Sunday, 19 November, 2017, 3:21 AM
Home
নতুন রেশম পথ
‘বউজেট্টি’ নয়, ওটা যেন জাদুর ব্যাগ
অদ্বয় দত্ত লিখেছেন ইত্তেফাকে
Published : Saturday, 20 May, 2017 at 12:00 AM, Count : 0
জুন মাসে বাজেট হাসে। এই মাসে বাজেট নিয়ে যেসব কথা ভাঙা রেকর্ডের মতো বাজবে, তা হলো—সবচেয়ে উন্নয়নমুখী, দারিদ্র্যবিমোচনকারী এ বাজেট। অন্যদিকে বলা হবে—ঘোষিত বাজেটে মানুষের ভোগান্তি বাড়বে, সাধারণ মানুষের জন্য এই বাজেট কোনো সুখবর বয়ে আনবে না। দিকনির্দেশনাহীন, গরিব মারার লুটপাটের বাজেট এটি।

আবহমান কাল ধরে বিরোধীপক্ষ বাজেটের ব্যাপারে যে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে আসছেন, সেই প্রতিক্রিয়ালিপির তারিখ বদলে দিলেই হয়, শব্দের কোনো পরিবর্তনের প্রয়োজন পড়ে না। যেমন—জনসমর্থনহীন ক্ষমতালিপ্সু সরকার শাসন ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করে রাখতে এবং তাদের অনিয়ম, দুর্নীতি, লুটপাট, অপশাসন, দুঃশাসন, দলীয়করণ এবং সর্বশেষ বংশকরণ চালু করার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে এই বাজেটে।

যে দল যখন ক্ষমতায় থাকে, তখন তারা গত্বাঁধা ভাষায় বয়ান দেন—বাজেট কত ধরনের উন্নয়নের জোয়ারে ভেঙে দিচ্ছে সব বাঁধ। তারা প্রমাণ করতে চেষ্টা করেন—অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের শ্রেষ্ঠ বাজেট করেছে তাদের দল। পক্ষান্তরে বিরোধী দল বাজেট উপস্থাপন করা মাত্রই ‘গণবিরোধী বাজেট’ তকমা দিতে তিলমাত্র কালক্ষেপণ করে না।

অনেকের কাছেই বাজেট মানে বেশ গুরুগম্ভীর একটা ব্যাপার। যারা একটু-আধটু পত্রিকা পড়েন, তারা দেখে নেন কোন পণ্যের দাম বাড়ল আর কোনটার কমল। টেলিভিশনেও নানা গ্রাফে বোঝানো হয় বাজেটের আকার-প্রকার, বিভিন্ন পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি বা মূল্যহ্রাস। বঙ্গবন্ধু মাত্র ৭৮৬ কোটি টাকা দিয়ে যে বাজেটের শুরু করেছিলেন, তার আকৃতি ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এসে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৪০ হাজার ৬০৫ কোটি টাকায়। সাধারণ ঐকিক নিয়মে দেখা যায় যে, ১৬ কোটি মানুষের প্রত্যেকের জন্য বরাদ্দ থাকে ২২ হাজার ২৮৭ টাকা। তাহলে প্রত্যেকের উন্নয়নে ২২ হাজার টাকা বুঝিয়ে দিলেই হয়! এসব অবশ্য শিশুতোষ ভাবনা। দেশ চালাতে যে বিপুল অঙ্কের প্রশাসনিক ব্যয় হয়, বাজেটের বড় একটি অংশ দখল করে রাখে সেই ব্যয়। আর উন্নয়নমূলক বরাদ্দ নিয়ে লুটপাট থেকে শুরু করে যত ধরনের নেতিবাচক কথাই বলা হোক না কেন—দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নের চিত্র উজ্জ্বল হয় সেইসব বরাদ্দ থেকেই।

বাজেট আসলেই দেখা যায় যে—কেমন বাজেট হওয়া উচিত—এই ব্যাপারে জ্ঞান দেওয়ার প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়। আসলে বাজেট কীভাবে কোন খাতে কোন কারণে কোন সমীকরণে কোন হিসাবে তৈরি করা উচিত, এটা যারা কিংবা যে অণুবিভাগের কর্তকর্তারা প্রণয়ন করেন, কেবল তারাই জানেন। অনেক সমালোচক বলেন যে, বাজেট প্রণেতারাই কেবল জানেন—কোন দুই কোনখানে নিয়ে আরো দুই মিলিয়ে কীভাবে পাঁচ করবেন। হ্যা,ঁ পাঁচ করবেন। এখানে একটা অদৃশ্য ‘এক’ আছে। এই অদৃশ্য ‘এক’ হলো বরাদ্দকৃত পুরো অর্থ ব্যয় না হওয়া অংশটুকু।

এ ব্যাপারে একটা কৌতুক স্মরণ করা যাক। একজন গণিতবিদ, একজন হিসাবরক্ষক, আরেকজন অর্থনীতিবিদ আবেদন করেছেন একটা চাকরির পদের জন্য। তারা একে একে হাজির হলেন ইন্টারভিউ বোর্ডের সামনে। প্রশ্নকর্তা গম্ভীর মুখে প্রশ্ন করলেন—দুই আর দুই যোগ করলে কত হয়?

গণিতবিদ বললেন, দুই আর দুইয়ে চার হয়।

হিসাবরক্ষক বললেন, দুই আর দুই যোগ করলে গড়ে চার আসবে। তবে টেন পারসেন্ট এদিক-ওদিক হতে পারে।

আর অর্থনীতিবিদ ঝুঁকে বসলেন প্রশ্নকর্তার দিকে। স্যার, আপনিই বলুন, দুই আর দুইয়ে ঠিক কত হলে আপনার চলবে। আমি মিলিয়ে দিচ্ছি।

বাজেটের তথ্য যাতে কোনোমতেই ফাঁস না হয়, এজন্য গভীর গোপনীয়তা বজায় রাখা হয়। কারণ বাজেটের ওপর ভরসা করে থাকে গোটা শেয়ার বাজারসহ মানি মার্কেট। এবার দেখা যাক, বাজেটের সূত্রপাত হলো কবে থেকে। জানা যায়, ব্রিটিশ ভারতে বাজেট পেশের বিষয়টি প্রথম উঠে আসে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পনির হাত ধরে। সেটা ছিল ১৮৬০ সালের ৭ এপ্রিল। ওই ব্রিটিশ সংস্থাই প্রথম বোঝানোর চেষ্টা করে, এই দেশ চালানোর জন্যও একটা হিসাবনিকাশ করা দরকার। সেই চেষ্টা ফলপ্রসূ হয় ১৮৬৯ সালে। ১৮ ফেব্রুয়ারি ব্রিটিশ-ভারতের জন্য প্রথম বাজেট পেশ করেন জেমস উইলসন। রাজনীতির পাশাপাশি তিনি ছিলেন নামকরা অর্থনীতিবিদ। ১৯২৪ সালে স্যার বাসিল ব্ল্যাকেট জানালেন, ব্রিটিশ ভারতে বাজেট বক্তৃতা পড়া হবে বিকাল ৫টায়। প্রশ্ন জাগতে পারে, সারা দিন বাদ রেখে বিকেল ৫টায় কেন? জানা যায়, ব্রিটিশ-ভারতে কী বাজেট পেশ হবে, তা আগে পড়ে শোনানো হতো ব্রিটিশ পার্লামেন্টে। প্রথমে ইংরেজরা সেদেশে আগে নিজেদের বাজেট পেশ করত। তারপর তারা ভারতবর্ষের বাজেট পড়ে শোনাত। তা শেষ হলে, তবেই তা ঘোষণা হতো ভারতবর্ষে।

এই ব্রিটিশ নিয়মটি ২০০০ সাল পর্যন্ত ভারত মেনে এসেছে। বাংলাদেশেও সাধারণত বাজেট পেশ করা হয় বিকেল বেলা।

ব্রিটিশ নিয়ম মেনে এখনো একটি ব্রিফকেস নিজের সঙ্গে রাখেন অর্থমন্ত্রী। সেই ব্রিফকেসে গুঁজে রাখেন বাজেটের যাবতীয় কাগজপত্র। বাক্সটি হাতছাড়া করেন না একবারের জন্যও। এর রহস্যটিও বেশ মজার। ‘বাজেট’ কথাটি এসেছে ফরাসি শব্দ ‘বউজেট্টি’ থেকে। পরবর্তীকালে সেটির বানানে কিছুটা হেরফের হয়ে ইংরেজি শব্দভাণ্ডারে ঢুকে যায়। এর আসল মানে হলো—চামড়ার ব্যাগ!

দেখা যাক, এবার আমাদের অর্থমন্ত্রীর ‘বউজেট্টি’ তথা চামড়ার ব্যাগ থেকে কেমন বাজেট বের হয়। জনমানসে দেখানো হয় যে, ‘বউজেট্টি’ নয়, ওটা যেন জাদুর ব্যাগ! সমালোচকরা মনে করেন, আসলে সবই ভেলকি মাত্র।

লেখক :সাংবাদিক, চলচ্চিত্রকার









« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: info@iportbd.com, বার্তা বিভাগ: newsiport@gmail.com