Friday, 22 September, 2017, 2:11 PM
Home শিক্ষা
টিনএজ : প্রসঙ্গ মাধ্যমিক
হোসনে আরা বেগম লিখেছেন ইত্তেফাকে
Published : Wednesday, 17 May, 2017 at 12:00 AM, Update: 17.05.2017 3:13:34 PM, Count : 2

আমি যখন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করতাম, তখন টিনএজের শিক্ষার্থীদের সুযোগ পেলেই বলতাম, তোমাদের এ বয়সটা অত্যন্ত মূল্যবান সময়। এ সময়টাকে কোনোক্রমেই হেলায়-ফেলায় নষ্ট করা যাবে না।

টিনএজ বোঝাতে গিয়ে ওদের বুঝিয়ে দিতাম, থারটিন থেকে নাইনটিন পর্যন্ত ‘টিনএজ’। এ বয়সটা শুধু শিক্ষার্থী নয়, যেকোনো ছেলে-মেয়ের জীবনেই সব থেকে বেশি মূল্যবান সময়। এ সময়টাই ঠিক করে দেবে, কে প্রকৃত মানুষ হবে, কে অধঃপাতে যাবে। আর এ বয়সেই ছেলে-মেয়েরা মাধ্যমিক পর্যায়ে পড়াশুনা করে। জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ অনুযায়ী, নতুন শিক্ষা কাঠামোয় নবম শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত মাধ্যমিক শিক্ষা স্তর হিসেবে বিবেচিত হবে। বর্তমানে প্রচলিত রীতি অনুযায়ী মাধ্যমিক স্তরকে তিনটি পর্যায়ে ভাগ করা হয়েছে। পর্যায়গুলো হলো, (১) নিম্ন-মাধ্যমিক: ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণি, (২) মাধ্যমিক: নবম ও দশম শ্রেণি, (৩) উচ্চ মাধ্যমিক: একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণি।

নিম্ন-মাধ্যমিক থেকেই টিনএজের ছেলে-মেয়েদের শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন শুরু হয়ে যায়। এ পরিবর্তন উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত চলতে থাকে। এ পরিবর্তন অনেক সময় বিড়ম্বনার কারণও হয়ে থাকে। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ পাই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত ছোটগল্প ‘ছুটিতে’। এ গল্পে টিনএজের ফটিকের নাজেহাল অবস্থা আমাদের মনে সহানুভূতির সৃষ্টি করে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আক্ষেপ করে বলেছেন, ‘বিশেষত, তেরো-চৌদ্দ বত্সরের ছেলের মতো এমন বালাই আর নাই। শোভাও নাই, কোনো কাজেও লাগে না। স্নেহও উদ্রেক করে না, তাহার সঙ্গসুখও বিশেষ প্রার্থনীয় নহে। তাহার মুখে আধো-আধো কথাও ন্যাকামি, পাকা কথাও জ্যাঠামি এবং কথামাত্রই প্রগল্ভতা’।

স্বাভাবিকভাবেই এ বয়সের ছেলে-মেয়েদের জীবন এলোমেলো হয়ে যায়। এ পরিবর্তনের সময় ছেলে-মেয়েরা দিগিবদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়ে। এ সময়ে সঠিক দিকনির্দেশনা না পেলে ওরা দিক্ভ্রান্ত হয়ে অসত্ সঙ্গে মিশে নষ্ট হয়ে যেতে পারে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই এ বয়সের ছেলে-মেয়েদের উপযুক্ত স্থান। এখানে একই বয়সের ছেলে-মেয়েরা পড়াশুনা করে—একে অপরের সঙ্গে ভাব বিনিময় করে। উপযুক্ত নির্দেশনা না থাকলে একজন খারাপ হলে সে আরো অনেককে টেনে তার দল ভারি করে। এক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান-প্রধানকে প্রতি ঘন্টায় সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে, বিষয় শিক্ষকরা যথাযথ ক্লাস নিচ্ছেন কিনা। তবে আমাদের অধিকাংশ মাধ্যমিক প্রতিষ্ঠানই বেশ অবহেলিত। উপযুক্ত এবং শ্রেণিতে পাঠদান করার মতো পর্যাপ্ত শিক্ষক প্রায় প্রতিষ্ঠানেই অপ্রতুল। এই অপ্রতুল শিক্ষক নিয়ে টিনএজের ছেলে-মেয়েদের সঠিকভাবে পরিচালনা করা সহজ ব্যাপার নয়। কারণ, বিপুলসংখ্যক ছেলে-মেয়ে মাধ্যমিক পর্যায়ে পড়াশুনা করে। আমরা যদি সময়মতো এই বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর দিকে নজর না দেই, তাহলে সমাজ একটা বিরাট ক্ষতির সম্মুখীন হবে।

সেই মধ্যযুগের কবি শাহ্ মোহাম্মদ সগীর ওস্তাদের কদর বোঝাতে গিয়ে তাঁর ‘বন্দনা’ কবিতায় লিখেছেন,

ওস্তাদে প্রণাম করোঁ পিতা হন্তে বাড়।

দোসর জনম দিলা তিঁহ সে আঁহ্মার।।

শিক্ষার্থীরা মা-বাবার থেকেও শিক্ষকের কথার গুরুত্ব বেশি দেয়। তাই মাধ্যমিক পর্যায়ের টিনএজের উঠতি বয়সের ছেলে-মেয়েদের ক্লাসরুমের নিয়ন্ত্রণের ভেতর রাখার জন্যে শিক্ষককে সবসময় সচেতন থাকতে হবে। ক্লাসরুমে যদি শিক্ষক না থাকেন, তাহলে শিক্ষার্থীরা অনেক সময় বিবেক-বুদ্ধি বিসর্জন দিয়ে উচ্ছৃঙ্খল হয়ে উঠতে পারে। মাঝিবিহীন নৌকা যেমন পথের দিশা পায় না, শিক্ষকবিহীন শিক্ষার্থীদেরও ঠিক একই অবস্থা ঘটে।

সারা দেশের মাধ্যমিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে চাঙ্গা রাখার জন্যে শিক্ষা-মন্ত্রণালয় থেকে শুরু করে শিক্ষাসংক্রান্ত সকল প্রতিষ্ঠানের সুচারু পর্যবেক্ষণ এবং সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ করার প্রয়োজন রয়েছে। তাহলেই মাধ্যমিক পর্যায়ের প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রাণের সাড়া জেগে উঠতে পারে।

টিনএজের ছেলে-মেয়েদের প্রকৃত মানুষ করে গড়ে তোলার জন্যে শুধুমাত্র শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের উপর নির্ভর করলেই চলবে না। কারণ, শিক্ষার্থীরা দিনের একটা নির্ধারিত সময় শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে অবস্থান করে। তাই শিক্ষার্থীদের মাঝে কোনো অঘটন ঘটলেই তা শিক্ষকদের উপর এককভাবে চাপিয়ে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কারণ, দিনের অবশিষ্ট বেশির ভাগ সময়ই তারা কাটায় পরিবার-পরিজন, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, পাড়া-পড়শির সাথে। ওই সময়টাতে যাতে ছেলে-মেয়েরা সঠিক পথে চলে, সে দায়িত্ব মা-বাবা, আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-পড়শি—এমনকি রাজনৈতিক দলগুলোরও।

টিনএজের ছেলে-মেয়েরা যেহেতু প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর থাকে, তাই অতি উত্সাহে ওরা রাজনৈতিক মিটিং-মিছিলে গিয়ে দল ভারি করে। এদের হাতে যখন বোমা-বারুদ তুলে দেওয়া হয়, তখন ওরা নেতার অঙ্গুলি হেলনে রাজপথে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এরা না বুঝে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে নিজেদের জড়িয়ে ফেলে। সময় থাকতে এদের রক্ষা করার দায়িত্ব বিবেকবানদের নিতে হবে। মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা ক্লাসে অনুপস্থিত থাকলে, কঠোর হাতে ওদের প্রতিষ্ঠানমুখী করতে হবে। নির্মল বিনোদনের ভেতর দিয়ে এদের নির্মল চরিত্র গঠনের চর্চা করতে হবে।

দলমত নির্বিশেষে সকল রাজনৈতিক নেতার উচিত, আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে এ পর্যায়ের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের যেন কোনো স্বার্থান্ধ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করা না হয়। এরা যাতে পড়াশুনার সাথে সম্পৃক্ত থেকে বিকশিত হতে পারে, সে সুযোগ এদের করে দিতে হবে। এরাই একদিন প্রকৃত মানুষ হিসেবে, মেধাবী রাজনীতিবিদ হয়ে দেশের সার্বিক মঙ্গল আনতে পারবে।

লেখক: প্রাক্তন উপদেষ্টা, রাজারবাগ পুলিশ লাইনস্ স্কুল এন্ড কলেজ,
প্রাক্তন অধ্যক্ষ, ভিকারুননিসা নূন স্কুল এন্ড কলেজ,
প্রাক্তন অধ্যক্ষ, আজিমপুর গার্লস স্কুল এন্ড কলেজ







« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: info@iportbd.com, বার্তা বিভাগ: newsiport@gmail.com