Friday, 22 September, 2017, 1:55 PM
Home সাহিত্য-সংস্কৃতি
একজন আধুনিক মানুষের প্রতিকৃতি
রফিকুন নবী লিখেছেন প্রথম আলোয়
Published : Wednesday, 10 May, 2017 at 12:00 AM, Update: 11.05.2017 4:10:34 PM, Count : 62

ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কের প্রায় শেষ প্রান্তে অসংখ্য গাছগাছালিতে আড়াল হয়ে থাকা একান্ত নিরিবিলি বাড়ি। পরম শ্রদ্ধেয় কামাল উদদীন আহমদ খান এবং তাঁর সহধর্মিণী কিংবদন্তি কবি বেগম সুফিয়া কামালের বাসগৃহ এটি। তাঁরা ছিলেন আমাদের সবার খালু-খালা।

আপাতদৃষ্টিতে বাড়িটিকে নিরিবিলি মনে হলেও আসলে সর্বক্ষণ, বলা যায় সকাল-সন্ধ্যা দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের, মুক্তচিন্তার আধুনিক মনস্ক, দেশাত্মবোধে উজ্জীবিত মানুষের আসা-যাওয়ায় মুখর থাকত। নানান সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনা তো থাকতই, রাজনীতির কথাবার্তাও হতো। প্রথিতযশা সংগীতশিল্পীদের আনাগোনা যেমন ছিল, তেমনি ছিল আঁকিয়েদেরও। আমরা কতিপয় ছিলাম শেষোক্তদের দলের। শিল্পী হাশেম খান, শিল্পী শাহাদাত চৌধুরী (বিচিত্রা সম্পাদক), আবুল বারাক আলভী ও আমি। আমাদের অবস্থানটি ছিল পুরো পরিবারেই ভিন্নতর। দুজনের স্নেহধন্য হওয়ার সুবাদে প্রায় প্রতিদিনই আমাদের উপস্থিতি ছিল অবধারিত। সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রের নানান করণীয় দিক নিয়ে ভাবনাচিন্তা ছিল নিত্যদিনের আলাপের বিষয়।

ড্রয়িংরুমের পাশেই ছিল খোলা লাউঞ্জ। স্থানটির দুদিকের দেয়ালজুড়ে থাকত বইয়ের আলমারি। মাঝখানে অনেকগুলো বেতের চেয়ার। সেগুলোর বেশির ভাগই দখলে থাকত একগাদা বিড়ালের। একটিতে বসে থাকতেন খালু। বই বা পত্রপত্রিকায় নিবিষ্ট চোখ। আমরা ঢুকতেই প্রথমে কুশল জিজ্ঞেস করতেন। তারপর তাঁর ভাবনায় নতুন কিছু জিজ্ঞাসা থাকলে বা বলার কিছু থাকলে বসতে বলতেন। নইলে ড্রয়িংরুমে চলে যেতে বলা ছিল দস্তুর। আসলে আমাদেরও তাঁকে বলার মতো কিছু থাকত না হেতু চোখের আড়াল হওয়ার চেষ্টায় থাকতাম সবাই।

খালুকে এমনিতেই অত্যন্ত গম্ভীর বলে মনে হতো। মনে হতো স্বল্পভাষী। কিন্তু কখনো কখনো তাঁর পছন্দসই বিষয় পেলে মন খুলে কথা বলতেন। বলা বাহুল্য, ষাটের দশকের পুরো সময়টা ছিল সামরিক শাসন। সেই কারণে নানান দুর্বিপাকে দিনযাপন ছিল অসহনীয়।
তাই তো নানামুখী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক মহলের মানুষের সংগঠিত হওয়ার সময় অতিবাহিত হওয়া ছিল দস্তুর। খালু সেই সবের কোনো বিষয় পেলে দীর্ঘক্ষণ আলাপ করতেন। কী পরিণতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে সবকিছু, তা নিয়ে নিজের মতামত ব্যক্ত করতেন। মনে আছে, উনসত্তরের গণ-আন্দোলনের সময় তিনি একদিন বলছিলেন, ‘পাকিস্তানের সঙ্গে থাকার সময় ফুরিয়ে
আসছে। কলোনি ভাবার জন্য ওদের দিন আর বেশি নেই।’

তাঁর এই উক্তি সত্যে রূপান্তরিত হতে বেশি সময় লাগেনি। পরবর্তী বছরেই বোঝা গিয়েছিল নির্বাচনের ফলাফল দেখে এবং তার পরের বছর তো যুদ্ধ শেষে স্বাধীন বাংলাদেশই আমরা পেয়ে গেলাম।

১৯৭১-এ দেশ স্বাধীন হওয়ার পর হঠাৎ করেই আমি গ্রিক সরকারের বৃত্তি পেয়ে উচ্চতর লেখাপড়ার জন্য এথেন্সে যাওয়ার সুযোগ পাই। ১৯৭৩-এ সেখানে যাওয়ার আগে খালা-খালুর সঙ্গে দেখা করতে গেলে বিদেশ নিয়ে অনেক উপদেশ দিয়েছিলেন। খালু বলেছিলেন, ‘দেশ স্বাধীন হওয়ার সুফল। সহজেই বিদেশের বৃত্তি পেলে। অতএব উচিত হবে লেখাপড়ায় ভালো করা। দেশের সুনাম বজায় রাখা। নতুন দেশের একজন প্রতিনিধি হয়ে যাচ্ছ, মনে রাখবে, বিদেশিরা কিন্তু অন্য চোখে দেখবে।’ তাঁর এই কথার প্রমাণ পেতে দেরি হয়নি। সেখানেও জনগণের মধ্যে অনেকের পাকিস্তানপ্রীতি তখনো অটুট ছিল। অতএব, তাদের সঙ্গে প্রতিনিয়ত বাগ্‌যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে হতো। এসব কারণে খালুর উপদেশ প্রায়ই মনে হতো।

লেখাপড়া শেষে দেশে ফিরে দেখা করতে গেলাম। দেখলাম সেই আগের মতোই খালু বই হাতে বসা। একথা-সেকথার পর একপর্যায়ে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, জয়নুল আবেদিনের কাজ আমি আমার গ্রিক শিল্পী-অধ্যাপকদের দেখিয়েছিলাম কি না। দেখে থাকলে তাঁরা কী মূল্যায়ন করেছিলেন। কথাটা উঠেছিল আমার কথার পিঠে, বক্তব্য থেকেই। অর্থাৎ, আমি এথেন্সে অধ্যাপকদের বাংলাদেশের শিল্পীদের কাজের ক্যাটালগ দেখিয়েছিলাম। তাঁরা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে তা দেখে প্রশংসা করেছিলেন।

আমাদের, মানে শিল্পীদের কাছে পেলে তিনি শিল্পকলা নিয়ে জ্ঞানগর্ভ আলোচনা যেমন করতেন, তেমনি অন্যান্য ক্ষেত্রের কাউকে পেলে সেই দিকের ভালো-মন্দ নিয়ে আলাপে বসতেন। রাজনীতিও তা থেকে বাদ থাকত না। কারণ, তিনি প্রচণ্ড রাজনীতিসচেতন ছিলেন। তাঁর প্রশ্রয়ে পুরো বাড়িতেই রাজনীতির আবহ বিরাজমান ছিল। খালা কবি সুফিয়া কামাল যে দুঃসাহসী ভূমিকা রেখে দেশের সুস্থ সংস্কৃতি, নারীমুক্তি, অসাম্প্রদায়িক সমাজ প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি নিয়ে আধুনিক মনস্ক হওয়ার লড়াইয়ে অবতীর্ণ হতে পেরেছিলেন, তার পেছনের প্রধান শক্তিটি যে ছিলেন তিনি, এ কথা সহজেই অনুমেয়।

খালু বলেছিলেন, ‘পশ্চিমা দেশগুলো নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতেই চিরকাল ব্যস্ত। আমরাও ওদিকেই তাকিয়ে থাকি। সেখানে কী হচ্ছে। কারা কোথায় কী করছে, এই সবকে বিশ্বময় জানান দিয়ে নিজেদের উচ্চাসনে অধিষ্ঠিত করছে। আমাদের এই প্রাচ্যেও যে চর্চাটা কোনো অংশে কম নয়। বরং নিজ নিজ সাংস্কৃতিক দর্শনকে উপজীব্য করে বিশাল কর্মকাণ্ড রয়েছে। সে দিকটাকে ধর্তব্যজ্ঞান করে না।

শিল্পকলা ও শিল্পীদের তিনি ছিলেন শুভানুধ্যায়ী। শিল্পকলার জগৎ সম্বন্ধে খবরাখবর রাখতেন। কনিষ্ঠ কন্যা সাঈদা কামালকে ছবি আঁকিয়ে বানিয়েছিলেন। ছবি আঁকেন যুক্তরাষ্ট্র নিবাসী কনিষ্ঠ পুত্র সাব্বিরও। এ ক্ষেত্রে দুজনেরই খ্যাতি রয়েছে।

কামাল উদদীন আহমদ খান লেখাপড়া করেছিলেন বিজ্ঞান নিয়ে। বিজ্ঞানের খুঁটিনাটি নিয়ে লেখালেখি করতেন। উল্লেখযোগ্য পত্রপত্রিকায় সেসব ছাপা হতো। এই লেখার অভ্যাসটি শুরু হয়েছিল যৌবনেই এবং কল্যাণকামী হরেক বিষয়ে লিখতেন। এসবের কারণে তিনি একজন অত্যন্ত আধুনিক প্রগতিশীল মানুষ হিসেবে গণ্য ছিলেন। তাঁর স্মরণে লেখা আবদুল কাদির সাহেবের একটি বক্তব্য এখানে উদ্ধৃত করছি। ১৯২৭ সালের ৪ আগস্ট তারিখের সাপ্তাহিক গণবাণী পত্রিকায় প্রকাশিত একটি লেখার উল্লেখ করতে গিয়ে কাদির সাহেব লিখেছিলেন, ‘তাঁর গণকল্যাণমুখী প্রগতিশীল চিন্তাধারা আমার সপ্রশংস দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল।’

কাদির সাহেবের লেখাটিতে কামাল খালুর বিষয়ে আরও অনেক উল্লেখ রয়েছে, যা থেকে প্রতীয়মান হয় যে তিনি শুধু বিজ্ঞান নিয়ে, শিশুতোষ কবিতা বা গল্প নিয়েই লেখালেখি করেননি, সামাজিক বিষয় নিয়েও লিখতেন। এমনকি ১৩৩৭ সনে জয়তী নামের সাহিত্য পত্রিকায় ‘অতি-বিবাহ’ শিরোনামে একটি একাঙ্কিকাও লেখেন। লেখাটি নারী-পুরুষের সম্পর্ক নিয়ে। গল্পের নায়িকা-নায়ক হিন্দু ও মুসলমান। সে আমলে ব্যাপারটি সহজ ছিল না। ধর্মীয় শাসন-অনুশাসনের কঠিনতাকে জেনেও এমন সাহসী অথচ রোমান্টিকতাকে লেখায় প্রশ্রয় দেওয়া সাহসী না হলে সম্ভব ছিল না। প্রচলিত নিয়মের ধারাবাহিকতা থেকে মুক্ত হওয়ার প্রচেষ্টায় যে ‘কল্লোল’ গোষ্ঠী সাহিত্য আর সংস্কৃতির ক্ষেত্রে নতুন ধ্যানধারণার অবতারণা করেছিল, তারও অনুসারী ছিলেন। এসবও কাদির সাহেবের লেখায় পাওয়া যায়।

আধুনিক ছাঁচে কবিতাও লিখতেন। শিশুদের জন্য ‘পাইড পাইপার অব হ্যামেলিন’-এর বঙ্গানুবাদ করেছিলেন। ‘হ্যামেলিনের অদ্ভুত বাঁশিওয়ালা’ নামে এবং কাব্যধর্মিতাকে বজায় রেখে।

এত সব গুণাবলি ধারণ করা শ্রদ্ধাজাগানিয়া মানুষটিকে অতি কাছে থেকে দেখেছি। স্নেহাশিস পেয়ে ধন্য হয়েছি। সেই সঙ্গে আমরা নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য দেশকে, মানুষকে, নিজের সময়টিকে বুঝতে পারার যে প্রয়োজনীয়তা, সেই উপদেশ আমাদের পাথেয় হয়ে আছে।

রফিকুন নবী: চিত্রশিল্পী ও কার্টুনিস্ট।

 





« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: info@iportbd.com, বার্তা বিভাগ: newsiport@gmail.com