Sunday, 19 November, 2017, 3:13 AM
Home বিশ্ব
স্মৃতির ইন্দিরা
একটি উল্কার উত্থান ও পতন
Published : Wednesday, 10 May, 2017 at 12:58 PM, Count : 22

ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও কংগ্রেসনেত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে নিয়ে দেশটির বর্তমান রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়ের স্মৃতিকথা দৈনিক ইত্তেফাকে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে। আজ প্রকাশিত হলো এর দশম কিস্তি

মোরারজি সরকার পদত্যাগ করল ১৫ জুলাই। কংগ্রেস (আই) দৃঢ় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল, কোনো অবস্থায় সরকারে যোগ দেবে না। চরণ সিংকে সরকার গড়তে ডাকা হলো। আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম, বিজেপি-কে একদম বাদ দিয়ে যদি সরকার গঠিত হয়, তাহলে সে সরকারকে বাইরে থেকে সমর্থন জানানো যেতে পারে। শেষ পর্যন্ত চরণ সিং সরকার গড়লেন। আমরা প্রথমে সমর্থন করলাম, কিন্তু পরে তা প্রত্যাহার করে নিই। বাজারচলতি ধারণা আছে, চরণকে নাকি আমরা চাপ দিয়েছিলাম সঞ্জয়ের বিরুদ্ধে মামলাগুলো তুলে নিতে। চরণ রাজি না হওয়ায় আমরা সমর্থন তুলে নিই। জনার্দন ঠাকুরের ‘ইন্দিরা গান্ধী অ্যান্ড হার পাওয়ার গেম’ থেকে উদ্ধৃতি দিচ্ছি: মোহন মেকিন গেস্ট হাউসে ধর্মীয় অনুষ্ঠানের অজুহাতে মিলিত হলেন সঞ্জয় গান্ধী ও রাজনারায়ণ। চরণ সিং সংসদে যেদিন আস্থা ভোট চাইবেন, তার দুদিন আগে সঞ্জয় তাকে সতর্ক করে বললেন, চরণ সরকারকে রাখতে হলে মামলাগুলো তুলে নিতে হবে। রাজনারায়ণ গেলেন বিজুর সঙ্গে কথা বলতে। সেখান থেকে সোজা চরণের বাড়ি। চরণ আইনমন্ত্রী এসএন কাক্করের সঙ্গে কথা বললেন। তারপর জানালেন, সঞ্জয়ের ব্ল্যাকমেল মেনে নেওয়ার চেয়ে পদত্যাগ করা ভালো। ক্রুদ্ধ, হতাশ রাজনারায়ণ চরণের ঘর থেকে বেরিয়ে বলে ফেললেন—ওফ্, এই জাঠকে বোঝানো অসম্ভব।

জানি না, এই তথ্য কোথা থেকে সংগৃহীত। তখন চরণ মন্ত্রিসভায় কংগ্রেস (ও)-এর (রেড্ডি ততদিনে সরে গেছেন, শরণ সিং আবার কংগ্রেস সভাপতি হয়েছেন) যেসব নেতারা স্থান পেয়েছিলেন তাদের অনেকেই শাহ কমিশনে ইন্দিরা-বিরোধী আপত্তিকর সাক্ষ্য দিয়ে এসেছেন। সি সুব্রহ্মণ্যম, ব্রহ্মনন্দ রেড্ডি, কেসি পন্থ, সফি কুরেশি, ড. করণ সিং—এরা ছিলেন মন্ত্রিসভায়। সবাই তখন ভাবছেন, কেন বঞ্চিত হব? লোকে ঠাট্টা করে বলতে লাগল এটা তো ইমার্জেন্সি ক্যাবিনেট।

আমরা সমর্থন প্রত্যাহার করি। তখন দেশজুড়ে একটা রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা দেখা দিল। বিপি মৌর্য খুব ক্ষুব্ধ হলেন সমর্থন প্রত্যাহার করায়। এখানে একটা পুরনো কথা বলি। চিকমাগালুরে যখন ইন্দিরাজি দাঁড়ালেন, তখন চ্যবন কংগ্রেসে দ্বিমত দেখা দেয়। লাকাপ্পা, কৃষ্ণা প্রমুখ বললেন, শ্রীমতী গান্ধীকে সমর্থন করা উচিত। কেরলের একে অ্যান্টনি বিরোধিতা করতে চাইলেন। দল ঠিক করল, নিরপেক্ষ থাকাই শ্রেয়। দলীয় কর্মীরা ব্যক্তিগতভাবে সমর্থন বা বিরোধিতা করতে পারেন, পার্টি কোনো নির্দিষ্ট নীতি নেবে না। ইন্দিরাজির বিরোধিতা করা হলো না বলে প্রতিবাদে অ্যান্টনি কংগ্রেস (ও)-এর কেরালা রাজ্য সভাপতির পদ থেকে ইস্তফা দিলেন। গড়ে তুললেন কংগ্রেস (অ্যান্টনি)।

এই সময় কথা চলতে লাগল, দুই কংগ্রেসকে ফের এক করা যায় কি-না, যাকে আমরা বলি ইউনিটি টক। আমাদের পক্ষ থেকে নরসিংহ রাওকে কথা বলার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। তিনি কিছুদিন আলোচনা করলেন, যদিও আমি আদৌ আশাবাদী ছিলাম না। ইন্দিরাজি বললেন, ঠিক আছে, নরসিংহ কথা বলছেন, বলুন না। শেষ পর্যন্ত ঐক্য হলো না, কিন্তু ওই তরফের কিছু মানুষ আমাদের কাছাকাছি চলে এলেন, সৈয়দ মহম্মদ, বিপিনপাল দাস প্রমুখ। পশ্চিমবঙ্গেও ততদিনে অনেকে আমাদের সঙ্গে। ভোলা সেন, গোপালদাস নাগ, আনন্দগোপাল, সন্তোষ রায়, অশোক সেন চলে এসেছেন। সিদ্ধার্থবাবুও খুব চেষ্টা শুরু করলেন। আমরা ওকে দলে নিতে আদৌ আগ্রহী ছিলাম না।

একটি উল্কার উত্থান ও পতন

১৯৭৯-এর আর একটা বড় ঘটনা হল সঞ্জয়ের রাস্তায় নামা। মে মাসে কংগ্রেস (আই)-এর এক বিক্ষোভ মিছিলে সঞ্জয় যোগ দেয়। তার ওপর পুলিশের লাঠি পড়ে। দেশজুড়ে যুব-ছাত্ররা বিক্ষোভ জানায়। এখানে যুব কংগ্রেস নিয়ে কিছু কথা বলা প্রয়োজন। ১৯৭৭ সালে যুব কংগ্রেস প্রায় তুলে নেওয়া হয়েছিল। ঠিক হয়েছিল যুব কংগ্রেস থাকবে কংগ্রেসের একটা শাখা সংগঠন হিসেবে, এর কোনো পৃথক অস্তিত্ব থাকবে না। এরপর আমি নিজে উদ্যোগী হয়ে যুব ফোরাম গড়ি। পরে ইন্দিরা যুব ফোরাম নাম দিয়ে পৃথক রাজনৈতিক অস্তিত্ব স্বীকার করে নেওয়া হয়। কংগ্রেস (আই) গঠিত হওয়ার কিছুদিন পরে আলোচনা শুরু হয় যুব কংগ্রেসকে পুনরুজ্জীবিত করা যায় কি না। অর্থাত্ যুব ফোরামকে যুব কংগ্রেস নাম দেওয়া হবে কি না। বিপি মৌর্য ওয়ার্কিং কমিটিতে আপত্তি করলেন। তখন আমাকে দায়িত্ব দেওয়া হলো। যুব নেতাদের সঙ্গে কথা বলে আমি একটা ফর্মুলা তৈরি করলাম। সেটাই ওয়ার্কিং কমিটি মেনে নেয়। তারপর আমরা দুটো বড় মিটিং করি। রামলীলা ময়দানে যখন সমাবেশ করি, তখন বহু যুবক ফ্ল্যাগ ফেস্টুন নিয়ে দাবি জানায় সঞ্জয় গান্ধীকে যুব ফোরামের দায়িত্ব দিতে হবে। সঞ্জয় কোনো পদ নিতে রাজি হলো না, তবে রাস্তায় নামল। দ্বিতীয় মিছিলটি করার সময় সঞ্জয় প্রহূত হলো।

এর আগে ’৭৮ জুলাইতে ‘কিস্সা কুর্সি কা’ মামলায় সঞ্জয়ের দুবছর জেল ও দশ হাজার টাকা জরিমানা হয়েছিল। তবে রায়ে বলা হয়েছিল, এই আদেশ ’৭৯-এর মার্চ থেকে কার্যকরী হবে। এর মধ্যে আপিল করা যেতে পারে। ঠিক পরদিনই খবর এল সঞ্জয় অস্ট্রেলিয়ায় এক লাখ ডলার সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয়েছে। নেহরুজির দারুণ ভক্ত ছিলেন অস্ট্রেলিয়ান মহিলা রুথ কয়েল। সিডনির সমুদ্রতীরে তার সম্পত্তি তিনি দিয়ে গেলেন সঞ্জয় গান্ধীকে। কী বলব? সঞ্জয়ের ভাগ্য নিয়ে তখন সাপ-লুডো খেলা চলছিল!

বিচারপতি শাহ ইন্দিরাজি আর আমার নামে যে মামলা এনেছিলেন, তার বিরুদ্ধে আমরা হাইকোর্টে বিচারপতি চাওলার এজলাসে রিট আবেদন করি। আমার বক্তব্য ছিল, মন্ত্রী যখন মন্ত্রগুপ্তির শপথ নেন, সেই সে শপথ ভাঙবে কিনা সেটা তার ওপর নির্ভর করে। অনেকে ঠাট্টা করে বললেন, মন্ত্রীই নেই তো আবার মন্ত্রগুপ্তি কীসের? জমিদারি না থাকলেও জমিদার বলে মানতে হবে নাকি? যাই হোক, ডিসেম্বর মাসে বিচারপতি চাওলা রায় দিলেন, কমিশন কখনো সংসদীয় আইন ভাঙতে পারেন না। যদি কোনো মন্ত্রী তার কার্যকালে কী করেছিলেন তা কমিশনকে বলতে রাজি না হন, সে ক্ষেত্রে কমিশন তাকে জোর করতে পারে না। এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ রায়। সাংবাদিক অরুণ শৌরি, পুলিশ অফিসার কিরণ বেদী, গুরুমূর্তিরা পরে এই রায়ের অ্যাডভানটেজ নিয়েছেন।

এবার সঞ্জয়ের প্রসঙ্গে ফিরে আসি। খবরের কাগজ আর বিরোধীদের হই-হুল্লা থেকে সাধারণ মানুষের মনে একটা ধারণা জন্মায়, সঞ্জয় উদ্ধত, বেপরোয়া, কটুভাষী। এসব একেবারে সত্য নয়। সে ছিল খুবই ঠান্ডা মাথার ছেলে। তার রাজনৈতিক দুরদর্শিতাও ছিল যথেষ্ট। আর নেহরু পরিবারের ব্যক্তিগত ভদ্রতার কোনো তুলনা হয় না। জ্যোতিবাবু যতবার ইন্দিরাজির কাছে গেছেন, ইন্দিরা পের্টিকো পর্যন্ত তাকে এগিয়ে দিতে আসতেন। গাড়িতে ওঠার পর নমস্কার করে তবে যেতেন। সঞ্জয়-রাজীবও একরকম। রাজ্যসভায় আমার ঘরটা সঞ্জয় অনেকসময় ব্যবহার করত। সে প্রতিদিনই এজন্য আমার অনুমতি চাইত। আমি ঘরে ঢুকলেই উঠে দাঁড়াত। আমার কোনো অসুবিধে হচ্ছে কি না প্রশ্ন করত। রাজীবও একইরকম। সঞ্জয়ের নামে যা যা রটেছিল, তা সত্যি নয়। কংগ্রেস (আই) গঠিত হওয়ার পর থেকে সে-ই সংগঠন দেখত। যুব কংগ্রেসিদের ওপর তার প্রভাব ছিল সম্মোহনী। গ্রেপ্তার হওয়ার পরে একমাস সঞ্জয়কে তিহার জেলে থাকতে হলো। গ্রীষ্মকাল,  দিল্লিতে তখন লু হাওয়া বইছে। সঞ্জয়ের ঘরে একটা সিলিং ফ্যানও ছিল না। কিন্তু ও কখনোই কোনো অভিযোগ করেনি। ইন্দিরাজি ওকে বলে এসেছিলেন, কারাবাস না করলে একজন রাজনীতিক সম্পূর্ণ হয়ে উঠতে পারেন না।

সাংগঠনিক কাজ, সঞ্জয় কতটা ভালো করে দেখেছে, তা তো বোঝা গেল আশির নির্বাচনে। খুব ঠান্ডা মাথায় জনতা পার্টির অন্তর্দ্বন্দ্বকে কাজে লাগিয়েছিল। চরণ সিং এর মন্ত্রিসভা পতনের পেছনে পুরো কৃতিত্বটাই সঞ্জয়ের। ১৯৮০-তে আমরা বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ফিরে এলাম। ইন্দিরাজির ইমেজ আর সঞ্জয়ের মেশিনারিই আমাদের সাফল্য এনে দিয়েছিল। কিন্তু জয়ের মাত্র কয়েক মাস পরেই পিটস এস-২ এ বিমান ভেঙে সঞ্জয়ের অকালমৃত্যু হয়েছিল—একটি উল্কার উত্থান ও পতন। ইন্দিরাজি ভীষণ ভেঙে পড়ে ছিলেন। তার ক্রন্দনরত মুখের বেদনাছবি আজও আমার চোখে ভাসে। রাজীবও নেপথ্য থেকে অনেক জরুরি পরামর্শ দিত। ওই ছিল সঞ্জয়ের বিশেষ উপদেষ্টা। নেহরু পরিবারের অভ্যন্তরীণ বন্ধন অত্যন্ত সুদৃঢ়। সঞ্জয় বেঁচে থাকলে রাজীব কোনোদিনই সক্রিয় রাজনীতিতে আসত না। শলাপরামর্শ অবশ্যই দিত।  (চলবে)






« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: info@iportbd.com, বার্তা বিভাগ: newsiport@gmail.com