Saturday, 22 July, 2017, 2:34 AM
Home সাহিত্য-সংস্কৃতি
যুদ্ধে-আগ্রাসনে প্রতিবাদী তিনি
আহমদ রফিক
Published : Monday, 8 May, 2017 at 8:41 PM, Count : 25
স্বদেশে  নানা সূত্রে বিতর্কিত হলেও রবীন্দ্রনাথ বিশ্ব প্রেক্ষাপটে একজন প্রকৃত যোদ্ধা। যেমন যুদ্ধের বিরুদ্ধে, তেমনি বিশ্বশান্তির পক্ষে, তেমনি সর্বপ্রকার  আধিপত্যবাদ ও আগ্রাসনের বিরুদ্ধে। এ লড়াই রাজনৈতিক ক্ষেত্রে, সংস্কৃতি ক্ষেত্রে। তাঁর সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধিতার প্রকাশ সেই উনিশ শতকে উপনিবেশবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে। দক্ষিণ আফ্রিকা বা সোমালিয়া থেকে তিব্বত-মাঞ্চুরিয়া হয়ে চীন বা কোরিয়ায় উপনিবেশবাদী হামলা ও সহিংসতার বিরুদ্ধে রবীন্দ্রনাথ সদা সোচ্চার। বিশ শতকে সূচিত বিশ্বযুদ্ধ তাঁকে নতুন করে প্রতিবাদী হতে শিখিয়েছে, বিশেষ করে স্পেনীয় যুদ্ধের বর্বরতা। ভাগ্যিস, ইরাকি যুদ্ধের একচেটিয়া বর্বরতা তাঁকে দেখতে হয়নি।

রবীন্দ্রনাথের কাল গত হলেও একালে আঞ্চলিক যুদ্ধ ও আগ্রাসনের বর্বরতা কোনো অংশে কম নয়। বিশ্বশান্তি যেন এক অসম্ভবের পায়ে মাথা ঠোকা। নানা মাত্রিক স্বার্থ বিশ্বজোড়া অশান্তির মূলে সক্রিয়। হিটলারের আবির্ভাব যুগে যুগে না ঘটলেও খুদে হিটলারদের সংখ্যা কম নয়। আর তাই আঞ্চলিক যুদ্ধই যেন বিশ্বযুদ্ধের স্থান দখল করে নিয়েছে। এ ক্ষেত্রে হিংস্রতা, নরমেধ বর্বরতার প্রকাশ কম নয়। আফগানিস্তান থেকে মধ্যপ্রাচ্যের দেশে দেশে পরাশক্তিসংশ্লিষ্ট যুদ্ধ চলছে তো চলছেই। ড্রোন হামলা ভিয়েতনামি যুদ্ধের বর্বরতার কথা মনে করিয়ে দেয়। একদা নিরপেক্ষ রাষ্ট্র আফগানিস্তান রক্তের হিংস্রতায় শেষ হয়ে গেল।

এসবের পেছনে রয়েছে মার্কিন রণশক্তির বিশ্বশাসনের আকাঙ্ক্ষা। যেমন রণাঙ্গনে আধিপত্যে, তেমনি করপোরেট বাণিজ্যে। এ কাজে মনে হয় অন্যদের চেয়েও তৎপর সম্প্রতি নির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, যাঁর পরিচয় যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে অজনপ্রিয় প্রেসিডেন্ট। স্বদেশ-বিদেশের রাজনৈতিক বিরোধিতা ট্রাম্পকে বিন্দুমাত্র স্পর্শ করছে না। সম্প্রতি উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষা ও কিছু উগ্র কথাবার্তা তাঁকে সুযোগ করে দিয়েছে যুদ্ধাবস্থা তৈরিতে। তাত্ক্ষণিক নির্দেশে কোরীয় উপদ্বীপে পাঠানো হয়েছে বোমারু বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ও সাবমেরিন।

বিশ্বজুড়ে সংশ্লিষ্ট মানুষ উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছে। এবার কি তাহলে পৃথিবীতে আণবিক যুদ্ধে নরকগুলজার হবে? উত্তর কোরিয়াসংলগ্ন তাদের বন্ধুপ্রতিম দেশ চীনও উদ্বিগ্ন। সম্ভাব্য যুদ্ধের বিরুদ্ধে, পক্ষ-প্রতিপক্ষ বাদে। যুক্তরাষ্ট্র চায় না উত্তর কোরিয়া পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষা চালাক, আর উত্তর কোরিয়ার বক্তব্য, সম্ভাব্য মার্কিন হামলার বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার বাধ্যবাধকতায় তাকে এ পরীক্ষা চালাতেই হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।

স্বভাবতই উদ্বিগ্ন-উৎকণ্ঠিত শান্তিবাদী বিশ্ব। গণতান্ত্রিক চেতনার প্রতিভূ চমস্কি নীরব থাকলেও জনৈক মার্কিন রাজনীতি বিশ্লেষক মাইক হুইটনিসহ বিশ্বের একাধিক বুদ্ধিজীবী তাঁদের যুদ্ধবিরোধী চেতনার প্রকাশ ঘটাচ্ছেন তাঁদের লেখায়। কিন্তু গত শতকের তুলনায় খ্যাতিমান বিশ্ব মনীষীর যেন ঘাটতি একালে বলিষ্ঠ প্রতিবাদী উচ্চারণের ক্ষেত্রে। মনীষা ও সংস্কৃতির অঙ্গন কি এখন অনেকটাই আত্মস্বার্থমুখী? গুচ্ছ গুচ্ছ প্রতিবাদী প্রতিভার প্রকাশ বিরল ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দুই.

রবীন্দ্রনাথ দু-দুটি বিশ্বযুদ্ধের বর্বরতা প্রত্যক্ষ করেছিলেন। প্রথমটির (১৯১৪ সাল থেকে শুরু) তাত্ক্ষণিক ভয়াবহতা ও পরিণাম আর দ্বিতীয়টির (১৯৩৯ সাল থেকে শুরু) অংশবিশেষ, তাতেই তিনি আতঙ্কিত বিশ্বসভ্যতা তথা মানবসভ্যতার পরিণাম বিবেচনায়। লিখেছিলেন ‘সভ্যতার সংকট’ শীর্ষক দূরদর্শী প্রবন্ধ (১৯৪১)। অভিশাপ বর্ষিত হয় যুদ্ধবাজদের ওপর।

এজাতীয় যুদ্ধের মূল অনুসন্ধান করতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ উগ্র জাতীয়তাবাদের বৈনাশিক ভূমিকাকে অভিযুক্ত করেছিলেন অশান্তির ঘটক হিসেবে। তাঁর প্রিয় জাপানকেও যুদ্ধবাজ অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। সেই সঙ্গে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী শক্তিকে। এই চিন্তার প্রকাশ তাঁর বহু খ্যাত ‘ন্যাশনালিজম’ পুস্তিকায়। পরিণামে শীতল ব্যবহার পেয়েছিলেন ইঙ্গ-মার্কিন লেখক, শিল্পী-বুদ্ধিজীবীদের কাছ থেকে। সরকারি-বেসরকারি উভয় স্তরে। কিছু ব্যতিক্রম অবশ্যই ছিল।

পরবর্তী সময়ে তাঁর এই লেখার সত্যতাই প্রমাণিত হয়েছে ফ্যাসিস্ট জাতীয়তাবাদী চরিত্রের ইতালি, জার্মানি ও জাপানের এবং স্প্যানিশ ফ্র্যাংকোর রক্তাক্ত অভিযানে। নষ্ট হয়েছে শুধু ইউরোপেরই নয়, বিশ্বজুড়ে শান্তির পরিবেশ। রক্তস্রোতে ভেসে গেছে মানবসভ্যতা ও মানব-মহিমার শুদ্ধ মূল্যবোধগুলো। নারী-শিশু নির্বিশেষে কয়েক কোটি মানুষের মৃত্যু বর্বরতার দলিল হিসেবে ইতিহাসে চিহ্নিত হয়ে আছে।

জাতীয়তাবাদের সার্থক, ইতিবাচক দিক ছোট-বড় সব শক্তিমানের হাতেই অবশেষ পরিণামে নেতিবাচক,  স্বৈরাচারী রূপ পরিগ্রহ করে। গোটা বিশ্বে উদাহরণ বিস্তর। মুক্তিসংগ্রামের পরিণামও জাতীয়তাবাদী শক্তির সুস্থ রূপ ধরে রাখতে পারে না। একনায়কি ধারার শাসন বা অগণতান্ত্রিক প্রভুত্ববাদ জনস্বার্থ বিবেচনা দূরে থাক, শ্রেণিস্বার্থের বৈষম্যকে বরং প্রসারিত করতে থাকে।

সে ক্ষেত্রে একনায়কি ব্যক্তিস্বার্থ, দলীয় স্বার্থ প্রাধান্য পায়। যেকোনো মূল্যে ক্ষমতা ধরে রাখার প্রবণতা একমাত্র লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়। কখনো সে প্রভাব নিজ দেশ অতিক্রম করে দুর্বল প্রতিবেশীর ওপর চাপ সৃষ্টি করে। গণতন্ত্রের নামে গণতন্ত্রকে হত্যা করাই হয়ে ওঠে নীতি। রাষ্ট্রীয় রাজনীতির এ ধ্যান-ধারণার ভুক্তভোগী হয়ে ওঠে সমাজ। সমাজ তখন অগণতন্ত্রী ধারাকেই বহন করে, লালন করে। করে তার অংশবিশেষ সুবিধাভোগের পরিপ্রেক্ষিতে। ব্যতিক্রমী প্রতিবাদী ধারা চেষ্টা করে সমাজের প্রতিক্রিয়াশীল ধারাকে প্রতিহত করতে, তার পরিবর্তন ঘটাতে। ক্বচিত্ পারে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পেরে ওঠে না।

তিন.

রবীন্দ্রনাথ এ সত্যটি বুঝেছিলেন বলেই বিদেশি শাসনে থেকেও জাতীয়তাবাদী সংগ্রামের ক্ষেত্রে নীতি ও নৈতিকতাকে প্রাধান্য দিয়েছেন। অন্ধ জাতীয়তাবাদের প্রতি ঢালাও সমর্থন জানাতে পারেননি। নৈতিকতাবহির্ভূত জাতীয়তাবাদী আবেগকে তাঁর মনে হয়েছে বিরূপ শক্তির অন্ধ বৈঠার টান।

ফলে রাজনৈতিক অঙ্গনের আবেগ তাঁকে ভুল বুঝেছে, যেমন তাঁর স্বদেশে, কখনো বিদেশে, এমনকি বহুস্থানীয় কেউ কেউ। যেমন ভারতে জাতীয়তাবাদীরা, তেমনি শান্তিবাদী, ফরাসি বুদ্ধিজীবী রঁমা রলাঁ। এ পরিপ্রেক্ষিতে রবীন্দ্রনাথ আন্তর্জাতিক চেতনা ও মানবিক চেতনাকে অধিকতর গ্রহণযোগ্য বিবেচনা করেছেন। গোটা পৃথিবীকে দেখতে চেয়েছেন মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন বিশ্ব হিসেবে। তেমনি সমাজকেও। বাদ যায় না সংস্কৃতিচিন্তা।

এমন এক সর্বজনীন মানবিক মূল্যবোধের পৃথিবী কবি-দার্শনিক রবীন্দ্রনাথের আকাঙ্ক্ষিত, তাঁর অন্বিষ্ট। এমন এক পৃথিবীকে প্রতিক্রিয়াশীল ও যুদ্ধবাজ নেকড়েদের হাতে তুলে দেওয়া যায় না। সেখানে প্রয়োজনে প্রতিবাদ অবশ্যকর্তব্য বিষয়। অবশ্য তা থেকে ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদ, সর্বশ্রেণির মানুষের প্রতিবাদ, দেশ থেকে দেশে, এককথায় আন্তর্জাতিক বিশ্বে। প্রতিবাদহীন বিশ্ব কখনো নিজেকে রক্ষা করতে পারবে না। এ জন্য দরকার আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ঐক্য।

একুশ শতকে পৌঁছে, অবিশ্বাস্য মনে হলেও সাম্রাজ্যবাদ নিয়ন্ত্রিত সংকট সমাজ ও রাষ্ট্রকে সমানভাবে প্রভাবিত করে চলেছে। সমাজের, রাষ্ট্রের শক্তিমান অংশ রাজনৈতিক পুঁজিবাদ ও বাণিজ্যিক পুঁজিবাদী চরিত্র অর্জন করে চলেছে। তাই দেশে দেশে করপোরেট পুঁজির প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বুদ্ধিজীবীর কলাম প্রতিবাদ লিখিত রূপ নিয়ে প্রকাশ পাচ্ছে। কিন্তু তা বিগত শতকের শান্তি আন্দোলন ও সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক লড়াইয়ের মতো শক্তিমান হতে পারছে না।

সে সময়কার রলাঁ-বার্বুস-রাসেল-আইনস্টাইন-জিদ-রবীন্দ্রনাথ প্রমুখ লড়াকু শান্তিবাদীর তুলনায় অনুরূপ মনীষীর সংখ্যা এখন কম, প্রতিবাদী শক্তিও কম। তাই সমস্যা বাড়ছে, সংকট বাড়ছে। শক্তিশালী প্রতিবাদহীন পরিপ্রেক্ষিতে বছর কয়েক আগে বুশ-ব্লেয়ার জোট দিব্যি রক্তস্রোত বইয়ে ইরাক দখল করে নিল  যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী ইরাকি শাসক সাদ্দাম হোসেনকে হত্যা করে ইরাকের বিশাল তেলভাণ্ডার দখলে নেবে বলে। পশ্চিমা গণতন্ত্রীরা এ অন্যায়ের বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিরোধ গড়ে তোলেনি।

অনেকটা একই চরিত্রের ঘটনা প্রচ্ছন্নভাবে, পরিণামে শাসক গাদ্দাফি হত্যা ও সেখানকার তেলভাণ্ডারের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ। এরপর সিরিয়া। সে মৃত্যুর ভয়াবহতা এখনো চলমান। সক্রিয় রুশী প্রতিবাদে অবস্থা উল্টো দিকে হাঁটতে শুরু করেছে বলে বর্তমান ওয়াশিংটন শাসনের নির্দেশে মার্কিন আঘাত সিরিয়া রণাঙ্গনে হাজির। শুরু যুদ্ধবাদী ট্রাম্প জমানা।

পরিণাম কী হবে বলা কঠিন। এ শতকের বড় বিশেষত্ব উগ্র ধর্মীয় মৌলবাদী বর্বরতা, পরাশক্তির বর্বরতা এবং আঞ্চলিক যুদ্ধের অমানবিক ভয়াবহতা সত্ত্বেও শক্তিমান প্রতিবাদী বিশ্বের প্রকাশ ঘটছে না। যেমন রাজনৈতিক অঙ্গনে, তেমনি সাংস্কৃতিক বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনে। এটিই একুশ শতকের সমাজে ও রাজনৈতিক ভুবনে বড় দুর্বলতা, বড় ব্যর্থতা।

চার.

এ অবস্থায় প্রতিক্রিয়াশীল, যুদ্ধবাদী নানা মতাদর্শিক শক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নামতে পূর্বোক্ত দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে হবে রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক অঙ্গনে। দেশে দেশে সমাজে, রাজনীতিতে ঐক্যবদ্ধ, ব্যাপক প্রতিবাদী সংগঠন গড়ে তুলতে হবে শান্তি আন্দোলনের নামে। জাগরণ ঘটাতে হবে জনচেতনায়।

খোদ যুক্তরাষ্ট্রে ‘অকুপাই ওয়াল স্ট্রিটে’র মতো বিশাল গণজাগরণ কিছুটা বৈশ্বিক চরিত্র নিয়েও লক্ষ্য অর্জনে ঠিকানা খুঁজে পেল না, ব্যাপক বিশ্বযোগে বিচক্ষণ লক্ষ্যভেদী পরিচালনার অভাবে, পরিচালক রাজনৈতিক শক্তির অভাবে। ১ শতাংশের বিরুদ্ধে ৯০ শতাংশের দাবির স্লোগান ব্যর্থতায় পর্যবসিত হলো। মূলত জনবিচ্ছিন্ন, মধ্যশ্রেণিপ্রধান সঠিক লক্ষ্যহীন আন্দোলনের এমন পরিণতিই ঘটে।

তবু গুরুত্বপূর্ণ, ব্যাপকভিত্তিক প্রতিবাদী আন্দোলনের গুরুত্ব ও এর উত্তর প্রভাব অস্বীকার করা চলে না। সমাজে এর প্রভাব তাত্ত্বিক হলেও দাগ কাটে। এজাতীয় প্রতিবাদের পারম্পর্য স্থায়ী প্রভাব ও পরিবর্তনের জন্য বীজতলা তৈরিতে সাহায্য করে থাকে। এখানেই পূর্বোক্ত আন্দোলনের ইতিবাচক দিক। তবে দেশটা যুক্তরাষ্ট্র বলে কথা। এর ব্যাপারস্যাপারই আলাদা। এর সামাজিক বিন্যাসও বড় অদ্ভুত। ৯০ শতাংশের পক্ষে আবার কবে স্লোগান উঠবে কে জানে।

তাই বলে সব দেশ তো যুক্তরাষ্ট্র নয়। নয় মিসর বা মধ্যপ্রাচ্যের শেখতন্ত্র বা রাজতন্ত্র। প্রতিবাদহীন, প্রতিকারহীন বিশ্বে এমন দেশ, এমন সমাজ কি একেবারে নেই যেখানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ উচ্চারিত হতে পারে, প্রতিবাদ ছড়িয়ে যেতে পারে দেশ দেশান্তরে? তৈরি করতে পারে বিশ্বভিত্তিক শান্তিবাদী আন্দোলন? তবে সময়টা এখন দুঃসময়, দেশ থেকে দেশে এবং গোটা বিশ্বে।

রবীন্দ্রনাথ তাঁর কালে প্রতাপশালী, প্রভুত্ববাদী ও যুদ্ধবাদী শক্তির রাষ্ট্রিক ও সামাজিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বরাবর প্রতিবাদ জানিয়েছেন কঠোর ভাষায়। তাঁর ভাষায় ‘প্রতাপশালীর প্রতাপের আগুন জ্বালানো হয়েছে অসংখ্য দুর্বলের রক্তের আহুতি দিয়ে। ...এ সভ্যতা ক্ষমতা দ্বারা চালিত, এতে মমতার দান অল্প। এ সভ্যতায় পৃথিবীজুড়ে মানুষের ভয়ে মানুষ কম্পানিত (১৯৩৬)।

বিগত শতাব্দীর তিরিশের দশকে লেখা রবীন্দ্রনাথের চিঠিগুলোয়ও সাম্রাজ্যবাদী হামলা ও দলিতের কান্নায় তাঁর চিত্তে রক্তক্ষরণ ঘটেছে। প্রতিক্রিয়ায় ফুটে উঠেছে প্রতিবাদ। দূর আবিসিনিয়ার ঘটনা বা স্পেনীয় বর্বরতা থেকে আক্রান্ত চীনের প্রতি রবীন্দ্রনাথের মর্মবেদনার প্রকাশ ছিল গভীর মানবিক চরিত্রের। সংগোপন মর্মবেদনাই নয়, প্রকাশ্য প্রতিবাদেও ঘটেছে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া।

একই বিষয়ে একাধিক একান্তজনের কাছে প্রতিবাদী প্রতিক্রিয়ার প্রকাশ ঘটিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ, কখনো সরস তির্যক ভঙ্গিতে, কখনো বা বলিষ্ঠ নৈতিক ভাষ্যে। অতীব প্রিয়জন কবি অমিয় চক্রবর্তীকে লেখা এক চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন : ‘ভেবে দেখো, ঐতিহাসিক বিপ্লবে কবির আলটিমেটাম আমি ইতিপূর্বেই দিয়ে দিয়েছি,...তার মেয়াদের শেষ তারিখ হয়তো বহু শতাব্দী পরে’ (১৯৩৯)।

বিশ শতকে ইউরোপীয় মনীষীদের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত বিশ্বশান্তি সম্মেলনগুলোর মর্মবাণীর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ বরাবর একাত্ম। সেখানে মূল কথা : ‘এই যুগসন্ধিক্ষণে নীরবতার অর্থ পাপ। আগামী দিনের যুদ্ধ সভ্যতাকে ধ্বংস করবে। আমরা চাই যুদ্ধ চিরতরে নির্বাসিত হোক। সংস্কৃতি যে অঙ্গনেই বিপন্ন হবে তার প্রতিরক্ষায় আমরা প্রস্তুত থাকব। ’ রবীন্দ্রনাথের স্বাক্ষরে ধন্য এ বৈশ্বিক ঘোষণা একালের জন্য আরো সময়োচিত ও রাজনৈতিক তাৎপর্যে গুরুত্বপূর্ণ। সে দায়িত্ব পালনের ভার এখন একালের রাজনীতিসচেতন মানুষের ওপর, সংস্কৃতিকর্মীদের ওপর ন্যস্ত।

‘নীরবতার অর্থ পাপ’ এই মহত্ সত্যটি আমাদের জন্য জপমন্ত্র হয়ে ওঠা দরকার। কারণ বিশ্বশান্তি এখন বেশি মাত্রায় বিপন্ন। সাম্রাজ্যবাদী শক্তির শিরোমণি যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক আসনে এখন এমন একজন মানুষ আসীন, যাঁর কাছে কোনো অশান্তিই অশান্তি নয়। বিশ্বসভ্যতা ও বিশ্ব সংস্কৃতির মূল্য তাঁর কাছে কানাকড়ির। আধিপত্যবাদ তাঁর মূলমন্ত্র।

তাই রবীন্দ্রনাথের প্রতিবাদের ভাষা, প্রতিরোধের চেতনা আজ যেন আমাদের উদ্দীপ্ত করে বিশ্বজনীন বিশ্বশান্তির বোধে। বিশ্ব সংস্কৃতিকে প্রতিবাদী চেতনায় জাগিয়ে তোলার মহত্ আদর্শে। ঐক্যবদ্ধ সক্রিয় প্রতিবাদে আমরা যেন বিশ্বযোগে একাত্ম হতে পারি, যেখানে থাকবে না জাতি-ধর্ম-বর্ণভেদ। মানবিক বিশ্বকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে যুদ্ধ নামক দানবকে পরাজিত করতে হবে। আবারও বলি, এ ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ আমাদের প্রেরণা।

 

লেখক : কবি, গবেষক, ভাষাসংগ্রামী







« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: info@iportbd.com, বার্তা বিভাগ: newsiport@gmail.com