Sunday, 28 May, 2017, 8:20 PM
Home জাতীয়
ভিশন ২০৩০ এবং আওয়ামী লীগের বিএনপি চর্চা
বিভুরঞ্জন সরকার লিখেছেন যুগান্তরে
Published : Thursday, 18 May, 2017 at 12:00 AM, Update: 18.05.2017 7:49:18 PM, Count : 1
রাজনৈতিক ও সাংগঠনিকভাবে যথেষ্ট চাপের মধ্যে থাকলেও দেশের অন্যতম রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপি নিয়ে আলোচনার কোনো কমতি নেই। বিএনপি সংসদে নেই কিন্তু তা বলে সংসদে বিএনপি নিয়ে কথা কম হচ্ছে না। গত ১০ মে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ‘ভিশন ২০৩০’ ঘোষণা করার পর বিএনপি নিয়ে আলোচনার মাত্রা আরো বেড়েছে। বিএনপি এখন আন্দোলন-সংগ্রামে নেই, সংসদে নেই, দল পুনর্গঠন করতে ব্যর্থ হচ্ছে, অভ্যন্তরীণ কোন্দল-বিভেদে জর্জরিত, অথচ রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু থেকে বিএনপি সরছে না। বিএনপির ‘ভিশন ২০৩০’ নিয়ে নানামুখি আলোচনা হচ্ছে। বিএনপির যারা সমালোচক তারা এতে নতুন কিছু না দেখলেও বিএনপি সমর্থকরা উত্সাহিত, উজ্জীবিত। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কেউ কেউ একে ইতিবাচক বলেই মনে করছেন।

বিএনপির ‘ভিশন ২০৩০’তে অনেক ইচ্ছার কথা, অনেক আশার কথা, অনেক স্বপ্নের কথা আছে। খালেদা জিয়া দীর্ঘ দুই ঘণ্টা ধরে এই ভিশন সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরেছেন। মোট ৩৭টি বিষয়ে ২৫৬টি দফা এই ভিশনে আছে। সুনীতি, সুশাসন প্রতিষ্ঠাসহ বিস্তর রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের আভাস যেমন দেওয়া হয়েছে, তেমনি সরকার ও বিরোধী দলের সমন্বয়ে কার্যকর সংসদ প্রতিষ্ঠা; প্রতিহিংসা বাদ দিয়ে ভবিষ্যত্মুখী নতুন ধারার রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতিও এতে আছে। বিএনপির ভিশন ২০৩০-এ প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্যের কথাও বলা হয়েছে। এই ভিশন ঘোষণার পর পঞ্চগড় থেকে আমার এক বন্ধু আঞ্চলিক ভাষায় প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেছেন; ‘হবে ছুরা, কহিবে বাপ; তারপর পুরিবে মনের তাপ’ (ছেলে হবে, বাবা বলবে, তারপর মনের জ্বালা দূর হবে)। অর্থাত্ সবটাই ভবিষ্যতের ব্যাপার। ছেলে সন্তানের জন্ম না হলে বাবা ডাকও শোনা যাবে না, মনের তাপ বা যন্ত্রণাও দূর হবে না। ভিশন ২০৩০-এ অনেক সুবচন আছে। কোনো সন্দেহ নেই, এর বাস্তবায়ন দেশকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে। মানুষের জীবনমান উন্নত হবে, অর্থনৈতিক উন্নয়নে অগ্রযাত্রা নতুন মাত্রা পাবে, রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তন আসবে। কিন্তু এ স্বপ্ন যে পূরণ হবে তার গ্যারান্টি কী? বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি এর আগে একাধিক দফায় ক্ষমতায় ছিল। তখন কি দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল? দুর্নীতি, স্বজন-পোষণ কি কম ছিল? বিচার বিভাগ, পুলিশ প্রশাসন কি সরকারের নিয়ন্ত্রণ মুক্ত ছিল? বলা হতে পারে, অতীতের ভুল ও ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়েই বিএনপি এবার নতুন যাত্রা শুরু করবে, বিএনপি যে সত্যি সত্যি নতুন যাত্রা শুরু করবে, তার নিশ্চয়তা কী? অতীতে ক্ষমতায় থাকতে বিএনপি ভুল করেছিল, বাড়াবাড়ি করেছিল, সে কথা কি প্রকাশ্যে স্বীকার করেছে? সে জন্য দেশবাসীর কাছে ক্ষমাপ্রার্থী হয়েছে?

খালেদা জিয়া ঘোষিত ‘ভিশন ২০৩০’-এর আশ্বাস পূরণ করতে হলে বিএনপিকে প্রথমে তো ক্ষমতায় যেতে হবে। আর ক্ষমতায় যেতে হলে দলটিকে আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে হবে। বিএনপি যে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আগামী নির্বাচনে অংশ নেবে— এটা তো খোলসা করে বলছে না। তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি থেকে সরে এসেছে। এখন চাইছে নির্বাচন সহায়ক সরকার। বিএনপির জন্য ‘সহায়ক’ সরকার আওয়ামী লীগ কেন দেবে? যদি বলা হয়, আন্দোলনের মাধ্যমে তেমন সরকার আদায় করা হবে, তাহলে সেটা মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হবে না। দেশের মানুষ এটা বুঝে গেছে যে, আওয়ামী লীগ সরকারের কাছ থেকে কোনো দাবি আদায়ের মুরোদ বা ক্ষমতা বিএনপির নেই। তারা আন্দোলনের আগে সহিংসতা, অরাজকতা করতে পারে, পেট্রোল বোমা ছুড়ে নিরীহ মানুষ মারতে পারে, ট্রেন-বাসে আগুন দিতে পারে, সম্পদ ধ্বংস করতে পারে, মানুষকে কষ্ট দিতে পারে কিন্তু দাবি আদায় করতে পারে না। শুধু ক্ষমতায় গেলেই বিএনপি ভিশন ২০৩০ পূর্ণ করতে পারবে তা-ও নয়। অনেক প্রস্তাব আছে যেগুলো বাস্তবায়ন করতে হলে সংবিধান সংশোধন করতে হবে। আর, সংবিধান সংশোধন করতে হলে জাতীয় সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে হবে। এককভাবে বিএনপি সেটা অর্জন করতে ব্যর্থ হলে বিরোধী দলের সমর্থন পেতে হবে, বিএনপি যদি সরকারি দল হয় তাহলে অবধারিতভাবেই বিরোধী দল হবে আওয়ামী লীগ। বিএনপির ভিশন পূরণে আওয়ামী লীগ সহযোগিতা করবে—সে রকম রাজনৈতিক বাস্তবতা কি দেশে বিরাজ করছে? আওয়ামী লীগ যেমন বিএনপিকে দুর্বল করতে চায়, শক্তিহীন করতে চায়, তেমনি বিএনপিও তো চায় আওয়ামী লীগকে নিঃশেষ করতে। কোন জাদুমন্ত্র বলে এই চিরবৈরী রাজনৈতিক পরিবেশ থেকে বিএনপি বেরিয়ে আসবে, তার কোনো ধারণা ভিশন ২০৩০-এ উপস্থাপিত হয়নি।

বিএনপি ক্ষমতায় এলে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য আনা হবে—এটা বিশ্বাস করার কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ আছে কি? বিএনপি তাদের দলের প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে রাষ্ট্রপতি বানিয়ে তার সঙ্গে শেষ পর্যন্ত কী আচরণ করেছিল তা কি আমরা ভুলে গেছি? ডা. বি. চৌধুরী ক্ষমতার ভারসাম্য নয়, কিছু ব্যাপারে একটু স্বাধীনভাবে চলতে চেয়ে কী বিপাকে পড়েছিলেন, বিএনপির সুশীল কর্মীদের তাড়া খেয়ে কীভাবে রেললাইন ধরে দৌড়েছিলেন সেটা দেশের মানুষের মনে আছে। বেগম খালেদা জিয়া যদি ক্ষমতার বাইরে থাকেন অর্থাত্ প্রধানমন্ত্রী না হন তাহলে অবশ্য ভিন্ন কথা। কিন্তু তেমন কোনো সম্ভাবনা কিংবা আশঙ্কা এখনই কেউ দেখছেন না। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের প্রশ্ন তুলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় ভারসাম্য কীভাবে হবে? রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়বে? কাদের অবশ্য বলেছেন যে, বেগম জিয়া নিজে রাষ্ট্রপতি হয়ে তার ‘দুর্নীতিবাজ’ পুত্র তারেক রহমানকে প্রধানমন্ত্রী বানাতে চান। বর্তমান পর্যায়ে এটা অবশ্য অনেকটাই স্পষ্ট কল্পনার বিষয়।

তবে হ্যাঁ, প্রসঙ্গত এটাও বলতে হবে যে, বেগম জিয়ার ‘ভিশন’ ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে ত্বরিত গতিতে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের খুব রাজনৈতিক সুবিবেচনার পরিচয় দিয়েছেন বলে মনে হয় না। কথা বলার লোভ সংবরণ করতে হবে আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল নেতাদেরকে। তাদের বুঝতে হবে বিএনপি হেলাফেলার দল নয়। ক্ষমতা থেকে বহু দূরে থেকেও বিএনপি যে আওয়ামী লীগের সার্বক্ষণিক আতঙ্কের কারণ সেটা তো অসত্য নয়। প্রশাসনিক শক্তি দিয়ে কিংবা কথার হুল ফুটিয়ে বিএনপিকে ঘায়েল করা যাবে না। বেগম জিয়ার ভিশন ঘোষণা শেষ হতে না হতেই ওবায়দুল কাদের তার তাত্ক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, ‘খালেদা জিয়া ঘোষিত ভিশন ২০৩০ একটি ফাঁকা প্রতিশ্রুতির ফাঁপানো রঙিন বেলুন। এই বেলুন অচিরেই চুপসে যাবে। ২০৩০ সাল পর্যন্ত পৌঁছানোর পথ বিএনপির জন্য খোলা নেই।’

ভিশন ২০৩০-এর বেলুন চুপসে যাবে কিনা, ২০৩০ পর্যন্ত পৌঁছানোর পথ বিএনপির জন্য খোলা আছে কি-না, এসব অহেতুক আগাম মন্তব্য না করে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক যদি নিজের ঘর গোছানোর কাজে মনোযোগী হন, তাহলে সেটা দলের জন্য এবং দেশের জন্য বেশি ভালো হবে। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বিএনপির ভবিষ্যত্ নিয়ে উদ্বেগ-উত্কণ্ঠায় সময় কাটান কেন সেটা অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের কাছেই পরিষ্কার নয়। তিনি বিএনপি-চর্চা কমিয়ে আওয়ামী লীগের মধ্যে যেসব অনিরাময়যোগ্য ব্যাধি দেখা দিয়েছে, সেগুলো কীভাবে দূর করা যায়, সেদিকে বেশি সময় ও জোর দিলেই ভালো করবেন।

বিএনপির ভিশন ঘোষণা এবং আওয়ামী লীগের প্রতিক্রিয়া দেখে কোনো কোনো রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করছেন, বার বার ঠকে দেশের মানুষ নাকি ‘সাবালক’ হচ্ছেন। এখন আর শুধু কথায় চিড়ে ভিজবে না। ‘ল্যাম্পপোস্ট’ বা ‘কলা গাছ’ কে ভোট দেওয়ার দিন আর নেই।

সত্যি কি তাই? দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ কি ‘নৌকা’ অথবা ‘ধানের শীষ’ মার্কার মোহজাল ছিন্ন করতে পেরেছেন? আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের কলাগাছ কিংবা বিএনপির ল্যাম্পপোস্টের বিপরীতে একজন বিত্তহীন অথচ সত্ মানুষ কি ভোটে দাঁড়িয়ে বিজয় ছিনিয়ে আনতে পারবেন?

লেখক :সাংবাদিক, কলামিস্ট

ই-মেইল: bibhu54@yahoo.com









« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: info@iportbd.com, বার্তা বিভাগ: newsiport@gmail.com