Friday, 24 November, 2017, 11:38 AM
Home জাতীয়
মোবাইল ব্যাংকিং: খরচ কমানোর সুযোগ আছে
প্রতীক বর্ধন লিখেছেন প্রথম আলোয়
Published : Wednesday, 17 May, 2017 at 12:00 AM, Update: 17.05.2017 7:54:19 PM, Count : 2
দেশে অর্ধশতাধিক ব্যাংকের কার্যক্রম মূলত শহরাঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকায় বহু মানুষ ব্যাংকিং সেবার আওতার বাইরে ছিল। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির মতো আলাদা কর্মসূচি হাতে নিতে হয়। এই প্রক্রিয়ায় ২০১১ সালে দেশে মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) চালু হয়, যা সাধারণভাবে মোবাইল ব্যাংকিং নামে পরিচিত। প্রথম দিকে এটি নিয়ে তেমন আগ্রহ দেখা না গেলেও যতই এর সফলতা দৃশ্যমান হতে শুরু করে, ততই এ নিয়ে আগ্রহ সৃষ্টি হয়। দিন দিন এর লেনদেন বাড়তে থাকে। কিন্তু এ বছরের জানুয়ারি মাসে কেন্দ্রীয় ব্যাংক অবৈধভাবে রেমিট্যান্স (হুন্ডি) আসার অভিযোগে এমএফএসের দৈনিক ও মাসিক লেনদেনের সীমা কমিয়ে দেয়। এতে বৈধ পথে রেমিট্যান্স আসা না বাড়লেও এমএফএসে লেনদেনের প্রবৃদ্ধি কমে গেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুসারে, এই পরিপত্রের আগে লেনদেনের প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৪ শতাংশ, মার্চে তা নেমে আসে ১ দশমিক ৩ শতাংশে। মার্চ মাসে গড়ে দৈনিক লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮০৭ দশমিক ৯৬ কোটি টাকা, যার মধ্যে আছে ক্যাশ-ইন, ক্যাশ আউট ও হিসাব থেকে হিসাবে স্থানান্তর।

সম্প্রতি বিআইডিএসের একটি অনুষ্ঠানে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের খরচ কমানোর কথা বলা হয়েছে। গ্রাহকদের তরফ থেকেও এই দাবি আসতে শুরু করেছে। অন্যদিকে মোবাইল অপারেটররা দাবি তুলেছে, তাদের ফি বাড়াতে হবে। কিন্তু এ পরিস্থিতিতে কীভাবে খরচ কমানো সম্ভব?     

স্বাভাবিকভাবেই মোবাইল ব্যাংকিং সাধারণ ব্যাংকিংয়ের মতো নয়। এটি মূলত এজেন্টদের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়, তবে ব্যাংকের শাখায়ও এর লেনদেন হয়। এটিএম বুথ থেকে টাকা তোলা যায়। প্রত্যন্ত অঞ্চলে যেখানে ব্যাংকের শাখা নেই, সেখানে এজেন্টদের মাধ্যমে মানুষ এই সেবা পেয়ে থাকে। লেনদেনের খরচ ১ দশমিক ৮৫ শতাংশ। কিন্তু খুচরার প্রচলন কমে যাওয়ায় এজেন্টরা ১০০ টাকায় ২ টাকাই রাখেন। ফলে হিসাববিহীন গ্রাহকদের ১০০০ টাকা পাঠাতে খরচ হচ্ছে ২০ টাকা, তখন এটা বেশিই মনে হয়। তবে মানুষ যদি নিজ হিসাব থেকে লেনদেন করে, তাহলে এই অতিরিক্ত দেড় টাকা লাগবে না। আবার এই খরচ পৃথিবীতে আমাদের দেশেই সবচেয়ে কম। উল্লেখ্য, এই ১ টাকা ৮৫ পয়সার আবার তিন ভাগ হয়: ৭৭ শতাংশ পায় এজেন্ট ও ডিস্ট্রিবিউটর, ৭ শতাংশ মুঠোফোন অপারেটর ও বাকি ১৬ শতাংশ পায় সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান।  

এখন কথা হচ্ছে, খরচ কীভাবে কমানো যায়। হিসাবটা কঠিন নয়, অংশীজনেরা কম নিলেই এটা সম্ভব। দেশে বর্তমানে পাঁচ লাখ খুদে পুঁজি বিনিয়োগকারী এজেন্ট রয়েছেন। মাঠপর্যায়ে তাঁরাই অর্থ বিনিয়োগ করে এই সেবা পরিচালনা করেন। তাঁদের লভ্যাংশে হাত দিলে এই সেবার প্রসার থমকে যেতে পারে। বাকি রইল সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান এবং মুঠোফোন অপারেটরদের খরচ ও মুনাফার মধ্যে সংগতি স্থাপনের বিষয়টা। মুঠোফোন অপারেটরদের যে ইউএসএসডি চ্যানেল ব্যবহার করে এই লেনদেন হয়, তার ব্যয় খুবই কম। প্রতি লেনদেনের খরচ এসএমএসের চেয়েও কম। এ ছাড়া প্রযুক্তির ধারাবাহিক উন্নতির কারণে খরচও কমতির দিকে। ভারতের একটি কোম্পানি মাত্র ১ রুপিতে সারা দিন ইউএসএসডি ব্যবহারের সুযোগ দিচ্ছে। সব ব্যাংকের লেনদেন তাদের চ্যানেলে হচ্ছে, ফলে তাদের হিস্যা এমনিতেই বেশি। আর সেবা প্রদানকারীদেরও খতিয়ে দেখতে হবে, নিজেদের ভাগটা কমানো হলে গ্রাহকসংখ্যা বাড়ে কি না। অর্থাৎ ব্যাপারটা এককভাবে কারও হাতে নেই। তাই সব পক্ষকে গ্রাহক স্বার্থের বিষয়টি মাথায় নিয়ে আলোচনার টেবিলে বসতে হবে। সারা পৃথিবীতে অনলাইনভিত্তিক ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার হচ্ছে। আমাদের দেশেও এর বাড়বাড়ন্ত দেখা যাচ্ছে। ডিজিটাল অর্থনীতি বলে নতুন একটি খাতই গড়ে উঠছে। আগামী দিনে এর ভূমিকা আরও বাড়বে বৈ কমবে না।

সম্প্রতি অ্যাসোসিয়েশন অব মোবাইল অপারেটরস বাংলাদেশ (অ্যামটব), সেবাদাতা, অপারেটর ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রতিনিধিদের বৈঠকে ইউএসএসডি (মোবাইল নেটওয়ার্ক) খরচ নির্ধারণের চেষ্টা সফল হয়নি। তাই তাড়াহুড়ো না করে সময় নিয়ে এটা করা উচিত। এর সঙ্গে বিশেষজ্ঞদের যুক্ত করা দরকার। অর্থনীতির নিয়ম অনুসারে উৎপাদন যত বাড়বে, খরচ ততই কমে আসবে। কিন্তু লেনদেনের প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ায় সেই সুযোগও সীমিত হয়ে গেছে। সোজা কথায়, লেনদেনের পরিমাণ যদি ছয় মাসে দ্বিগুণ হয়ে যায়, তাহলে খরচ কমানোর ব্যাপারে সবাই ভাবতে পারেন।

এমএফএস সেবা প্রদানকারী এজেন্টদের মধ্যে কেউ কেউ হুন্ডির সঙ্গে জড়িত, সবাই নয়। যারা এটা করছে, তাদের আইনের আওতায় আনার প্রক্রিয়া চলছে। সরকারকে বরং হুন্ডি বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। যেসব মাধ্যমে টাকা পাচার হয়, সেখানে নজরদারি বাড়াতে পারে। মোবাইল ব্যাংকিংয়ে লেনদেনের সীমা কমায় সাধারণ মানুষের অসুবিধাই হচ্ছে, সুবিধা নয়। ক্যাশ-আউটের দৈনিক সীমা ১০ হাজার টাকা এখন বাস্তবসম্মত নয় (তাও আবার ক্যাশ-ইনের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পাঁচ হাজারের বেশি টাকা তোলা যায় না)। সাধারণ মানুষকে এর বেশি লেনদেন করতে ঝামেলায় পড়তে হচ্ছে। অথচ তারাই এর প্রাণ। সরকারের উচিত, ক্ষুদ্র লেনদেনের রাশ টেনে না ধরে রাঘববোয়ালদের ধরা। আশার কথা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনেক কর্মকর্তা এখন মনে করছেন, লেনদেনের সীমা কমানো ঠিক হয়নি।          

সরকার এমএফএসের মাধ্যমে রেমিট্যান্স আনার অনুমতি দিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত, এমন ব্যবস্থা করা যাতে মানুষ ঘরের পাশ থেকে রেমিট্যান্স তুলতে পারে। আজকের যুগে মানুষ ব্যাংকে গিয়ে লাইন ধরে রেমিট্যান্স তুলতে চাইবে না, এটাই স্বাভাবিক। এই প্রক্রিয়ার আরও মানুষ এই খাতের আওতায় আসবে এবং খরচ কমানোর সুযোগ সৃষ্টি হবে। হুন্ডিতে ডলারের দাম বাজারমূল্যের চেয়ে বেশি পাওয়া যায়, তাই হুন্ডি প্রতিরোধে রেমিট্যান্সের ক্ষেত্রে ডলারের বিনিময় মূল্য বাজারের চেয়ে একটু বেশি দেওয়া যেতে পারে। গরিব মানুষকে এই প্রণোদনা দেওয়াই যায়।

এ কথা অস্বীকারের জো নেই, আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে মোবাইল ব্যাংকিং সবাইকে ছাড়িয়ে গেছে। প্রথাগত ব্যাংকিং তো গ্রামে যেতেই পারেনি। এমনকি ক্ষুদ্রঋণের গ্রাহকসংখ্যাও গত ৪০ বছরে দুই কোটি ছাড়ায়নি। অথচ ছয় বছরেরও কম সময়ে এমএফএসের গ্রাহকসংখ্যা পাঁচ কোটি হয়ে গেছে। এজেন্টের সংখ্যা সাত লাখ। বোঝা যায়, এই খাত কতটা সম্ভাবনাময়। আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে এটা বিপ্লব ঘটিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু এ মুহূর্তে দেশের মোবাইল ব্যাংকিং এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। এখন আমরা যে সিদ্ধান্ত নেব, তার ওপরই এর ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। ফলে সবাইকে এই বিষয়টি মাথায় রেখেই কাজ করতে হবে।

প্রতীক বর্ধন: সাংবাদিক ও অনুবাদক।

bardhanprotik@gmail.com









« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: info@iportbd.com, বার্তা বিভাগ: newsiport@gmail.com