রেম তাঁদের একচেটিয়া। সেখানে অন্য কারও মাথা ঘামানোর সুযোগ নেই।
অনেকে ভাবতে পারেন, ধান ভানতে গিয়ে শিবের গীত গাইছি। রাজনীতি বা রাজনৈতিক দলের সংস্কারের কথা বলতে গিয়ে কেন আদালতের রায় টেনে আনলাম? আনলাম এ কারণে যে এই রায়ে এমন কিছু আছে, যা রাজনীতি ও রাজনীতিকদের জন্য শিক্ষণীয় হতে পারে। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় কোনো কিছুই রাজনীতির ঊর্ধ্বে নয়। আমাদের দুর্ভাগ্য, স্বাধীনতার পর হরেক রকমের সরকার এলেও কেউ রাষ্ট্রকাঠামো কিংবা রাজনীতিতে মৌলিক কোনো পরিবর্তন আনেনি। রোগ না সারিয়ে তারা কেবল রোগের উপসর্গ নিয়েই টানাটানি করেছে, এখনো করছে।
বিএনপি উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে ভিশন ২০৩০ ঘোষণা করেছে। রাজনৈতিক ক্ষমতাকাঠামোয় সংস্কার আনার কথা বলছে। তারা প্রধানমন্ত্রীর একক ক্ষমতা হ্রাস করে ভারসাম্য আনারও প্রস্তাব হাজির করেছে। খুবই ভালো প্রস্তাব। কিন্তু ক্ষমতায় থাকতে কেন তারা কাজটি করল না। মানলাম, দেরিতে বোধোদয় হয়েছে। কিন্তু দলীয় কাঠামোয় কেন ক্ষমতার ভারসাম্য আনার কথা বলছে না বিএনপি? কেন দলীয় চেয়ারপারসনের একক ক্ষমতা হ্রাস করার কথা ভাবছে না? বিএনপির গঠনতন্ত্র চেয়ারপারসনকে যে ক্ষমতা দিয়েছে, তা সম্ভবত মোগল সম্রাটদেরও ছিল না। তাঁর ইচ্ছায় কেবল বিএনপির কমিটিই হয় না; তাঁর ইচ্ছায় ছাত্রদল, যুবদল, কৃষক দল, শ্রমিক দল, স্বেচ্ছাসেবক দল ইত্যাদির কমিটিও হয়, কিংবা কমিটি ভাঙে।
অন্যদিকে আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্র অপেক্ষাকৃত গণতান্ত্রিক হলেও তার প্রয়োগ নেই। দলের সম্মেলনে নেতৃত্বের যে রদবদল হয়, তা কাউন্সিলরদের মতামতের ভিত্তিতে হয় না। কাউন্সিলররা হাত তুলে সব দায়িত্ব দলীয় সভানেত্রীর ওপর অর্পণ করেন। এটিই যদি হবে, তাহলে কাউন্সিলের কী প্রয়োজন?
দিনবদলের অঙ্গীকার নিয়ে ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ কতটা নিজের ভাগ্যবদল করেছে, আর কতটা জনগণের ভাগ্যবদল করেছে, তার কিছুটা প্রমাণ গতকাল শুক্রবারের প্রথম আলোর প্রধান শিরোনামে (‘সাংসদ হারুনের পাঁচ বছরেই এত সম্পদ!’)। এ রকম ভাগ্যবান সাংসদ আওয়ামী লীগে আরও অনেকে আছেন। ২০০৮ সালে মানুষ যখন বিএনপির দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়ে জয়ী করেছিল, তখন তারা সত্যি সত্যি আশা করেছিল—গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তন আসবে; বিএনপি আমলের ক্রসফায়ার, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, ভিন্নমত দলন বন্ধ হবে। তারা আশা করেছিল, গণমাধ্যমের ওপর কোনো রকম খবরদারি থাকবে না। কিন্তু এখন সে খবরদারি দেশের সীমা ছাড়িয়ে বাইরেও চলে যাচ্ছে। তাহলে দিনবদল হলো কীভাবে? বিএনপি ও জাতীয় পার্টির মতো ৬৮ বছরের পুরোনো গণতান্ত্রিক দলটিতেও ‘উড়ে এসে জুড়ে বসা’ নেতাদের দৌরাত্ম্য বেড়েছে।
আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা ১৭ মের সমাবেশেও নতুন নেতৃত্বের হাতে দলের দায়িত্ব দিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করেছেন। কিন্তু নতুন নেতৃত্ব কি দলটি তৈরি করতে পেরেছে? তারা তিন দফায় (১৯৯৬-২০০১, ২০০৯-২০১৩, ২০১৪ থেকে বর্তমান) ক্ষমতায় থেকেও দেশে ছাত্রসংসদ নির্বাচন কেন দেয়নি, সে প্রশ্নের জবাব নেই। ক্ষমতায় থাকতে বিএনপিও ওই পথে হাঁটাকে নাজায়েজ মনে করেছে।
কেবল ছাত্রসংসদ নির্বাচনই নয়, আরও অনেক ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে অদ্ভুত মিল রয়েছে। এই দুটি দলে বিশাল নির্বাহী ও কেন্দ্রীয় কমিটি রয়েছে। কিন্তু অধিকাংশই জানেন না কী নির্বাহ তাঁরা করবেন। উপদেষ্টা পরিষদের বেলায়ও একই কথা প্রযোজ্য।
রাজনীতিকেরা হবেন সমাজের সবচেয়ে আধুনিক ও রুচিশীল মানুষ। তাঁদের কথাবার্তা ও আচরণ থেকে সাধারণ মানুষ শিখবে, অনুপ্রাণিত হবে। কিন্তু রাজনীতিকেরা একে অপরের প্রতি যে ভাষা ব্যবহার করেন, একজন অারেকজনের প্রতি যেভাবে তেড়ে যান, তাতে মনে হয়, তাঁদের কাছ থেকে শেখার কিছু নেই; বরং পালিয়ে বেড়ানোই শ্রেয়।
রাজনীতিকেরা দেশকে উন্নত দেশের স্তরে নিয়ে যেতে চাইলে রাজনীতিকেও উন্নত করতে হবে। এখন তঁারাই ঠিক করুন, তাঁরা নতুন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনুসারী হবেন, না বারাক ওবামার। সাড়ে তিন মাসেই ট্রাম্প আমেরিকা ও বিশ্বের মানুষের ধিক্কার কুড়িয়েছেন, আর বারাক ওবামা আট বছর ক্ষমতায় থাকার পরও মার্কিন রাজনীতিতে সহিষ্ণুতার যে ধারা তৈরি করেছেন, তা অনুকরণীয় হয়ে আছে।
আওয়ামী লীগ জঙ্গি ও দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে চাইছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় নিয়েছে। বিএনপি আধুনিক ও জ্ঞাননির্ভর বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নির্ধারণ করে ফেলেছে। এক নেত্রী শান্তি ও সৌহার্দ্যের বাংলাদেশ চান, আরেক নেত্রী হিংসামুক্ত বাংলাদেশ চান। অথচ দুই দলেই এর বিপরীত চিত্র দেখা যায়। দুই দলের সমাবেশেই মারামারি-হানাহানি হয়। মন্ত্রী নেতার বিরুদ্ধে, সাংসদ মন্ত্রীর বিরুদ্ধে, উপজেলা চেয়ারম্যান সাংসদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। সবাই সবার বিপক্ষে। এটাই এখন রাজনৈতিক সংস্কৃতি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নব্বই-পরবর্তী রাজনীতির পোস্টমর্টেম করে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রওনক জাহান লিখেছেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলো ক্রমাগত পৃষ্ঠপোষক ও সুবিধাভোগীদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, আদর্শ বা নীতি দূরবর্তী ব্যাপারে পরিণত হয়। মানুষের সম্পদ লাভের যে প্রতিযোগিতায় তারা নামে, তার ফলে ব্যাপক দুর্নীতি ও অপরাধপ্রবণতা বেড়ে যায়। দলের ভেতরেও এসব লুটপাটের ভাগের কারণে নানা রকম উপদল গড়ে ওঠে। ফলে দলের ভেতরে শৃঙ্খলা ক্ষয়ে যায়। উপদলীয় কোন্দল ও নেতাদের হাতে ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন ঘটে, নানা রকম চক্রও গড়ে ওঠে।... দলের গঠনতন্ত্রে তৃণমূলের হাতে নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষমতা থাকলেও বস্তুত তাদের ক্ষমতা খুবই সীমিত। দলের আদর্শিক ও নীতিগত বিষয়ে খুব সামান্যই তর্ক-বিতর্ক হয়। মূল রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত সাধারণত দলের প্রধান নেতাই নিয়ে থাকেন। দলের প্রচারকাজ ও তহবিলের উৎস সাধারণত অস্বচ্ছ।’
এই অস্বচ্ছতার সর্বগ্রাসী থাবা থেকে কবে রাজনীতি স্বচ্ছতার ধারায় ফিরে আসবে? রাজনীতি দেশবদলের কথা বলে। মানুষবদলের খোয়াব দেখায়। কিন্তু নিজে বদলায় না। রাজনীতিবদলের ঝান্ডাধারীরা নিজেদের, দলের বদলকে এত ভয় পান কেন?

সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrabhassan55@gmail.com

 







« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: info@iportbd.com, বার্তা বিভাগ: newsiport@gmail.com