Friday, 22 September, 2017, 1:56 PM
Home বিবিধ
কথা নিয়ে কত কথা!
চিররঞ্জন সরকার
Published : Sunday, 14 May, 2017 at 2:51 PM, Count : 18
সম্প্রতি কথা বলা নিয়ে নানা কথা হচ্ছে। ‘কথা’ নিয়ে যে শুধু আইনমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি কথা বলেছেন তাই নয়, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরও কথা বলেছেন। সম্প্রতি তিনি দলের নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে বলেছেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর মাত্র দেড় বছর বাকি। সুতরাং কথা কম বলে বেশি বেশি কাজ করুন।

দেখা যাচ্ছে কথা বলা বা বেশি কথা বলা নিয়ে দেশের মাননীয়রাও মুখ খুলেছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ‘কথা বলা’ নিয়ে এত কথা কেন? কথা বললে, কিংবা বেশি কথা বললে সমস্যা কোথায়? বেশি কথা বললেও কিন্তু সমস্যা হয় না, যদি সেটা কাজের কথা হয়। আবার অকাজের কথা বা বাজে কথা কম বললেও তা অনেকের কাছে সহনীয় মনে হয় না। কেউ কেউ আবার কিছু না বলেও অনেক কথা বলে যান। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যেমনটি বলেছেন, ‘অনেক কথা যাও গো বলি কোনো কথা না বলি।’

মানুষ আসলে কথা না বলে থাকতে পারে না। বাক-প্রতিবন্ধী ছাড়া কম-বেশি সবাই কথা বলে। কেউ বেশি কথা বলে কেউ বা কম। পৃথিবীতে এমনও মানুষ আছে যারা হয়তো একদিন না খেয়ে থাকতে পারবে কিন্তু কথা ছাড়া থাকতে পারবে বলে মনে হয় না! একদিক থেকে দেখলে আসলে কথাই মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে। সুখের কথা যদি আমরা কাউকে না বলি সে সুখের মূল্য কি? আবার যখন দুঃখ আসে তখন কারো মুখের দুটো কথাই বাঁচার আশা জাগায়। কথাই অনেক সময় আনন্দ, আবার কথাই দুঃখ। কথার কারণেই ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়, আবার কথা দিয়েই তা ভাঙানো হয়। কথাই মানুষকে বড় করে, কথাই আবার মানুষকে নিচে নামায়। কথাতেই সত্য প্রকাশ পায় আবার মিথ্যাও কথার মাধ্যমেই আসে। সবটা আসলে নির্ভর করে আমাদের মর্জির ওপর। আমরা কোন কথা মুখ দিয়ে বলার জন্যে বেছে নেব। আর কোন কথাটা এড়িয়ে চলব।

অনেকে কম কথা বলেন, কাজ বেশি করেন। কেউ কথা বেশি বলেন, কাজ কম করেন। অনেকে যতটুকু বলেন, ততটুকু করেন। কেউ আবার না করেও বলেন। আর কেউ না বলেও করেন। এই কথা ও কাজের ক্ষেত্রে কে ভালো কে মন্দ, তা সবাই জানেন। তার পরও একটা মান বা স্ট্যান্ডার্ড বোধহয় আমাদের চারপাশ থেকেই বোঝার আছে।

কম কথা বলে যে কাজ করে যায়, তার কাজই তাকে মানুষের কাছে স্মরণীয় করে রাখে। কথার মানুষ আর কাজের মানুষ এক নয়। অনেকে নিভৃতচারী, কেবল কাজই করে যান। আপাতদৃষ্টিতে তাদের কেউ অনেকটা অবহেলিত কিংবা তার সময়ে তেমন দাম পান না। কিন্তু মৃত্যুর পর ঠিকই তার কাজ তাকে অবিস্মরণীয় করে রাখে। কাজ করলে তা বলা দরকার, তাতে হয়তো মানুষ বুঝতে পারে। কাজ না করে বলাটা নিশ্চয়ই সমীচীন নয়। অল্প করে বেশি বলাও উচিত নয়।

তবে কথা বড় মারাত্মক জিনিস। কবি লিখেছেন: ‘মধুবাবুর কথার বিষে, পাড়ার লোকে হারায় দিশে’ অর্থাত্ কথায় সত্যি বিষ আছে। নাম ‘মধু’ বাবু হলে কি হবে, কথার জ্বালায় সবাইকে অতিষ্ঠ করতে পারেন তিনি। কথায় কী হয়? এ কথার জবাবটা বোধহয় সহজ নয়। কথায় অনেক কিছু হয়। হতে পারে। আবার নাও হতে পারে। মূল ব্যাপার হলো কোন কথা, কেমন কথা, কে বলছেন, কাকে বলছেন! ভাবুকরা বলে থাকেন, ‘কথা শতধারায় বয়’।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বিখ্যাত একটি কবিতা আছে ‘কেউ কথা রাখেনি’।‘তেত্রিশ বছর কাটল কেউ কথা রাখেনি’। এটা হলো কবিতার প্রথম লাইন। আর কবিতার শেষে আছে, মোক্ষম কথাটা, ‘কেউ কথা রাখে না’! কবিতাটিতে বেশ কতক কথা-না-রাখার ছোট-ছোট গল্প বলেছেন কবি। বলেছেন অসাধারণ চিত্রকল্প সহযোগে। বৈষ্ণবী, নাদের আলি, বরুণা কথা প্রত্যেকেই দিয়েছিল, কেউই কথা রাখেনি। মানুষের জীবন কি তাহলে এই রকমই কথা না-রাখার পঞ্জিকা?

তা হলে, সেই কবিতা, এমন নেতিবাচক কবিতা যুগযুগান্তর ধরে এমন প্রসিদ্ধ হয় কী করে? আসলে এ কবিতা বলতে চায়, মানুষের কথা রাখা উচিত, তাই কথা রাখার ব্যাপারে এক আশ্চর্য আকুলতা সৃষ্টি করে কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের এ কবিতা। কবিতাটা নেগেটিভ, নট ফর নেগেটিভ। নেগেটিভ ফর পজিটিভ।

অপর এক কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় বলেছিলেন অন্য কথা। বলেছিলেন, ‘আগে কথায় কাজ হত।?’ কথাটার মানে হলো, আগে কথা হত, কাজও হত। আর এখন কথা হয়, কাজ হয় না।

কথা শব্দটির নানান মানে। সুনীলের কবিতায় কথা মানে প্রতিশ্রুতি। কিন্তু সুভাষের বাক্যে কথা মানে বাণী। বা কথা মানে সত্যকথা বা কথা মানে মানুষের সুচেতনার অভিব্যক্তি। কথার আরো নানা অর্থ হতে পারে, হয়। কথা বলতে অনেক সময় আখ্যান বা জীবন-আখ্যান বোঝায়। কথাসাহিত্য শব্দজোটে কথা বলতে গল্প বা আখ্যান বোঝায়। ফের ধর্মকথা বলতে আমরা যেমন ধর্মের কাহিনি বুঝি, ধর্মের উপদেশও বুঝি, ফের আধ্যাত্মিক আদর্শও বুঝি। কিন্তু যখন আমরা বলি মুখের কথা, তখন কখনো কখনো আমরা মুখের বাক্যকে তুচ্ছ করি।

যেকালে লিখিত ভাষার জোরদার প্রতিষ্ঠা ঘটেনি, সেকালে মানুষের মুখের কথার জোর ছিল উল্লেখযোগ্যভাবে অধিক। মুখের কথার ছিল অশেষ গুরুত্ব। যাকে বলি শাস্ত্রবচন, তা আসলে তো কথাই। এক সময় সমাজে কবি-সাহিত্যিকদের খুব মান্য করা হত। তাদের কথার গুরুত্ব ছিল। তখন ভাবা হত কবি-সাহিত্যিকদের কথার মধ্য দিয়ে ঈশ্বর কথা বলেন। তাদের কথাতেও থাকত ঈশ্বর-বন্দনা। এ যুগের মানুষ সাহিত্যের ভেতর থেকে ধ্বনি বা শব্দ বা চিত্রকল্প গঠিত ঈশ্বরকে খানিকটা সরিয়ে রাখতে চায়। কারণ ঈশ্বরের নামেও আজকাল মানুষ মানুষকে প্রতারিত করে। মানুষের মুখের শব্দকে কেউ আর শব্দব্রহ্ম ভাবে না। তাহলে কি কবিতায়-সাহিত্যে সত্যকে ব্যক্ত করার কাজ আজ ফুরিয়েছে?

কথা দিলে কথা রাখতে হয়, এটা মূল্যবোধ, কথায় কাজ হয়, এটাও মূল্যবোধ। দাগা খেয়েও মানুষ কথাতেই ভরসা রাখে। এর কারণ কী? কারণ কথায় বিশ্বাস না রাখলে গরিব তার আহত-মলিন জীবনটাকে সামনের দিকে ঠেলে ঠেলে নিয়ে যেতে পারে না। কথা বলতে হবে। কথা বলতে দিতে হবে। কথা যেন বিশ্বাসযোগ্য ও যৌক্তিক হয়, সেদিকটাও খেয়াল লাখতে হবে। কথা যেন মানুষের মুখশ্রী হয়, মুখোশ নয়। পরিশেষে কবির ভাষায় নিবেদন: ‘সবাই শুধু কথা বলে/কাজ করে না কেউ/মিটিং সিটিং চারিদিকে১/কথার কেবল ঢেউ।/টকশোতে হয় নানান কথা/দেয় উপদেশ হাজার/কেমন করে হাঁটতে হবে/করতে হবে বাজার/কথার মেলা, কথার খেলা/কথার কত রং/কথায় কথায় বাড়ছে শুধু/কথারুদের ঢং।/সবকিছু তাই ‘কথার কথা’/হচ্ছে বুঝি আজ/কথা ছেড়ে আসুন সবাই/করি নিজের কাজ—জাহিদ রহমান, কথার কথা)।

লেখক :রম্যলেখক





« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: info@iportbd.com, বার্তা বিভাগ: newsiport@gmail.com