Saturday, 22 July, 2017, 2:31 AM
Home বিবিধ
পুঁজিপতির সামন্ত ধর্ষণ!
জয়া ফারহানা লিখেছেন যুগান্তরে
Published : Tuesday, 16 May, 2017 at 12:00 AM, Update: 17.05.2017 1:42:03 AM, Count : 3
আপন জুয়েলার্সের স্বত্বাধিকারী দিলদার আহমেদকে ধন্যবাদ। রাজধানীকেন্দ্রিক রাজনৈতিক চিন্তার মুরোদ নেই যেখানে পৌঁছানোর, তিনি সেখানে পৌঁছে দিয়েছেন খবর অথবা প্রতিদিন কোটি কোটি টাকা খরচ করে রাষ্ট্রযন্ত্র উন্নয়নের যে বিজ্ঞাপন দেখাতে তৎপর, সে উন্নয়নের আড়ালে যে কী পরিমাণ দগদগে ক্ষত, তা উন্মোচন করে দিয়েছেন তিনি। প্রতিদিন শত শত ঘটনায় থানা পুলিশের হয়রানির শিকার হয়ে যখন ভুক্তভোগীরা পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে, রাষ্ট্রযন্ত্র সেই অভিযোগ শুনেও শোনে না। মাত্র কয়েকদিন আগেও গাজীপুরে দরিদ্র দিনমজুর হযরত আলী সরকার পালিত মেয়ে আয়েশা আখতারকে নিয়ে ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিয়েছেন কন্যাধর্ষণের বিচার না পেয়ে। তিনিও মামলা করতে গিয়েছিলেন থানায়। পুলিশ মামলা নেয়নি। স্বামী-সন্তান হারিয়ে হযরত আলীর স্ত্রী হালিমা বেগম বলেছেন, শ্রীপুর থানার সহকারী পরিদর্শক বাবুল মিয়ার কাছে তার স্বামী অভিযোগ নিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু জনগণের বন্ধু পুলিশ বাহিনীর এএসআই ঘটনার তদন্তেই যেতে রাজি হননি। এরপর তারা এসআই কায়সার আহমেদের কাছে অভিযোগ দেন। এসআইও জনগণের আরেক বন্ধু। তিনিও তাদের কথা শোনেননি। হালিমা বেগম বলেছেন, ‘ওই পুলিশের অ্যানো (কাছে) গেয়া পাই(পা) ধরচি, ট্যাহা ছাড়া পুলিশ আমার লগে কতাই কইবার চাইচে না। কুনু হানে বিচার পাইচি না। বিচার না পাইয়া আমার কোলজার টুরহাডারে লইয়া আমার সরল মানুষডা আল্লাহর হেহানো বিচার দিত গ্যাছে।’
তো এমন বন্ধু থাকলে আর শত্রুর দরকার নেই। জনগণের বন্ধু পুলিশ যে হযরত আলী বা হালিমা বেগমদের কথা শোনে না, এটা নতুন কিছু নয়। আমরা জানি তা। আচ্ছা দরিদ্রের এলাকা শ্রীপুর থানার কথা থাক। ধনিক শ্রেণীর এলাকা বনানী থানার কথাই বলি। সেখানকার ওসি ফরমান আলীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তিনি নিরপরাধ লোকদের টাকার জন্য হয়রানি করেন। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ আমলে না নিয়ে আসামিদের পক্ষ নেন। ক্ষমতাহীন সাধারণ মানুষের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেন। সূত্রাপুর থানার সেকেন্ড অফিসার থাকাকালীন ডাকাতি মামলার রিমান্ডের আসামিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণে তিনি পদোন্নতি পেয়ে মতিঝিল থানার ওসি হিসেবে যোগ দেন। সেখানেও তার বিরুদ্ধে অন্যায়ভাবে বিপুল অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ উঠেছে। এরপর যোগ দেন বিমানবন্দর থানায়, সেখানে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল স্বর্ণ চোরাচালানের সঙ্গে যুক্ত থাকার। রেইনট্রি হোটেলে দুই ছাত্রী ধর্ষণের মামলাও নিতে চাননি এবং ধর্ষকদের পক্ষ নিয়েছিলেন। দুই ছাত্রী ধর্ষণ মামলায় প্রভাবশালীদের গ্রেফতার না করায় তাকে ক্লোজ করার পরিবর্তে পাঁচ দিনের ছুটি মঞ্জুর করা হয়েছে। এ ছুটির নাম কী? রিক্রিয়েশন লিভ? হতে পারে। পঁয়তাল্লিশ হাজার টাকা মাসিক বেতনের যে ওসি সত্তর লাখ টাকা খরচা করে উত্তরা ক্লাবের মেম্বার হন, তার রিক্রিয়েশনের প্রয়োজন আছে বৈকি। এরপরও যদি আপনি-আমি বলি উন্নয়ন হয়ইনি, তা হলে বিজ্ঞাপন দিয়ে উন্নয়ন দেখানো ছাড়া উপায়ই বা কী! অবশ্য ফরমান আলীদের উন্নয়ন দেখার জন্য বিজ্ঞাপন দেয়ার প্রয়োজন নেই। সাদা চোখেই দেখা যায়।
শুরুতে যে বলেছিলাম, রাজনৈতিক চিন্তার মুরোদ নেই আসল জায়গায় হাত দেয়ার তা নিশ্চয়ই ব্যাখ্যা দাবি করে। দুই ছাত্রীর ধর্ষণের বিনিময়ে আমরা প্রশাসনকে নড়তে চড়তে দেখলাম। ১৪ মে শুল্ক গোয়েন্দা অধিদফতর আপন জুয়েলার্সের সব শাখায় অভিযান চালিয়েছে। এখন দেখা যাচ্ছে, সোনা ও ডায়মন্ডের ব্যবসার পুরো প্রক্রিয়াটিই অস্বচ্ছ। প্রশ্ন, তাহলে কী করে এতদিন এ অস্বচ্ছ প্রক্রিয়া চলতে পারল? যদি ওই দুই ছাত্রী ধর্ষিত না হতো, তাহলে তো সোনা বা ডায়মন্ড আমদানির এ অস্বচ্ছ প্রক্রিয়া চলতেই থাকত। এবং আমরা কোনোদিনই জানতে পারতাম না আপন জুয়েলার্সের ২৬৮ কেজি সোনা এবং ৬১ গ্রামের হীরার পুরোটাই অবৈধ। না জানি এমন কত আপন জুয়েলার্স এমন অবৈধ স্বর্ণ ও ডায়মন্ড ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। এবং আর কত মেয়ে ধর্ষিত হলে সেসব উদঘাটন হবে? শুল্ক ও গোয়েন্দা দল এখন রেইনট্রি হোটেলের বিরুদ্ধে বলছে তারা নাকি ভ্যাট এবং শুল্ক ফাঁকি দিয়েছে। এবং মদ বেচাকেনার লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও মদ বেচেই যাচ্ছে। আবার হোটেলের নথিতে মুদ্রা পাচারেরও প্রমাণ পাওয়া গেছে। তো এতদিন সেটি উদঘাটিত হয়নি কেন? রেইনট্রি হোটেলের মালিক সরকারি দলের সংসদ সদস্য বলে? বিশ্বের শীর্ষ ধনীদের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক অংশ নিজের চেষ্টায় অথবা উত্তরাধিকারসূত্রে ধনী হয়েছেন। বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তি খাতের ধনীরা অর্থ উপার্জন করেছে সম্পূর্ণ নিজের যোগ্যতায়। ধনী হওয়া নিশ্চয়ই কোনো অপরাধ নয়। পুঁজিতান্ত্রিক অর্থ ব্যবস্থাকে যখন মেনে নিয়েছি, তখন এমন অভিযোগ করার অধিকার নেই। কিন্তু রাষ্ট্র এবং ক্ষমতাকে ব্যবহার করে, কর ফাঁকি দিয়ে, অর্থ পাচার করে যারা ধনী বনে গিয়েছেন তাদের বিরুদ্ধে বলার অধিকার নিশ্চয়ই আমাদের আছে। যে দেশে এখনও বিপুলসংখ্যক মানুষ মানবেতর জীবনযাপন করে সেই দেশ অবৈধ অর্থ পাচারের শীর্ষে। ২০১৪ সালে বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে ৭ হাজার ৫৮৫ কোটি ডলার যা গত বছরের বাজেটের দ্বিগুণ। বাংলাদেশে ধনীদের দুনিয়া কেমন, তাদের দিন কীভাবে কাটে, তাদের যাপিত জীবনের সাংস্কৃতিক মানই বা কী, সে বিষয়ে আমাদের মতো ছাপোষা মানুষের কিছু জানা থাকার কথা নয়। রাজধানীকেন্দ্রিক ক্ষমতার রাজনীতি তো খালি উন্নয়নের কথাই বলে। সেখান থেকেই জেনেছি দেশ উন্নয়নের এমন একপর্যায়ে পৌঁছে গেছে যে যারা হতাশাগ্রস্ত অথবা উন্নয়ন সহ্য করতে না পেরে জ্বলে-পুড়ে মরে যাচ্ছে, কেবল তারাই উন্নয়নের বিরুদ্ধে কথা বলে দেশকে অন্ধকারের দিকে টেনে নিয়ে যেতে চায়। ওসব কথাবার্তা থেকে ধনীদের ধনী হয়ে ওঠার গল্প জানার কোনো সুযোগ নেই।
খানিকটা সুযোগ করে দিয়েছেন দিলদার আহমেদ। তিনি বলেছেন, ছেলে নওজোয়ান হলে ওরকম একটু-আধটু তো করবেই। জোয়ানকালে তিনিও ওরকম করেছেন। আমরা জানতে পারলাম, ধনী পিতা এবং তার পুত্রধনদের জোয়ানকাল সামলানোর জন্য বিচিত্র ধরনের বিনোদন দরকার। এমনকি পিতাপুত্রের জোয়ানকালের খাই মেটানোর জন্য অস্ত্রের মুখে ধর্ষণও আর কী এমন বড় ঘটনা! দেখা যাচ্ছে, সেই খায়েশ মেটানোর সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানেরও অভাব নেই। স্বয়ং এমপিপুত্রই নির্বিঘেœ সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। কারা টাকা পাচার করার সুযোগ পাচ্ছে, কাদের পাচারকৃত টাকায় দেশ অবৈধ মুদ্রা পাচারের শীর্ষে উঠে যাচ্ছে, পুঁজি কার স্বার্থ রক্ষায় কাজ করছে- না এগুলো কোনো প্রশ্ন নয়, এসব প্রশ্ন হওয়ার যোগ্যতা রাখে না। আগামীতে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় যাবে না বিএনপি যাবে, তা নিয়ে আমাদের কোনো মাথাব্যথা নেই। গদিতে কে বসবে আর কে বসবে না, তাতেও আমাদের কিছু যায় আসে না। কিন্তু রাষ্ট্র তার জন্মকালীন অঙ্গীকার থেকে সরে গেল কিনা, পুঁজির চরিত্র ধনীকে কতভাবে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে ধনীকে আরও কত ধনী বানিয়ে দেয় এবং গরিবকে সুশাসন থেকে বঞ্চিত করে আরও কত গরিব বানিয়ে দেয়, সে নিয়ে অবশ্যই আমাদের কথা বলার আছে। সংবিধানই আমাদের সেই অধিকার দিয়েছে। আর এ সংবিধান কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা দলের দয়ায় আমরা পাইনি। অসম্ভব চড়া মূল্যে কিনতে হয়েছে এ সংবিধান, রীতিমতো রক্ত ঝরিয়ে, সর্বোচ্চ ত্যাগের মাধ্যমে। রক্ত আর লাশের দাম এত কম ভাবি না যে, ভাবব রাষ্ট্র কেবল ধনিক শ্রেণীর স্বার্থের রাষ্ট্র হয়ে থাকবে। এ রাষ্ট্রটিকে অবশ্যই ঠিক হতে হবে। রাষ্ট্রকে তখনই ঠিক মনে করব, যখন হযরত আলী, হালিমা বেগম, আয়েশার মতো মানুষরা নির্বাহী বিভাগ, শাসন বিভাগ এবং বিচার বিভাগের কাছ থেকে তাদের ন্যায্য অধিকার পাবে। রেইনট্রি হোটেলের ছাত্রী ধর্ষণের ঘটনাটি কেবল আমাদের গড়পড়তার চিন্তাকেই টাল খাইয়ে দেয়নি, খোদ মার্কস সাহেবের চিন্তাকেও ঘোল খাইয়ে দিয়েছে। পুঁজিতন্ত্র থেকে রাষ্ট্র আর কখনও সামন্ততন্ত্রে প্রবেশ করে না বলে মার্কসের যে তত্ত্ব, তা ভুল প্রমাণ হয়েছে। জবানবন্দিতে সাফাত আহমেদ বলেছে, মেয়ে নিয়ে এ ধরনের ঘটনা তাদের নিত্যদিনের রুটিন। এ কি সামন্তকালের নারীর জন্য অবমাননাকর হেরেম প্রথার চেয়ে কোনো অংশে কম কিছু?
জয়া ফারহানা : গল্পকার ও প্রাবন্ধিক








« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: info@iportbd.com, বার্তা বিভাগ: newsiport@gmail.com