Sunday, 19 November, 2017, 3:20 AM
Home ধর্ম
বুদ্ধ পূর্ণিমা এবং বুদ্ধের অহিংসার মন্ত্র
ভদন্ত প্রজ্ঞানন্দ মহাথেরো লিখেছেন ইত্তেফাকে
Published : Wednesday, 10 May, 2017 at 12:00 AM, Update: 10.05.2017 1:28:03 PM, Count : 24

আজ শুভ বুদ্ধ পূর্ণিমা। বৌদ্ধ জগতে এ মহান পূর্ণিমার গুরুত্ব ও তাত্পর্য অপরিসীম। মহান পুণ্যপুরুষ মানবপুত্র বুদ্ধ এ পূর্ণিমা তিথিতে সিদ্ধার্থ গৌতম রূপে কপিলাবস্তুর লুম্বিনী উদ্যানে ভূমিষ্ঠ হয়েছিলেন, বুদ্ধগয়ার বোধিবৃক্ষতলে ৬ বছর ৪৯ দিন কঠিন এবং কঠোর ধ্যান সাধনার মধ্য দিয়ে তাঁর ৩৫ বছরের বয়সকালে এ বৈশাখী পূর্ণিমা তিথিতেই সম্যক সম্বুদ্ধত্বজ্ঞানে অধিষ্ঠিত হয়ে নির্বাণ লাভ করেছিলেন। এ পূর্ণিমা তিথিতেই বুদ্ধ ৮০ বছর বয়সে কুশিনারার যুগ্ম শালবৃক্ষতলে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন। এজন্যে গোটা বিশ্ব বৌদ্ধ-জগতে এ পূর্ণিমাটি ত্রিস্মৃতিবিজড়িত মহান বুদ্ধ পূর্ণিমা হিসেবে গভীর শ্রদ্ধার সাথে পালিত হয়।

অহিংসা, মহামানবিকতা, পৃথিবীর তাবত্ প্রাণী-প্রজাতির প্রতি অমলিন কল্যাণকামিতা, মৈত্রী ও করুণার স্বপ্ন-সম্ভাবনার সংশ্লেষণে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার দীপ্তোজ্জ্বল কাণ্ডারি মহামানব বুদ্ধ। আমাদের গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারও বাংলাদেশস্থ সমতল ও আদিবাসী বৌদ্ধদের প্রতি প্রাণময় সহযোগিতা, স্বীকৃতি ও সম্মাননার বাতাবরণে এ দিবসটিকে সরকারি ছুটি হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন। ঐতিহ্যগত পারম্পর্য বজায় রেখে বাংলাদেশের বৌদ্ধ জনগণ অহিংসার মূর্ত প্রতীক মানবপুত্র বুদ্ধের পাদমূলে তাঁদের জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ অর্ঘ্য নিবেদনপূর্বক বৌদ্ধিক চিন্তা-চেতনায় অভিষিক্ত হওয়ার প্রত্যাশাপূর্ণ অঙ্গীকারের পুনর্মূল্যায়নের প্রয়াস পাচ্ছে। এ প্রয়াসের সংশ্লেষণে বৌদ্ধ জনগণ দিনব্যাপী নানা অনুষ্ঠানমালার মধ্য দিয়ে বুদ্ধ পূজা, পঞ্চশীল ও অষ্টশীল গ্রহণ, ধর্মশ্রবণ, ধর্মপর্যালোচনা, পরম পূজ্য ভিক্ষুসংঘকে দান-দক্ষিণা প্রদানসহ নানাবিধ পুণ্যকর্ম সম্পাদন করবে। তার পাশাপাশি বাংলাদেশের তাবত্ জনগোষ্ঠী, বিশ্বের তাবত্ প্রাণী-প্রজাতির সর্বাঙ্গীন উন্নয়ন ও মঙ্গল কামনাসহ বিশ্বশান্তির উদ্দেশ্যে বিশেষ প্রার্থনানুষ্ঠানের আয়োজন করবে।

বুদ্ধ মহাকারুণিক। তিনি মৈত্রী, প্রেম ও অহিংসার মূর্ত প্রতীক। বিশ্বের তাবত্ প্রাণী-প্রজাতির দুঃখ-মুক্তিই হলো তার ধর্ম-দর্শনের মর্মবাণী। তার ধর্ম-দর্শনের আরেকটি মর্মবাণী হলো শত্রুতার দ্বারা শত্রুতা নিরসন বা শত্রুতার স্থায়ী নিরসন বা নির্মূলকরণ অসম্ভব। শত্রুতা শত্রুতা ডেকে আনে। সন্ত্রাস সন্ত্রাস ডেকে আনে। হিংসা হিংসা ডেকে আনে। শত্রুতা, সন্ত্রাস, হিংসা, রক্তের বদলে রক্ত, চোখের বদলে চোখ বুদ্ধের ধর্ম-দর্শনের মর্মবাণী নয়। এসবের বিপরীত ক্ষমা, মৈত্রী, করুণা, অহিংসা, সমচিত্ততার উত্কর্ষ সাধনই বুদ্ধের ধর্ম-দর্শনের মর্মবাণী। নর-নারীর যাপিত জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে প্রতিমুহূর্তের কর্মে কথায়-বার্তায়, চলনে-বলনে, আচারে-ব্যবহারে, মননে-অনুশীলনে সদাসর্বদা অপ্রমত্ততা বা সংযম সুসংরক্ষণই বুদ্ধের ধর্ম-দর্শনের মর্মবাণী।

বুদ্ধের ধর্ম-দর্শনের আরেকটি অনন্য সাধারণ মর্মবাণী হলো জন্মসূত্রে কেউ বৌদ্ধ হয় না। একমাত্র কর্মসূত্রেই বৌদ্ধরা বৌদ্ধ হিসেবে দাবি করতে পারেন। কারণ একজন বৌদ্ধকুলে জন্মগ্রহণ করে যদি সে প্রাণীকে হিংসা করে, প্রাণী হত্যা করে, চুরি করে, দুর্নীতিবাজ হয়, ঘুষখোর হয়, আত্মস্বার্থ চরিতার্থকরণের লক্ষ্যে ছল-চাতুরিসহ ধান্ধাবাজি, মতলববাজি ও কুচক্রী হিসেবে কাজ করে, ব্যাভিচার করে, মিথ্যা কর্কশ বাক্য বলে আর মদ-গাঁজা আফিন বা মরণঘাতী নেশাদ্রব্য সেবন করে তাহলে তাকে কোনোমতেই সত্যিকার বৌদ্ধ বলা যাবে না।  তেমনি কেউ গৈরিক বসনধারণ করলে ভিক্ষু হয় না। যিনি জাগতিক সর্ববিধ পাপ-পুণ্যের ঊর্ধ্বে উঠে ব্রহ্মচর্যপরায়ণ হয়ে সত্যিকার জ্ঞানালোকে উদ্ভাসিত অবস্থায় জগতের সকল প্রাণী-প্রজাতির সার্বিক কল্যাণ কামনায় সর্বমাঙ্গলিক কর্মে নিজেকে ব্যাপৃত রাখেন বুদ্ধ তাঁকেই সত্যিকার ভিক্ষু হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তবে বর্তমান এ একবিংশ শতাব্দীর দ্বন্দ্ব বিক্ষুব্ধ, হিংসা-কূটিল, বক্র মন-মানসিকতা তাড়িত, চর্চিত, অনুশীলিত, ক্ষমতা-মদমত্ত, ক্ষমতালিপ্সু, বেনিয়া মনোবৃত্তির বদৌলতে সুকৌশলে সর্বময় ক্ষমতা, অর্থ-বিত্তের অধিকারী হয়ে নিজ নিজ আধিপত্যের চিরস্থায়ী অবস্থান পাকাপোক্ত করার তাগিদে লাগামহীন প্রতিযোগিতায় লিপ্ত বিশ্ব ব্যবস্থায় জন্মগ্রহণ করা নর-নারীর মাঝে বৌদ্ধ ভিক্ষুরাও তাঁদেরকে সমালোচনামুক্ত রাখতে পারছেন না।

বুদ্ধের ‘অহিংসা পরম ধর্ম’—এ মূলমন্ত্রকে আত্মগতভাবে বুকে ধারণ করে অহিংসার সর্বব্যাপী স্পন্দনকে (Vibration) কাজে লাগিয়ে মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী অহিংসার মূর্ত প্রতীকরূপে মহাত্মা গান্ধী আখ্যায় আখ্যায়িত হওয়ার বিরল সৌভাগ্য অর্জন করেছেন। দ্বিপদধারী চক্ষুষ্মাণ, স্থিতধী, সচেতন ও সংযত তাবত্ নর-নারীর উদ্দেশ্যে মহাকারুণিক বুদ্ধের চিরন্তন ও কালজয়ী নির্দেশনা হলো—স্নেহময়ী মা যেমন নিজের একমাত্র পুত্র বা কন্যাকে নিজের বুকের রক্ত দিয়ে হলেও ইহজাগতিক সর্বপ্রকার বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা করার তরিকা অবলম্বন করেন তেমনি এ জগতের সকল স্তরের ও সর্ব সম্প্রদায়ের শুধু মানুষ নয়, সর্বপ্রকার প্রাণী-প্রজাতিকেও মাতৃত্ব জ্ঞানে অবলোকন করে তাদের সার্বিক মঙ্গল ও কল্যাণ কামনা করতে হবে এবং তাদেরকে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের মধ্য দিয়ে সুরক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। এটিই হলো বুদ্ধের ধর্ম-দর্শন বা তাঁর অনন্য সাধারণ সর্বমাঙ্গলিক মর্মবাণী।

তাই আজকের এ মহাপবিত্র বুদ্ধ পূর্ণিমা উপলক্ষে আয়োজিত প্রার্থনানুষ্ঠানে অমলিন প্রত্যাশাভরে কামনা করি আমাদের এ প্রাণপ্রিয় বাংলাদেশের সর্বস্তরের, সর্ব-সম্প্রদায়ের, সর্ব ধর্মাবলম্বী প্রিয়ভাজন জনগণসহ বিশ্বের সাতশ’ কোটি মানুষের অন্তরের অন্তঃস্তলে বুদ্ধের অহিংসা মন্ত্র, সর্বকাজে সমচিত্ততার চেতনা, সর্বপ্রাণী-প্রজাতির নির্বিঘ্নে, নিরুপদ্রবে সুস্থ শরীরে বেঁচে থাকার ও অস্তিত্ব রক্ষার ব্যাপারে ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস সংবলিত কর্ম-সংস্কৃতির উত্সর্জন ঘটুক। বিশ্বের মধ্যে শান্তি, সুস্থিতি, প্রগতি ও সমৃদ্ধিসহ সর্বমাঙ্গলিক ঐক্য চেতনার বাতাবরণে অমলিন শান্তির সুবাতাস বয়ে চলুক অনন্ত অনন্তকাল।

সব্বে সত্তা সুখিতা ভবন্তু

জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক।

 


লেখক :সভাপতি, পার্বত্য বৌদ্ধ সংঘ, বাংলাদেশ








« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: info@iportbd.com, বার্তা বিভাগ: newsiport@gmail.com