Sunday, 19 November, 2017, 3:14 AM
Home শিক্ষা
র‍্যাগিং না নির্যাতন?
মোহাম্মদ অংকন লিখেছেন ইত্তেফাকে
Published : Tuesday, 16 May, 2017 at 12:00 AM, Update: 17.05.2017 1:38:01 AM, Count : 1

র‍্যাগিং শব্দের প্রচলিত অর্থ হচ্ছে ‘পরিচয় পর্ব’। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নতুন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুরাতন শিক্ষার্থীদের একটা সখ্য গড়ে তোলার জন্য যে পরিচিতি প্রথা সেটাকে র‍্যাগিং বলে সবাই জানে। অধিকাংশের মতে র‍্যাগিং সংস্কৃতি মূলত মিলিটারি থেকে এসেছে। যেখানে ‘চেইন অব কমান্ড’ মেনে চলতে হয়। আবার, অনেকের মতে, এর প্রথম শুরুটা হয়েছিল গ্রিক কালচারে; সপ্তম ও অষ্ঠম শতকে খেলার মাঠে টিম স্পিরিট নিয়ে আসার জন্য। কালের বিবর্তনে পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় এটা ঢুকে যায় অষ্টদশ শতাব্দীতে; বিশেষ করে ইউরোপিয়ান দেশগুলোয়। ১৮২৮ থেকে ১৮৪৫ সালের দিকে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় এর প্রচলন ঘটে বিভিন্ন ছাত্র সংস্থার মাধ্যমে। সেসব ছাত্র সংস্থা হলো- পাই, আলফা, বিটা, গামা, কাপ্পা ইত্যাদি। এগুলোয় সদস্যদের সাহসের পরিচয় নিতে র‍্যাগিংয়ের প্রচলন চলে। পশ্চিমে অবশ্য এটাকে হ্যাজিং বলে। আমাদের উপমহাদেশে ইংরেজদের মাধ্যমে এই অপসংস্কৃতি অনুপ্রবেশ করে এবং এর বিবর্তিত রূপটা রয়ে গেছে। বর্তমানে র‍্যাগিংয়ের সবচেয়ে খারাপ প্রভাব শ্রীলঙ্কাতে। যেসব দেশে র‍্যাগিংয়ের উদ্ভব হয়েছে, তারা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর প্রভাব মুক্ত হলেও আমাদের উপমহাদেশে এটি আরো ভয়ঙ্কর রূপ নিয়েছে। এমন অপমানকর প্রথা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভয়াবহ রুপ ধারণ করেছে। এর ফলে ভুক্তভোগীরা আতঙ্ক ও মানুষিক বিষণ্নতায় ভুগছে। যারা এগুলো কাটিয়ে উঠতে পারে তারা পরবর্তীকালে র‍্যাগিংয়ের নের্তৃত্ব দেয়। যারা র‍্যাগিং করে, তারা এটাকে ঠাট্টা মনে করে। অথচ নির্মম নির্যাতন চলে। মানুষকে কষ্ট দিয়ে তাদের মনকে সংকুচিত করে তারা আনন্দ পায়। নবীনদের বরণ করতে, তাদের সঠিক জিনিসটি শিক্ষা দিতে অনেক ভালো ভালো পদ্ধতি থাকা শর্তে এমন প্রথা কেন? মানষের কথা শুনতে হবে, কাউকে কোনো কিছুতে বাধ্য করতে হবে, এটা কেমন নিয়ম?

বাংলাদেশের অধিকাংশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে র‍্যাগিংয়ের নামে নীরব নিপীড়ন নির্যাতন চলে। যা কর্তৃপক্ষ ছাত্র রাজনীতির দাপটে কিছু করতে পারে না। সম্প্রতি খুলনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে র‍্যাগিং নিয়ে নির্মম ঘটনার কথা সকলে জানে। রসিকতার নামে নীরব এই নির্যাতনে পিছিয়ে নেই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল কলেজ ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ভুক্ত সরকারি কলেজগুলোও। র‍্যাগিংয়ের শিকার হয়ে অসংখ্য শিক্ষার্থী স্বপ্ন সিঁড়িতে পা রাখতেই হোঁচট খায়। অনেকে ক্যাম্পাস পরিবর্তন করে, আত্মহত্যার চেষ্টা করে ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। অভিযুক্তদের প্রতি কর্তৃপক্ষের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না থাকার কারণে অবিরাম চলছে এমন নির্মমতা ও নির্যাতন।

আমার এক বন্ধুর নিকট শুনেছি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে র‍্যাগিংয়ের ভয়াবহতা তেমন নেই, আছে ভিন্নতা। ভিন্নতা কি সে তা স্বীকার করেনি। বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে র‍্যাগিং প্রথা অতিমাত্রায় বেড়ে গেছে। আমি ভর্তি পরীক্ষাকালীন সময়, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে এই নির্মমতার সামান্য নমুনা লক্ষ্য করেছি। মেয়েরাও এর সাথে জড়িত ছিল। তবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন চিত্র আমার চোখে পড়েনি। দুর্ভাগ্যজনকভাবে র‍্যাগিং সংস্কৃতিটা দেশের সবচেয়ে মেধাবীরাই অনুশীলন করে। এটাকে তারা ‘মজা’, ‘আদব-কায়দা শেখানো’, ‘বাস্তব পৃথিবীর জন্য তৈরি করা’, ও ‘সিনিয়র-জুনিয়র সম্পর্কোন্নয়ন’ ইত্যাদি নামে প্রচার করে। এসবের নামে নবীন শিক্ষার্থীদের জোরপূর্বক সব রাজনৈতিক বড় ভাইদের পরিচয় মুখস্থ রাখা, পিতা-মাতা ও পরিবারের অন্যদের জড়িয়ে অশ্লীল ভাষা ব্যবহার, সবার সামনে পুরোপুরি নগ্ন করে নাচানো, সবার সম্মুখে চরম অশ্লীল বই পড়তে বাধ্য করা, সবার সামনে যৌন অভিনয়ে বাধ্য করা, পেস্ট খেতে বাধ্য করা, সবার সামনে পর্নো দৃশ্য দেখতে বাধ্য করা, রাতে মশার কামড় খাওয়ানোর জন্য বাইরে দাঁড় করিয়ে রাখা, কান ধরে উঠবস, বুকডন, মুরগি হয়ে বসিয়ে রাখা, প্রকাশ্যে কোনো মেয়েকে প্রেমের প্রস্তাব দিতে বাধ্য করা, শীতের মধ্যে পানিতে নামানো ও ফুটবল খেলতে বাধ্য করা, শীতের রাতে সিনিয়রদের কাজে বাইরে পাঠানো, সিগারেট, গাঁজা, মদ পানে বাধ্য করা, ম্যাচের কাঠি দিয়ে রুম, মাঠের মাপ নেয়া, কোনো আদেশ না মানলে গায়ে হাত তোলা ছাড়াও কথার মারপ্যাঁচে বিব্রত করা হয়। এসব কি কোনো নিয়মের আওতায় পড়ে?

কে জানে না যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনগুলো নিয়ন্ত্রণ করে। সিট পাওয়ার আগে জুনিয়রদের গণরুমে রাখা হয় সত্য, সেই সাথে প্রতিরাতে র‍্যাগিং চলে। এ ধরনের র‍্যাগিংকে আমি ‘রাজধানীর সিটিং সার্ভিসের মতো চিটিং’ বলে অভিহিত করেছি। কর্তৃপক্ষ এসবের বিরুদ্ধে কঠোর হলে বিব্রতকর, অপমানকর নতুন শিক্ষার্থীদের প্রতি এ মানুষিক অত্যাচার অচিরেই বন্ধ হবে। সত্য হলো, কেউ প্রশাসনের কাছে অভিযোগের সাহসও পায় না। প্রশাসন তো দায়সারা হয়ে থাকে, ছাত্র রাজনীতির তোপেরমুখে পড়ে যেন দেখেও দেখে না । তবে আমার প্রবল ইচ্ছা ছিল, এই প্রথা দূর করতে আন্দোলন করার। কিন্তু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সামান্য ব্যবধানে ছিটকে পড়েছি। শুধু র‍্যাগিংয়ের কারণে আমার কিছু বন্ধু কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দেয়নি। র্যাগিংয়ের নামে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলের গেস্টরুম, গণরুম ও বিভাগের করিডোরে প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা মধ্য রাত পর্যন্ত শারীরিক নির্যাতন করে, এমন গল্প শুনেছি, হাবিপ্রবির তাজ উদ্দিন হলের এক বড় ভাইয়ের কাছে। সাধারণত র্যাগিং যারা দেয় তারা ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। তারা নবীনদের প্রথমেই জানিয়ে দেয় তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে কোনো লাভ নেই এবং দু-চারটি উদাহরণ পেশ করেন। তাছাড়া অভিযোগ করলে পরবর্তীকালে অন্য সমস্যা হতে পারে এই ভয় দেখায়। অনেকেই এটাকে ‘রীতি’ হিসেবে মেনে নেয়। কিছু ছাত্র আছে যারা আবার এটা উপভোগ করে আর সহপাঠী র্যাগিংয়ের শিকার হলে তাকে সান্ত্বনা দেয় ও অভিযোগে অনুত্সাহিত করে। র‍্যাগিংয়ের ফলে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থী বাধ্য হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়তে, অনেকে মানসিক বুদ্ধি প্রতিবন্ধী হয়ে পড়ছে।

ভারতসহ অন্যান্য দেশে র্যাগিং প্রতিরোধে আইন থাকলেও বাংলাদেশে সুস্পষ্ট র‍্যাগিং প্রতিরোধে কোনো আইন নেই। সুনির্দিষ্ট আইনের অভাব আর সুস্থধারার রাজনীতির অনুপস্থিতি এমন সামাজিক ব্যাধি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আরো ছড়িয়ে পড়ছে বলে আমি মনে করি।

লেখক :শিক্ষার্থী, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজি, ঢাকা








« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: info@iportbd.com, বার্তা বিভাগ: newsiport@gmail.com