Monday, 18 November, 2019, 7:06 AM
Home শিক্ষা
চির ভাস্বর এক বিজ্ঞানসাধক
মো. শহীদ উল্লা খন্দকার লিখেছেন ইত্তেফাকে
Published : Tuesday, 9 May, 2017 at 12:00 AM, Update: 09.05.2017 2:21:07 PM, Count : 16

রাজনৈতিক বলয়ে থেকেও বিজ্ঞানী হিসাবে নিজের গবেষণা নিয়ে আলাদা জগত্ তৈরি করেছিলেন যিনি, তিনি আমাদের প্রয়াত ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া। বিজ্ঞানের সর্বোচ্চ ধাপ পরমাণু নিয়ে স্বপ্ন দেখার মতো কাজটি তিনি করে গেছেন। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের জন্য এমন একজন বিজ্ঞানী অপরিহার্য ছিল। বাংলাদেশের আণবিক পাওয়ার প্লান্টের একজন স্বপ্নদ্রষ্টা হিসেবে তিনি আমাদের গর্ব, আমাদের অহংকার।

আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন এই পরমাণু বিজ্ঞানী নানাভাবেই বাঙালি জাতির পরম আপনজনে পরিণত হয়েছিলেন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর আদর্শ অনুসরণ করে বাংলাদেশকে প্রযুক্তি ও বৈজ্ঞানিকভাবে উন্নত দেশে পরিণত করার এক স্বপ্ন ছিল তার— যা তিনি তার জীবন ও  কর্মে প্রতিফলিত। এই মহান বিজ্ঞান সাধকের ৮ম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ২০০৯ সালের ৯ মে ৬৭ বছর বয়সে তিনি মারা যান।

স্বপ্নবান এই বিজ্ঞানী বলেছিলেন, “একটা উন্নয়নশীল দেশে, যেখানে সম্পদ অপ্রতুল সেখানে একমাত্র বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিই জাতির জন্য সর্বোচ্চ ভূমিকা রাখতে পারে।” কথায় নয়, তার কাজেও আমরা সেই প্রতিফলন দেখেছি, তার জীবনের সবগুলো কর্মময় বছরই তিনি নিবেদন করেছেন বিজ্ঞান এবং তার পেছনের মানুষগুলোকে মহিমান্বিত করার কাজে।

এই সাধক বিজ্ঞানের সঙ্গে কতটা জড়িয়ে ছিলেন তা তার কর্মজীবনের দিকে তাকালেই স্পষ্ট দেখতে পাওয়া যায়। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে নিউক্লিয়ার ল্যাবরেটরিতে পোস্ট-ডক্টরাল গবেষণা ছাড়াও ইতালির ট্রিয়েসটের আন্তর্জাতিক পদার্থ বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্রে একাধিকবার গবেষণা করেছেন। গবেষণা করেছেন ভারতের পরমাণু শক্তি কমিশনেও। তার গবেষণা ও বিজ্ঞান বিষয়ক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন জার্নালে। ১৯৭৫ সালের ১২ মার্চ থেকে ২৪ আগস্ট পর্যন্ত তিনি তত্কালীন পশ্চিম জার্মানির কার্লসরুয়ে শহরের আণবিক গবেষণা কেন্দ্রে আণবিক রিঅ্যাক্টর বিজ্ঞানে উচ্চতর প্রশিক্ষণ লাভ করেন। ১৯৭৫ সালের ১ অক্টোবর থেকে ১৯৮২ সালের ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত তিনি ভারতের আণবিক শক্তি কমিশনের দিল্লিস্থ ল্যাবরেটরিতে গবেষণায় নিয়োজিত ছিলেন। বঙ্গবন্ধু হত্যা ট্র্যাজেডির পর গোটা পরিবারের হাল ধরেন ওয়াজেদ মিয়া। ১৯৮১ সাল পর্যন্ত  নির্বাসিত জীবনে বৃত্তির টাকায় সংসার চালিয়েছেন তিনি। সর্বশেষ চাকরি করেছেন বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের চেয়ারম্যান পদে। ১৯৯৯ সালে অবসর গ্রহণ করেন চাকরি থেকে।

বিজ্ঞান সাধনায় নিবেদিত থাকলেও সামাজিক কর্মকাণ্ড থেকে সরে যাননি তিনি। তিনি ঢাকার রংপুর জেলা সমিতির আজীবন সদস্য এবং ১৯৯৪ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত দুইবছর মেয়াদকালের জন্য ওই সমিতির সভাপতি নির্বাচিত হন। তিনি বাংলাদেশ জার্নালিস্ট এসোসিয়েশনের উপদেষ্টা এবং ঢাকাস্থ বৃহত্তর রংপুর কল্যাণ সমিতি, উত্তরবঙ্গ জনকল্যাণ সমিতি, রাজশাহী বিভাগীয় উন্নয়ন ফোরাম, সমন্বিত উন্নয়ন ফাউন্ডেশন, বেগম রোকেয়া স্মৃতি সংসদ এবং রংপুর জেলার মিঠাপুকুর থানার মির্জাপুর বছিরউদ্দিন মহাবিদ্যালয়ের প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন। বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে তার অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ ঢাকার বিক্রমপুর জগদীশ চন্দ্র বসু সোসাইটি তাকে ১৯৯৪ সালে স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু স্বর্ণপদক এবং ম্যাবস ইন্টারন্যাশনাল, ঢাকা ১৯৯৭ সালে পদক প্রদান করে।

মেধাবী সন্তানরা দেশের সম্পদ। একটি দেশ এগিয়ে যাওয়ার মূলশক্তিই হচ্ছেন এই মেধাবীরা। ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া এদেশের এমনই একজন মেধাবী বিজ্ঞানী। বিজ্ঞান সাধনায় অবদানের জন্য তিনি যুগের পর যুগ বাংলাদেশের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। তিনি পরমাণু বিজ্ঞানকে বাংলাদেশের মানুষের কল্যাণে ব্যবহারের জন্য নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন।

আজ বাস্তবায়নের পথে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুত্ প্রকল্প। বলা যায়, এটা তার স্বপ্নেরই বাস্তবায়ন। বাংলাদেশের এই পারমাণবিক বিদ্যুত্ প্রকল্পের ভিত্তি স্থাপনকালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ‘এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে পূরণ হবে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন। সফল হবে বিশিষ্ট পরমাণুবিজ্ঞানী ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়ার আমরণ প্রচেষ্টা এবং তার সুফল ভোগ করবে সারা দেশের মানুষ।’ যথার্থই বলেছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী।

ড. ওয়াজেদ মিয়াকে ব্যক্তিগতভাবে যারা চিনতেন, কাছ থেকে দেখেছেন তারা একবাক্যেই তার সততা ও মোহমুক্ততা নিয়ে প্রশংসায় মেতে ওঠেন। সহকর্মীদেরও উদ্বুদ্ধ করেছেন সত্ ও নিষ্ঠাবান হওয়ার জন্য। তিনি নিজে ক্ষমতার খুব কাছাকাছি থেকেও কোনো সুযোগ-সুবিধা নেননি। কোনো অন্যায়কে প্রশ্রয় দেননি। সর্বদা নিজস্ব বলয়ে থেকে নিজের যোগ্যতায় নিজ কর্মক্ষেত্রের পরিধিতে স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে কর্মজীবন শেষ করেছেন।

ড. ওয়াজেদ মিয়া সাতটি পাঠ্যবই লিখেছিলেন, এর মধ্যে ছয়টি ইতোমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে। মৃত্যুর আগে সপ্তম বইটি সম্পাদনার কাজে ব্যস্ত ছিলেন তিনি। দেশের বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা ও গবেষণা প্রসারে তার অবদান অবিস্মরণীয়। ড. ওয়াজেদ মিয়া মনে করতেন, সমাজে বিজ্ঞানীদের যথাযথ অবস্থান নিশ্চিত করতে হলে বিজ্ঞানীদের আগে নিজেদের কাজ করে যেতে হবে; তারপরই কেবল জনগণের কাছ থেকে প্রত্যাশা করা যেতে পারে। তিনি পাণ্ডিত্য ও প্রতিভার দ্বারা নিজস্ব একটি পরিচয় গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন। এজন্যই অন্য পরিচয়গুলো তার জন্য অলংকার— যা তিনি প্রচার করতে চাননি বা তার প্রয়োজনও বোধ করেননি। মৃত্যুর আগে ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া সম্পর্কে দেশবাসী যতটা জানতেন, মৃত্যুর পর জেনেছেন তার চেয়ে অনেক বেশি।

লেখক : সচিব, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়







« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: [email protected], বার্তা বিভাগ: [email protected]