Friday, 24 November, 2017, 11:41 AM
Home আইন-আদালত
কর আদায়ের কর্তৃত্ব গোয়েন্দা কর্মকর্তার নেই
আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ
Published : Thursday, 18 May, 2017 at 1:36 PM, Update: 18.05.2017 7:58:21 PM, Count : 3
এক-এগারোর সময় (২০০৭) বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে আদায় করা ৬১৫ কোটি ৫৫ লাখ টাকা ফেরত দেওয়ার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেছেন আপিল বিভাগ। রায়ে বলা হয়, সংবিধান অনুযায়ী কোনো গোয়েন্দা সংস্থার কোনো কর্মকর্তার পক্ষে কর হিসেবে অর্থ আদায়ের কোনো অধিকার বা কর্তৃত্ব নেই। গত মঙ্গলবার আপিল বিভাগের ৮৯ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।
হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ব্যাংকের করা পৃথক আপিল খারিজ করে দিয়ে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের আপিল বিভাগ গত ১৬ মার্চ এ রায় দিয়েছিলেন। বেঞ্চের অপর তিন সদস্য হলেন বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ও বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার। রায়টি লিখেছেন প্রধান বিচারপতি।
পূর্ণাঙ্গ রায়ে বলা হয়েছে, ওই সময় ডিজিএফআই যদিও জবরদস্তি অর্থ আদায়ে তার ভূমিকা অস্বীকার করেছিল। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়ের করা নথিপত্রে স্পষ্টত দেখা যায়, ডিজিএফআইয়ের পক্ষে লে. কর্নেল মো. আফজাল নাসির ভূঁইয়া এই অর্থ সংগ্রহ করেছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে যে চিঠিতে তিনি অর্থ পাঠিয়েছিলেন, তা লেখা ছিল ডিজিএফআইয়ের লেটারহেডে। সংবিধান বা আইন অনুযায়ী ডিজিএফআই কিংবা গোয়েন্দা সংস্থাসমূহের কোনো কর্মকর্তার পক্ষে কর বা মূসক হিসেবে অর্থ আদায়ের কোনো অধিকার বা কর্তৃত্ব নেই। সংবিধানের ৮৩ অনুচ্ছেদ সংসদের কোনো আইন ব্যতিরেকে ওই ধরনের কোনো প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়া বা মূসক বাবদ অর্থ আদায় নিষিদ্ধ করেছে।
রায়ে বলা হয়, বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরে ন্যাশনাল সিকিউরিটি ইনটেলিজেন্স (এনএসআই) ছিল বাংলাদেশের একমাত্র গোয়েন্দা সংস্থা। বিদেশি সামরিক বাহিনীর তরফে বহিস্থ হুমকি বিবেচনায় ১৯৭২ সালে ডাইরেক্টরেট ফোর্সেস ইনটেলিজেন্স (ডিএফআই) প্রতিষ্ঠা করা হয়। ডিএফআইয়ের ভূমিকা সশস্ত্র বাহিনীগুলোর মধ্যে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানের মধ্যে সীমিত ছিল।
সুপ্রিম কোর্ট এ বিষয়ে তৎকালীন ডিজিএফআইকে তিরস্কার করেছেন। এ ছাড়া জরুরি অবস্থা প্রত্যাহারের পরে সেই অর্থ ফেরত না দিতে ভূমিকা পালনের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকারের সমালোচনা করেছেন আপিল বিভাগ। সামরিক বাহিনীর ওপর বেসামরিক নিয়ন্ত্রণের জন্য সুপ্রিম কোর্ট ছয় দফাবিশিষ্ট একটি দিকনির্দেশনা দিতে গিয়ে মন্তব্য করেছেন, একটি গণতন্ত্রে দুই ধরনের বিপদ থেকে সশস্ত্র বাহিনীসহ রাষ্ট্রকে বাঁচাতে সাংবিধানিক গ্যারান্টি থাকা উচিত। দুই বিপদের একটি হলো রাজনীতিবিদগণ, যাঁদের সামরিক উচ্চাভিলাষ রয়েছে এবং অন্যটি হলো সামরিক বাহিনীর সদস্য, যাঁদের রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ রয়েছে।
রায়ে বলা হয়, ডিজিএফআইয়ের প্রাথমিক ভূমিকা হচ্ছে, সামরিক গোয়েন্দা তথ্যের সংগ্রহ, বিশ্লেষণ ও তার মূল্যায়ন করা। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, সশস্ত্র বাহিনীসমূহ–সংক্রান্ত কৌশলগত ও প্রাকৃতিক বিবরণ–সংক্রান্ত (টপোগ্রাফিক্যাল) তথ্য সংগ্রহ ও মূল্যায়ন করা এবং বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর জন্য কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স এবং নিরাপত্তাবিষয়ক যথা পদক্ষেপ নেওয়া। ডিজিএফআই কার্যত প্রধানত সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত।
রায়ের ৬৭ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে, রিট দায়েরকারীদের আইনজীবীরা অর্থ আদায়ের প্রক্রিয়ায় সেই সময়ের ডিজিএফআইয়ের ভূমিকার সমালোচনা করেছেন। রায়ে একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের আইনজীবী হিসেবে আমীর–উল ইসলামের যুক্তিতর্ক নিবেদন সম্পর্কে উষ্মা প্রকাশ করা হয়। আপিল বিভাগ বলেন, তাঁর ভূমিকা আমাদের স্তম্ভিত করেছে।
জানতে চাইলে আমীর–উল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি শুধু এটাই বলতে পারি, এই রায় আইনবিদ, শিক্ষাবিদ ও গবেষকদের নিরীক্ষা এবং ছাত্রদের আইন শেখার বিষয় হয়ে থাকবে। আমি আমার যুক্তিতর্কে অবিচল আছি।’
রায়ের পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করা হয়, ডিজিএফআইয়ের একজন কর্মকর্তা, যিনি হলফ করে প্রকারান্তরে স্বীকার করেছেন, ডিজিএফআইয়ের একজন কর্মকর্তা অর্থ আদায় করেছেন এবং ওই কর্মকর্তার মতে, অর্থ আদায় করতে গিয়ে তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। সে কারণে ডিজিএফআই সংগঠনগতভাবে কোনো দায়দায়িত্ব নেবে না। তাঁর এ বিবৃতি আদালতে বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া নথিপত্রের ভাষ্য খণ্ডন করে। তবে রায়ে উল্লেখ করা হয়, তথ্যপ্রমাণদৃষ্টে এই বাহিনী তার দায়িত্ব নাকচ করতে পারে না। কারণ, পে-অর্ডারের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহের পরে তিনি তাঁর কার্যক্রমের বিষয়ে তাঁর সংস্থার প্রধানকে অবহিত করেছেন।
রিট আবেদনকারী ও আইনজীবীরা দাবি করেছেন, তখন ডিজিএফআইয়ের নিয়ন্ত্রণে থাকা একটি নির্দিষ্ট অফিসে ব্যবসায়ীদের উপস্থিত হতে বাধ্য করা হয়। তাঁদের একত্রে দিনের পর দিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বসিয়ে রাখা হয়। সুতরাং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অগোচরে এত সব কিছু সম্পাদন করা একজন ব্যক্তির পক্ষে সম্ভব নয়। এটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বিশিষ্ট এবং ধনাঢ্য ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার, অন্তরীণ রাখা এবং শারীরিক ও মানসিকভাবে দিনের পর দিন নির্যাতন করা হয়েছে। সংস্থাটির পক্ষে এমন সব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, যা অবশ্যই তিরস্কারযোগ্য।
রায়ে আরও উল্লেখ করা হয়, আমরা যদিও লক্ষ করি যে ডিজিএফআই যত টাকা আদায় করেছে, তার সবটাই বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দিয়েছে। কিন্তু তারা তাদের এ কাজকে যথার্থতা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। এটা তিরস্কারযোগ্য। তারা একটি স্বাধীন সংগঠন এবং তাদের কার্যক্রম নির্বাহী বিভাগ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। তারা নির্বাহী বিভাগের মতো কাজ করতে পারে না। এবং নির্বাহী বিভাগের একটি অঙ্গের বেআইনি কাজ সমর্থন করতে পারে না। এটা হলো সরকারের কাজ। অথচ সরকার নীরব দর্শক থেকেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক এবং তার প্রধান নির্বাহী সরকারের একটি গোয়েন্দা বিভাগের অমানবিক কার্যক্রমকে সহায়তা করেছে। আর এভাবে সরকার কর্তৃক যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, তার রীতিনীতি লঙ্ঘন এবং সীমা অতিক্রম করেছে। অ্যাটর্নি জেনারেলের দৃষ্টি আকর্ষণ করা সত্ত্বেও রিট আবেদনকারীদের দাবি নাকচ করে দিতে সরকারের পক্ষে কোনো ধরনের বিবৃতি দেওয়া হয়নি। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের বিজ্ঞ আইনজীবীকে আমরা নির্বিকার দেখেছি। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ব্যাংক কীভাবে অর্থ তার দখলে রাখার যুক্তি দিয়েছে, তা বোধগম্য নয়। যেহেতু বিভিন্ন ব্যবসায়ী ও ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে চাঁদাবাজির মাধ্যমে অর্থ আদায় করা হয়েছে। তাই বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত ছিল জরুরি অবস্থা প্রত্যাহারের পর সেই অর্থ ফেরত দেওয়া। বাংলাদেশ ব্যাংক তার সর্বনাশের ঝুঁকি নিয়েও অর্থ আগলে রেখেছে।
রায়ে আরও বলা হয়, প্রতিরক্ষা বাহিনী আমাদের দেশের জন্য একটি সম্পদ। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরে সশস্ত্র বাহিনীকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের সেনা, নৌ এবং বিমানবাহিনীর পৃথক কাঠামোতে বিন্যাস করা হয়। সামরিক বাহিনী তার ঐতিহ্যগত প্রতিরক্ষার ভূমিকা ছাড়াও দুর্যোগ মোকাবিলা এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তায় তাদের ডাকা হয়েছে। মধ্য সত্তর দশক থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে উপজাতি বিদ্রোহ দমনে লড়াই করেছে। ২০০৮ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশের সমুদ্রে মিয়ানমারের অর্থনৈতিক আগ্রাসন কার্যকরভাবে মোকাবিলা করেছে। মাঝেমধ্যে সামরিক বাহিনীকে বন্যা বা ঘূর্ণিঝড়ের পর দুর্গত মানুষের পুনর্বাসনের মতো সামাজিক কাজে শামিল করা হয়েছে। আশির দশকের শেষ দিক থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা বাহিনীতে তারা আন্তর্জাতিকভাবে সুনাম অর্জন করেছে। বাংলাদেশের সামরিক বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় পরিস্থিতি মোকাবিলায় একটি শৃঙ্খলাপূর্ণ এবং একটি সুপ্রতিষ্ঠিত জাতীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে।
রায়ে এরপর উল্লেখ করা হয়, এই বাহিনীসমূহের একই সঙ্গে একটি অন্ধকার দিক রয়েছে। কতিপয় বিপথগামী কর্মকর্তা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাঁর পরিবারের অন্যান্য সদস্য ও আত্মীয়স্বজনকে হত্যায় অংশগ্রহণ করেছেন। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় চার নেতাকে হত্যার মতো জঘন্য অপরাধ করেছেন। কতিপয় বিপথগামী সেনাসদস্য নিষ্ঠুরভাবে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকেও হত্যা করেছে। কতিপয় বিভ্রান্ত ক্ষমতালোভী উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তা ১৯৭৫ ও ১৯৮২ সালে সামরিক আইন জারি করেছেন। এসব বিদ্রোহী কর্মকর্তা ও জওয়ানদের দায়দায়িত্ব বাহিনীগুলোর নেওয়া উচিত নয়। একইভাবে কতিপয় কর্মকর্তা ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতিকে জরুরি অবস্থা জারি করতে বাধ্য করেছিলেন। যদিও সেই পদক্ষেপ বাস্তবে তাঁদের একক দায়িত্বে ঘটেছে বলা যায় না। কারণ, তৎকালীন রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ সংবিধানের বিধানাবলি লঙ্ঘন করে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হয়েছিলেন।
রায়ে আরও উল্লেখ করা হয়, এই অবৈধ ক্ষমতা দখল রাজনৈতিক দল এবং জনগণকে বিক্ষুব্ধ করেছিল। এটাও বোধগম্য নয় যে কীভাবে এ সরকার সদ্য বিদায়ী প্রধানমন্ত্রীকে গ্রেপ্তার না করে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, যিনি তখন দেশের শেষ ভূতপূর্ব প্রধানমন্ত্রী ছিলেন না, তাঁকে গ্রেপ্তার করেছিল। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল (বিএনপি-জামায়াত জোট) তাদের পাঁচ বছরের শাসনামলে যেখানে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা দায়ের করেনি, সেখানে এক-এগারোর সরকার জনৈক ব্যক্তিকে তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা দায়ের করতে বাধ্য করেছিল। দুর্নীতি দমন ও প্রতিরোধের নামে তাঁকে গ্রেপ্তারের নিরপেক্ষতা নিয়ে গুঞ্জন শুরু হলে সরকার সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তার করেছিল। আর সে কারণেই এ ধরনের গ্রেপ্তারের উদ্দেশ্য নিয়ে নাগরিকদের মধ্যে সন্দেহ দেখা দিয়েছিল। সরকার নির্বিচারে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং ব্যবসায়ীদের গ্রেপ্তার করেছিল। কতিপয় উচ্চাভিলাষী সামরিক কর্মকর্তা কর্তৃক সেই গ্রেপ্তারের ফলে দেশের অর্থনীতি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে গিয়েছিল। আইনের সমর্থন ব্যতিরেকে নির্বাহী ক্ষমতার অবৈধ দখল এবং সশস্ত্র বাহিনীর কতিপয় কর্মকর্তার মাত্রাতিরিক্ত ক্ষমতার অনুশীলন তাঁদের প্রতি জনগণকে বীতশ্রদ্ধ করে তুলেছিল। ২০১০ সালে পঞ্চম সংশোধনীর মামলায় সামরিক শাসনকে চিরকালের জন্য অবৈধ এবং অবৈধ জবরদখলকারীদের উপযুক্ত শাস্তিদানের অভিমত ব্যক্ত করেছিল।
রায়ে বিদেশি সেনাবাহিনী প্রসঙ্গ
একটি জাতির প্রতিরক্ষা বাহিনী তার নাগরিকদের কাছে কতটা শ্রদ্ধা অর্জন করতে পারে, তার বিবরণ নিচে দেওয়া হলো:
ভারতের স্বাধীনতার পর থেকে সশস্ত্র বাহিনীর অর্জনসমূহকে পেছনে রাখতে নিরলস প্রচেষ্টা নেওয়া হয়েছে। সশস্ত্র বাহিনী অব্যাহতভাবে সতর্কতার সঙ্গে তার বিভিন্নমুখী ভূমিকা পালন করেছে। যেকোনো জরুরি অবস্থায় তার ওপর নির্ভরশীল থাকার মতো প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাঁড়িয়েছে। সেনাবাহিনীর ওপর ভারতের ক্রমবর্ধমান নির্ভরশীলতা সত্ত্বেও ভারতের সেনাবাহিনী পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে অরাজনৈতিক থেকে গেছে। সত্তর বছরের বেশি সময় ধরে বিরাট মূল্য দিয়ে ভারতের মধ্যকার বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তিকে পরাস্ত করেছে। ভারতকে তারা ভেতর ও বাইরে থেকে সুরক্ষা দিয়েছে। ভারতের সেনাবাহিনী বাংলাদেশকে একটি জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠায় সাহায্য দিয়ে অনন্য ভূমিকা রেখেছে। এবং তারপর তারা জনগণের কাছে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে নীরবে চলে গেছে। ১৯৪৭ সাল থেকে একটি প্রতিষ্ঠান যারা নিরঙ্কুশভাবে সাম্প্রদায়িকতা এবং বিভক্ত হওয়ার প্রবণতার ঊর্ধ্বে থেকেছে তারা ভারতীয় সেনাবাহিনী। যখন বর্ণ এবং ধর্মীয় পার্থক্য দেশের রাজনীতি এবং বৃহত্তর সমাজকে আক্রান্ত করেছে। তখন তার বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী অবিচল থেকেছে। ভারতীয় সেনাবাহিনী সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ এবং সংবিধানের প্রতি শর্তহীন আনুগত্যে আস্থাশীল থেকে একটি স্বাধীন সার্বভৌম ভারতের প্রথম সাত দশকের জাতি গঠনে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশ, নেপাল, মিয়ানমার ও পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনী বন্দুকের নলের মুখে দেশ পরিচালনায় হস্তক্ষেপ করেছে। এটা কোনো গোপনীয় বিষয় নয় যে রাজনৈতিক সামরিক বাহিনী সবকিছুতে হস্তক্ষেপ করে। কিন্তু ভারতের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে তা অনুপস্থিত।
রায়ে এরপর বলা হয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বৈপ্লবিক যুদ্ধের পরে ১৭৮৪ সালের ২ জুন কংগ্রেস ঘোষণা দিয়েছিল যে ‘শান্তির সময় নিয়মিত স্থায়ী সেনাবাহিনীর উপস্থিতি প্রজাতন্ত্রী সরকারের নীতিসমূহের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। মুক্ত জনগণের স্বাধীনতার প্রতি হুমকিজনক এবং সাধারণভাবে স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় বিধ্বংসী যন্ত্রে পরিণত হয়।’ সুতরাং সেনাবাহিনীর সদস্যসংখ্যা ৮০-তে নামিয়ে আনা হয়েছিল। এরপর কংগ্রেস মার্কিন উপজাতিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য হার্মারের নেতৃত্বে মার্কিন সেনাদের প্রথম রেজিমেন্ট সৃষ্টি করে। ১৭৯২ সালে জর্জ ওয়াশিংটন এবং তাঁর মন্ত্রী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘লিজিওন’ প্রতিষ্ঠা করেন। এই লিজিওন পরে স্থায়ী সেনাবাহিনীতে রূপান্তরিত হয়। প্রধান বিচারপতি তাঁর রায়ে ভিয়েতনাম যুদ্ধ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মার্কিন সেনাবাহিনীর ভূমিকার কথা উল্লেখ করে বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর আজকের আমেরিকার সব থেকে বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে আধুনিক মার্কিন জীবনের সব থেকে সম্মানিত ব্যক্তিত্বের মধ্যে রয়েছেন সৈনিক, নৌ, বিমান সেনা এবং নাবিকবৃন্দ। উই দ্য পিপল বইয়ে জোয়ান উইলিয়ামস মন্তব্য করেছেন, সামরিক বাহিনী বেশি বেশি শ্রদ্ধা অর্জন করেছে।
ছয় দফা নির্দেশনা
১. একটি স্পষ্ট আইনি এবং সাংবিধানিক ফ্রেমওয়ার্ক থাকবে। এতে রাষ্ট্র এবং সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যকার মৌলিক সম্পর্ক সংজ্ঞায়িত থাকবে।
২. প্রতিরক্ষা এবং নিরাপত্তা–সংক্রান্ত আইন প্রণয়নে সংসদের একটি তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা থাকবে। এর লক্ষ্য হবে জাতীয় কৌশল প্রণয়নে প্রভাব বিস্তার, প্রতিরক্ষা এবং নিরাপত্তা নীতিসংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা বজায়, বাজেট অনুমোদন এবং ব্যয় করার সামর্থ্যের নিরিখে সমরশক্তি বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখা।
৩. জনপ্রশাসনের একটি বেসামরিক অঙ্গের মাধ্যমে সরকারের কাছে সামরিক বাহিনীর উচ্চপর্যায়ের নেতৃত্বের জবাবদিহি করবে। সাধারণভাবে এর দায়িত্বে থাকবে একটি মন্ত্রণালয় কিংবা প্রতিরক্ষা বিভাগ, যারা তাদের নির্দেশনা এবং তাদের কার্যক্রমের নজরদারি করবে।
৪. একটি সুপ্রশিক্ষিত এবং অভিজ্ঞ সামরিক বাহিনীর উপস্থিতি থাকবে। তারা একটি বেসামরিক কর্তৃপক্ষের কাছে শ্রদ্ধাভাজন থাকবে, তারাই তাদের পরিচালনা ব্যয় বহন করবে। রাজনৈতিক নিরপেক্ষতার নীতি এবং সশস্ত্র বাহিনীর নির্দলীয় থাকাসহ বেসামরিক নিয়ন্ত্রণ নীতিসমূহের প্রতি তাদের থাকবে অবিচল আস্থা।
৫. গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানসমূহ এবং তার মূল্যবোধের প্রতি আস্থাশীল একটি উন্নত নাগরিক সমাজ থাকবে। এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ হিসেবে জাতির সামরিক বাহিনীর ভূমিকা ও তার লক্ষ্য সম্পর্কে দেশের জনগণের মধ্যে একটি মতৈক্য থাকবে।
৬. প্রতিরক্ষা কমিউনিটির মধ্যে একটি যুক্তিসংগত বেসরকারি মহলের উপস্থিতি থাকবে। প্রতিরক্ষা এবং নিরাপত্তা নীতি বিষয়ের ওপর উন্মুক্ত জনবিতর্কে অংশ নিতে এবং বিকল্প মতামত এবং কর্মসূচি উপস্থাপনে তাদের সামর্থ্য থাকবে।
১২২৯ কোটি টাকা জমা হয়: সংসদে তথ্য
২০১০ সালের ২২ মার্চ অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত জাতীয় সংসদে জানিয়েছিলেন, এক-এগারোর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ১ হাজার ২২৮ কোটি টাকা ৯৫ লাখ ৬৪ হাজার ৯২৫ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছিল। জরুরি অবস্থার সময়ে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা প্রায় ৪০ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে দুই শতাধিক পে-অর্ডারের মাধ্যমে এই অর্থ আদায় করেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি হিসাবে এই অর্থ জমা হয়।
এক-এগারো সরকারের সময়ে দুর্নীতি দমনে টাস্কফোর্স গঠন করা হয়। তখন দুর্নীতির অভিযোগ এনে রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের আটক করা হয়। এরপর ২০০৯ সালে বর্তমান মহাজোট সরকার ক্ষমতায় এলে বিভিন্ন মহল থেকে সেই অর্থ ফেরত দেওয়ার দাবি জানানো হয়। অর্থ ফেরত পেতে মামলাও হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওই টাকা ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন। অর্থমন্ত্রী একবার সাংবাদিকদের বলেছিলেন, সরকারের হিসাবে টাকা জমা পড়লে তা ফেরত পাওয়া কঠিন। সরকারের কোষাগারে জমা হওয়া টাকা ফেরত দেওয়া যায় না।





« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: info@iportbd.com, বার্তা বিভাগ: newsiport@gmail.com