Sunday, 19 November, 2017, 3:15 AM
Home বিশ্ব
সূক্ষ্ম আলোর রেখা ক্রমশ উজ্জ্বলতর হলো
প্র ণ ব মু খো পা ধ্যা য়
Published : Tuesday, 9 May, 2017 at 1:50 PM, Count : 27

ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও কংগ্রেসনেত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে নিয়ে দেশটির বর্তমান রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়ের স্মৃতিকথা দৈনিক ইত্তেফাকে ধারাবাহিকভাবে
 প্রকাশিত হচ্ছে। আজ প্রকাশিত হলো এর নবম কিস্তি

আমাদের ফেরার সময় একটি মজার ঘটনা ঘটে। অন্যরা আগেই ফিরে গিয়েছিলেন। ইন্দিরাজি আর আমি বিশেষ উদ্দেশ্যে এরোফ্লোটের বিমানে চড়ি। আমাদের কেবল লন্ডনে যাবার ও ফেরার অনুমতি ছিল। অন্য কোনো দেশে যেতে পারব না, শুধু বিমানবন্দরে নামতে পারি। এরোফ্লোটের প্রথম শ্রেণিতে ভারতীয় শুধু আমরা দুজন, এটাও বিশেষ উদ্দেশ্যে। আমাদের পরিকল্পনা ছিল মস্কোয় স্টপওভারের সময়টুকু কয়েকজন রুশ শীর্ষনেতার সঙ্গে কথা বলা। দিব্যি যাচ্ছিলাম। বিমানে অধিকাংশই রুশ যাত্রী। হঠাত্ সিপিআই-এর একজন মাঝারি নেতার সঙ্গে দেখা। তিনি তো একগাল হেসে ‘কী ব্যাপার—আপনারা’ বলে এগিয়ে এলেন। ইন্দিরাজির আর আমি প্রমাদ গুনলাম। ওকে সরিয়ে নিয়ে গেলেন এরোফ্ল্যাটের কর্মীরা। মস্কোয় যখন বিমান থামে, তখন শীতে ঠকঠক করে কাঁপছি। ইন্দিরাজির হাতে ওভারকোট ছিল, কিন্তু আমার ওভারকোট তো লাগেজ রুমে চলে গেছে। তখন স্থানীয় একজন একটি ওভারকোট দিলেন, রুশ ওভারকোট, আমার তিনগুণ সাইজের। মনে মনে ভাবছি এ জিনিস পিলু মোদীর জন্য টেলর-মেড হতে পারে, আমার পক্ষে দাদুর দস্তানা! যাই হোক, শীত এড়াতে পরেই ফেললাম। রিজার্ভড লাউঞ্জের একটি ঘরে একঘণ্টা কথা বললেন শ্রীমতী গান্ধী। নির্বিবাদেই দিল্লি ফিরে এলাম, কিন্তু ওই সিপিআই নেতা ঘটনাটা ফাঁস করে দিলেন। তাতে অবশ্য তেমন কিছু অসুবিধে হয়নি।

১৯৭৯-এর বড় ঘটনা হলো দেবরাজ আরসের সঙ্গে বিচ্ছেদ। আরস প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি থাকতে চাইলেন। কিন্তু তখন আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি এক ব্যক্তি এক পদ। আরস কর্নাটকের মুখ্যমন্ত্রী, কী করে উনি কংগ্রেস (আই) সভাপতি থাকবেন? তিনি কিছুতেই পদ ছাড়তে চাইছেন না। খবর এল চরণ সিংয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন, চন্দ্রশেখরের সঙ্গে ডিনার করছেন, জর্জ ফার্নান্ডেজের সঙ্গে বৈঠক করছেন। শ্রীমতী গান্ধীকে নির্বাসিত করে জনতা পার্টি চরণকে ফিরিয়ে এনেছিল, উপ-প্রধানমন্ত্রী করে। তখন ওঁরা স্পেশাল কোর্ট বিল আনছে, যাতে আমাদের সামারি ট্রায়াল হয়। আমাকে শ্রীমতী গান্ধী কর্নাটকে পাঠালেন। মে-জুন টানা দু’মাস থাকলাম। দেখলাম অনেকেই ইন্দিরাজির সঙ্গে থাকতে আগ্রহী। অন্ধ্রের মুখ্যমন্ত্রী হয়ে চেন্না রেড্ডি কংগ্রেস (আই) সভাপতি পদ ছেড়ে দিয়েছেন। তিরপুরে ছিলেন মহারাষ্ট্রের কংগ্রেস(আই) সভাপতি। তিনি উপ-মুখ্যমন্ত্রী হলেন, তাই প্রভা রাও আমাদের মহারাষ্ট্র শাখার প্রধান। কাজেই আরসের আবদার মেনে নেওয়া গেল না। ওয়ার্কিং কমিটির কেউ কেউ আমাকে বললেন, কেন ভুল করছ? সারা ভারতে কংগ্রেসের মরূদ্যান তো মাত্র দুটি। অন্ধ্র্র আর কর্নাটক। কেন আরসকে ঘাঁটাচ্ছ? আমি বললাম, আরস বরাবরই ভেবে এসেছেন ইন্দিরা গান্ধীর জয় হয়েছে তাঁর ইমেজের জোরে, ইন্দিরাজির জোরে নয়। ওঁর ভুলটা ভাঙা দরকার। আসলে আচার্য কৃপালনীর মন্তব্য থেকেই আসরের এই ধারণা জন্মায়।

মে মাসে ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে ফের সঞ্জয় ও তথাকথিত ‘দুষ্টচক্র’ নিয়ে আরস অভিযোগ করলেন। অর্থনৈতিক প্রস্তাব পেশ করার কথা ছিল তাঁর। তা না করে ওইসব অবান্তর কথাবার্তা বললেন। সঞ্জয়রা ফিরে আসছে, ইন্দিরাজিকে একটা শনিচক্র ঘিরে ধরেছে বলে নাটকীয়ভাবে সভা থেকে বেরিয়ে গেলেন।

বোঝা গেল, আরস সংঘর্ষের লাইন নিচ্ছেন। আমি যুক্তি দেখিয়ে বললাম, আমাদের শক্ত থাকা প্রয়োজন। শ্রীমতী গান্ধী চাপের মুখে ভয় পাচ্ছেন, এরকম রটলে তাঁর ইমেজ খর্ব হতে বাধ্য।  ভারতবাসী ইন্দিরাজিকে শ্রদ্ধা করে, সম্মান করে—তার কারণ তিনি নির্ভীক, সাহসী। তাঁর মেরুদণ্ড সোজা। ভারতবর্ষ গোটাটাই তো হাতের বাইরে চলে গেছে, কর্নাটকও যায় যদি যাক। দিল্লিতে ইন্দিরাজিকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে হলে কোনোরকম চাপ আমাদের বরদাস্ত করা উচিত নয়।

দেবরাজ আরস চেয়েছিলেন, চাপ দিয়ে দুটো পদেই থেকে যেতে। শেষ পর্যন্ত ইন্দিরাজি ও অন্য নেতারা আমার সঙ্গে একমত হলেন। গুন্ডু রাও, এফএম খান, জাফর শরিফ তো ছিলেনই, আরো কয়েকজন নতুন নেতাকে কর্নাটকে তুলে আনলাম। জনার্দন পূজারি, বাঙ্গারাপ্পা, বীরাপ্পা মৈলি, অস্কার ফার্নান্ডেজ প্রমুখ নেতাদের সামনের সারিতে আনা হলো। ওঁরা সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলেন। জনার্দন আমাকে দারুণ সাহায্য করেছিলেন। দিল্লিতে ফিরে এসে রিপোর্ট দিলাম। অ্যাডহক কমিটি করা সম্ভব। তারপর আরসকে ঠিক পাঠান হলো। তিনি এর জবাব দিলেন এইভাবে: আমরা তোমার বাড়ির চাকর নই, বন্ডেড লেবার নই, তুমি যা বলবে তাই শুনতে বাধ্য নই। আমরা ৬ জনকে নিয়ে প্রদেশ অ্যাডহক কমিটি তৈরি করলাম। আহ্বায়ক হলেন বাঙ্গারাপ্পা। মৈলি, জনার্দান পূজারিরা থাকলেন কমিটিতে। কংগ্রেসের মোট ১৬৬ বিধায়কের মধ্যে আমাদের সঙ্গে ছিলেন মাত্র ৩৬ জন। ২৭ এমপি-র মধ্যে আমরা পেলাম ১০ জনকে। তখন দেবরাজ আরসকে দারুণভাবে স্বাগত জানায় ইন্দিরা-বিরোধী কংগ্রেস।

জনতা পার্টিতে ক্ষমতার লড়াই

জনতা পার্টিতে ভিন্ন ভিন্ন আদর্শের মধ্যে দ্বন্দ্বের সমস্ত উপকরণ নিহিত ছিল। ক্ষমতা লাভের প্রায় সঙ্গে সঙ্গে প্রকাশ্যে এসে পড়ে নেতাদের অন্তর্বিরোধ। ব্যক্তিগত উচ্চাশা, পারস্পরিক অবিশ্বাস, মতাদর্শগত বিভেদ, কর্মসূচির প্রতি দায়বদ্ধতার অভাব, কার্যকরী নেতৃত্বের অনুপস্থিতিতে এটাই স্বাভাবিক ছিল আর তাই সামান্য সময়ের মধ্যে ভেঙে পড়ল জোট সরকার। প্রতিটি গোষ্ঠী নিজেদের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ করে তুলতে চাইল। সরকারে পূর্বতন জনসংঘের প্রভাব ছিল বেশি। তিন প্রাক্তন কংগ্রেসি নেতার অন্তর্দ্বন্দ্ব ও উচ্চাশাকে নিজেদের সুবিধেমতো ব্যবহার করতে তারা বিলম্ব করলেন না।

চরণ সিং প্রথম থেকেই বিক্ষুদ্ধ ছিলেন। তিনি জনতা পার্টির চেয়ারম্যান হতে চেয়েছিলেন, হতে চেয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী—দুটোই চলে যায় মোরারজি দেশাইয়ের হাতে। তিনি কর্পূরি ঠাকুরকে জনতা পার্টির প্রথম প্রেসিডেন্ট করতে চেয়েছিলেন—জেপির ইচ্ছায় সে পদ পেয়ে গেলেন চন্দ্রশেখর।

১৯৭৮-এর জুনে জনতার অন্তর্দ্বন্দ্ব চরমে উঠল। প্রধানমন্ত্রী মোরারজিভাই বিদেশ থেকে ফিরে চরণ সিংয়ের পদত্যাগ দাবি করলেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চরণ সিং এবং স্বাস্থ্যমন্ত্রী রাজনারায়ণ পদত্যাগ করলেন। কাগজে তখন নানা রকম ‘স্টোরি’ বেরোচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী ও দুই পদত্যাগী মন্ত্রীর মধ্যে যেসব চিঠি চালাচালি হয়েছিল, তাও  কাগজে ছাপা হতে শুরু করল। রাজনারায়ণ সবটাই ফাঁস করে দিচ্ছিলেন। বিশেষ এক সাক্ষাত্কারে চরণ জানালেন, পদত্যাগ করে তিনি ভারমুক্ত। কেননা দুর্নীতিগ্রস্তরা তাকে চারদিক থেকে ঘিরে ধরছিল।

১৭ জুলাই লোকসভার বাদল অধিবেশন শুরু হলো। আমরা প্রস্তুত ছিলাম। এই প্রথম আমাদের সামনে আক্রমণের সুযোগ এল, এর আগে সময় কেটেছে রক্ষণের কাজে। এর মধ্যে আমরা দলের সংবিধান সংশোধন করে ইন্দিরাজিকে সংসদীয় দলের সভানেত্রী পদে বসিয়েছি। ইন্দিরাজির নির্দেশে তৈরি হয়ে রইল কংগ্রেস-আই সংসদীয় দল। অধিবেশন শুরু হওয়ামাত্র বিরোধী নেতা কমলাপতি ত্রিপাঠী বিশেষ উল্লেখ দাবি করে প্রশ্ন তুললেন—চরণ সিং মোরারজি পুত্রের বিরুদ্ধে গুরুতর দুর্নীতির অভিযোগ এনেছেন, অনেক মন্ত্রীর বিরুদ্ধেও একই অভিযোগ। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হয়েও বলেছেন, দুর্নীতিগ্রস্তদের দ্বারা পরিবেষ্টিত ছিলেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী ও পদত্যাগী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যে বহু চিঠি চালাচালি হয়েছে, যা কাগজেও দেখা গেছে। ওইসব চিঠি জাতীয় স্বার্থে সংসদে পেশ করা হোক। এই নিয়ে তুমুল হইচই শুরু হলো। ১৯ জুলাই দৃষ্টি আকর্ষণী প্রস্তাব তুললেন এপি শর্মা। মোরারজি সংক্ষিপ্ত বিবৃতিতে জবাব দিলেন। এতে আমরা সন্তুষ্ট নই। এপি শর্মা দীর্ঘ বক্তৃতা দিলেন। তারপর মোরারজি বললেন, আমাকে প্রশ্ন করা হয়নি। আমি উত্তরও দেব না। আগে যা বলেছি, তার সঙ্গে আর নতুন কিছু যুক্ত করার নেই। প্রধানমন্ত্রীর অনমনীয় মনোভাবে গোটা সভা স্তব্ধ হয়ে গেল। এরকম পরিস্থিতি সংসদীয় রাজনীতিকদের কাছে মহা সুযোগ। পয়েন্টে অব অর্ডার তুলে আমি একে একে দেখালাম, যেসব তথ্যকে প্রধানমন্ত্রীর ‘গোপনীয়’ বলতে চাইছেন তা কাগজে ছাপা হয় কী করে? সংসদে প্রধানমন্ত্রী জোর করে এসব গোপন রাখলেও পদত্যাগী চরণ সিং যদি সব কাগজে ছাপিয়ে দেন, তাহলে ওই গোপনীয়তা রক্ষায় কী লাভ? সংসদ ও দেশবাসীকে সব জানাতে হবে, কে সত্যি বলছেন আর কে মিথ্যা। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার কয়েকটি নজির তুলে ধরলাম। আইনমন্ত্রী শান্তিভূষণ মন্তব্য করলেন, সব অদ্ভুত নজির কি পশ্চিমবঙ্গেই ঘটে? অন্যান্য রাজ্যের দৃষ্টান্ত পেশ করলাম। এই লড়াই দীর্ঘস্থায়ী হয়ে উঠল এবং এতে আমরা অনেকটা এগিয়ে গেলাম। দেশবাসী জনতার শীর্ষ নেতাদের প্রতি আস্থা হারাল আর আমরা দেখতে পেলাম সূক্ষ্ম আলোর রেখাটি ক্রমশ উজ্জ্বলতর হয়ে উঠেছে। (চলবে)






« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: info@iportbd.com, বার্তা বিভাগ: newsiport@gmail.com