Friday, 24 November, 2017, 11:37 AM
Home জাতীয়
ভিশন বনাম ভিশন
আবু সাঈদ খানের লেখা সমকালে
Published : Wednesday, 17 May, 2017 at 12:00 AM, Update: 17.05.2017 3:13:55 PM, Count : 2

বিএনপির ভিশন-২০৩০ প্রকাশের পর ভেবেছিলাম, এটি নিয়ে তুমুল তর্কাতর্কি চলবে। না, তেমনটা হলো না। এটি ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের প্রতারণা ও নকল বলে চিহ্নিত করলেন। জবাবে বিএনপির মহাসচিব আওয়ামী লীগও যে তাদের থেকে নকল করেছে বলে অভিযোগ আনলেন। এর মধ্যে কী আছে, কী নেই- তা নিয়ে তেমন কথা হলো না। যুক্তি-পাল্টা যুক্তির অবতারণা হলো না। আলোচনা মূলত কাদা ছোড়াছুড়ির মধ্যেই নিপতিত হলো। মনে হয়, নির্বাচন পর্যন্ত বক্তৃতা-বিবৃতি ও টক শোতে তা পুনরাবৃত্তি হতে থাকবে।

আমাদের দেশে কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার রেওয়াজ এখনও গড়ে ওঠেনি। নির্বাচনের প্রাক্কালে ইশতেহার ঘোষণা করা হয়; তারপর তা সংবাদপত্র ও বেতার-টেলিভিশনে প্রকাশ হয়। ওই পর্যন্তই। নেতাদের বক্তৃতায়ও তা তেমন স্থান পায় না। বক্তৃতাজুড়ে থাকে আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণ- কে ভারতীয় দালাল, কে পাকিস্তানের এজেন্ট, কে কতখানি মুসলমান তা নিয়ে কথা ছোড়াছুড়ি। এসব যে জনগণ পছন্দ করে না তা নেতা-নেত্রীরা বুঝতে নারাজ। তবে কোন আমলে কত বেশি কাজ হয়েছে, কোন আমলে কত চুরি হয়েছে- এসব কিছু আলোচিত হয়। তা দেশবাসীর জানা জরুরি। একই সঙ্গে কর্মসূচি পর্যালোচনাও জরুরি।

এ প্রসঙ্গে বলা দরকার যে, ১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা এবং '৭০-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ৬ দফা-১১ দফা সংবলিত ইশতেহার কেবল রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। সাধারণ মানুষের মাঝেও আলোড়িত হয়েছিল। '৫৪-তে মানুষ মোটা দাগে বুঝেছিল, ২১ দফার সরকার আসলে বাংলা ভাষার মর্যাদা বাড়াবে, পূর্ব বাংলা শাসনে পাকিস্তানি হস্তক্ষেপ থাকবে না, জমির ওপর ষোলআনা হক কায়েম হবে ইত্যাদি। '৫৪ সালে আমার বয়স দুই-আড়াই বছর। সঙ্গত কারণেই ওই নির্বাচনের ব্যাপারে আমার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা নেই। তবে সে সময় যারা নির্বাচন প্রত্যক্ষ করেছেন, এমন সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে দেখেছি- হক-ভাসানী কী চেয়েছিলেন তা তাদের মতো করে গড়গড় করে বলে যান। আর '৭০-এর নির্বাচনে শহরের কেরানি, ছাত্র, শ্রমিক থেকে গ্রামের কৃষক সবার কাছে স্পষ্ট ছিল- ৬ দফা-১১ দফার সরকার হলে পূর্ব-পশ্চিমে বৈষম্য থাকবে না, শিক্ষার সুযোগ বাড়বে, বাঙালিরাও মিলিটারি ও চাকরি-বাকরিতে সমান সুযোগ পাবে ইত্যাদি। তখন নির্বাচনী ক্যাম্পেইনের অভিজ্ঞতা এখনও মনে গেঁথে আছে। গ্রামের সাধারণ মানুষ আমাদের মুখ থেকে বক্তব্য নিয়ে আরও সহজ করে তুলে ধরতেন। তখন গ্রামে পত্রিকা যেত না। বেতারে বিরোধী দলের কথা থাকত না। টেলিভিশন ছিল না। তারপরও নেতাদের মুখ থেকে কর্মীদের মুখে, কর্মীদের মুখ থেকে জনতার মুখে রাজনৈতিক বক্তব্য ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হতো। তাছাড়া, আওয়ামী লীগের কর্মসূচির মূলে ৬ দফা-১১ দফা ছিল বহুল আলোচিত। ৬ দফা নিয়ে পাকিস্তানপন্থিদের সঙ্গে বাহাস '৬৬ থেকেই শুরু হয়েছিল।

'৫৪-এর যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা আর '৭০-এর আওয়ামী লীগের ইশতেহার ছিল বিপ্লবাত্মক। এর মধ্য দিয়ে বিদ্যমান অবস্থার পরিবর্তন চাওয়া হয়েছিল। আর এখন মূলধারার দলগুলোর কর্মসূচি গতানুগতিক। তবে গতানুগতিকতার মধ্যেও ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ঘোষিত ভিশন-২০২১ সংবলিত দিনবদলের সনদে চমক ছিল, ডিজিটাল বাংলাদেশের ধ্বনি তরুণদের আলোড়িত করেছিল। নারী অধিকারের বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে নারীদেরও কাছে টেনেছিল। তদপুরি উপস্থাপনার মুন্সিয়ানাও ছিল। প্রচারের ডামাডোলও ছিল। এ কারণে ২০০৮-এর নির্বাচনে সুফলও পেয়েছিল আওয়ামী লীগ। সে যাই হোক, আওয়ামী লীগের ভিশন-২০২১-এর সঙ্গে বিএনপির ভিশন-২০৩০-এর বেশ মিল আছে। আর মিল থাকা দোষের কিছু নয়। বরং তা ইতিবাচক। সব মহল থেকে জাতীয় ঐকমত্যের কথা বলা হচ্ছে। যত মিল থাকবে, সে লক্ষ্যে তত নৈকট্য বাড়বে।

সরকার পদ্ধতিতে একদা আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে অমিল ছিল। কিন্তু '৯১-তে বিএনপি সংসদীয় পদ্ধতিতে প্রত্যাবর্তনের পর সে অমিল আর নেই। প্রধানমন্ত্রীর অধিক ক্ষমতা নিয়ে এই দুই বড় দলের মধ্যে ভিন্নমত ছিল না। তবে ভিশন-২০৩০-এ প্রধানমন্ত্রীর একক ক্ষমতা কমিয়ে আনার কথা বলা হয়েছে। এটি প্রশংসনীয় প্রস্তাব। তবে তা স্পষ্ট করা হয়নি। আর তা না করা হলে এটি হবে- কথার কথা। কথার কথা আরও আছে। যেমন- '৭৪-এর বিশেষ ক্ষমতা আইন বাতিলের কথা হয়েছে। স্বৈরাচারী এরশাদের শাসনকালে সব দলের নেতাদের বক্তৃতায় এই আইন বাতিলের দাবি শুনেছি। বিরোধী দলে থাকলে এটি বাতিলের দাবি করেন, ক্ষমতায় গেলে ভুলে যান। কথার কথা'র আরও উপমা আছে। দুই দলের বক্তব্যে মাদ্রাসা শিক্ষা যুগোপযোগী করার কথা আছে। বিগত বিএনপি সরকার তা না করে দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার্স মানের ঘোষণা করেছিল। গেজেটভুক্ত করার সময় পায়নি। আওয়ামী লীগ সরকারও একই ঘোষণা দিয়েছে। আসলে দুই ভিশনে কর্মসূচি ও কর্মকাণ্ডে এমন ঐক্যের জায়গাই বেশি, অনৈক্যের জায়গা কম।

বিএনপির রূপকল্পে নতুন সংযোজন-দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ। এটিও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখবে বলে বলা হয়েছে। দুটি নিরীক্ষামূলক প্রস্তাবনাই জাতির কাছে সুস্পষ্ট করার দাবি রাখে। শিগগিরই তা করবেন বলে আশা করি।

বিএনপির রূপকল্পে নতুন ধারার রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে । আর তা করতে তারা সামাজিক চুক্তিতে পেঁৗছার কথা বলেছেন। এটি আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তবে এটি হতে হবে বহুমাত্রিক। প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর মধ্যে আবার প্রতিটি দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সঙ্গে অধস্তন কমিটির, দলের সঙ্গে কর্মী-সমর্থকদের সর্বোপরি জনগণের সঙ্গে রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক দলগুলোকে চুক্তিবদ্ধ হতে হবে। এভাবেই রুশোর 'সোশ্যাল কনট্রাক্ট' বিবৃত পথে সামাজিক চুক্তির মাধ্যমে রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন সম্ভব। তবে সর্বাগ্রে প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর মধ্যে চুক্তি বা সমঝোতায় আসা জরুরি মনে করি।

দুই দলের রূপকল্পে অর্থনীতি ও উন্নয়ন প্রস্তাবনার মূলে কোনো অমিল নেই। দুই দলই মুক্তবাজারের অনুসারী। দারিদ্র্য মোচন, মানবাধিকার, সুশাসন, মানবসম্পদের উন্নয়নে ইউএনডিপি, ইউনেস্কোসহ জাতিসংঘের নানা ছকের মধ্যে কসরত করতে হচ্ছে। তাদের প্রেসক্রিপশন বিএনপিও অনুসরণ করেছে, আওয়ামী লীগও করছে। এতে হেরফের হয়, বড় পার্থক্য দেখা যায় না। তাই এসব ক্ষেত্রে দুই ভিশনে সাযুজ্যও আছে।

আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে একাত্তরকে ঘিরে কিছু দূরত্ব আছে। আওয়ামী লীগ বক্তৃতা-বিবৃতিতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, '৭২-এর সংবিধান, চার রাষ্ট্রীয় নীতির কথা বলে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কথা কেবল বলছেই না, আওয়ামী লীগ সরকার তাদের বিচারও করছে। এখন দলটি একাত্তরের অঙ্গীকারের কতটুকু করছে, কতটুকু ছাড় দিচ্ছে- সেটি আরেক প্রসঙ্গ। বিএনপি মুক্তিযুদ্ধের কথা বলে; কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলে না। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ব্যাপারে স্ববিরোধিতায় ভোগে। যে কারণে তার দলিলপত্রে গোঁজামিলও থেকে যায়। বিএনপিকে বুঝতে হবে- এভাবে দুই নৌকায় পা দিয়ে বেশিদূর যাওয়ার সুযোগ নেই।

আর একাত্তরের প্রশ্নে অভিন্ন মত ছাড়া রাজনীতি থেকে আবর্জনা, অস্থিরতা দূর হবে না। বিএনপি যে সামাজিক চুক্তির কথা বলেছে, তা নিশ্চয়ই রাজাকারের বন্ধুদের সঙ্গে হবে না।

বলা আবশ্যক, আওয়ামী লীগের ভিশন আছে। বিএনপি ভিশন ঘোষণা করল। অন্যরাও হয়তো তাদের মতো করে ভিশন ঘোষণা করবে। ভিশনে ভিশনে যত লড়াই হবে, ততই কর্মীরা প্রশিক্ষিত হবে। রাজনীতি উৎকর্ষিত হবে। জনসচেতনতা বাড়বে। নিশ্চয়ই হানাহানি কমে আসবে। আশাবাদী হতে চাই। তবে দলের ভিশন শেষ কথা নয়, জাতির একটি ভিশন থাকতে হবে। থাকতে হবে জাতীয় ঐকমত্য। আমার মনে হয়, এসব ভিশনের মধ্যে জাতীয় ভিশন আছে, তা একত্র করতে হবে। ছোট দলগুলোর কর্মসূচিকে আলোচনায় আনতে হবে। তা টেবিলে বসে সম্ভব নয়। সুস্থ রাজনীতি চর্চার মধ্য দিয়ে জাতীয় চাহিদা ও সমাধান বেরিয়ে আসবে। তবে রাজনীতিতে যদি ভুঁইফোড়, সুবিধাবাদীদের প্রাধান্য থাকে, টাকা ও পেশিশক্তির দৌরাত্ম্য থাকে, 'কাউয়া' ও 'ফার্মের মুরগির' আনাগোনা থাকে, চিহ্নিত স্বৈরাচারী, রাজাকার ও ধর্ম ব্যবসায়ীদের নিয়ে টানাটানি থাকে; তবে ভিশন কীভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব? কর্মসূচি দরকার; তবে তা বাস্তবায়নে যোগ্য নেতৃত্ব চাই। চাই আদর্শবাদী কর্মী বাহিনী।








« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: info@iportbd.com, বার্তা বিভাগ: newsiport@gmail.com