Saturday, 22 July, 2017, 2:38 AM
Home নগর জীবন
ভুক্তভোগীদের দৃষ্টিকোণ থেকে সমস্যা দেখুন
জয়া ফারহানা লিখেছেন কালেরকন্ঠে
Published : Thursday, 18 May, 2017 at 12:00 AM, Update: 18.05.2017 7:54:24 PM, Count : 1
‘প্রচেষ্টার দুই বছর’ শিরোনামে ডিএনসিসির মেয়র সাফল্যের কথা বলেছেন। পড়তে গিয়ে দেখা গেল সাফল্য তালিকার প্রায় সবটা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদসংক্রান্ত। না, এটা বোঝাতে চাইছি না যে গত দুই বছরে ডিএনসিসি শুধু এই একটি কাজই করেছে। তিনি বলেছেন, যখন সাধারণ মানুষ তার কাজের প্রশংসা করে, মেয়র হিসেবে তিনি আরো ভালো কাজ করার প্রণোদনা পান। আমরা সাধারণ মানুষ তো মেয়রদ্বয়ের কাজের প্রশংসা করার জন্য মুখিয়েই থাকি। গুলশান-বারিধারা হাইকমিশন অফিসের সামনের রাস্তা দখলমুক্ত করার ঘটনাটির কথা বলি। ডিএনসিসির মেয়র বারবার মান্যবর হাইকমিশনারদের অ্যাপয়েন্টমেন্ট চেয়েছেন। না পেয়ে শেষমেশ অ্যাপয়েন্টমেন্টের তোয়াক্কা না করে সরাসরি হাইকমিশনের গেটে গিয়ে বলেছেন, মেয়র ইজ ইন দ্য গেট। ওয়ান্ট টু মিট হাইকমিশনার। একে কি আমরা প্রশংসা করিনি? এ ধরনের তৎপরতাকে প্রশংসা না করে উপায়ই বা কী! এক বলিউডের ‘নায়ক’ সিনেমা ছাড়া এজাতীয় স্মার্ট তৎপরতা যে বাস্তবে ঘটতে পারে তা তো আমাদের চিন্তার মধ্যেই ছিল না। মাননীয় মেয়র দাবি করেছেন শতাংশের ভিত্তিতে ৩০ ভাগ কাজ সম্পন্ন করতে পেরেছেন। আমাদের জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে এমন অনেকে আছেন যাঁরা এক ভাগ কাজ না করেও শতভাগ সাফল্য দাবি করে বসেন। সম্ভবত এটিই আমাদের রাজনীতির সংস্কৃতি। দিন বদলে যাচ্ছে। সামনে আরো বদলাবে, ফোরজির দিন আসছে। বিভিন্ন খাতে নগরের বেহালসংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তরে ডিএনসিসির মেয়র মোকাবেলা করেছেন তাঁর এখতিয়ারের অপারগতা দেখিয়ে। শুনছি, বাসাবাড়ির আবর্জনা সংগ্রহ করে উপযুক্ত স্থানে ফেলা, রাস্তা ঝাড়ু দেওয়া, বাতি জ্বালানো-নেভানো—এটুকুই নাকি খালি মেয়রের দায়িত্ব! প্রশ্ন, নির্বাচনের আগে কি মাননীয় মেয়র মেয়রের দায়িত্বের পরিধি সম্পর্কে অবহিত ছিলেন না? তিনি আক্ষেপ করে বলেছেন, জলাবদ্ধতা তো দূর করতেই চান। কিন্তু করবেন কিভাবে? একটা জলাশয়ের মালিকও তো সিটি করপোরেশন নয়। এমনকি বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের জন্য সিটি করপোরেশনের তৈরি নর্দমাগুলোতে স্যুয়ারেজ সংযোগ দেওয়ার ক্ষমতা পর্যন্ত সিটি করপোরেশনের নেই। এই সামান্য কাজটুকুর জন্য পর্যন্ত তাদের ওয়াসার মুখের দিকে তাকিয়ে বসে থাকতে হয়। তবে যে নির্বাচনের আগে শুনেছিলাম নির্বাচিত হলে শহরের কোনো রাস্তায় জলাবদ্ধতা থাকবে না! এখন একটু বৃষ্টি হলেই যে হাঁটু সমান পানির মধ্যে আমাদের দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, ম্যানহোলের ঢাকনা না থাকায় ম্যানহোল প্লাবিত মলমূত্রযুক্ত পানির মধ্যেও যে দাঁড়িয়ে থাকি, এর প্রতিকার তবে কার কাছে চাই?

রাজধানীর যে ২৬টি খাল, তিন হাজার কিলোমিটার ড্রেন ও জলাশয়, পৌনঃপুনিক আবর্জনায় ভরাট হচ্ছে এবং অনিবার্য জলাবদ্ধতার সৃষ্টি করছে, এটা দেখার দায়িত্ব কি সিটি করপোরেশনের? দুই বছর আগে মেয়র নির্বাচনের সময় অন্তত এটুকু আশা ছিল যে নির্বাচনের পর নির্বাচিত মেয়ররা এর প্রতিকার করবেন। প্রয়োজনে নগরে ৫৮টি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যেভাবেই হোক যুক্ত হয়ে হলেও প্রতিকার করবেন। সেই সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা কি প্রণীত হয়েছে? গ্রিন সিটির রূপকার মেয়র প্রথম দফায় উত্তরা এলাকার শত শত গাছ কাটার ব্যবস্থা করেছেন। জানি বলা হবে ৩২ হাজার গাছের চারা লাগানো হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, চারাগুলো মনিটরিংয়ের কোনো ব্যবস্থা কি আছে? রাস্তায় নামলে দেখি উত্তরায় রোপণ করা চারাগাছ কি অবহেলার মধ্যে রয়েছে। কোনো কোনোটি শুরুতেই নিশ্চিহ্ন। ভুক্তভোগী হিসেবে টের পাই পানিতে দুর্গন্ধ, স্ট্রম স্যুয়ারেজ লাইন নেই। রাস্তায় ময়লা ফেলতে গেলে দেখি ডাস্টবিনগুলো ভাঙা। হাতিরঝিলের উত্তরাংশে এফডিসির মোড় থেকে মেরুল পর্যন্ত কিছুদূর পরপর ৪০টি আবর্জনা ফেলার বাক্স বসানো হয়েছে। আরো ১০০টি বসানোর পরিকল্পনা আছে। কিন্তু কোনোটির ভেতরে ময়লা নেই। ময়লা আছে বাক্সের বাইরে। সিটি করপোরেশন থেকে মনিটরিংয়ের কেউ থাকবে না? জানি এখানে নগরবাসীর সচেতনতাবোধ, দায়িত্ববোধের প্রশ্ন আসবে। কেন নগরবাসী নিজের নগর পরিচ্ছন্ন রাখার দায়িত্ব পালন করে না, সে মনস্তত্ত্ব উদ্ঘাটন হওয়া দরকার। সমাজে যেখানে সমস্যা আছে সেই সমস্যার পেছনে কোনো না কোনো কারণ আছে। নগরবাসীর সাংস্কৃতিক মান কেন নিচে নেমে গেল, কেন নাগরিকরা নগরের কোনো যৌথ সম্পত্তিকে নিজের ভাবতে পারে না, কেন ডাস্টবিন বা অন্যান্য জিনিস চুরি না করার জন্য উপদেশের জন্য বাইরের দেশ থেকে তারকাদের ডেকে আনতে হয়, সেটা অবশ্যই বিশ্লেষণের প্রয়োজন আছে। মানবিক হয়ে ওঠার উপায় খোলা না রাখলে অমানবিক মানুষই তো তৈরি হবে। নগরে তিনতারা-চারতারা রিসোর্ট দেদার গজিয়ে ওঠে, অথচ পাবলিক লাইব্রেরি গড়ে ওঠে না। অনেক অভিভাবকই সন্তানকে সুস্থ বিনোদনের আওতাভুক্ত রাখতে চান, তার উপায় কী? খেলার মাঠ, পার্ক অথবা উন্মুক্ত যেকোনো জায়গা যেখানে সমসংস্কৃতির সমভাবাপন্ন মানুষের সম্মিলন সম্ভব তার কটি জায়গা দখলমুক্ত আছে?       

এক গণপরিবহন নিয়ে লিখতে গেলে অন্তত এক লাখ কথা আছে। গণপরিবহন কি সিটি করপোরেশনের আওতাভুক্ত? না। কিন্তু সিটি করপোরেশনের রাস্তাগুলো কি হাঁটার উপযোগী? ফুটপাত তো ফুটপাত, রাস্তারও অর্ধেক দখল সারা। ফুটপাত বাণিজ্যে বখরার কথা বাদ দিলেও ফুটপাত দিয়ে চলতে গেলে যে মোটরবাইক গায়ে উঠে আসে তার জন্য অভিযোগ জানাই কার কাছে? ঢাকার শব্দদূষণের মাত্রা বিপত্সীমা পার করেছে বহু আগেই। মারকাটরি কিছু ভিআইপি সড়ক ছাড়া অধিকাংশ রাস্তার অবস্থা এত শোচনীয়, এত নাজুক যে একটু বৃষ্টি হলেই কাদাপানি জমে যায়। ভালো হয়, জনপ্রতিনিধিরা যদি প্রতিটি সমস্যাকে ভুক্তভোগীর দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেন। বিশেষ মানুষদের জন্য বহু বিশেষ ব্যবস্থা আছে। যে কারণে সাধারণের কষ্ট অনুভব করা তাঁদের পক্ষে সম্ভব নয়। হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি শিল্প সরেছে, কিন্তু শ্যামপুরে এখনো ২০০টির বেশি শিল্প-কারখানা রয়ে গেছে। সেখানে ৬৫টি বর্জ্য শোধনাগার থাকার কথা ছিল। আছে পাঁচটি। বুয়েট থেকে বিশেষজ্ঞ টিম গিয়ে পরীক্ষা করে বলেছে, শ্যামপুরে পানি ও বাতাসের দূষণ এমন বিপজ্জনক স্তরে পৌঁছেছে যে সেখানকার মানুষকে আসলে পরোক্ষভাবে হত্যাই করা হচ্ছে। শ্যামপুর নিম্নবিত্ত এলাকা। ওখানকার অধিবাসীদের পরোক্ষ হত্যার দায় সম্ভবত কাউকেই নিতে হবে না।

২০ লাখ অবৈধ অভিবাসীকে বহিষ্কার, ওবামা কেয়ার বাতিল, মেক্সিকোর সঙ্গে দেয়াল নির্মাণ, নাফটা চুক্তি বাতিলসহ আরো বেশ কিছু প্রতিশ্রুতি সংবলিত প্রথম ১০০ দিনে করণীয় কাজের তালিকা তৈরি করেছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফলাফল, এখনো পর্যন্ত মন্ত্রিপরিষদ গঠন করতে পারেননি। সিনেটের সমর্থন লাগে এমন ৫৫৬ পদের মধ্যে এখনো অন্তত ১০০টি পদ পূরণ করতে পারেননি। দেয়াল নির্মাণে মেক্সিকো অর্থ দেবে না জানিয়ে দিলে কংগ্রেসের কাছে হাত পেতেছেন, কংগ্রেস প্রাথমিক তহবিলও দেয়নি। চীনের বিরুদ্ধে কারেন্সি ম্যানিপুলেশনের অভিযোগ এনে তুফান ছুটিয়েছিলেন নির্বাচনের আগে। নির্বাচিত হয়ে চীনা প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আলাপের পর বলেছেন, ১০ মিনিটের মধ্যেই শি চিনপিং নাকি তাঁকে গোটা ব্যাপারটা বুঝিয়ে দিয়েছেন। অবশেষে ট্রাম্প কবুল করেছেন, সব কিছুকে তিনি যত সহজ ভেবেছিলেন, যত সরল ভেবেছিলেন, বিষয়গুলো তেমন নয়। দেশের আদালত বা আইন পরিষদ কোনোটাই তাঁর হাতে নয়। জনপ্রতিনিধিদের প্রতিশ্রুতি, হোক আমেরিকা, হোক বাংলাদেশ কোথায় যেন একটা মিল খুঁজে পাওয়া যায়!

 
লেখক : কথাশিল্পী









« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: info@iportbd.com, বার্তা বিভাগ: newsiport@gmail.com